নিখিলেশ রায়চৌধুরী

বহু কাল আগে উত্তরবঙ্গের লেখক সুরজিৎ বসু-র একটি গল্প পড়েছিলাম৷ গল্পটির নাম বোধহয় ‘চরণরেখা তব’৷ তাতে ভারতের উত্তরের একটি দেশের একনায়কের কথা বলা হয়েছিল৷ তিনি তখন আর কথা বলতে পারেন না৷ পারকিনসনস ডিজিজে ভুগছেন৷ ঠোঁট নাড়লে তাঁর স্ত্রী-ই দোভাষী হিসাবে তাঁর মনের ইচ্ছার কথা জানান৷ সেনাপতিদের সঙ্গে বৈঠকে বসে এ রকম ঠোঁট নাড়িয়েই সেই একনায়ক কিছু বলতে চেয়েছিলেন৷ কিংবা স্নায়বিক কারণে তাঁর মুখ হয়তো ভেচকে গিয়েছিল৷ তাঁর স্ত্রী শ্রোতৃমণ্ডলীকে জানিয়েছিলেন, একনায়ক ‘প্যারটস নেস্ট স্যুপ’ খেতে চাইছেন৷ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কিছু জায়গায় সেই প্যারটস নেস্ট পাওয়া যায়৷ অতএব? অতএব ওই জায়গাগুলি একনায়কের দরকার৷ পেতে হলে কী করতে হবে? যুদ্ধ করতে হবে৷ ভারতের ওই অঞ্চলগুলি দখল করতে হবে৷
বলা বাহুল্য, সেই একনায়কটি ছিলেন মাও সে-তুং৷ বহু বছর ধরেই মাও সে-তুং পারকিনসনস ডিজিজে ভুগছিলেন৷ অবশ্য কারও কারও মতে রোগটি ছিল যৌনরোগ৷ যেমন সিফিলিস৷ স্মৃতিশক্তি লোপ পায়৷

আবার এও হতে পারে, তাঁর কিসুই হয়নি৷ স্রেফ মাদাম মাও-কে ছড়ি ঘোরাতে দেওয়ার সুযোগ করে দিতেই তিনি ওই ভেক ধরেছিলেন৷ মাদাম মাও ছাড়া মাও সে-তুং আর কাউকেই বিশ্বাস করতেন না৷

চীন এক দুঃখী দেশ৷ ১৯১১ সালে রাজতন্ত্রের অবসান ঘটা সত্ত্বেও সেদেশে গণতন্ত্র কখনই স্ফূরণের সুযোগ পায়নি৷ তার আগেই গৃহযুদ্ধ৷ ধুন্ধুমার৷ কমিউনিস্ট পার্টি সেদেশে গঠিত হয়েছিল রুশ বিপ্লবের অনুপ্রেরণায়৷ কিন্তু স্তালিনের আমল থেকেই চীনের কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে প্রকৃত লেনিনপন্থী বনাম স্তালিনপন্থীদের লড়াই শুরু হয়ে যায়৷ মাও সে-তুং সেই লড়াইয়ের সুযোগটা পূর্ণমাত্রায় নেন৷ তিনি ছিলেন অত্যন্ত ধুরন্ধর৷ সেইসঙ্গে আবার কবি৷ তার উপর রমণী পটাতে ওস্তাদ৷ বুঝে গিয়েছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির মাথায় চড়তে হলে এবং চীনের ক্ষমতা দখল করতে হলে তাঁকে মেকিয়াভেলির লাইন নিতে হবে৷ লেনিনের বিপ্লবী আদর্শে এগলে চলবে না৷

