একটি পরিবারে বামপন্থা

দীপ শেখর

একেকটা সকাল এমন মুসুরির ডাল সেদ্ধ এবং গরম ভাতের ভাপে শুরু হয়। আমার মধ্যবিত্ত বাবা যখন তা খুব স্থূলভাবে পেটে ঢুকিয়ে কেমন কচ্ছপের মতো অফিসের দিকে রওনা দেয় তখন তাকে দেখে মনে হয় না সে বামপন্থী। কিন্তু সন্ধেবেলা চায়ের আসরে বাবার বামপন্থী বন্ধুরা যখন উচ্চকণ্ঠে দলের ভালো কাজের, স্রেফ ভালো কাজের আলোচনা করে তখন আমি নিজের রোগা, খুব রোগা চেহারার জন্য লজ্জিত হই। আমি ঘরের এক কোণা ধরে বসে থাকি, যাতে অনেকক্ষণ আমাকে কেউ খুঁজে না পায়। আসর শেষ হলে যখন একে একে সবাই বাড়ি ফিরে যায় তখন আমি জানলা থেকে ওদের দেখি, বাবার বন্ধুদের।

ওরা সকলেই খুব স্থূল, প্রবল গ্রীষ্মের সন্ধেতেও ভারি জামাকাপড় পড়ে আসতেন এবং সকলেই কম বেশি মদ্যপান করে গিয়ে উঠতেন একটা রিকশায়। রিকশা চলে যাওয়ার আগে অবধি আমার মধ্যে এক ভয়ানক আতঙ্ক কাজ করতো, আমি ওই পনেরো ষোলো বছর বয়সেও খুব খুব ভীতু ছিলাম। তখন রাতের বেলা দরজা বন্ধ করে আমি সমস্ত পোশাক খুলে নিতাম, হাত বুলোতাম আমার সমস্ত অঙ্গ প্রত্যঙ্গে। দীর্ঘক্ষণ। ততদিনে আমি হস্তমৈথুন শিখে গেছি, তবু এই হাত বোলানো সারাগায়ে আমাকে এক অদ্ভুত অনুভূতির দিকে নিয়ে যেত। জীবনের অনেক সময়তেই মনে হয়েছে যে আমার মধ্যে মেয়ের লক্ষণ বেশি, এমনকি আমার কোন খুব শক্তিশালী, উচ্চতায় বেশি ছেলে বন্ধুর কাছে অদ্ভুত বিপন্নতা অনুভব করতাম। তবু আমি চিরকাল মেয়েদের কাছাকাছি থাকতে ভালবেসেছি, মেয়েদের আমি নানাভাবে কামনা করেছি, মেয়েদের শরীর আমাকে নানা বয়সে নানাভাবে টেনেছে। তবে শুধু আমি সারাজীবনে একটি হাতের স্পর্শ ভুলতে পারিনি। লিলি। বাবার সহকর্মী শ্যামল কাকুর মেয়ে লিলি বছর দুই বড় আমার থেকে। লম্বা ছিপছিপে গড়ন, চুলটা রুক্ষ, চোখের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ। বেশি খানিকটা উঁচু বুক ছিল লিলির, কোমর পাতলা, শরীরটি খুব আকর্ষণীয়।লিলি ছোট থেকে আমাদের বাড়িতে এসেছে বেশ কয়েকবার তবে এমন চেহারা ধীরে ধীরে আমার চোখে যখন ধরা দিল তখন আমরা দুজনেই অনেককিছু বুঝে গেছি। লিলি যে আমাকে খুব একটা পছন্দ করতো তা নয় তবে আমার সেই ঘরে দুজনে অনেকক্ষণ কাটিয়ে দিতে পারতাম। নইলে চলে যেতাম ছাদে। জলাধারটা যে নিচু ছাদে রাখা আছে সেখানে লিলি এবং আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে পারতাম কোন কথা না বলে। এমনকি লিলির হাত নিজের হাতে নিয়ে খেলতে পারতাম, এমনকি আচমকা ছুঁয়ে নিতে পারতাম লিলির বুক। লিলি গোটাটাই বুঝতো, কোন আপত্তি করতো না। কেন? এমন চুপ করে বসে থেকে থেকে একসময় যাওয়ার সময় চলে আসতো। লিলি উঠে চলে যেত। বিদায়-ও বলতো না। তবে সকলের সামনে আমার ও লিলির সম্পর্কটা এতটা শব্দহীন ছিল না কখনওই।

