শুভ চ্যাটার্জী

এবারে দশ বছর পূর্ণ হল। সেই গুড ফ্রাইডে। সেই টানা তিন দিনের ছুটি। সেই ‘সৈকতসুখ’। সামনে বালিয়াড়ি। সকাল শুরুর নরম রোদ শৈশব আমোদে গড়াগড়ি খাচ্ছে। এই দশ বছরেও স্নানার্থী ট্যুরিস্ট সংখ্যা প্রায় নেই। ভিড় যত ওই ওদিকটায়। অন্যদিকে ‘সৈকতসুখ’ পেরোলেই ঝাউবনের পর ঝাউবন। তাই কি চাঁদ, সূর্য, আলো, আঁধার, জোছনা সবই এখানে বড় বেশি উদ্দাম, উন্মুক্ত? যেমন বেলাভূমি এগিয়ে চলেছে হলুদ ঢেউয়ের পর ঢেউ পেরিয়ে, সামনে পান্নাসবুজ অসীম, অতল গভীর নীল সমুদ্র, ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে, শুভ্র সফেন; অক্লান্ত, নিরন্তর– সবই উদাত্ত, উল্লসিত, উচ্ছ্বসিত।

‘সৈকতসুখ’য়ের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ‘সুরছন্দম্’য়ের প্রাণপ্রতিমা মঞ্জরী শ্রীবাস্তব দেখছিল ‘চাহৎ’য়ের সবচেয়ে পপুলার বার-সিঙ্গার মিস্ মুন্নিকে সমুদ্রপাড়ে শাঁখ, ঝিনুক কুড়োতে, একটা বটুয়ায় ভরে রাখতে; তারপর এক পা এক পা করে এগিয়ে গেল জলের দিকে, প্যান্টের পা-গোটানো, গোড়ালির উপর খানিকটা অবধি ভিজিয়ে ফিরে এলো। বালিয়াড়িতে বসল একটু। তারপর শুয়ে পড়ল সটান। আকাশ কি বিশাল এখানে! রেষারেষি, বিরোধিতা নয়; সমুদ্রের সঙ্গে চলছে কোন প্রীতি-প্রতিযোগিতা। উঠে বসে চারপাশ চোখ মেলে দেখল, ঠোঁটে সলাজ হাসি, দৃষ্টিতে প্রথম প্রেমের আবেশ, স্বপ্নঘোর, গোলাপি কোন সুগন্ধি বুকে বাজছে রিনিঝিনি– কে বলবে এই সেই মেয়ে!

সন্ধে নামল। ‘চাহৎ’য়ের সিঙ্গিং ফ্লোর লালনীল আলোয় ঝিকিমিকি, মিস্ মুন্নি এলো, ঝিলিমিলি সলমাচুমকির বেশবাস, হাতে মাইক নিল, শুরু হয় ‘দো ঘুঁট মুঝে ভী পিলা দে শরাবী’ অথবা ‘পিয়া তু অব তো আ যা…’, বার জুড়ে মাতামাতি, মিস্ মুন্নির চোখে বিলোল কটাক্ষ। দেহবল্লরী দুলছে, ঘুরছে, বেঁকছে। হাসিতে আহ্বা, প্রশ্রয়, প্রত্যাখ্যান, অভিমান না জানি আরও কত কি! সবই ওই কত কত টাকা, ওরা বলে ‘ছুট্’, কে কে দিতে পারে, ওড়াতে পারে ওর পিছনে, সেসব বুঝে, মেপে, আন্দাজ করে। কন্ঠস্বরের উৎকর্ষতাটা উপরি, আসল হল পারফর্মেন্স। যার শেষ ফল ভোগী, মত্ত, অহংকারী, অসাধু টাকার ব্যাপারীদের বেহিসেবী টাকার উড়ানে শুরু হয় পাল্লা দেওয়ার, টেক্কা নেওয়ার, মিস্ মুন্নির দখল পাওয়ার উদ্দেশ্যে “দানা ভ’রে দেব” হুমকির থেকে সত্যিকারের চপার, নেপলা, মেশিন প্রদর্শন। এসব বুঝে নেওয়ার পুরো দায়িত্ব ‘চাহৎ ‘য়ের। এক-একদিন রাতে নানাদিকে দিয়েথুয়ে কুড়ি-বাইশ হাজার টাকা নিয়ে বাড়ি ফেরে মুন্নি নিশ্চিন্তে, দক্ষ এক্স-হিটম্যান আক্রমচাচার ভাড়ার গাড়িতে।

