গৌতম রায়

কেমন করে আমরা স্মরণ করবো উনিশ শতকের নবজাগরণের অন্যতম ব্যক্তিত্ব বিদ্যাসাগরকে তাঁর জন্মদিনে? ১৮২০ খৃষ্টাব্দের ২৬ সেপ্টেম্বর বীরসিংহ গ্রামে যখন তিনি জন্মগ্রহণ করেন তখন সেই গ্রামটি মেদিনীপুর জেলার অন্তর্গত ছিল না। ছিল হুগলী জেলার অন্তর্গত। পরবর্তী সময়ে জেলা ভাগের প্রেক্ষিতে সেটি মেদিনীপুর জেলায় পড়ে। এখন অবশ্য পশ্চিম মেদিনীপুর জেলায়। ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের শৈশব জীবনে তাঁর পিতামহের একটা প্রভাব ছিল।

ঈশ্বরচন্দ্রের পিতা ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা বিদ্যাসাগর মশাইয়ের জীবনী আলোচনার ক্ষেত্রে বহুভাবে আলোচিত হলেও তাঁর পিতামহ রামজয় তর্কভূষণের কথা সেভাবে আলোচিত হয় না। বিদ্যাসাগরের পিতামহ রামজয় তর্কভূষণ সেযুগের সামাজিক প্রেক্ষাপটে একজন বিশিষ্ট্য ব্যক্তিত্ব ছিলেন। রামজয় তর্কভূষণের খ্যাতি যে কেবল একজন সুপন্ডিত বলেই ব্যাপ্ত ছিল তা কিন্তু নয়। বিদ্যাসাগরের পিতামহ রামজয় তর্কভূষণ তাঁর দৃঢ়চেতা ব্যক্তিত্বের জন্যে সে যুগে বিশেষ সমাদৃত ছিলেন।

বিদ্যাসাগরের চারিত্রিক দৃঢ়তার সঙ্গে তাঁর পিতামহ রামজয় তর্কভূষণের চারিত্রিক দৃঢ়তার বহুক্ষেত্রেই যথেষ্ট পরিমাণে সাদৃশ্য দেখতে পাওয়া যায়। বিদ্যাসাগরের নামকরণ ও তাঁর পিতামহ রামজয় তর্কভূষণই করেছিলেন।

বিদ্যাসাগরের পিতা ঠাকুরদাস কর্ম উপলক্ষে থাকতেন কলকাতাতে। ফলে বিদ্যাসাগরের শৈশব গাঁয়ের বাড়িতে পিতামহী এবং গর্ভজননী ভগবতী দেবীর সঙ্গেই কাটাতে হয়েছিল। গ্রামের সহজ সরল জীবনযাত্রা ঈশ্বরচন্দ্রের মানসলোকের উদ্ভাষণে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করেছিল। পরবর্তী জীবনে বিদ্যাসাগর বহু মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশের ভিতর দিয়ে নিজের জীবন কাটিয়েছিলেন। তা স্বত্ত্বেও গ্রামের ছোটবেলার পরিবেশ যে তাঁর মননলোকেএকটা বড়ো জায়গা জুড়ে থেকে গিয়েছিল, তা আমরা খুব ভালো করে বুঝতে পারি তাঁর জীবনের অন্তিম পর্যায়ে কার্মাটার পর্বে।

ঈশ্বরচন্দ্র যখন বীরসিংহে র পাশের গাঁয়ে সনাতন বিশ্বাসের পাঠশালাতে ভর্তি হন তখন তিনি একটু পরিণত বালকই বলা যেতে পারে। সেই গ্রামের সনাতন বিশ্বাসের পাঠশালাতে ভর্তি হওয়ার কালে বিদ্যাসাগরের বয়স ছিল চার বছর নয় মাস। সেই পাঠশালাতে গিয়ে দেখা গেল যে, গুরুমশাই সনাতন বিশ্বাসের ছেলেদের পড়াশুনা করানোর থেকে তাদের উপর খবরদারি করা, ছুতোয় নাতায় তাদের মারধোর করবার দিকেই বেশি লক্ষ্য-নজর।

