“চিনি বনাম নুন, অতিমধুর বনাম অনতিমধুরের চিরাচরিত দ্বন্দ্ব আজও মরে যায়নি। শতাব্দীর শেষ প্রান্তে এসে বাংলা কবিতা যেন এক প্রশ্ন চিহ্নের সামনে দাঁড়িয়েছে, যেন শিবির বিভাজনের উত্তাপ ভেসে আসছে হাওয়ায় – মধুর কবিতা না রক্তমাংসে নোনা কবিতা- আসলে এভাবে কোনও বিভাজন হয় না। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেই ঠিক করে নিতে হবে বাংলা কবিতাকে তারা গুড়ের নাগরি বানাবে না রক্তমাংসে গড়া প্রাণের সন্তান।”

(মধুর কবিতার বিরুদ্ধে, মল্লিকা সেনগুপ্ত, কৃত্তিবাস, জানুয়ারি, ১৯৯৯ )

অরিজিৎ ভট্টাচার্য

বাংলা কবিতা সম্পর্কে এমন নির্ভীক কন্ঠে উচ্চারিত বয়ান সম্ভবত মল্লিকা সেনগুপ্তের পক্ষেই উচ্চারণ করা সম্ভবপর ছিল। মেরুদণ্ডহীন মানুষদের প্রতি তাঁর ঘৃণা, নিষ্পাপ ভালোবাসার প্রতি আত্মসমর্পন আর আগামী প্রজন্মের প্রতি নির্লোভ আশ্রয় দেওয়া তাঁর স্বভাব বৈশিষ্ট্য। সর্বোপরি তাঁর কোনোদিনই কোনো দল ছিল না। অথচ কোনো দলীয় বৃত্তের বাইরেও তিনি নন। এমনই ছিল তাঁর ব্যক্তিত্ব, তাঁর সৃষ্টি।

মল্লিকা সেনগুপ্ত আশির দশকের কবি হলেও সত্তরের একেবারে শেষ পর্যায়ে তাঁর কবিতায় আনুষ্ঠানিক পদার্পন ঘটে। তাঁর কবিতায় পিতৃতন্ত্রের কঠোর সমালোচনা ও প্রতিবাদ তীব্রভাবে প্রকাশিত। ‘চল্লিশ চাঁদের আয়ু’(১৯৮৩), ‘সোহাগ শর্বরী’(১৯৮৫), ‘আমি সিন্ধুর মেয়ে’(১৯৮৮), হাঘরে ও দেবদাসী’(১৯৯১), ‘অর্ধেক পৃথিবী’(১৯৯৩), মেয়েদের অ আ ক খ(১৯৯৭), কথামানবী(১৯৯৭), পুরুষকে লেখা চিঠি(২০০২), প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থে তিনি পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে তীব্র কুঠারাঘাত করেছেন।

মল্লিকা সেনগুপ্তের প্রথম সংকলন ‘চল্লিশ চাঁদের আয়ু’। শব্দের অসম্ভব শক্তিময় সঞ্চার সেদিনই কবিতাপ্রেমী বাঙালি পাঠক বুঝতে পেরেছিলেন। ‘আমি সিন্ধুর মেয়ে’ সংকলনের কবিতায় শুধু যে পিতৃতান্ত্রিক পরাক্রমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এসেছে শুধু তাই নয়, এসেছে নারীর নিজস্ব বয়ান। নারীর নিজস্ব অস্তিত্ব বিষয়ক যাবতীয় স্বপ্ন-কল্পনা-যন্ত্রণা সবই সযত্নে গেঁথেছেন কবি। একইভাবে পরবর্তী কাব্যগ্রন্থেও তিনি যে বীজ বপন করেছেন, তা সর্বাঙ্গীন স্বাধীনতার, মৌলিক অধিকার রক্ষার। আজীবন তিনি অন্যায়ের সামনে মাথানত করেননি। তাঁর সচেতন মন-মানসিকতা সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-ঐতিহাসিক-পৌরাণিক নানা কাঠামোতে পুরুষতন্ত্রের পীড়নের ছবি আবিস্কার করেছে। এই সমাজ ব্যবস্থাতেই নারী তাঁর শরীর ঢেকেছে যে কাপড়ে, সেই কাপড়ই টেনে নিয়ে বেআব্রু করেছে সমাজ। ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে এই লাঞ্ছনার কথা উল্লেখ করেছেন কবি তাঁর ‘আম্রপালী’ কবিতায়,

“গণিকালয়, মীনবাজার তৈরী করে কারা ?
প্রতিযুগেই ইন্দ্র কেন উর্বশীর অধীশ্বর হন ?”