সকলের সামনে লিলি অনেক কথা বলতো আমাকে নিয়ে, বিশেষ করে এমন কথা যেখানে আমার প্রশংসা ফুটে ওঠে, বিশেষত এমন প্রশংসা যা আমি জানি লিলি একেবারেই বিশ্বাস করতো না। আমার চোখ মুখ লাল হয়ে যেতে দেখলে সে তার এই প্রশংসার পরিমাণ বাড়িয়ে দিত খুব। অপছন্দ করলেও লিলি আমাকে ঘৃণা করতো না একেবারেই। একেকদিন কাগজের একটা খাম বানিয়ে এনে হাতে দিত, বলতো খুলে দেখো এবং প্রত্যেকবারেই তাতে কিছুই থাকতো না। এই কাজে লিলির যে খুব মজা হত এমন নয় বরং খামের ভেতর যে কিছুই নেই তাতে লিলি নিজেও খুব অসন্তুষ্ট হত। একেকদিন তার হাতে কাটা দাগ দেখে খুব চমকে উঠতাম, কি গভীর দাগ। কেন? কেন লিলি? এই জিজ্ঞাসা কোনওদিন আমার থেকে আসেনি, আসেনি, কেন তার কারন জানি না। মাঝে মাঝে মনে হয় আমি যদি না জানতাম যে জন্মের আগে আমি কোথায় ছিলাম এবং মৃত্যুর পর কোথায় যাব তবে আমি লিলিকে অনায়াসে এসব প্রশ্ন করতে পারতাম। কেন লিলি কেন? কেন আমরা আরো ঘনিষ্ঠ হতে পারি না? কেন আমরা একে অপরকে অনেকগুলো কথা বলতে পারি না? কেন, এমন এক লাল রঙের আকাশের দিকে তাকিয়ে সেই বিরাট উল্কাটার পতনের অপেক্ষায় আমরা বসে থাকি? কেন লিলি কেন? কেন চোখ বুজে নিতে পারি না ওই অন্ধকারে, তারপর প্রতিদিন তোমার ঠোঁটের প্রতিটি ভাঁজে ঠোঁট বুলিয়ে বুলিয়ে অনুভব করতে পারি না কি ভয়ানক ভাবে বেঁচে আছি, বলতে পারি না কি প্রতারিত হয়ে বেঁচে আছি, কেন লিলি? কেন সারাগায়ে হাত বোলাতে বোলাতে, স্তনে, উরুদ্বয়ে হাত বোলাতে বোলাতে একটা সামান্য চুম্বনের জন্য তোমার এত কাছে গেলে তুমি মুখ ফিরিয়ে নাও, তারপর অদ্ভুত খুব অদ্ভুত চোখে আমার দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে বলো– এবার বোধহয় বামফ্রন্ট হেরে যাবে।

