সুকুমার মণ্ডল

রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের মধ্যে সাক্ষাতের স্থান ও নির্দিষ্ট তারিখ নিয়ে মতানৈক্য থাকলেও, ১৯২১ সালেই যে ওই কবিদ্বয়ের মধ্যে প্রথম দেখা হয়েছিল, এটা একরকম নিশ্চিতই। তবু তাঁদের এই ‘দেখা’-হয়ে-ওঠা রবীন্দ্রনাথের দিক থেকে কতটুকু ‘সাক্ষাৎ’ হয়ে উঠেছিল, তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ আছেই। অর্থাৎ দুজনের মধ্যে কবিতা ও গান নিয়ে নানা কথা হলেও, রবি ঠাকুর তাঁর নজরুলকে কতখানি বুঝতে পেরেছিলেন, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়।

রবীন্দ্রনাথ নজরুলকে তলোয়ার দিয়ে দাড়ি চাঁছার কথা বলেছিলেন। ঠাকুরের এই বলার অভিপ্রায়কে নানারূপে বিশ্লেষিত করা হলেও, তিনি যে তাঁর অনুজ কবির রাজনৈতিক শেকড়টিকে তখনও ঠিকমতো বুঝে উঠতে পারেননি, এইমত অনুভব ছিল স্বয়ং নজরুলেরই। কবিতা, গান আর কাব্যচর্চাই হবে তাঁর পথ ও পাথেয়, এইমত ভাবনা থেকেই, কবিগুরু নজরুলকে শান্তিনিকেতনে স্থায়িভাবে থাকার প্রস্তাবটিও দিতে পেরেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন, সেখানে নজরুল ছেলেমেয়েদের ড্রিল শেখাবেন, আর দীনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে নিজে শিখবেন গান। কিন্তু নজরুল ইসলাম কবিগুরুর সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেননি।

১৯২২ সালের মে-জুন মাস। অসহযোগ আন্দোলন স্তিমিত হয়ে এল। ‘সেবক’ ছিল সেই সময়ের বাংলা দৈনিক কাগজ। কাগজটি এই আন্দোলনের সমর্থনে কাজ করতো। এবং এই কাগজে লিখতেন নজরুল। একদিকে, কাগজটির মালিক ও সম্পাদক মাওলানা মুহম্মদ আক্রম খান রাজদ্রোহের অপরাধে এক বছরের জেলবন্দী হয়ে আছেন। অন্যদিকে, নজরুল ইসলামও কলকাতা থেকে কুমিল্লায় চলে গেছেন। কাগজটির তখন করুণ অবস্থা, বিক্রি নেই তেমন। তখনকার দিনে তো আর অন্তর্জাল ছিল না! তাই সেখান থেকে লেখা পাঠানো ছিল অসম্ভব।

মাসিক একশ টাকা বেতনের বিনিময়ে কলকাতায় এসে তিনি ‘সেবক’-র জন্য আবার লেখা শুরু করুন, এইমত বিশেষ অনুরোধে নজরুল কলকাতায় ফিরেও এসেছিলেন। কিন্তু নজরুলের মতো একজন স্বাধীনচেতা মানুষের লেখাও ‘সেবক’ নিয়ন্ত্রণ করত। সেখানে তিনি সুখী ছিলেন না । এমত অবস্থায়, মসউদ আহমদ নামক একজন হাফিজ একটি বাংলা সাপ্তাহিক কাগজ বের করতে চাইলেন, যার উদ্দেশ্য হবে সম্পূর্ণত রাজনৈতিক। তিনি নজরুলকে বলেন, কাগজটির প্রকাশের আনুকূল্যে তিনি আড়াইশ টাকা যোগাড় করেছেন। মাত্র আড়াইশ টাকা হাতে নিয়ে কাগজ করতে নেমে পড়া ঝুঁকির কাজই ছিল। তবু নজরুল সহজেই রাজি হয়ে গেলেন।

