আর পাঁচটা ভোর যেভাবে আসে, মহালয়ার ভোর ঠিক সেভাবে আসে না। তার আগমনের মধ্যে রাজসিক ব্যাপার স্যাপার আছে বলে আমার বিশ্বাস। এক কবি লিখেছিলেন দিনরাত্রির মধ্যে সব চেয়ে সুন্দর সময় হল ভোর। এর ভেতর যে রহস্যময় স্নিগ্ধতা আছে তা দিনের আর কোন সময়ে নেই। আমিও তা-ই মনে করি। কিন্তু মনে করলেই তো আর হল না। কাজের ক্ষেত্রে আমি একটু আলসে ধরণের। ভোরে উঠতে বেশ কষ্টই হয়। তবে মহালয়ার ভোর হলে সেটা একেবারেই আলাদা। এইদিন ভোরে ওঠাটাই স্বাভাবিক রীতি, অন্তত আমার জীবনে। এটা চলে আসছে একেবারে সেই ছোট্টবেলা থেকে। আজও তার ব্যতিক্রম হয়না।

মানিক সাহা

মহালয়ার ভোরে চোখ খুলতাম বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠস্বর শুনে। রেডিও বা টিভিতে যখন সেই মেঘমন্দ্র কণ্ঠস্বরে ধ্বনিত হত “আশ্বিনের শারদ প্রাতে বেজে উঠে আলোক মঞ্জরী। ধরণীর গভীরাকাশে অন্তরীত মেঘমালা…. “। এই শব্দ মনে হত আকাশ থেকেই নেমে আসছে।

আমি যখন অনেক ছোট, এই ক্লাস টু থ্রি হবে, মহালয়ার আগে আগে আমাদের বড় রেডিওটা বিগড়ে গেল। আমাদের বাড়িতে তখনো টিভি ঢোকেনি। বাবা মহালয়া দেখার জন্য টিভি নিয়ে এল। সাদাকালো পোর্টেব, ১৪ ইঞ্চি। বডিটা লাল রঙের। বাড়িতে টিভি মানে চরম উত্তেজনার ব্যাপার। আমাদের বাড়ি রাতারাতি পাড়ায় বিশেষ বাড়ি হয়ে উঠলো। এর আগে মহালয়া দেখতে যেতে হত অনন্ত মাষ্টারের বাড়ি।

অনন্ত মাষ্টার লোকটি ভালো। কিন্তু তার বউ বড় বদমেজাজি। সারাদিন ক্যাটক্যাট করতেই থাকত। মহালয়ার দিন তার বাড়ির বারান্দায় টিভি লাগানো হত। একটু যারা গন্যমান্য লোক তাদের জন্য চেয়ার অথবা মোড়া। আর বাকিদের জন্য চটের মাদুর। আমরা যারা ছোট তাদের নিজেদের ব্যবস্থা নিজেদেরই করতে হত। তখন তো আর এত চ্যানেল, এত বাহার এত বৈচিত্র্য ছিল না, চ্যানেল বলতে ডিডি ন্যাশনাল। কে যেন মন্ত্র পড়ে আমাদের স্তব্ধ করে রাখতো। আমরা নির্বাক ও মুগ্ধ হয়ে দেখতাম ‘মহিষাসুরমর্দিনী’। মহালয়ায় যে অনুষ্ঠানটি রেডিওতে প্রথম সম্প্রচার করা হয়,সম্ভবত সেটার নাম ছিল ‘মহিষাসুরমর্দ্দিনী’। আমি অপেক্ষা করে থাকতাম মহিষাসুর বধের মুহূর্তটির জন্য।

দুর্গা প্রিয় হলেও সংলাপ ভালো লাগতো মহিষাসুরের। মহালয়ার পর থেকে আমাদের খেলা ছিল দুর্গা আর মহিষাসুরের লড়াই। বাঁশের বাতা বা কঞ্চি দিয়ে তৈরি হত আমাদের অস্ত্র। আমি সংলাপ বলতাম: ‘আমাকে হত্যা করবে সামান্য এক নারী? হুম হা হা হা হা হা!” আমার সেনাপতি হত আমার পাড়ার ভাই বোনেরা– চামুর, চিক্কুর, অসিলোমা…। আমাদের সে ভীষণ লড়াই। তবে জয় তো সব সময় শুভ ও সুন্দরেরই হয়৷ তাই শুভ ও সুন্দরের প্রতীক দুর্গার পায়ের নিচেই অশুভ ও অসুন্দর মহিষাসুরের অবস্থান।

পুজোর কেনাকাটা শুরু হত এই মহালয়ার পর থেকেই। এ যেন এক বাঁধাধরা নিয়ম। মহালয়ার আগে কেনাকাটা করা যাবে না। মহালয়ার জন্য তাই আমিরা মুখিয়ে থাকতাম। এখন অবশ্য তেমন কোন ব্যাপার নেই। এখন বুঝি আগের অনেক নিয়মই ছিল বাবা মায়ের মনগড়া৷ সংসার চালাতে গেলে এমন কিছু মনগড়া নিয়ম মানতে হয়।

মনগড়া নিয়ম এখনো আছে, তবে তা আগের মতো নয়। পালটে গেছে। যেভাবে পালটে গেছে মহালয়ার আবেশ ও মুগ্ধতা। এখন এত চ্যানেলে এত মহালয়ার অনুষ্ঠান, কিন্তু কোনও টাই ভালোভাবে দেখাও হয় না, সেভাবে মুগ্ধও করে না। হয়তো বড় হয়েছি বলে এখন আর সহজে মুগ্ধ হই না। তবু মহালয়ার ভোর এখনো তাড়াতাড়ি ঘুম ভাঙিয়ে দেয়। মনে হয় আকাশ থেকে দৈববাণীর মতো ভেসে আসছে বীরেন্দ্রকৃষ্ণের চন্ডীপাঠ। শিউলির গন্ধ ভেসে আসছে। একটু ঠান্ডা ঠান্ডা পড়েছে। আর আলোর বেণু বাজিয়ে প্রকৃতি আবাহন করছে মায়ের। মা আসছেন।