সত্যিই কি অমিল দুই মুন্নির। মঞ্জরী যে মঞ্জরী, তারও মনে হয়, এ কি বিভ্রম! তবে প্রতিক্রিয়াটা তাৎক্ষণিক। কারণ পর মুহূর্তেই তার তীক্ষ্ণ নজরে পড়ল, আজও মুন্নি লক্ষ্য করল না তাঁকে– সেই দীর্ঘকায়, সুঠামদেহী, পক্ককেশ, সৌম্যদর্শন মহাপুরুষটিকে, বেলাভূমিতে একটু দূরে একা এসে যে বসেছেন; সুদূর দিগবলয়ে নিবদ্ধ তাঁর সুস্মিত, ক্ষমাসুন্দর, মায়াময় দু’চোখের উদার। গভীর দৃষ্টি ঠিক যেমন লক্ষ্যে পড়েনি সেদিনও, দশ বছর আগে, যতক্ষণ না পর্যন্ত সে আক্রান্ত হয়েছিল খোকা রায় আর তার সাঙ্গপাঙ্গদের হিংস্র লালসার শিকার হিসাবে; যেদিন রূপকথার সৈকতভূমি হয়ে উঠতে পারত রক্তাক্ত ধর্ষণভূমি। হ্যাঁ, রক্ত ঝরেছিল বটে। এবং প্রচুর, তবে প্রেম-মায়া-মমতা-মানবিকতা ধর্ষিতা হয়নি। হতে পারে সেদিন না-হয় নতুন প্রেমের উন্মেষকালে ছায়ামায়ার ওড়না টানা ছিল মুন্নির, কিন্তু আজ?

মঞ্জরী ভাবে, আসলে হয়ত অনুতাপের পর অনুতাপ, প্রায়শ্চিত্তের পর প্রায়শ্চিত্ত, একের পর এক নগ্ন, উন্মুক্ত স্বীকারোক্তির পথে ধাপের পর ধাপ পেরিয়ে উত্তরণ-সদৃশ একটা অবস্থানে পৌঁছেও মুন্নি আজও সম্পূর্ণ অতিক্রম করতে পারেনি তার ন্যক্কারজনক অতীতকে। কারণ সেই জীবনযাপনের ভয়ানক দুঃস্মৃতিভার। তাই সে মহান মানুষটিকে দেখেও না দেখার ভান করে এড়িয়ে যায়। এ যেন আজীবনকার এক লাজন্যুব্জ প্রতিবন্ধকতা ঘটে গেছে তার। যেমন সংগোপনে ভয়ে, আশঙ্কায় থাকে খোকা রায়ের কিশোরী মেয়ে চিরশ্রীকে নিয়ে। মুন্নিমায়ের যত্নআত্তি, স্নেহ-ভালবাসায় নিজের ছেলের সঙ্গে তুলনায় কোথাও-ই কোনও পক্ষপাত, তারতম্য কিছুই নেই। কিন্তু ওই যে অতীতের অপচ্ছায়া, চিরশ্রী যে কোনওদিনই বলতে পারে, বয়স যখন চোদ্দ, নেহাতই কোন নিছক অভিমানের ভরে, তুচ্ছ মুহূর্তটুকুর অবুঝপনার ঘোরে, “আমি তো তোমার কাছে জাস্ট ইদার সার্ফ এক্সেল অর হারপিক। এই অ্যাত্ত যত্নফত্ন, ওনলি সো দ্যাট আই ওয়াশ এ্যান্ড ক্লীন থওরলি অল দা ডার্টস অফ ইওর পাস্ট”, তখন কি মুন্নি পারবে বলতে এলানো গলায় “ওঃ, এসব কথা তোর মাথাতেই আসে। নে নে আরেকটু চিকেন নে। আপনার তো আবার লেগপিস্ না হলে– আছে? হ্যাঁ, এই তো দে, ডিশটা এগিয়ে দে “অথবা চোখ গোলগোল” মায় গড! চিরু তুই তো একজন জিনিয়স রে। একদম পারফেক্টলি ধরেছিস”?

