গৌতম রায়

সাতের দশকের শেষের দিকের মফস্বল শহর নৈহাটির সবথেকে অভিজাত দোকানে যখন বাবা দমদম থেকে ফেরবার পথে ঢুকলো তখন তাঁর ছোট ছেলেটা ঠিক কারণটা বুঝে উঠতে পারেনি। দোকানটার নাম শ্রীকৃষ্ণ স্টোর্স। সেই সময়ের দোতলা দোকান। একতলাতে কাপড় চোপড়, আর দোতলাতে ছোটদের স্বর্গ রাজ্য। আজকের ছেলেমেয়েরা অবশ্য সেইসব দিনকালের খেলনা পত্তরের নাম শুনলে আনন্দ পাওয়া তো দূরের কথা, এমন ভাবে মুখ ভ্যাটকাবে যে মনে হবে, কেন যে বলতে গেলাম ওকে। আসলে বলার সময়ে যিনি বলেন, তাঁর বলবার তাগিদ যতোখানি থাকে, শোনবার সময়ে যে শুনছে, তার তাগিদখানা তার আদ্দেক ও থাকে কি না বক্তার ভারি বয়ে গেছে তার হিশেব নিকেশ রাখতে।

তবু বলা যার স্বভাব সে বলেই যাবে। বলাতেই তার বাহাদুরি।লেখা যার স্বভাব, সে লিখেই যাবে।কেউ পড়ুক আর নাই পড়ুক। ফ্রজেন সোল্ডার হোক আর নাই হোক। টেন্ডনে যনতোন্না হোক আর নাই হোক, হাইড্রকর্টিজেন ফুঁড়েও সে লিখেই যাবে। তেমনিই সেদিনের সে স্বর্গ রাজ্যে ছিল ক্লাইম্বিং ঘোড়া। ঘোড়ার পিঠে বসে দোল খাওয়া যেত। বড্ড শখ ছিল ছেলেটার, যদি কোনোদিন মা কিংবা বাবা কিনে দেয়।

সেদিন তাই শ্রীকৃষ্ণ স্টোর্সে দোতলার সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময়ে তার মনের ভিতর সেই দোল খাওয়া ঘোড়াটা হয়ে উঠেছিল স্বপ্নের টাট্টু। টাট্টু ঘোড়ার রূপকথা তখন তার স্বপ্ন রাজ্যে ছেয়েছিল শরতের ঝলমলে রোদের মতো করেই। ছোটোমাসী ঘুম পাড়ানোর সময় গাইতো, ‘শান্ত নদীটি পটে আঁকা ছবিটি’। অন্য গান শুনলে ঘুমই আসতে চাইতো না। গাছের পাতার ঝিম ধরা পাল গুটিয়ে ছোট্ট তরীর মতোই ফুলের কলিদের চোখে ঘুম নামিয়ে দিয়ে যেত।

একটু পরেই ছেলেটার ঘোড়া কেনার আশা আকাঙ্ক্ষা তার বাবাই ঘেঁটে এক্কেবারে ঘ করে ছেড়ে দিলেন। ছেলের জন্যে বাবা একটা ভালো ক্যারাম বোর্ড কিনতে গেছেন। এসব ইনডোর এমনকি আউট ডোরে ছেলেটার কোনোদিনই তেমন কোনো উৎসাহ নেই। বাড়ির বিরাট উঠোনের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত দৌড়ে সে ব্যস্ত থাকে আপনারে দিয়ে আপনার আভরণ রচনাতে। তাই ক্যারাম নিয়ে তার মাথা ব্যথাও জন্মাবার অবকাশ পায়নি। ‘অঙ্কুশ’ ছবি দেখে ক্যারাম জানার যুগ সেটা ছিল না। অঙ্কুশে নানা পাটেকর আর বাঙালি অর্জুন চক্রবর্তীর অভিনয়ের তালে তাল মিলিয়ে ‘আয়া মাজা দিলওয়ালা’ করবার যুগ তখনও শুরুই হয়নি।