আসলে এই আধিপত্যবাদী স্বৈরতন্ত্রী সমাজের হর্তা-কর্তা বিধাতার আসনে একছত্রাধিপতি হয়ে উঠে যখন পুরুষ, তখন নারী শুধুমাত্র তার হাতের পুতুল হয়ে উঠে। যুগ যুগ ধরে পুরুষশাসিত সমাজে নারীরা যেভাবে লাঞ্ছনা ও বঞ্চনার শিকার হয়েছেন, তার-ই প্রতিবাদ লক্ষ্য করা যায় মল্লিকা সেনগুপ্তের কবিতায়।

“হাজার বছর ধ’রে কেন তুমি সূর্য দেখতে দাওনি
যে মাটিতে তুমি দাঁড়িয়ে রয়েছ তাঁর অপমান ক’রো না
পুরুষ আমি তো কখনো তোমার বিরুদ্ধে হাত তুলিনি।”

সুদূর অতীতকাল থেকে নারীর কন্ঠস্বরকে উপেক্ষিত করে অবদমিত অনালোকিত কুণ্ডে বিসর্জিত করে সব রকমের অধিকার কেড়ে নিয়েছে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ। তাই কবি মল্লিকা সেনগুপ্ত লিখেছেন,

“মেয়েটির কাছ থেকে একদিন তোমরা
কেড়ে নিয়েছিলে বেদ পড়বার সুযোগও
তোমরা বললে মেয়েরা শুধুই ঘরণী
মেয়েদের ভাষা, শূদ্রের ভাষা আলাদা।”

এমনকি কার্ল মার্ক্সের দিকেও কবি কঠিন প্রশ্ন ছুঁড়ে দিতে একটুও দ্বিধা বোধ করেননি,

“ কখনো বিপ্লব হ’লে
পৃথিবীতে স্বর্গরাজ্য হবে
শ্রেণীহীন রাষ্ট্রহীন আলোপৃথিবীর সেই দেশে
আপনি বলুন মার্কস, মেয়েরা কি বিপ্লবের সেবাদাসী হবে ? ”

‘ফ্রয়েডকে খোলা চিঠি’ কবিতাতেও কবি পুরুষতন্ত্রের প্রতি পক্ষপাতদৃষ্ট ফ্রয়েডীয় তত্ত্বকে প্রত্যাখ্যান করে লিঙ্গ রাজনীতির মুখোশকে উপড়ে ফেলেছেন

“পুরুষের দেহে এক বাড়তি প্রত্যঙ্গ
দিয়েছে শ্বাশত শক্তি, পৃথিবীর মালিকানা তাকে
ফ্রয়েড বাবুর মতে ওটি নেই বলে নারী হীনমন্য থাকে
পায়ের তলায় থেকে ঈর্ষা করে পৌরুষের প্রতি।”

মল্লিকা সেনগুপ্ত তাঁর কবিতাকে হাতিয়ার করে চিরাচরিত লৈঙ্গিক অভিজ্ঞানের ধারণাকে কুঠারাঘাত করতে চেয়েছেন। তিনি সেখানে ব্যক্তি নারীর সত্তা নির্মাণের দিকে যেমন উৎসাহী হয়েছেন তেমনি সমষ্টিগত চেতনার দিকটিও তাঁর নজর এড়ায়নি।

“সুপুরুষ এসেছিল, আসেনি নারীরা
আমি সিন্ধুর মেয়ে, যোদ্ধা ও মানুষ
কালো মেয়েদের পায়ে তামার গগন
এত দীপ্যমান চোখে ঘোড়সওয়ারেরা
গর্ভে অগ্নি ঢেলে দিল, জন্মাল কার্তিক …”

পুরুষতন্ত্র নারী অভিজ্ঞতার যে বিস্তৃত সীমাকে চিরদিন অন্ধকারাচ্ছন্ন করে রেখেছে, পারাপারহীন সেই শূন্যতাকে অর্জন করেই মল্লিকা সেনগুপ্তের আবির্ভাব ও জয়যাত্রা। তাঁর কবিতার বুকে কান পাতলে শোনা যায় চাপা দীর্ঘশ্বাস, গভীর ক্ষোভের শোভনীয় গর্জন। তাঁর এই গর্জন অনভ্যস্ত অপ্রস্তুত চোখকে ধাধিয়ে দেয় স্পষ্টতা ও তীব্রতার অভিসারে। ভুলে গেলে চলবে না, মল্লিকা তো আসলে সিন্ধুর মেয়ে।

*ড. অরিজিৎ ভট্টাচার্য। সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, মানকর কলেজ, পূর্ব বর্ধমান।