তবে, শেষাশেষি, মুন্নির গল্প মুন্নির, মঞ্জরীর গল্প মঞ্জরীর। সে দু’চোখ ভ’রে দেখল মহাপুরুষটিকে। তাঁকে দর্শন করতেই তো আজ দশ বছর ধরে এই ‘সৈকতসুখ’য়ে আসা। এই ‘পবিত্র শুক্রবার’ উপলক্ষে ছুটির অবকাশে। শ্রদ্ধাভক্তিতে মাথা নোয়াল। প্রণাম করল না। ক্রস্ আঁকল বুকে। সাধারন মানুষ অবাক হতে পারে। মঞ্জরী না হিন্দুঘরের মেয়ে-বউ? কিন্তু মানবপ্রেমের ঊর্দ্ধ্বে আর কোনও ধর্ম আছে কি? আচারমুদ্রায় কতটুকু কি এসে যায়? আসলে ওই যে মহাপুরুষ, যিনি এখন উঠে দাঁড়ালেন ফিরবেন ব’লে, তাঁকে কেন্দ্র করে ঘিরে আছে প্রভু যীশু, ক্রুশবিদ্ধ মানবপ্রেমিক, পবিত্র শুক্রবার, আঁধার শেষে আলোর ঠিকানা-সন্ধান প্রভৃতির অনুষঙ্গ-শৃঙ্খল। অবচেতনে সেসবেরই যৌথ প্রক্রিয়ার প্রতিফলন বুকে ওই ক্রস্ আঁকায়। এ সময়ই সে অনুভব করল তার পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে তার ঘরের মানুষটি। শ্রীনাথ শ্রীবাস্তব। উষ্ণ আদরের আলগা আলিঙ্গনের একটা বেড় দিয়ে, স্ত্রীয়ের গালে গাল ছুঁয়েছে অল্প, গভীর গলায় জিজ্ঞাসা করল, “দেখা পেলে?” মঞ্জরী বলল, “হ্যাঁ। ওই তো ঝাউবনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন… এতক্ষণ পাড়ে বসেছিলেন।” শ্রীনাথ দেখল। দু’চোখ জুড়ে শ্রদ্ধানম্র চাহনি। ও-ও বুকে ক্রস্ আঁকল। বেলাভূমি নির্জন। বেলা বাড়ছে, সূর্যর তাপও। চারপাশ ঘিরে ঝলমলে রোদের ঝালর। তারই আড়ালের সুযোগে কোন ফাঁকতালে মুন্নি অদৃশ্য হয়ে গেছে।