পেল্লায় ক্যারাম নিয়ে বাড়ি ঢুকে বাবার কাছে সে বসে গেল খেলা শিখতে। শিখতে গিয়ে দেখলো তার দিদি আগে ভাগেই খেলাটা জানে। আর যায় কোথা? বাবা তাহলে ক্যারাম আসবে বলে তার আগেই দিদিকে শিখিয়ে রেখেছিল কেমন করে স্ট্রাইকারটা আলতো করে ঠেলে দিতে হয়? এত্তোসতো বোঝবার আগেই ছেলেটার হাতে স্ট্রাইকার। পাউডার ঢালা পিছলে ক্যারাম বোর্ডে হালকা হলুদ স্ট্রাইকারটা পুড়ুৎ করে যেন একদম পিছলেই সামনের দিকে চলে গেল।

আনাড়িপনা দেখালে চলে? জীবনের সব ক্ষেত্রে যে যত্তো বেশি আনাড়ি, সে তত্তোবেশি করে নিজের মতো স্মার্টনেশের ঝুটো চেষ্ট দেখায় মানুষ। ঝুটোপনার ধরনধারণ আবার বয়স অনুপাতে আদলের অদল বদল ঘটায়। এই যেমন জীবনের প্রথমবার স্ট্রাইকারে হাত রাখার সেকেন্ড খানিকের ভিতরেই ওর দিদি চেঁচিয়ে উঠলো ডবল ফাইন। ছেলেটা একটু হতোভম্ব হয়ে গেছে সেই চিল চিৎকারে আর কি। ভেতরে ভেতরে কেদরে গেলেও সেই কেদেরে যাওয়াটা কেতরে যাওয়া করে কি দেখানো যায়? তাও আবার দিদির সামনে?

দিদির কথার সুর ধরেই বাবা বলে উঠলো হাসতে হাসতে তুলছিস কেন? ফেল,স্ট্রাইকারটা আগে পকেটে ফেল। তারপর না হয় তুলবি। যেমন কথা তেমন কাজ। স্মার্টনেশের চুড়ান্ত পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে ছেলেটা তখন ক্যারামের পকেট থেকে তেলালো স্ট্রাইকারটা তুলে ততোক্ষণে নিজের পকেটে চালান করেছে। হাসিতে ফেটে পড়েছে দিদি। বাবাও যোগ দিয়েছে হাসিতে। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গিয়ে ছেলেটা বুঝে উঠতে পারেনি সবাই হাসছে কেন? সে তো বাবার কথা মতোই নিজের পকেটে স্ট্রাইকারটা পুড়েছে।

একুশ শতকের একটাই নিশ্চিন্তি এমন বুদ্ধু এই সময়ে একটাও হয় না। বই পড়ে কিছু জেনে নেওয়ার আগে এখন সবাই অ্যানড্রয়েট ফোনের টাচ স্ক্রিনে আঙুল ঠেকিয়ে সব জেনে যায়। একুশ শতকেও তো ছোটরা ছোট থেকে বড়ো হয়। এই পোড়া বাংলাতে দক্ষিণারঞ্জন এখন ও তো ছাপা হয়। খগেন মিত্তিরও হয়। ঊনিশ কুড়ির ছেলে ছোকরাদের জন্যে প্রেমের কথা লিখতে বসার আগে কি স্মরণজিৎ চক্রবর্তী ভাবে, বাটানগরের কোনো এক অবিরাম বৃষ্টির দিনের কথা? সেদিন সন্ধে থেকেই লোর্ডশেডিং। মন্তর দিয়ে মাছের কাঁটা তোলা পিসীটা রান্নাঘরে বসে মা, কাকীমার সঙ্গে বসে গল্প করছে। ঠাকুরদাদাকে ঘিরে ছোটোরা। ঠাকুরদাদা বলছেন ষোড়শী ভূতের কীর্তি কলাপ। বর্ষার মৌসুমী বাতাস তখনই থমকে দাঁড়িয়ে সবাইকে ভিজিয়ে দিয়ে গিয়েছিল?