নজরুল কাগজের নাম স্থির করলেন, ‘ধূমকেতু’। ঠিক হল, সম্ভব হলে, কাগজটি সপ্তাহে দুবার বেরোবে। আফজালুল হক মুদ্রাকর ও প্রকাশক হিসেবে আদালতের কাছ থেকে ডিক্লারেশন নিলেন। একদিকে যেমন ‘বাসন্তী’ ও ‘অমৃতবাজার’ সহ সমকালীন পত্রিকাগুলি ‘ধূমকেতু’-র আবির্ভাবকে স্বাগত জানাল, অন্যদিকে তাকে আক্রমণের শিকারও হতে হয়েছিল। ১৯২২ সালের ১১ই আগস্ট, বাংলা ২৬ শ্রাবণ ১৩২৯ শুক্রবার ‘ধূমকেতু’-র প্রথম সংখ্যা বের হল। ঠিকানা: ৩২ নং কলেজ স্ট্রীট, কলিকাতা। মুদ্রক: মেটাকাফ প্রেস: ৭৯ বলরাম দে স্টীট, কলিকাতা। প্রথম সংখ্যায় কাগজটির সম্পাদক ও স্বত্বাধিকার হিসেবে কাজী নজরুল ইসলামের নাম ছাপা হয়েছিল। পরে, অষ্টম সংখ্যা থেকে ‘সারথী’ হিসেবে নজরুলের নাম ছাপা হতে লাগল।

কাগজটির কর্মসচিব ছিলেন শ্রী শান্তিপদ সিংহ। ‘ধূমকেতু’ ছিল ফুলস্কেপ বা ক্রাউন ফলিও সাইজের আট পৃষ্ঠার কাগজ। কাগজটিতে লেখা থাকত ‘কলকাতার সবচেয়ে বেশী কাটতির কাগজ’। এক কপি ‘ধূমকেতু’-র নগদ মূল্য ছিল এক আনা এবং বাৎসরিক গ্রাহক চাঁদা পাঁচ টাকা। প্রসঙ্গত, প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই কাগজটির প্রথম সংখ্যা শেষ হয়ে যায়। পরিকল্পনা অনুসারে, ‘ধূমকেতু’ সাপ্তাহিক থেকে কিছুদিন অর্ধ-সাপ্তাহিক হিসেবেও বেরোতে থাকে। ধূমকেতু “হপ্তায় দু’বার দেখা দেবে”, কাগজটিতে এইমত ঘোষণাও থাকত। কাগজটি তখন সপ্তাহের শুক্রবার ও মঙ্গলবার বেরত। শীঘ্রই কাগজটির আর্থিক সংকট দেখা দেয়।

মসউদ আহমেদ তাঁর প্রতিশ্রুত আড়াইশ টাকাও দিতে পারেননি। তিনি সম্ভবত দু’শ টাকা পর্যন্ত দিতে পেরেছিলেন। এরপরেও কাগজটি যে বেরোতে পারছিল, তার কারণস্বরূপ ছিল কাগজটির নগদ বিক্রয় বাবদ ও অগ্রিম বিজ্ঞাপন বাবদ কিছু টাকা। বিশেষত ‘এক্সপার্ট এডভারটাইজিং এজেন্সী’ আর্থিক ব্যাপারে ‘ধূমকেতু’-কে অনেক সাহায্য করে। সর্বমোট ‘ধূমকেতু’-র ৩২টি সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল। তার মধ্যে পাঁচটি বিশেষ সংখ্যা। কাগজটিতে রবীন্দ্রনাথ সহ অনেক খ্যাত-অখ্যাত কবি-লেখকদের রচনা প্রকাশিত হয়। গদ্য রচনাকারদের মধ্যে ছিলেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, শৈলজা মুখোপাধ্যায়, হুমায়ুন কবির, প্রবোধ চন্দ্র সেন প্রমুখ। আর কবিতা লিখেছেন অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, শিবরাম চক্রবর্তী, জিতেন্দ্রনাথ লাহিড়ী সহ আরও অনেক কবি।