এবার মঞ্জরী-শ্রীনাথের সাগরকেলিতে যাওয়ার সময়। বেড-টি হয়ে গেছে। স্নানের পর ব্রেকফাস্ট। মঞ্জরী এখন আগে সারা শরীরে সানস্ক্রিন লোশন মাখবে। শ্রীনাথ জানে এবং মানেও, সে বউ-ই হোক্ বা যে কোনও নারী, তাদের নিজস্ব কিছু কিছু মুহূর্ত থাকে যা তাদের ভীষণ ব্যক্তিগত; এতটাই যে স্বামী, যেহেতু সে পুরুষ, তারও সঙ্গে ভাগাভাগি করতে বাধে। মঞ্জরীর একান্ত মুহূর্তগুলো ওর সাজ-প্রসাধন, রূপচর্চার সময়টুকু। অতএব শ্রীনাথ ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেছে। অবশ্য দরজা টানার আগে এক ঝিলিক চোখ মারল, তারপর ঠোঁট উল্টে করুণ একটা “বুঝলে না মেরি জান্, কোথায় দাগা দিলে আমায়” ভাব ফোটাল। এমনতর দুষ্টুমির জন্য হোক্, অথবা বিশেষ বিশেষ মুহূর্তের সূক্ষ্ম বোধের কারণে, মঞ্জরীর বিচারে ও ছিল বরাবরই স্বতন্ত্র বিশেষ এক পুরুষ। ঠোঁটে মৃদু হাসি, নতুন মিউজিক এ্যালবাম ‘পিউ কাঁহা, পিউ কাঁহা’-র প্রথম গানের গুনগুন, সামনেই ‘সুরছন্দম্’য়ের এ্যানুয়াল প্রোগ্রাম-ফাংশান, ওদিকে মেয়ের পরীক্ষা, ছেলের নতুন স্কুল ইত্যাদি ভাবতে ভাবতে মঞ্জরী হাউসকোট সরায়, তারপর নাইটি, সানস্ক্রিনের বোতল খুলবে, তার আগে আয়নায় দেখে নিজের দেহসৌষ্ঠব, রূপলাবন্য। মনে পড়ে যুগপৎ একাধারে শ্রীনাথের বাঁ গালে গভীর ক্ষতচিহ্ন, হনুর হাড় চওড়া, শক্ত চোয়াল, ভারী ঠোঁট, পুরু গোঁফ, চাপা হাসিতে জিদ ও দৃঢ় ক্রুরতাও: অথচ অন্যাধারে ভাষা ভাষা দু’চোখ জুড়ে থৈ থৈ ভাসছে প্রেম আর ভালবাসা। মঞ্জরী সানস্ক্রীন লোশন মাখতে শুরু করল।