পঁচিশ বছর দুবার আসে না

বাবার ডানপন্থায় বিশ্বাস এবং মায়ের প্রতাপ কাকুর সঙ্গে গৃহত্যাগের পূর্বে আমি যেসমস্ত মেয়েতে মজেছি তাদের সকলের দুটি বৈশিষ্ট্য এক ছিল। প্রত্যেকের ছিল উঁচু স্তন এবং বুদ্ধি বা মেধা বলে তাদের কিছুই ছিল না। নইলে তারা সকলেই আমার ফাঁকিটা ধরে নিতে পারতো। এই যে আমি খুব বেশি আদরের মধ্যে নিয়ে আলগা করে তাদের থেকে দূরে চলে যাচ্ছি, এই দূরে চলে যাওয়ার এক অসম্ভব নেশা, আহা, আমাকে প্রবল আছন্ন করে রাখে। কিন্তু আমার পঁচিশ বছর বয়সের এক ঘটনা, আমাকে খুব বিপদে ফেলে দিয়েছিল আর কি। তখন আমি বামপন্থায় বিশ্বাস করি, দুবেলা কসরত করে আমার শরীরেরও প্রবল উন্নতি ঘটিয়েছি এবং মেয়েরা যারা আমাকে পেয়েছে,পাচ্ছে নানাভাবে তারা বলেছে যে বিছানায় আমি খুব খুব দক্ষ, বিশেষত ঘন্টার পর ঘণ্টা তাদের কাঙ্ক্ষিত আনন্দ দেওয়াইয় আমার মতো দক্ষ লোক খুব কম এমন এক সুন্দর সময়ে এমন এক সুন্দর দিনে আমি সকালে উঠে আয়নায় মুখ দেখি এবং আবিষ্কার করি যে আমার ঠোঁটযুগল আর নেই। নেই মানে একেবারে নেই, কিচ্ছু নেই, কোত্থাও নেই। আমি গোটা বিছানা তন্ন তন্ন করে খুঁজেও তার খোঁজ পাইনি, খাটের তলা, আলমারির তলা সর্বত্র খোঁজ, না না, কোথাও নেই আমার প্রিয় ঠোঁটদুটো। দীর্ঘক্ষণ খোঁজার পর হতাশ আমি বুঝতে পারলাম না এবার কি করবো? এদিকে একটা ভাষণ দিতে যাওয়ার কথা কেন্দ্রের চক্রান্তের বিরুদ্ধে এবং রাজ্য সরকারের অপদার্থতার কথা জনে জনে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য। আজ সন্ধেতে কফি হাউসের আড্ডাটা এবং খুব দরকারি, খুব দরকারি ঐশীকে দেওয়ালে ঠেসে ধরে একটা চুমু খাবো। এই কথাবার্তা কাল হয়ে গেছে মেসেজে মেসেজে। ওর প্রেমিক, আমার বন্ধু এসবের কিচ্ছুটি জানবে না। ইশ এমন দিনে কী করে হারিয়ে যায় আমার ঠোঁটদুটো? কীভাবে? কীভাবে? তবে কি কেউ কোনওরকম ভাবে রাতের বেলা আমার ঠোঁট চুরি করে নিয়ে গেছে? কি তবে কি আমার ভাবনাই ঠিক? হ্যাঁ, এই সেই,সেই।কাল রাতে কে এসেছিল? লিলি?

যেগুলো স্বীকার করতেই হত

আমার বাবা শেষে গেরুয়া রং ভালবেসেছিলেন। স্ট্রোকে সারাদিন আরাধ্য ঈশ্বরের কাছে যাওয়ার আগে বাবা নিশ্চিত গুস্তাভ ক্লিমত এর দ্যি কিস দেখেননি, পড়েননি সিলভিয়া চিদি অথবা অ্যান সেক্সটনের চুমু বিষয়ক কবিতা। দ্যি নোটবুকের রায়ান গস্লিং এবং রাচেল মাকাডামসের বিখ্যাত চুম্বন দৃশ্য তার পদেখা হয়নি হয়ত। ঈশ্বর চিন্তার মাঝে তিনি ব্যাংকে টাকা জমানো এবং রাতের বেলা নীল ছবিতে খুব আসক্ত ছিলেন, মা চলে যাওয়ার পর। আমি যাতে খুব তাড়াতাড়ি কিছু একটা কাজ পাই তার জন্য বিভিন্ন মহলে অনেক তদ্বির করেছিলেন।