সরকারি হিসাবে মাও সে-তুংয়ের বিবাহের সংখ্যা চারটি, মতান্তরে পাঁচ৷ এটা বৈধ বিবাহের প্রসঙ্গ৷ বেসরকারিভাবে এর বেশি ‘বিবাহে’র কোনও প্রয়োজন তাঁর জীবনে ছিল না৷ কারণ, নারী ছিল তাঁর চোখে ‘অর্ধেক আকাশ’৷ প্রতিদিনই নিত্যনতুন ‘অর্ধেক আকাশ’ তিনি ভোগ করতেন৷
জীবনযাত্রায় মাও সে-তুং ছিলেন আপাদমস্তক কুলাক৷ পয়সাওয়ালা ভূস্বামীদের মতোই ছিল তাঁর আচার-আচরণ৷ কিন্তু ধূর্ততাতেও তাঁর জুড়ি মেলা ভার৷ নেতৃত্বে পৌঁছানোর জন্য কমিউনিস্ট পার্টির ভিতরেই তিনি লড়াই লাগিয়ে দিতেন৷ এক নেতাকে সরাতে আর এক নেতাকে সঙ্গী করতেন৷ তার পর সেই নেতাকে সরিয়ে দিলে সঙ্গীকেও বধ করতেন৷

মাও সে-তুং বুঝে গিয়েছিলেন চীনের কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃ্ত্বে পৌঁছাতে হলে তাঁকে স্তালিনের আশীর্বাদ পেতে হবে৷ যদিও ব্যক্তিগতভাবে তিনি স্তালিনকেও একাধারে ভয় পেতেন এবং ঘৃণাও করতেন৷ তবু বুঝতে পেরেছিলেন স্তালিনকে সরাসরি অমান্য করলে তাঁর নিজেরই গর্দান যাবে৷ তাই ধাপে ধাপে উপরে ওঠার জন্য তিনি জোসেফ স্তালিনের সঙ্গেই চোর-পুলিশ খেলায় নেমেছিলেন৷ চীনে স্তালিনের পাঠানো কমিনটার্ন (কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল) অনুচরদের চোখে ধুলো দিতেন অনায়াসে৷ কারণ, স্তালিনের পাঠানো কেজিবি গুপ্তচররা বেশিরভাগই সাংহাইয়ের পার্টি নেতৃত্বের উপর ভরসা রাখতেন৷ গৃহযুদ্ধের কালে কোথায় কী ঘটছে সে সম্পর্কে তাঁরাও সব খুঁটিনাটি খবর রাখতেন না৷ মাও সে-তুং এই সুযোগটা পুরোমাত্রায় নিয়েছিলেন৷

কার্ল মার্কস ও ফ্রিডরিখ এঙ্গেলসের শিষ্য, প্লেখানভের ছাত্র ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিনের তত্ত্ব অনুসারে শ্রমিক শ্রেণির নেতৃত্বাধীন বিপ্লবের শত্রুপক্ষ হল লুম্পেনরা৷ মাও সে-তুং সেই লুম্পেনদের মধ্যেই তাঁর ‘বিপ্লবে’র আলো দেখতে পেয়েছিলেন৷ ঠগীদের নিয়েই তিনি তাঁর প্রথম ‘বিপ্লবী’ বাহিনী গড়েছিলেন৷ সন্ত্রাস, খুন আর লুণ্ঠনই ছিল তাদের বেঁচে থাকার অবলম্বন৷ যদিও চিয়াং কাই-শেকের সেনাবাহিনীর তাড়ায় তিনি সেই ঠগীদেরও পিছনে ফেলে একাধিকবার চম্পট দিয়েছিলেন৷ যখন যেমন, তখন তেমন– এটাই ছিল মাও সে-তুংয়ের উপরে ওঠার পলিসি৷
মাও সে-তুং নিজে কখনই সমরবিদ্যা শেখেননি৷ সে ব্যাপারে তাঁর খুব একটা আগ্রহও ছিল না৷ কিন্তু কমিউনিস্ট সেনাপতিদের গড়া বাহিনীর উপর খবরদারি করতে গেলে ঠিক কোন ধরনের শঠতার রাস্তা নিতে হয়, সেটা তাঁর ভালোমতোই জানা ছিল৷ এভাবেই মার্শাল চু-তে’র গড়া সামরিক বাহিনীকে তিনি কবজা করেছিলেন৷ কুচক্রীদের মাধ্যমে এক জেনারেলের সঙ্গে আর এক জেনারেলের লড়াই লাগিয়ে৷ পরবর্তীতে চীনের শাসনকর্তা হিসাবেও এই দ্বৈধী নীতিই ছিল তাঁর বলভরসা৷