মুন্নি লাগাচ্ছিল রক্তলাল নেলপালিশ। আর আঙুল মেলে মেলে দেখছিল কেমন মানিয়েছে রংটা। খোকা রায়ের বউ রত্নার গলা চিরে বেরিয়ে আসে মরীয়া আর্তপ্রশ্ন “কি শুনছো তো?”। উত্তরে মুন্নি এমন এক তীব্র চোখে তাকিয়ে রইল, যেন একটানা বলল, “তোমাকে ঘরে এনে বসতে দিয়েছি, জানবে তাই অনেক। কাজের মেয়েটা এসে আমাকে কি বলল জানো? উলিঝুলি পাগলীপানা একটা মেয়েছেলে দেখা করতে এসেছে। এই তো হল তোমার দেখনদারি। তার উপর যখন তখন ‘চাহৎ’য়ে গিয়ে হাজির হচ্ছ, চেল্লাচিল্লি পাকাচ্ছ, ছিঁচকাঁদুনি কাঁদছ, আমার কাজের কি ক্ষতি হচ্ছে জানার দরকার নেই– তোমার বর তোমার কাছে, আমার সে ক্লায়েন্ট। সে যাক্! তোমার যা বলার আছে বলো– আমি আমার মতন শুনছি, পরে কিছু বলার থাকলে বলব”। রত্না বলে যেতে থাকে কতবড় জমিদার বংশের বউ ও…. ও হতভাগী, ওর অংশের ভাগটা পড়ে গেছে…চার বছরের একটা মেয়ে….পরে দুটো যমজ ছেলে, দু’টোই অস্বাভাবিক, তাদের পিছনে কত্ত খরচা। বাপটা তো অমানুষের একশেষ। কিচ্ছু কাজ করে না। বাপদাদার টাকা উড়িয়ে উড়িয়ে প্রায় নিঃশেষ। এখন বউয়ের গয়না নিয়ে কাড়াকাড়ি। এমন পাষন্ড, গৃহদেবতার অত সাবেকী সব ভারী ভারী গয়না, তাও চুরি করে বেচে দিতে বিবেকে আটকাল না। জ্ঞাতিশরিকেরা ছাড়বে কেন? থানা পুলিস কোর্ট-কাছারি সবই হল, আবার ছাড়াও পেল কোন এক নেতার দৌলতে আর কিছু না থাক্ লোচ্চা, লাফাঙ্গা টাকাওয়ালা ইয়ারদোস্ত আছে তো গন্ডাগন্ডা। “এসব হল কেন? সব তোমার জন্য– ওই যে কি বলো না তোমরা! হ্যাঁ, ছুট্__ তাই তোমার পিছনে ওড়াতে ওড়াতে সর্বস্বান্ত। এবার মন মজল তোমার, তা-ও তো তোমার যা দর। তার তিনগুন বেশি টাকা গুনে আমার হাঁদা বরটা তোমাকে নিয়ে ফূর্তি মারতে যেতে পারল বকখালিতে। জানো, ফেরার সময় যে ভারী নেকলেসটা তোমার গলায় পরিয়ে দিয়ে খুব পীরিত দেখিয়েছিল, ওটা কার? আমার। বিয়েতে দিদিশাশুড়ী দিয়েছিলেন।” মুন্নি আর সহ্য করতে পারল না, গর্জে উঠল, “শোনো রত্না, আমি তো আর রেড লাইট এরিয়ার মেয়ে নই! আমার স্বাধীন শখ, রুচি আছে। সেই মতন পুরুষকে আমি সঙ্গ দিই। তোমার বর তো পুরুষমানুষই নয়। এখন ও যদি ‘চাহৎ’য়ে গিয়ে মদ খেয়ে গড়াগড়ি খায়, আমার গানে টাকার পর টাকা ওড়ায়, আমি সেসব আটকাতে পারব না। কিন্তু ওর সঙ্গে আর বাইরে যাওয়া? ওয়াক্, ভাবলেও বমি আসছে।” রত্না উঠে দাঁড়িয়েছিল, মুন্নি বলে, “দাঁড়াও এক মিনিট”, তারপর বেরিয়ে যায়, ফেরে নেকলেসটা নিয়ে। রত্না নিরূপায়, নিস্তেজ হাতে সেটা গ্রহণ করে। দয়া-মায়া-সহানুভূতি তো দূরের কথা, মুন্নির দিক থেকে করুণা, অনুকম্পাও ছিল না। ছিল শুধু জ্বলন্ত অহংকারের দৃপ্ত ঘোষণা। কারণ ততদিনে ওর জীবনে এসে গেছে ঝামুয়াভাই। অন্ধকার জগতেরই মানুষ। কিন্তু প্রবল এক পুরুষ।