তবু, ‘ধূমকেতু’-র মূল উদ্দেশ্যটি ছিল যেহেতু রাজনৈতিক, তাই এই কাগজটিকে ঘিরে কোনও সাহিত্য গোষ্ঠী তৈরি হয়নি। তবে, শুধু দেশীয় নয়, আন্তর্জাতিক যেকোনো রাজনৈতিক লেখা, বিশেষত সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লেখা, ধূমকেতু নির্ভীকতার সঙ্গে প্রকাশ করত। দেশ ও বহির্বিশ্বের সংবাদের জন্য ছিল ‘দেশের খবর’, ‘মুসলিম জাহান’ ও ‘পরদেশী পঞ্জী’ প্রভৃতি বিভাগ। সবচেয়ে জনপ্রিয় ‘খাট্টামিঠা’ বিভাগে সম্পাদকের কৌতুক মন্তব্য সহ সংবাদ প্রকাশিত হত। ‘সাড়ে বত্রিশ ভাজা’ বিভাগে বিশ্বের ছোট ছোট ঘটনা এবং ‘অগ্নি সম্মহিনী’ বিভাগে থাকত দেশি-বিদেশি সংবাদের পর্যালোচনা। এছাড়া ‘সান্ধ্য প্রদীপ’ ছিল নারীদের সমস্যা নিয়ে মেয়েদের বিভাগ। ‘শনিরপত্র’ বিভাগে থাকত সম্পাদক বা সারথীকে লেখা চিঠিপত্রগুলি। আর ‘হংসদূত’ বিভাগটিতে প্রকাশিত হত বিশিষ্ট জনের আশীর্বাণী।

তাঁর আবেগতাড়িত নিবন্ধে নজরুল মূলত আবেদন জানাচ্ছিলেন শিক্ষিত মধ্যবিত্ত তরুণদের কাছে। চরমপন্থী বিপ্লবীরা যেহেতু এই সম্প্রদায়ের, তাই ধূমকেতু শীঘ্রই তাদের কাছে খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। ১৯২২ সালের ১৩ ই অক্টোবর কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর ধূমকেতুর পাতায় লিখলেন:

“সর্বপ্রথম ‘ধূমকেতু’ ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা চায়।
স্বরাজ টরাজ বুঝি না, কেন না, ও-কথাটার মানে এক এক মহারথী এক এক রকম করে থাকেন। ভারতবর্ষের এক পরমাণু অংশও বিদেশীর অধীনে থাকবে না। ভারতবর্ষের সম্পূর্ণ দায়িত্ব, সম্পূর্ণ স্বাধীনতা রক্ষা, শাসন-ভার সমস্ত থাকবে ভারতীয়ের হাতে। তাতে কোন বিদেশীর মোড়লী অধিকারটুকু পর্যন্ত থাকবে না। যাঁরা এখন রাজা বা শাসক হয়ে এদেশে মোড়লী করে দেশকে শ্মশানভূমিতে পরিণত করেছেন, তাঁদের পাততাড়ি গুটিয়ে, বোঁচকা পুটলি বেঁধে সাগরপাড়ে পাড়ি দিতে হবে।”

পাঠক, লক্ষ করুন, নজরুল বলছেন, “সর্বপ্রথম ‘ধূমকেতু’ ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা চায়”। আমরা যেভাবে ইতিহাস পড়েছি তাতে শ্রী অরবিন্দ ঘোষ, সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও বিপিনচন্দ্র পাল এর বহু আগেই ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি করেছেন। কিন্তু পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, শ্রী অরবিন্দ ‘অটোনমি ও সেল্ফ গভর্নমেন্ট’, এই শব্দ ব্যবহার করেছিলেন। একবারের জন্যেও কিন্তু ‘ইনডিপেন্ডেন্স’ শব্দটি ব্যবহার করেননি। সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ও ‘অটোনমি ও সেল্ফ গভর্নমেন্ট’-ই দাবি করতেন। আর বিপিনচন্দ্র পাল তো বলেছিলেন তিনি ‘ডোমিনিয়ন স্ট্যাটাস’কেই বেছে নেবেন।

