গৌতম গুহ রায়

বার্ধিক্য জনিত অসুস্থতার প্রতিকুলতা তাঁকে কাবু করতে পারেনি, তীব্র শ্বাসকষ্ঠ উপেক্ষা করেও হাজির ভারতের ক্ষমাতাসীন শাসকের সৌরতান্ত্রিক আচরণের বিরুদ্ধে আহূত প্রতিবাদ সভায়। নাকে অক্সিজেনের নল, সঙ্গী পোর্টেবল সিলিন্ডার। ‘আরবান নক্সাল’ তকমা দিয়ে প্রতিবাদী সামাজকর্মীদের গ্রেপ্তারের বিরুদ্ধে গোটা দেশজুড়ে প্রতিবাদ উচ্চারিত হয়েছিল, সেই প্রতিবাদ মিছিলের সামনে ৮০ পার হওয়া গিরিশ কারনাড।

২০১৫ সালে টিপু সুলতানের ২৬৫ তম জন্মজয়ন্তীর অনুষ্ঠানে বিশিষ্ঠ অতিথি গিরিশ কারনাড প্রস্তাব রেখেছিলেন ব্যাঙ্গালড়ুর বিমানবন্দরের নাম কেম্পেগৌড়ার বদলে টিপু সুলতানের নামে রাখার জন্য, বলেছিলেন ‘টিপু’ যদি হিন্দু হতেন তবে তার স্থান শিবাজীর যায়গায় হত। সাম্রাজ্যবাদী বিদেশি শক্তির বিরুদ্ধে টিপু এক আপোসহীন যোদ্ধা। এর ফলে উগ্র হিন্দুত্ববাদী ধর্মিয় সন্ত্রাসীদের খতম তালিকায় সর্বাগ্রে ছিলেন তিনি। এই প্রসঙ্গে কলকাতায় দৃঢ় স্বরে তিনি বলেছিলেন, “উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের আমি ভয় পাই না। জীবন নশ্বর।” শুনিয়েছিলেন বাংলার সেই গানের কলি, ‘ভয় কি মরণে!’ এই অকুতভয় মানুষটি চলে গেলেন চির ঘুমের দেশে।

উপমহাদেশের সাহিত্য, থিয়েটার, ফ্লিম অভিনয়ে সবার থেকে স্বতন্ত্র, টানটান ও ঋজু, তিনি গিরিশ রঘুনাথ কারনাড, ৯ জুন সকালে ৮১ বছর বয়সে প্রয়াত হলেন তার বেঙ্গালুরুর বাসভবনে। মৃত্যুর কিছুদিন আগেও তাকে চিন্তিত রেখেছিল দেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকা শক্তির ধর্মান্ধ আচরণ, ক্ষমতার পেশীশক্তির আস্ফালন। তাঁর প্রতিবাদ ছিল আসন্ন সমাজিক বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে, নাগরিকের মুক্তচিন্তার স্বপক্ষে। সত্যের পক্ষে তিনি আজন্ম লড়েছেন, আপসহীন এই লড়াইয়ে তার আয়ুধ ছিলো সাহিত্য ও থিয়েটার।

বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী কারনাড একাধারে ছিলেন নাট্যকার, সাহিত্যিক, চলচ্চিত্র অভিনেতা ও পরিচালক। বিভিন্ন ভাষায় তার লেখা নাটক অনুদিত হয়েছে, বাংলা সহ দেশে ও বিদেশে তাঁর নাটক মঞ্চস্থ হয়েছে। নাট্যকার হিসাবে তার পরিচিতি বেশি হলেও তিনি চাইলে সাহিত্যেও তার আসন স্থায়ী করতে পারতেন। সার্বিক অর্থেই গিরিশ কারনাড ছিলেন বহুমুখী প্রতিভা। ভারতীয় সাহিত্যর নব্য আন্দোলনের একজন পুরোধা ছিলেন তিনি।

গিরিশ কার্নাডের জন্ম মহারাষ্ট্রের মাথেরানে, ১৯৩৮ এ। গিরিশের মানসিক দৃঢ়তা মা কৃষ্ণাবাই মাঙ্কিক-এর থেকে পাওয়া। খুব কম বয়সে স্বামীকে হারান কৃষ্ণবাই, এক পুত্রকে নিয়ে যাকে বলে অকুল পাথারে পরেন। এর পর সংসার পালনের জন্য নার্সিং প্রশিক্ষণ নেন। সেখানেই পরিচয় হয় ডাঃ রঘুনাথ কারনাডের সঙ্গে, তিনি তখন বম্বে মেডিক্যাল সার্ভিসেসে যুক্ত। দুজনে ক্রমশ কাছাকাছি আসেন ও বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু বিধবার বিয়ে তঠকালীন কন্নড় সমাজে সহজ ছিল না। তাঁরা শেষমেশ আর্য সমাজের বিধি মেনে বিয়ে করেন। তাঁদের ৪ সন্তান জন্মায়। তৃতীয়জন গিরিশ। পরে মহারাষ্ট্রে হলেও শৈশব কাটে তাঁর কর্ণাটকের শির্ষিতে। সেখানে পারিবারিক ভাবেই তিনি সংস্কৃতির পরিবেশে বড় হয়েছেন। স্থানীয় লোকনাট্য ও ট্রেডিশানাল পালা ‘যক্ষগণ’এর প্রতি আগ্রহী হন সেসময় থেকেই, যা তাকে পরবর্তীতে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।

কর্ণাটকের গ্রামীন সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহী হন সেই সময় থেকেই, অনাড়ম্বর গ্রামীণ লোকনাটক তাকে আকর্ষণ করত, এই টান চিরকাল তাকে আটকে রেখেছিল শেকড়ের সঙ্গে। কিশোর বয়সেই চলে আসেন ধারোয়ারে, ১৯৫২তে ভর্তি হন বাসেল মিশান হাই এডুকেসান ইন্সটিটুয়েটে। সাহিত্যের আগ্রহী হলেও পাঠ নেন অংকে, সেখান থেকেই ১৯৫৮তে কর্ণাটক বিশ্ববিদ্যালোয়ের থেকে অংকে স্নাতক হন। আবার ভিন্ন বিষয়ে চলে যান, ১৯৬০এ রোডস স্কলারশিপ নিয়ে চলে যান অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন ও রাজনীতির পাঠ নিতে। সেখানে সক্রিয় থাকেন সাংস্কৃতিক কর্মী হিসাবেও, অক্সফোর্ড ইউনিয়নের সম্পাদকও হন। এরপর আবার ফিরে আসেন নিজের শেকড়ে। চাইলে ইংরাজি ভাষায় সাহিত্য রচনায় মগ্ন থাকতে পারতেন, কিন্তু মাতৃভাষা কন্নড়কেই বেছে নেন কাজের ক্ষেত্র হিসাবে।