লাল প্রিয় রং মঞ্জরীরও। নেলপালিশ তার প্রমাণ। বাক্সে আছে বেদিং-স্যুট। তারও রং লাল। হঠাৎ যেন বিদ্যুৎ ঝলসে উঠল মঞ্জরীর ভিতরে। কোন অন্যমনষ্কতার ফাঁদে পা আটকেছিল, যে এই ভুলটা হল? অন্য কোন রঙের নেলপালিশ বা সুইমিং-স্যুট ছিল না? গুড ফ্রাইডের ছুটিতে ‘সৈকতসুখ’য়ে এলে ও কি কখনও লাল রং ব্যবহার করে? কি ভীষণ অপরাধ করে ফেলেছি, কিভাবে মুক্তি পাব এই পাপ থেকে! এমনতর কোনও অন্ধ, তীব্র আবেগ কাজ করছে, সেভাবে নেলপালিশ রিমুভারে তুলো ভিজিয়ে তা দিয়ে ঘষে ঘষে নখের রং তুলতে শুরু করল মঞ্জরী। মনের ভিতরে চলছে রক্তাক্ত এক চলচ্চিত্র। লাল লাল ছোপ ছোপ রক্তে ভিজে গেছে হলুদ বেলাভূমি…. মহামানব সেই পুরুষটি জানপ্রাণ দিয়ে বাঁচাচ্ছে মুন্নিকে। খোকা রায় আর তার সাঙ্গপাঙ্গরা…. হাতে নয় লোহার রড, নয় পাইপ বা চেন। কিভাবে যেন ছাড়া পেয়ে গেছে, ঝড়ের বেগে ছুটছে ‘সৈকতসুখ’য়ের দিকে আর্তচিৎকার “ঝাআমুউয়াআ বাঁআচাওওও”। খোকা রায় ছুটছে মুন্নিকে ধরতে…। অন্য জানোয়ার পুরুষগুলো মহান মানুষটার পাজামা পাঞ্জাবী ফালাফালা করে ছিঁড়ে দিল। এবার হিঁচড়ে হিঁচড়ে টানতে টানতে নিয়ে চলেছে ঝাউবনের দিকে। ততক্ষণে মানুষটি প্রায় উলঙ্গ। পশুগুলো একটা গাছের সঙ্গে তাঁকে বেঁধে ফেলল ছিন্নভিন্ন কাপড়ের টুকরোয়। এমন একটা প্রতিকৃতি, যেন ক্রুশবিদ্ধ যীশু। খোকা রায় কব্জায় নিয়ে ফেলেছে মুন্নিকে, বকখালির অভিজ্ঞতা বাঁচাল ওকে, চশমা ছাড়া খোকা রায় অন্ধ, চশমা টেনে দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিল, সামনেই ‘সৈকতসুখ’, ঝামুয়াকে ডাকার আগেই দেখা গেল সে সিঁড়ি বেয়ে তরতরিয়ে নেমে আসছে, মুঠোয় ওর অব্যর্থ অস্ত্র, ওর ‘মেশিন’, রিসর্টের লোকেরাও বেরিয়ে এসেছে। ঝাউবনে তখন চলছে মারের পর মারের তান্ডব। মুন্নি ছুটল ওদিকে, পিছনে ঝামুয়া। ঝাউবনতলা রক্তে রক্তাক্ত, যীশুপুরুষ তাঁর অবশিষ্ট সামান্য সংজ্ঞা– চেতনের জোরে ঈঙ্গিতে আকূতি জানাচ্ছে বন্ধ হোক্ সমস্ত হত্যা, মৃত্যু, রক্তপাত, হিংসা, হানাহানি…… কিন্তু আগ্নেয়গিরির মতন ঝামুয়া, তার গহ্বরমুখ খুলে গেছে, তার ‘ মেশিন ‘-এর তাক্ কখনও ভুলেও ফসকায় না। মুন্নি এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল, কেড়ে নিল আগ্নেয়াস্ত্র। খোকা রায় সদলবলে পালাল। ঝাউবনে যীশুপুরুষ তখন ঝিমিয়ে পড়েছেন, ঘাড় কাত হয়ে গেছে, আয়ু আর কতক্ষণের? মঞ্জরী দেখল ওর সবকটা নখের রং সাদা হয়ে গেছে। সমুদ্রস্নানে যাওয়ার আগ্রহটা কোথায় যেন উধাও। মন ভারাক্রান্ত। মোবাইলে শ্রীনাথকে ডেকে পাঠাল। দরজাটা আধভেজা রেখে গান চালিয়ে দিল। কতকাল আগেকার গান– “আমি অন্ধকারের যাত্রী, প্রভু আলোর দৃষ্টি দাও…”। শ্রীনাথ এসে মঞ্জরীকে দেখল। কোন জিজ্ঞাসাবাদ করল না স্নানে কেন এই হঠাৎ অনীহা। ওদের ভাবতরঙ্গে এমন একটা অন্ত্যমিল আছে, যে অনেক প্রশ্নোত্তরের প্রয়োজন হয় না।

প্রতিশোধস্পৃহার আগুনে দাউদাউ জ্বলছিল ঝামুয়া। শুধুমাত্র মুন্নির কারণে নয়, দেবোপম মানুষটির জন্যও। তাঁকে নিয়ে আসা হয়েছে সদর হাসপাতালে। অবস্থা খুবই সঙ্গীন। আগে হলে মুন্নিও হয়ত ঝামুয়ার মত করে ভাবত। কিভাবে খোকা রায়ের উপর প্রতিশোধ নেওয়া যায়। কিন্তু প্রেমের কলি যখন সবে ফুটেছে, তখন একদল দুবৃর্ত্ত এল সেই কলি ছিঁড়ে নিতে, কিন্তু পারল না। কারণ আরও বৃহৎতর প্রেম এসে তাকে বাঁচাল, তারপর যখন গোলাগুলি, খুনোখুনি, রক্তারক্তির হিংস্রলীলা শুরু হতে চলেছে। সেই বৃহৎ, মহৎ প্রেমাধারী মহাপুরুষটি মৃত্যুর দোরগোড়ায় দাঁড়িয়েও আকূতি জানাতে থাকল ওই ধ্বংসমাতন বন্ধ করার। এই ঘটনা পরম্পরার নির্যাসটুকুতেই মুন্নির পাল্টে গেছে রাতারাতি। ঝামুয়ার আগুনও নিভতে শুরু করল ধীরে ধীরে।

ওরা দু’জনায় রোজ যেত দু’জনায় হাসপাতালে মানুষটিকে দেখতে। নিজেদের কথার মধ্যে একদিন ওরা আবিষ্কার করল প্রভুযীশুর সেই বিখ্যাত বাণী, যেখানে তিনি বলছেন, পাপকে ঘৃণা কর’, কিন্তু পাপীকে নয়– এ যেন ওদের নিজেদের কথা। খোকা রায়ের বউ রত্না তার অস্বাভাবিক যমজ দুটো ছেলেকে নিয়ে গায়ে আগুন দিয়ে আত্মহত্যা করেছিল। আক্রোশে খোকা রায় উন্মাদ হয়ে ওঠে। দলবল নিয়ে এসেছিল মুন্নির উপর, ঝামুয়ার উপর প্রতিশোধ নিতে। পরে ওরা জানতে পারে পাওনাদারদের হাত থেকে বাঁচতে সে নিরুদিষ্ট। তাহলে চার বছরের মেয়ে চিরশ্রীর কি হল? তিন বছর তখন কেটে গেছে। তার মানে মেয়ের বয়স সাত বছর। মুন্নি গিয়ে দেখল এ মহলে সে মহলে কাকি, পিসি, বৌদিদের বাচ্চা সামলাচ্ছে সেই মেয়ে। ও নিয়ে এল নিজের কাছে। ঝামুয়াও ওর সমস্ত ব্যবসা বৈধীকৃত করেছে। তার জন্য যা যা ন্যায্য খেসারত, বা গুনাগার দিতে হয়েছে, তাই দিয়েছে। তবে সেই মহৎপ্রাণ মানুষটির জ্ঞান ফিরেছিল কি ফেরেনি তা জানা যায়নি। একদিন ঝামুয়া আর মুন্নি গিয়ে দেখে তাঁর কেবিন ফাঁকা। তবে জানালার বাইরে ফুলে ফুলে ভ’রে রয়েছে দোলনচাঁপা গাছটা।

রাত এখন গভীর।শরীরে শরীর ছুঁয়ে পাশাপাশি শুয়ে আছে শ্রীনাথ আর মঞ্জরী। কিছুক্ষণ হল কামনা বাসনার আগুন নিভেছে। এখন জ্বলছে প্রেমের নিষ্কম্প দীপশিখা।

ঘুমে ভারী দু’জোড়া চোখ। হতে পারে স্বপ্ন, তবু কি সত্যি, সামনাসামনি কোথাও থেকে ভেসে আসছে গীর্জার ঘণ্টা, ধূপের পবিত্র সুবাস, সমবেত গান: “বিশ্বপিতা তুমি হে প্রভু, আমাদের প্রার্থনা এই শুধু, তোমারই করুণা হতে বঞ্চিত না হই কভু…”।