দীপ শেখর চক্রবর্তী

প্রচন্ড ঘেমে নেয়ে উঠে হোরাসিও ভিক্টর ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে তখনো ভোর হতে আরও ঘন্টা দুই বাকি।আগের রাতে দীর্ঘ সময় ধরে আমার সঙ্গে তর্ক করে কিছু না খেয়েই ঘুমোতে গেছে অনেকটা দেরিতে।একটা অস্বাভাবিকতা ওর মধ্যে যে আমি লক্ষ্য করিনি এমন নয়। বিশেষত রাজনৈতিক মতাদর্শ নিয়ে তর্ক করলেই হোরাসিও ভিক্টর বিপক্ষকে পশুর মতো ভাবে।তবে কালকের তর্কটা রাজনীতির ছিল না।বরং খালি হাল্কা চালেই আমি ভিক্টরকে বলেছিলাম- তোমার রক্ত নিশ্চয়ই আর লাল নেই,নীল হয়ে গেছে। এতেই প্রবল রেগে যায় ভিক্টর।

কিছুক্ষণ চুপ করে রাগে কেঁপে আমাকে যুক্তি দিতে বলে-কেন আমার এমন মনে হয়।আমি তাকে কিছুতেই বোঝাতে পারি না যে কথাটা আমি কেবল মজার ছলে বলেছি এবং এতে আমার ওকে আঘাত করার কোন বিশেষ উদ্দেশ্য ছিল না।ভিক্টর এও ভাবতে পারে যে আমি ওর কম্যুনিস্ট রক্তকে ব্যঙ্গ করে এসব বলছি কিন্তু আমি রক্তের রঙ নিয়ে এমন কথাটা কিছুতেই এমন কোন উদ্দেশ্য নিয়ে বলিনি। বরং ওর যৌবনের আগুনে দিনগুলো অতিক্রান্ত হয়েছে এমন বোঝাতেই এই উপমা আমি ব্যবহার করেছিলাম।

ভিক্টর আমাকে একপ্রকার বকাবকি করে প্রায় তাড়িয়ে দিয়েছে এবং সেই অপমান নিয়ে বাড়ি ফেরার সময় ভেবেছি কোনদিন কাউকে রক্তের রঙ নিয়ে কিছু বলবো না।বিশেষত যাদের বাড়িতে ধূসর রঙের একটা অস্বস্তিকর বেড়াল থাকে।

রাতের বেলায় আবার সেই ভিক্টরের টেলিফোন পেয়ে খুব অবাক হলাম।তার খুব ভয়ার্ত গলায়- ‘তাড়াতাড়ি একবার এসো’।শুনে সেই রাতেই চলে গেলাম ওর বাড়ি।রাস্তায় গাড়িঘোড়া কম ছিল।কিন্তু এক পুরোনো টাঙ্গাওয়ালার সঙ্গে দেখা হয়ে যাওয়ার ফলে তেমন অসুবিধে হল না।শুধু ঘোড়াগুলোর নীল রঙ আমাকে সামান্য অস্বস্তিতে ফেলেছিল।কেউ কোনদিন কি নীল ঘোড়া দেখেছে?টাঙ্গাওয়ালাকে জিজ্ঞেস করারে সে খুব ভয়ে ভয়ে বললো- কিছু করার নেই বাবু।চারিদিকে অনেক বিপদ আপদ।নীল রঙটা নিরাপদ এখন।

কিন্তু তাড়াহুড়োয় আমি একটা বাদামী জামা পড়ে এসেছে।হে ঈশ্বর।টাঙাওয়ালা আমাকে বললো বাবু খুব সাবধান,এই কয়েকদিন আগেই দুটো বাদামী পোশাক পড়া লোককে গুলি করে দিয়েছে ওরা।চেহারা এমন করে দিয়েছে যে চেনা যাচ্ছেনা।আপনি আপনার গাঢ় সবুজ লেখকের জামাটা পড়ে আসলেই পারতেন।বোঝা যেত আপনি কেবল রোমান্স লেখেন,প্রেম টেম লেখেন।ওদের পক্ষে বিপক্ষে কিছুই লেখেন না।খুব বড় ভুল হয়ে গেছে।অথচ এখন ভিক্টরের কাছে যাওয়াই বেশি প্রয়োজন।কিছু টাকা বেশি দিলাম,বললাম তোমার ঘোড়াগুলোকে একেবারে পক্ষীরাজ করে দাও।রাতের আকাশে তেমন চোখে পড়বে না।

