গৌতম রায়

সুচারুশরণ বাগচি। আমার স্কুল জীবনের শিক্ষক। পরবর্তী জীবনে দেশে– বিদেশে বহু মাষ্টারমশাইয়েরই পবিত্র সান্নিধ্যে এসেছি। তবুও তাঁদের ভিতরে কেমন যেন আলাদা করে চেনা যায় কৈশোরের স্কুল বেলার শিক্ষক সুচারুবাবুকে। আপাদমস্তক ভদ্রলোক। ধুতি পাঞ্জাবী আর একটা বড়ো লম্বা ছাতি, যেমনটা সে যুগে খুবই দেখতে পাওয়া যেত, এই ছিল সুচারুবাবুর পোশাক। ধুতির কোঁচাটা লুটোচ্ছে মাটিতে। রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময়ে পথের ধুলো থেকে বাঁচতে সেই ধুতির খুঁট দিয়েই নাক চাপা দিচ্ছেন মাষ্টারমশাই– এটাই ছিল তাঁর পথ চলতি একটি স্বাভাবিক দৃশ্য। সুচারুবাবুর বাড়ি থেকে তাঁর কর্মক্ষেত্রের দূরত্ব ছিল অনেকখানি। মাঝখানে রেলের কাঠের ব্রিজ পার হতে হত। এই পথটা খুব অসুবিধা না হলে প্রায় প্রতিদিনই রোদ-ঝড়-জল-বৃষ্টি উপেক্ষা করে তিনি কিন্তু হেঁটেই যাতায়াত করতেন। আসলে সে যুগের মানুষদের দৈনন্দিন জীবনচর্চাতে কায়িক শ্রমের একটাবিশেষ জায়গা ছিল। মানসিক শ্রমের সঙ্গে কায়িক শ্রমকে তাঁরা কোনও অবস্থাতেই ভয় করতেন না। ফলে দু-চার কিলোমিটার হাঁটাহাঁটি কে তাঁরা কোনও ভাবেই পরোয়া করতেন না। যদিও শৃঙ্খলা পরায়ণতার দিকটি ছিল সুচারুবাবুর জীবনের একটি বিশেষ দিক। আমাদের স্কুলে ছাত্র-শিক্ষক উভয়েরই স্কুলে হাজিরার ক্ষেত্রে সময়ের বাধ্যবাধকতার দিকটি ছিল খুব কড়া। তাই একমাত্র কোনও কারণে দেরি হয়ে গেলেই সুচারুবাবুকে রিক্সা চড়তে দেখা যেত। অন্যথায় হাঁটাই ছিল তাঁর যাতায়াতের সবথেকে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম।

সুচারুবিবুর আদি বাড়ি ছিল পূর্ববঙ্গের ময়নসিংহের আকুড়টাকুড় গ্রামে। এই গ্রামটির উল্লেখ পাওয়া যায় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মা নদীর মাঝি উপন্যাসে।আজন্ম সুচারুবাবুর যুক্তি ছিল; তিনি তো দেশত্যাগ স্বেচ্ছায় করেননি। তাঁর দেশই এখন বিদেশ হয়ে গেছে। যে ভারতভূমিতে তিনি তাঁর কর্মজীবন শুরু করেছিলেন, কর্মজীবনও শেষ করছেন সেই ভারতভূমিরই খন্ডিত অংশে। তাই তাঁর প্রশ্ন ছিল; কেন পেশাজীবনের পরিপূর্ণ সুযোগগুলি তিনি পাবেন না?
সুচারুবাবু আদ্যন্ত বামপন্থী ছিলেন। তাই বলে সেই সময়ের সরকারি বামপন্থী বলে যে রাজনৈতিক ধারার পরিচিতি ছিল, সেই ধারার মানুষ তিনি ছিলেন না। তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে সাযুজ্য ছিল ডাঙ্গের রাজনৈতিক চিন্তাধারার। আর আমাদের স্কুলের হেড মাষ্টারমশাই ছিলেন তখনকার সরকারি বামপন্থী বলে পরিচিত দলের একজন শিক্ষক নেতা। সুচারুবাবু শিক্ষকের ব্যক্তিত্বে সেই হেড মাষ্টারমশাইয়ের থেকে লক্ষ যোজন দূরে নিজেকে স্থাপিত করতে পেরেছিলেন। তাই ছাত্র-শিক্ষক-অভিভাবকদের ভিতরে তাঁর ছিল একটা অন্য ধরণের গ্রহণযোগ্যতা। সেই গ্রহণযোগ্যতার জেরে তাঁকে একটি দিনের জন্যে ও কর্তাভজা সম্প্রদায়ে নাম লেখাতে হয়নি। আর যেহেতু তিনি কর্তাভজা নন, তাই ত্যাল খেতে অভ্যস্থ দলদাস হেডমাষ্টারের পক্ষে সুচারুবাবুর মতো মুক্ত বিহঙ্গ কে মনে নেওয়াটা খুবই মুশকিলের ব্যাপার ছিল।

সুচারুবাবুর পড়াবার ভঙ্গিমাটিও ছিল ভারী সুন্দর। কেউ কোনওদিন তাঁকে বই ধরে রিডিং পড়ে যেতে শোনেনি। অথচ সিলেবাস শেষ করাতে গিয়েই সিলেবাসের অভ্যন্তরের বিষয়কে অতিক্রম করে তিনি পাঠ্যবস্তুর গহীনে ছাত্রকে যেভাবে নিয়ে গিয়ে হাজির করতেন, ছাত্রটি যদি একটু মন দিয়ে তাঁর ক্লাস শুনতো, মনে হয় সেভাবেই সিলেবাসের বাইরেও অনেক অনেক কিছু ছাত্রের মনের মণিকোঠাতে জমা হয়ে যেত। প্রবল ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন সুচারুবাবু হেড মাষ্টার মশাইয়ের সঙ্গে আদর্শগত সংঘাতে জড়িয়ে প্রবল পরাক্রম হেড মাষ্টারের অঙ্গুলি হেলনে জীবদ্দশায় পেনশনটুকু ও পাননি। বাধ্য হয়ে তাই তাঁকে অবসর গ্রহণের পর গ্রাসাচ্ছাদনের তাগিদে প্রাইভেট টিউশন পর্যন্ত করতে হত।

সুচারুবাবুর প্রাইভেট টিউশন ও তাঁর সময়কালের যে কোনও পেশাদার মাষ্টারমশাইয়ের প্রাইভেট টিউশনের থেকে গুণগত মানে একদম ই আলাদা ছিল। প্রথাগত ভাবে তিনি ছিলেন ইতিহাসের শিক্ষক। অথচ অঙ্ক থেকে শুরু করে ইংরেজি, ভূগোল– সবই ছিল তাঁর নখদর্পণে।

আসলে এটা বোবহয় সেই সময়ের বেশিরভাগ মাষ্টারমশাইয়ের একটা উজ্জ্বল বৈশিষ্ট্য ছিল এই যে, তাঁরা তাঁদের নিজস্ব সাবজেক্টের বাইরেও অন্যান্য বহু সাবজেক্টের উপরে প্রভূত জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন।