মাহফুজ সাদি

ছেলেবেলায় গ্রামেই বড় হয়েছি, বাংলাদেশের দক্ষিণবঙ্গের ঝালকাঠীতে। কৈশোরও কেটেছে গ্রামীণ সংস্কৃতিতে। ঋতুর বদলে চৈত্র এলে কাঠ ফাটা রোদের উষ্ণতায় উত্তপ্ত ধূ ধূ মাঠ বাতাসার মতো সাদা মনে হতো। কিন্তু বৈশাখী নতুন পানিতে মাঠ-ঘাট কেবল তৃষ্ণা মিটিয়ে বসন্তের মতোই শান্ত হতো না, থৈ থৈ পানিতে খাল-বিল কুমারী মেয়ের মতো টলমল করতো।

কালবৈশাখী ঝড় যদিও আমের মুকুলে আঘাত করতো, কিন্তু বৈশাখ যে এসেছে, হালখাতার যে সময় হয়েছে, ক্ষেতে যে নতুন স্বপ্ন বোনার সময় ডাকছে- তা শুনিয়ে, জানিয়ে ও বুঝিয়ে দিতো। তবে যৌবনে এই রাজধানী শহরে পা দিতে না দিতেই সেসব ছোঁ মেরে কেড়ে নিয়েছে। কিন্তু সেই শূন্যতা নিয়ে এই শহরে আজো ক্ষয়ে, বয়ে, সয়ে ও রয়ে গেছি আমি এবং আমরা।

আমার ন্যায় অন্যেরাও কেন্দ্রীভূত এই দেশের রাজধানী শহর ঢাকায় এসেছি, আসছি এবং আসবো। এই আসার কারণ ভিন্নতর হলেও শহুরে অন্তঃসারশূন্য সংস্কৃতি কাউকে গ্রাস করছে, কাউকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে, কাউকে শূন্যতায় ভাবিয়ে তুলছে- এ কথা সকলেই এক বাক্যে স্বীকার করবেন।

এ ক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য কথা হলো- প্রতিটি মানুষ তার হাজারটা মুখোশের আড়ালে প্রধানত দুটো ভিন্নরূপ ধারণ করে চলে। এর ফলে প্রত্যেকে একই সাথে শিকারি এবং শিকার হয়ে থাকে, একই সঙ্গে নিষ্পাপ এবং পাপীও হয়। কখন কোন মানুষের কোন রূপ প্রকাশ পায়, তা বোঝা বড় দায়! তবে বোঝার ভান করা, না বোঝা বা ভুল বোঝার যে প্রবণতা চলছে, তা ছাপিয়ে সঠিক পথেই হাঁটবে আমাদের সংস্কৃতি, বৈশাখী ঐতিহ্য।

অনেকেই বলে থাকেন, নিরাপত্তার ভাঁজে ভাঁজে বাড়তি কড়াকড়ি সাজিয়ে আরোপ করা হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হবে না। এই আরোপিত অযাচিত বিধি-নিষেধের চোটে মুখোশের মতো কিছু জিনিস খসে পড়ছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে (থাকবে হয়তো) আগামীতে আরও অনেক কিছু খসে ও ধসে যাবে। এক পর্যায়ে হয়তো পাওনা আদায়ের উৎসব হিসেবে বৈশাখী হালখাতা গ্রাম হয়ে এই শহরেও এসে হাজির হবে। তবে তা অনিবার্য হিসেবেই অধিকার আদায়ের উৎসবে রূপান্তরিত হবে। সেইসঙ্গে সময়ের ব্যবধানে প্রকৃত ও নিজস্ব ঐতিহ্য ফিরতে বাধ্য। কেননা, প্রত্যেক জাতি তার মূলের দিকে ধাবিত হয়। বিদ্যমান অবস্থা থেকে যে কাঙ্খিত উত্তরণ ঘটবে, তাতে কোনো অতিমাত্রায় নজরদারি ব্যবস্থা থাকবে না, প্রয়োজনও পড়বে না- সেই সমাজ হবে সর্বাঙ্গীনভাবে সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ এবং বিভিন্ন মত ও পথের সমন্বয়ে এক বৃহৎ জাতীয় রাষ্ট্র সমাজ।

আমাদের মনে রাখা দরকার, পৃথিবীতে মানুষ চাইলে সব কিছু পেতে পারে শুধু ভালোবাসা ছাড়া। আমরাও সব কিছু পেতে পারি আমাদের মাঝে থেকে যাওয়া কিছু সীমাবদ্ধতা ভালোবাসায় রূপান্তরিত করে। আমাদের নবীনেরা, তরুণ প্রজন্ম এই চেতনাকেই জাগ্রত করেছে, করে চলেছে। যার প্রমাণ মেলে দীর্ঘদিন ধরে চলা চাকরির ক্ষেত্রে কোটা সংস্কার এবং নিরাপদ সড়কের সাম্প্রতিক আন্দোলনে। যদিও এর আগে আমরা শাহবাগ ও শাপলা চত্বরের আন্দোলনের মাধ্যমে আমাদের জাতিকে বিভক্ত করার চেষ্টা দেখেছি। তবে আমরা সে বিভাজন পেছনে ঠেলে সামগ্রিক জাতীয় চেতনায় ফিরতে পেরেছি, এই ফেরা আগামী দিনগুলোতে আরও স্বতঃস্ফূর্ত, বেগবান ও ঐক্যবদ্ধ হবে। যদিও আমাদের রাজনীতিকরা প্রধান দুটি শিবিরে আবিষ্ট হয়েছেন, কিন্তু নতুন স্রোত তাদেরকেও সঠিক পথ বাতলে দিতে সক্ষম হবে।

সর্বোপরি বিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারি, মঙ্গল শোভাযাত্রাগুলো অমঙ্গল নির্মূলের মিছিলে পরিণত হবে। ভিড়ে চোখ আর হাসির আড়ালে চরিত্রহীনদের নিগ্রহের পরিবর্তে দ্রোহের তেজে উচ্ছ্বাসের দেখা মিলবে। নিরাপত্তার চাদরে ঢাকতে হবে না এই ঢাকা নগরী- উন্মুক্ত নগরেই প্রত্যেকে অতন্দ্র প্রহরী হয়ে উঠবে। এভাবেই কোনো এক বর্ষবরণে নতুন এক বাংলাদেশকে অবাক বিস্ময়ে দেখতে পাবে বিশ্ববাসী। সেই বাংলা এবং দেশ আমার হবে, সবার হবে।

এই বৈশাখে সেই ঝড় উঠুক মনে,
শেকড়ের সন্ধানে জাগুক শিহরণে…