এখন কথা হল, রাষ্টবিজ্ঞানের পরিভাষায়, ‘অটোনমি’, ’সেল্ফ গভর্নমেন্ট’ ও ‘ইনডিপেন্ডেন্স’ কিন্তু একার্থবোধক নয়। যাইহোক, প্রকাশ্য খবরের কাগজে এমন চাঁছা-ছোলা ভাষা প্রয়োগের পর নজরুলের গ্রেফতারটুকু ছিল শুধু সময়ের অপেক্ষা। ১৯২২-এর ‘ধূমকেতু’-র পূজা সংখ্যায় নজরুলের ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ শীর্ষক একটি কবিতা এবং এগারো বছরের বালিকা লীনা মিত্রের একটি গদ্য ‘বিদ্রোহীর কৈফিয়ৎ’-এর উপর রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ এনে কাগজটিকে বাজেয়াপ্ত করা হয়। এই কথিত অপরাধে নজরুলকে ওই বছর ২৩শে নভেম্বর কুমিল্লা থেকে গ্রেফতার করা হয়। প্রায় একবছর সশ্রম কারাবাস করেন নজরুল।

প্রসঙ্গত, ধূমকেতুর আত্মপ্রকাশ সংখ্যার জন্যে নজরুল, বাণী চেয়ে, রবীন্দ্রনাথ সহ আরও অনেককেই চিঠি লিখেছিলেন। কবিগুরু ততদিনে নজরুলের রাজনৈতিক দৃঢ়তাকে চিনে ফেলেছেন। নজরুলকে ‘কল্যাণীয়েসু’ সম্বোধন করে এই আট লাইনের কবিতাটি তিনি বাণীস্বরূপ লিখে পাঠান:
কাজী নজরুল ইসলাম কল্যাণীয়েষু

আয় চলে আয়, রে ধূমকেতু,
আঁধারে বাঁধ্ অগ্নিসেতু,
দুর্দ্দিনের এই দুর্গশিরে
উড়িয়ে দে তোর বিজয় কেতন!
অলক্ষণের তিলক রেখা
রাতের ভালে হোকনা লেখা,
জাগিয়ে দে রে চমক মেরে’
আছে যারা অর্দ্ধচেতন।
২৪ শ্রাবণ ১৩২৯ শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

রবি ঠাকুরের এই বাণীটি তখন প্রতি সংখ্যায় পত্রিকাটির শিরোনামের নিচে ছাপা হত। রবীন্দ্রনাথও শুরু থেকে পত্রিকাটির জন্য নিয়মিত লেখা পাঠাচ্ছিলেন। শুধু তাই নয়, ১৯২৩ সালের ২২শে ফেব্রুয়ারি রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘বসন্ত’ গীতিনাট্যটি নজরুলকে উৎসর্গ করেন। নজরুল বইটি পেয়েই বুকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। বিদ্রোহী কবির সেই মুহূর্তের অনুভব ছিল এই রকম, ‘তাঁর এই আর্শীবাদ-মালা পেয়ে আমি জেলের সর্বজ্বালা, যন্ত্রণা ক্লেশ ভুলে যাই।’ এরপরই নজরুল আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে বসে ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতাটি লেখেন।

নজরুল তাঁর ‘সঞ্চিতা’ রবি ঠাকুরকেই উৎসর্গ করেছিলেন। হুগলি জেলে থাকাকালীন রাজবন্দীদের উপর অত্যাচারের প্রতিবাদে নজরুল জেলের মধ্যেই অনশন শুরু করেন। উপরন্তু ডান্ডাবেড়ি, হ্যান্ডক্যাপ, সেল কয়েদ ও ফোর্সড ফিডিং-এর চেষ্টায় ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়েন নজরুল। তাঁর স্নেহভাজনের অনশনে বিচলিত হয়ে রবীন্দ্রনাথ নজরুলকে টেলিগ্রাম করেন। কিন্তু ‘Address not found’ লিখে সেই টেলিগ্রাম রবীন্দ্রনাথকে ফেরৎ পাঠিয়ে দেওয়া হয়। টানা চল্লিশ দিন অনশনের মাথায় বিরজাসুন্দরীর হাতে লেবুর রস খেয়ে অনশন ভাঙেন নজরুল। রবীন্দ্রনাথ ‘১৪০০ সাল’ কবিতাটি লেখেন ১৩০২ বঙ্গাব্দে। তাঁর প্রায় বত্রিশ বছর পরে নজরুল ওই একই শিরোনামে রবি ঠাকুরের প্রতি তাঁর প্রণাম-অনুরাগ কবিতাবদ্ধ করেন।