ভিক্টরের বাড়ির সামনে গিয়ে দেখি সিড়ি দিয়ে সামনের বাগান সব নীল জলে ভরে গেছে।বাড়ির ভেতর থেকে নীল জলের ধারা এসে ভাসিয়ে দিচ্ছে গোটা বাগানটা।টাঙ্গাওয়ালাকে ছেড়ে দিলাম যদিও বিশ্বস্ত সে,তবুও লাভ নেই সমস্যা বাড়িয়ে।ভেতরে ঢুকে দেখি হাতের ওপর মুখ ঢেকে কাঁদছে ভিক্টর।ওর চোখের জল অদ্ভুত নীল হয়ে উপচে পড়ছে গোটা বাড়িটায়,মেঝে আসবাবপত্র সবই নীল হয়ে যাচ্ছে।আমাকে দেখে ভিক্টর কিছুটা অভিমান আর প্রবল বিষন্নতার সঙ্গে বললো- এ তুমি কী করলে?

আমার এমন অপূর্ব লাল রক্ত তোমার কথাতে এমন পিশাচের মতো নীল হয়ে গেলো।কী করেছো তুমি?তোমাকে তো আমি বিশ্বাস করেছিলাম।একজন কবি হিসেবে,লেখক হিসেবে তোমাকে সম্মান করতাম আমি।তুমিও ওদের দালাল হয়ে গেলে?

ভিক্টরকে বোঝাতে গেলাম যে আমি কিছুই করিনি।আমি স্রেফ মজা করে বলেছিলাম কথাটা।অথচ তাতে যে এসব হবে আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি।ভিক্টর তুমি বিশ্বাস করো,আমার বাবা একজন কম্যুনিস্ট ছিল।আমার মা ছিল মহাবিদ্যালয়ের শিক্ষিকা।দুজনে মিলে সারাদিন শুধু মানুষের জন্য কাজ করে যেতেন।কম্যুনিস্ট আদর্শ আমি কোনদিন ঠিক মানতে পারিনি তাই বলে আমি ঘৃণা করিনি কখনো ভিক্টর।

ভিক্টরকে এসব কথা বোঝানো বৃথা। যত কথা হচ্ছে তত ওর কান্নার পরিমান বাড়ছে।নীল রঙের স্রোত বইছে গোটা ঘরটায়।যদিও নিরাপদ এখন তা।যতক্ষণ তার রঙ নীল।

তবে ওরা যদি খবর পায় তবে একবার অনুসন্ধান করতে আসবেই।তখন ভিক্টরকে সামলানো অসম্ভব হয়ে উঠবে আমার পক্ষে।

আশ্চর্য দেখি ধূসর গায়ের বেড়ালটা আমার ছেড়ে রাখা পোশাকে গা ঘষছে এবং ধীরে ধীরে রঙ বদলাচ্ছে। বেড়ালের রঙ বদলানো এই প্রথম আমি দেখলাম।এতদিন শুধু মুখেই শুনেছি এ কথা।অতয়েব আর ভুল নেই।আমাদের কপালে একটা বিরাট বড় বিপদ অপেক্ষা করে আছে।

রাত বাড়ছে ভিক্টরের কান্না থামছে না।আমরা দুজনেই যেন একটা বিরাট বিপদের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম।পালিয়ে লাভ নেই।এটার মুখোমুখি হতেই হবে।বরং তা এখানে হলেই ভালো।বসে মুখোমুখি আলোচনা করতে পারলে অনেক সমস্যার সমাধান হতে পারে।

ভিক্টরকে সেই ছোট থেকে বড় ভালোবাসি আমি যখন ওরা আমার বাড়ির পাশে থাকতো।সারাদিন ওর বাবা মা ঝগড়া করতো এবং যখন সেই ঝগড়ার মাত্রা বেড়ে যেত খুব তখন ছোট্ট ভিক্টরকে ওরা এনে বসিয়ে রাখতো বড় রাস্তার ওপরে।ছোট্ট ভিক্টর গাড়ি চাপা খেয়ে মরে গেলেই যেন সব সমস্যার সমাধান হয়।একদিন এমন অবস্থায় ওকে দেখে আমার মা বাড়িতে নিয়ে আসে।শরবত খাওয়ায়।এদিকে ভিক্টরকে খুঁজতে খুঁজতে ওর বাবা মা চলে আসে আমাদের বাড়ি।খুবই অপ্রসন্ন,অযথা মুখ খারাপ করে।

বলে- ভিক্টর হল ওদের ঝগড়া থামানোর পুতুল।ওদের শান্তির জীবনে আমরা যেন কোনপ্রকার অশান্তি লাগানোর না চেষ্টা করি।যদিও ভিক্টরের সঙ্গে আমার মাঝে মাঝে দেখা হত।ওকে আমি বাগান থেকে প্রতি বিকেলে একটা করে লাল রঙের ফুল দিতাম, যা ও খুব ভালোবাসতো।ভিক্টর বলতো,এটা খুব ভালো জাতের একটা লাল ফুল।এমন ফুল এই পৃথিবীর আর কোথাও নেই।ভিক্টরকে আমি অনেক বই পড়তে দিতাম যেটা আমার মা প্রতিদিন হাতে করে আমার জন্য নিয়ে আসতেন।

বাবার বাড়ির ড্রয়ারে রাখা রিভলভারটা একদিন লুকিয়ে লুকিয়ে ভিক্টরকে দেখিয়েছিলাম।বাগানের ঝোঁপের মধ্যে তা দেখে চকচক করে উঠেছিল ওর চোখ।বলেছিল,একদিন ঠিক এটার সঠিক ব্যবহার করবে ও।কিছু বছর পর ভিক্টরের পরিবার অন্য জায়গায় চলে গেলো প্রতিবেশিদের একপ্রকার না জানিয়ে।মা খুব চিন্তিত হয়ে পড়েছিল ভিক্টরকে নিয়ে।

এর বহু বছর পর একদিন মাতিয়ে বুহারদিনোর সঙ্গে ঘনিষ্টতার সময় সে ভিক্টরের কথা বলে।বলে সে এমন এক অদ্ভুত মানুষের কথা জানে। ভিক্টর।

ব্যাস তারপর আবার ভিক্টরকে খুঁজে বার করলাম আমি।সম্পর্কটা আমার নতুন করে হল।কিন্তু আগে শুধু ভালোবাসা ও যত্ন ছিল,এখন বিচ্ছিরিভাবে যুক্ত হল তর্ক।

আমার মদ এবং মেয়েমানুষের আকর্ষণটা ওকে খুব বিরক্ত করতো।ও বলতো আমি দিনদিন একটা শুয়োরের বাচ্চা হয়ে যাচ্ছি কারণ নিজের বাবা মায়ের রক্তের রঙের প্রতি আমার কোন শ্রদ্ধা নেই।আমার প্রেমের বা প্রকৃতির কবিতাগুলো যে আগুনে পুড়িয়ে ফেলা উচিৎ,এই নিয়ে ওর মনে কোন সন্দেহ ছিল না।

বেশ্যাবাড়ি থেকে কখনো আমার সঙ্গে দেখা করতে আসবে না বুঝলে- ও বলতো আমাকে।আমি প্রতিবাদ করতাম না।কারন একটা অপরাধবোধ আমার ছিল।আগের মতো সেই বিরল প্রজাতির লাল ফুলটা আমি ভিক্টরের জন্য নিয়ে আসতে পারতাম না আর।বহু আগেই সেটা দমবন্ধ হয়ে মরে গেছে বাগানেই।

অথচ আজ কী করবো এই পরিস্থিতিতে।ভোরেএ আলো প্রায় ফুটতে চায়।এদিকে কাল রঙ খেলার উৎসব।উৎসব তো নয়।এ যেন এক হত্যালীল।ফায়ারিং স্কোয়াডের মতো করে সবাইকে এক সারিতে দাঁড় করিয়ে ঠিক বন্দুকের মতো পিচকারি দিয়ে ওদের ওপর রঙ দেওয়া হবে।নীল,হলুদ,বেগুনী,সবুজ।এমন রঙ যা ওদের পছন্দ।সবথেকে বেশি ব্যবহার করা হবে নীল রঙ।কারন, নীল রঙ ওদের সবথেকে বেশি পছন্দ।

ভোর হতে না হতেই কোর্ট টাই পড়া লোকজন সব এসে নামলো ভিক্টরের বাড়ির সামনে।চমৎকার তাদের পোশাক।তাদের চুলের ছাট এমন যা তাদের অসম্ভব ভদ্র করে তুলেছে।দরজা ঠেলে ঢুকে প্রথমেই তাদের চোখ গেলো আমার দিকে।

সামান্য হাসিমুখে আমাকে যেন উষ্ণ অভ্যর্থনা জানালো তারা।

একদম পেছনের লোকটি সামনে এসে আমার বুকের মধ্যে লাগিয়ে দিলেন একটা নীল ফুল।ফিসফিসিয়ে বললেন –
আপনি আমাদের সুখনজরে আছেন।সেদিন ‘দ্যি আল্টিমেট’ পত্রিকায় আপনার কবিতাদুটো পড়লাম।কি অসম্ভব ভালো লিখেছেন আপনি।এবারও পুরস্কারটা আপনিই পাচ্ছেন।কোন কুত্তার বাচ্চা কি জন্মেছে?আপনাকে হারায়?

তারপর ভিক্টরের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে বললেন- ‘এটাকে সামলালেন কী করে?সত্যিই।যা এতদিন এত চেষ্টা করে পারলাম না… কোন কুত্তার বাচ্চা কি জন্মেছে… পুরস্কার আপনাকেই মানায়…’
আমার তার কথার দিকে খেয়াল নেই।আমি শুধু ভিক্টরের দিকে তাকিয়ে আছি।আমি কেন,সবাই তাকিয়ে আছে।ওর কান্না থামেনি এখনো।গোটা বাড়ি পাড়ার রাস্তায় এত জল জমেছে যে গোটাটাকে একটা নীল সমুদ্র বলে ভুল করলেও দোষ নেই।

দলের যে লোকটির চেহারা অসম্ভব মোটা,সে এবার গম্ভীর স্বরে বলে উঠলো- ভিক্টরবাবু কাঁদবেন না আর।যথেষ্ট হয়েছে।আপনাকে আমরা ভুল বুঝেছি।আপনি যা প্রমাণ করে দিয়েছেন আজ তা কেউ কখনো করতে পারেনি।আপনি বুঝিয়ে দিয়েছেন যে আমরা এত সুশাসন গড়ে তুলেছে যে মানুষের কান্নার রঙটাও এখন আমাদের দলের রঙ।সত্যি,আপনার কাছে কী বলে যে ক্ষমা চাইবো।বরং একটা সুযোগ করে দিন আপনাকে যথাযোগ্য পুরস্কৃত করার।

ভিক্টরকে নিয়ে গেলো ওরা।মোটা চেহারার লোকটি আমার দিকে তেমন গুরুত্ব দিলেন না,বরং সেই পেছনের লোকটি চোখের ইশারায় বলে গেলেন- আছে,আপনার জন্য আছে।
তারপর পকেটে আগামীকালের রঙের উৎসবে যোগদান করার টিকিট দিয়ে গেলেন।
– ওখানে কবিতা পড়বেন আপনি।আমরা আপনাকে ওখানেই পুরস্কৃত করতে পারি।

ভিক্টর আমার দিকে একবার তাকিয়ে দেখলো না।নিঃশব্দে গিয়ে উঠলো গাড়িতে।বাড়ি ফিরে এলাম আমি।খুব করে নিজেকে মেরে ফেলতে ইচ্ছে করছিল আমার।আমিই শত্রুতা করে ওকে শেষ করে ফেললাম? ভিক্টর? আমার ছোট্টবেলার প্রিয় বন্ধু ভিক্টরকে?

সারারাত মদ খেয়ে শুয়ে রইলাম খাটে।ভিক্টর।আমার সেই ছোট্ট ভিক্টর যাকে বাগান থেকে লাল একটা ফুল তুলে এনে দিতাম।এমন ফুল যা আমাদের বাগান ছাড়া আর কোথাও ফোঁটে না।

রাতে উঠে একটা কবিতা লিখলাম আমি।মদ খেয়েছি এত,যে চোখে ঝাপসা দেখছি।তবু এই কবিতাটা আমায় লিখতে হবে।কাল যখন আমাকে পুরস্কারটা দেওয়া হবে এবং চোখের সামনে ফায়ারিং স্কোয়াডের মতো মানুষ দাঁড় করিয়ে বন্দুকের মতো পিচকারি দিয়ে রঙ ঢালা হবে তখন এই কবিতাটা আমি পড়বো।
কবিতাটা
হবে- ‘আমার বাগানের ফুল আজো লাল, ভিক্টর।’

গোটা কবিতাটা লিখে আর নিজেকে সামলানো গেলো না।বমি করে ফেললাম কাগজের ওপর।বাসি এক গন্ধ।ছিঃ।নীল রঙের বমি।কিন্তু একি,রক্ত।রক্ত।সামান্য রক্ত উঠে এসেছে।অপূর্ব রঙ তার।আহা।ভিক্টরের প্রিয় রঙ।বাবার প্রিয় রঙ। আহা। রক্ত।

সারারাত জেগে রইলাম আমি।সকালে উঠে এই কবিতাটা নেওয়া হল না।নতুন কবিতা।নাম-‘মাতিয়া,তোমার বুকের উঁচু পাহাড়টা।’
নতুন সবুজ পোশাকটা পড়ে নিলাম আমি।ঝকঝক করছে কলারটা।আয়নায় দেখলাম আমার মেদবহুল চেহারাটার সঙ্গে বেশ মানিয়েছে পোশাকটা।

রঙ আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছে কখন কোথায় কথা বলতে হবে।রঙের কাছে আমি খুব কৃতজ্ঞ।বিপদ একটাই, নৈঃশব্দের কোন রঙ আবিষ্কার করতে পারেননি ভগবান।