বিশ্বের বহু দেশ দারিদ্র জর্জরিত। দারিদ্রতা হল মানুষের জরুরি বিষয়, যা নজর দেওয়া আবশ্যিক। সত্তর কোটি লোক একদম দারিদ্র সীমার নীচে বাস করে। পঞ্চাশ লক্ষ পাঁচ বছরের নীচে শিশু প্রতি বছর নানা অসুখে মারা যায়। অথচ তাদের অল্প পয়সায় ও বাঁচানো যায়। বিশ্বের অর্ধেক শিশু, স্কুলের দোরগোড়ায় যেতে পারে না, ন্যূনতম লিখতে অংক করতে শিখতে পারে না। মূল সমস্যা টাকার অভাব- দারিদ্রতা।

অ্যালবার্ট অশোক

এই বিষয় গুলিকে নিয়ে বহু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকরা গবেষণা করছেন। যে যা ভাবেন দারিদ্রতা থেকে মুক্তির উপায়, তাই নিয়ে কাজ করছেন, দেখছেন তাদের ভাবনা কতটুকু সফল। এই অর্থনীতি বিজ্ঞানকে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য, বিশ্ব নাগরিকদের উৎসাহ হেতু, ১৯৬৮ সালে সুইডেনের ব্যাংক, অর্থনীতি বিজ্ঞানে মানুষকে উৎসাহিত করার জন্য আলফ্রেড নোবেলের স্মৃতিতে চালু করেছে (The Sveriges Riksbank Prize in Economic Sciences in Memory of Alfred Nobel, informally known as The Nobel Memorial Prize in Economic Sciences)। মানে নোবেল স্মৃতি পুরস্কার। পুরস্কারের টাকা নোবেল কমিটি দেয় না, সুইডেনের ব্যাংক দেয় আর তা সুইডিশ অ্যাকাডেমির (The Royal Swedish Academy of Sciences) মাধ্যমেই দেয়।

আলফ্রেড নোবেল, (Alfred Bernhard Nobel, (born October 21, 1833, Stockholm, Sweden-died December 10, 1896, San Remo, Italy) একজন রসায়ন বিজ্ঞানী ও ব্যবসায়ী, তার বন্দুক বানানোর কারখানা (artillery factories), ডিনামাইট ও নানা বিস্ফোরক বোমা (dynamite and other explosives) আবিষ্কার থেকে বিশাল সম্পত্তি বানিয়েছিলেন। আজকের দিনে সে সম্পত্তির পরিমাণ ভারতীয় মুদ্রায় ১৫০০ কোটি টাকার মত ( £148m). মৃত্যুর ১ বছর আগে তার বিশাল সম্পত্তি থেকে পাঁচটি পুরষ্কার ঘোষণা করে উইল করে যান। ৫টি বিষয় যথা physics, chemistry, physiology or medicine, literature and peace. শুধু peace বা শান্তির পুরস্কার বাদে বাকি ৪টি পুরস্কার সুইডেন থেকে দেওয়া হবে এবং শান্তির পুরষ্কার দেওয়া হবে নরওয়ে থেকে। কেন নরওয়ে থেকে দেওয়া হবে এর কোন ব্যাখ্যা তিনি দেননি। আলফ্রেড নোবেলের নামানুযায়ী পুরস্কারই নোবেল পুরস্কার নামে খ্যাত।

সুইডেনের ব্যাঙ্ক The Sveriges Riksbank, আলফ্রেডের মহান পুরস্কারের কথা মাথায় রেখে রয়েল সুইডিশ অ্যাকাডেমিকে অর্থনীতির পুরষ্কার আলফ্রেডের স্মরণে দিতে চাইল। এবং সেই পুরস্কারের নাম The Sveriges Riksbank Prize বা Nobel Memorial Prize. আলফ্রেডের পরিবারের সদস্যরা অর্থনীতির জন্য সুইডেনের ব্যাংক এর দান দেওয়া পুরস্কার নোবেল পুরস্কারের সঙ্গে মেশাতে বারণ করল ফলে, অর্থনীতির জন্য পুরস্কারের নাম হল The Sveriges Riksbank Prize in Economic Sciences in Memory of Alfred Nobel, informally known as The Nobel Memorial Prize in Economic Sciences. এই অর্থনীতির নোবেল স্মৃতি পুরস্কারের সঙ্গে বাংলার দুই জনের নাম সম্প্রতি যুক্ত হল। ফলে বাঙালির যার পর নাই আহ্লাদিত।

অমর্ত্য সেন ১৯৯৮ সালে (একাই) এই পুরস্কার পান। তিনি Trinity College, Cambridge, U.K.-র অধ্যাপক ছিলেন তার নাগরিকত্ব ভারতীয় ছিল। তিনি Social Choice, Welfare Distributions, and Poverty-র উপর কাজ করেছিলেন। তার অনেকগুলি মুখ্য গবেষণা ছিল on fundamental problems in welfare economics. তার অবদান ছিল axiomatic theory of social choice, over definitions of welfare and poverty indexes, to empirical studies of famine. তার তাত্ত্বিক গবেষণা economic mechanisms underlying famines দুর্ভিক্ষের তলায় অর্থনৈতিক যান্ত্রিকতা বুঝতে সাহায্য করেছিল। ১৯৭৪ সালে বন্যায় বাংলাদেশের দুর্ভিক্ষের উপর আলোক পাত ছিল খাবারের দাম বেড়ে গিয়েছিল এবং চাষিদের রোজগার নেমে গেছিল। তিনি দেখিয়েছিলেন দুর্ভিক্ষ কি করে রোধ করা যায়।

এ বছর ২০১৯ সালের, এই পুরস্কার The Sveriges Riksbank Prize বা Nobel Memorial Prize পেয়েছেন তিনজন যৌথ ভাবে। পুরস্কার প্রাপকরা হলেন: ১.অভিজিৎ ব্যানার্জী, ভারতীয় বংশোদ্ভূত আমেরিকার নাগরিক, মুম্বইয়ে ১৯৬১ সালে জন্মান। ৫৮ বছর বয়েস (Abhijit Banerjee, born 1961 in Mumbai, India. Ph.D. 1988 from Harvard University, Cambridge, USA. Ford Foundation International Professor of Economics at Massachusetts Institute of Technology, Cambridge, USA )

২. এস্থার ডাফলো, ফরাসি-আমেরিকান, জন্ম ফ্রান্সে,১৯৭২ সালে। ৪৭ বছর বয়স। (Esther Duflo, born 1972 in Paris, France. Ph.D. 1999 from Massachusetts Institute of Technology, Cambridge, USA. Abdul Latif Jameel Professor of Poverty Alleviation and Development Economics at Massachusetts Institute of Technology, Cambridge, USA.) ৩. মাইকেল ক্রেমার, ১৯৬৪ সালে জন্ম, আমেরিকান, ৫৪ বছর বয়েস। (Michael Kremer, born 1964. Ph.D. 1992 from Harvard University, Cambridge, USA. Gates Professor of Developing Societies at Harvard University, Cambridge, USA.) অর্থাৎ পুরষ্কারের টাকা, নয় মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনার, ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় সাড়ে ছয় কোটি টাকার মতো ( 6,52,86,612 Indian rupee) তিন জনকে ভাগ করে দেওয়া হবে।

এই তিনজন, রয়েল সুইডিশ অ্যাকাডেমির কথায়, বিশ্ব দারিদ্রতা দূরীকরণে নানা পরীক্ষামূলক পথের দিশা দেখিয়েছেন। ‘for their experimental approach to alleviating global poverty.’ পুরস্কার বিজেতারা এর উপর নানা পদক্ষেপ নিয়ে ভেবেছেন ও কল্যাণমূলক কাজ করছেন। তাদের দেখানো পথে দারিদ্রতার বিরুদ্ধে লড়াই সম্ভব।

এই তিনজন, গত দুই দশক ধরে গবেষণা করছেন। এ বছর প্রায় ৫৭ হাজার লেখকের অর্থনীতির উপর কাজ করছেন বলে নাম এসেছে। (56, 942 authors, RePEc. Research Papers in Economics; a central index of economics research) তার মধ্যে তিন জনকে বেছে নেওয়া খুব কঠিন কাজ ছিল। জনপ্রিয়তার বা মেরিট নিরিখে Esther Duflo is ranked 3rd worldwide. Abhijit Banerjee is ranked 163rd worldwide and Michael Kremer is ranked 260th worldwide. সারা বিশ্বে তাদের ডাফলো ও অভিজিৎ এর গবেষণা ২৪০টি পরীক্ষা হয়েছে। তাঁদের দু’জনের লিখিত অর্থনীতির বই Esther Duflo is ranked 3rd worldwide. Abhijit Banerjee is ranked 163rd worldwide and Michael Kremer is ranked 260th worldwide. তাঁদের গবেষণা ও ভাবনার সাক্ষী।

বাংলার অর্থনীতির নোবেল বলতে যে দুইজন পেয়েছেন, অমর্ত্য সেন, ভারতীয় নাগরিক, বাংলায় থেকে, বাংলায় কাজ করে, কোনওদিন পেতেন না। বহুদিন ইংরেজ দেশে থেকে, অধ্যাপনা করে ইংরেজ সেজে গবেষণা করে পেয়েছেন। অভিজিৎ ব্যানার্জী মুম্বাই জন্ম, বহুদিন আমেরিকার নাগরিক। তাঁর লেখা ও জীবন আমেরিকার। শুধু তার পিতামাতা বাংলার। এই নিয়ে বাঙালিদের হাসি কান্না মজা চলছে।

বাঙালি কোনওকালে কিছু পাওয়ার যোগ্যতা রাখে না, যা পায় লটারির মতন। না-হলে গত ১০০ বছরের অধিক সময়ে ভারতে ১০টি নোবেল এসেছে, অভিজিৎকে গুনলে। কিন্তু সেই তুলনায় আমেরিকা এক তৃতীয়াংশের বেশি নোবেল পুরস্কার, ৩৬৮টা পেয়েছে, ব্রিটিশরা পেয়েছে ১৩২ টা, খোদ সুইডেন পেয়েছে মাত্র ৩০ টা। তো ভারতের লোকদের গর্ব করার কি থাকতে পারে!

নোবেল পুরস্কার গড়ে দেখা যায় ৬৩ বছর না হলে পাওয়া যায় না। কোনও সৃষ্টিশীল কাজ করে ম্যানিপুলেট করতে ন্যূনতম ২৫ বছর লাগে। বড় পুরস্কার আশা করলে আপনাকে বাংলার বাইরে ইংলিশ জল খেতে হবে, অবাঙালি বা ইংলিশ বিয়ে করতে হবে, আর দীর্ঘদিন ইউরোপ আমেরিকায় থেকে সেখানকার নাগরিক হলে আপনি দীক্ষিত হবেন। তারপর পুরস্কার। এখানকার জলবায়ু বাংলা সিনেমা টিভি সিরিয়ালের প্যানপানানি। যেমন ন্যাতা, তেমন তার রাজ্যবাসী।
অভিজিৎ ব্যানার্জী, একজন ব্যক্তি হিসাবে পরিশ্রম করেছেন, পুরস্কৃত হয়েছেন। তাকে অভিনন্দন। তিনি বাঙালি নন, এই বিশ্বের নাগরিক!