বিদ্যাসাগরের বাড়ির মানুষজনদের আদৌ পছন্দ হলো না ভিন গাঁয়ে সনাতন বিশ্বাসের পাঠশালার রকম সকম। বিশেষ করে ঈশ্বরচন্দ্রের পিতামহ রামজয় তর্কভূষণের বেজায় আপত্তি অপন মারকুটে গুরুমশাইয়ের পাঠশালাতে নাতি কে পড়াতে পাঠাতে। তিনি তখন নিজেই উদ্যোগ নিলেন নিজের গাঁ বীরসিংহ তে একটি পাঠশালা খুলতে। রামনাথ তর্কভূষণ তাঁর এই নিজের গ্রাম বীরসিংহ তে পাঠশালা খুলবার উদ্যোগে গ্রামের ই কয়েকটি ডাকাবুকো ছেলেকে পেয়ে গেলেন তাঁর সহযোগী হিসেবে।

বীরসিংহ গ্রামে সেদিন রামজয় তর্কভূষণের স্বপ্নের পাঠশালা খুলতে তাঁকে সবথেকে বেশি সাহায্য করেছিলেন বীরসিংহের পাশের গ্রামের কালীকান্ত চট্টোপাধ্যায় নামক এক অত্যন্ত উদ্যোগী এবং পরিশ্রমী যুবক। রামজয় তর্কভূষণ বীরসিংহে পাঠশালা স্থাপন করবার পর এই কালীকান্ত চট্টোপাধ্যায়কেই সেই পাঠশালার শিক্ষকতার দায়িত্বভার অর্পণ করেছিলেন। বিদ্যাসাগর এই কালীকান্তের পাঠশালাতে আবার যখন ভর্তি হলেন তখন তাঁর বয়স আট। কিছুটা পরিণত বয়সেই ঈশ্বরচন্দ্র কালীকান্তের পাঠশালাতে ভর্তি হয়েছিলেন। এই কালীকান্তকে ঈশ্বরচন্দ্র তাঁর জীবনের অন্যতম আদর্শ শিক্ষক হিসেবে চিরদিন যথাযোগ্য মর্যাদা দিয়ে এসেছেন।

গ্রামের পাঠশালাতে পড়াশুনা শেষ করে ঈশ্বরচন্দ্র তাঁর পিতা ঠাকোরদাসের সঙ্গে প্রথম কলকাতা মহানগরীতে আসেন ১৮২৮ সালে। বিদ্যাসাগরের এই প্রথম কলকাতা আগমণ যেন আমাদের উনিশ শতকের নবজাগরণের একটি দ্বারোন্মোচক ঘটনাপ্রবাহ। বিদ্যাসাগর যখন প্রথম কলকাতাতে এসেছিলেন তখন তাঁদের সঙ্গেই এই কল্লোলিনী তিলোত্তমাতে এসেছিলেন ঈশ্বরচন্দ্রের আদিগুরু কালীকান্ত আর পরিচারক আনন্দরাম গুটি। বিদ্যাসাগরের এই প্রথম কলকাতা আগমণ নিয়ে মাইলফলকের গল্পটি সর্বজনবিদিত। এই মাইলফলকই হয়ে রইলো উনিশ শতকের নবচেতনার উন্মেষের এক স্মরণীয় দিকচিহ্ন। শিক্ষাবিস্তার, বিশেষ করে স্ত্রী শিক্ষা বিস্তার, বাল্য বিবাহ রোধ এবং বিধবা বিবাহ আইন প্রস্তুতের ভিত্তি ভূমি রচনাতে যে বৈপ্লবিক অবদান বিদ্যাসাগর সেই উনিশ শতকের পটভূমিতে অবস্থান করে রচনা করেছিলেন– তাকে এই একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকের সময়কালে দাঁড়িয়েও আমাদের জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি বলেই মনে হয়।