কিন্তু গেরুয়া মহল বাবাকে তরমুজ হিসেবে চিনতেন ফলে খুব একটা লাভ কিছুতেই কিছু হল না। আমি বাকি জীবনটা কবিতা লিখেই কাটাবো মনোস্থির করেছি কারণ বিয়েতে একেবারেই আমার কোনও ইচ্ছে নেই। বাবার বামপন্থী রক্ত বিবর্তনের নিয়ম মেনে ব্যাংকে যা সঞ্ছয় করেছে তাতে আমার বিশেষ অসুবিধে হওয়ার কথা নয়। বিশেষত,আমি যে কোনও মহৎ উদেশ্যে নিজের সমস্ত কিছু বিলিয়ে দেব সেই বয়স এবং সেই রক্ত এখন আর নেই। ব্যামো বলতে সামান্য মাথার। মাঝে মাঝে প্রবল বৃষ্টির দিনে চলে যেতে ইচ্ছে করে ওপাড়ার ইস্কুলের গায়ের গলিটায়। দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে ইচ্ছে হয়, মনে পরে অনেকের কথা, অনেকের কথা, অনেক দিন। যখন বামফ্রন্ট হারেনি, দেওয়ালে দেওয়ালে অদ্ভুত সিংহতে ভরে যেত পাড়া। গোধুলি যখন ছেয়ে ফেলতো গোটা শহরতলি আর মামা বাবা রিকশাতে পাশাপাশি বসে আমাকে মাঝখানে বসিয়ে ঘুরতে যেত ওই বড় রাস্তা দিয়ে, পুলটার উপর দিয়ে, সে সব দিনের কথা। এমন প্রবল দিনে বৃষ্টির সাথে সাথে অনেক ঝড় আসে।

আমি সেই ঝড় দেখে শচীশের মতো বেড়িয়ে পড়ি ক্রমাগত কমতে চাওয়া মাথার চুল, এক মুখ দাড়ি নিয়ে। মনে হয় মনে হয় লিলি তুমি আসবে, তুমি আসবে লিলি। এমন এক ঝরের দিনে, বৃষ্টির দিনে। মেসেজে প্ল্যান করে নয়, বন্ধুকে লুকিয়ে নয়, নীলছবির নায়িকাদের মতো স্বপ্নে নয়, তুমি আসবে লিলি ওই ফুলকপির মতো বুক আর ভেজা খুব ভেজা ঠোঁট নিয়ে। এসে ওই স্কুল বাড়ির গায়ের গলির অন্ধকারে আমাকে বুকে টেনে নিয়ে দীর্ঘ একটা চুমু খাবে, দীর্ঘ, পুরনো মদের গন্ধওয়ালা, যার কোনও অন্ত নেই এবং সাথে সাথে খুলে যাবে আমার সমস্ত অস্ত্র, আমার সমস্ত পোশাক, ঝরে যাবে সমস্ত পাপ, সমস্ত প্রতারণা, পুনরায় আমার মাথা ঢেকে যাবে চুলে, আমার এই গালে পাক খেয়ে ওঠা সাপের মতো দাড়ি অদৃশ্য হয়ে যাবে আর আমার এই হৃদপিণ্ড, আমার এই পাথুরে হৃদপিণ্ড এক বাউলের মতো, এক পাগল বাউলের মতো নেচে নেচে গান গাইবে, তুমি আসবে লিলি, আমি নিশ্চিত তুমি আসবে, সেই বৃষ্টির দিনে, নগ্ন, নির্জনতম এক শরীর নিয়ে, এবং তুমি নিশ্চিন্ত থাকো লিলি, আমি বারবার গিরগিটির মতো নিজের রং পালটে পালটে বেঁচে গেছি ঠিক বাবার মতো, মেয়েদের আমি যথেচ্ছা ব্যবহার করেছি রাজনীতির মতো, নিজের হারানো ঠোঁট আমি উঁচু মহলে বারবার ঘুষ দিয়ে খুঁজে পেয়েছি তবু আমি কোনওদিন কাউকে বলিনি যে তুমি আমি, হ্যাঁ লিলি,তুমি আমি সেই বৃষ্টির রাতে একদিন আচমকা ঠোঁটে ঠোঁট রেখে যে জগতের সন্ধান পেয়েছি, তার খোঁজ কাউকে দেইনি, কাউকে না, কক্ষনো না।

আমি জানি লিলি এই একটি চুমুর কাছে একদিন গোটা বিশ্ব মাথা নত করে নেবে।