চিনুয়া আচেবে-র গল্প।। অনুবাদ গৌতম গুহ রায়

চিনুয়া আচেবে: জন্ম ১৯৩০ সালে নাইজেরিয়ায়। আফ্রিকার সাহিত্যের সবচেয়ে বড় নাম, বিশ্বসাহিত্য তাঁর উপন্যাস, কবিতা ও সমালোচনা সাহিত্যে তাঁর সৃজনে ঋদ্ধ হয়েছে। ১৯৫৮তে লেখা ‘থিংস ফল এপার্ট’ তাঁর প্রধান লেখা, এছারাও ‘এরো অফ গড’, ‘এন ইমেজ অফ আফ্রিকা’ প্রভৃতি তাকে বিশ্বসাহিত্যে চিরকালীন জায়গা দিয়েছে। ২০০৭-এ ম্যান বুকার পুরস্কার পান। ২০১৩ সালে প্রয়াত হন।


গৌতম গুহ রায়

একডাকে তাকে চেনেন সবাই, রুফাস ওকে, গ্রামের জনপ্রিয় তরুণ। তাঁর জনপ্রিয়তার কারণ ছিল তার স্বভাব, গ্রামবাসীর যে কোনো প্রয়োজনে সে সর্বদা হাজির। ছটফটে রুফাস, বা সংক্ষেপে রুফ সবসময় যে কোনো দরকারে মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। তাই গ্রামের লোকজন কৃতজ্ঞ এই তরুণটির কাছে, সে আন্যান্য ছেলে ছোকড়াদের মতো নয়, আজকালকার দিনে সবাই যেমন গ্রাম ছেড়ে শহরে পাড়ি দিচ্ছে কজের খোঁজে, সে তেমন নয়। তবে রুফাস অলস ভবঘুড়েও নয়। গ্রামের প্রতিটি মানুষ জানে একসময় সে হারকোর্য বন্দরে বাইসাইকেলের মেকানিকের হেল্পার হিসাবে কাজ করেছে। বছর দুয়েক সেই কাজ করার পর স্বেচ্ছায় তা ছেড়ে দিয়ে নিজের গ্রামে ফিরে এসেছে । সবাই যখন গ্রাম ছেড়ে চলে যাচ্ছে তখন সে গ্রামের মানুষের পাসে থাকের জন্য ফিরে এসেছে।

উর্মেফিয়ার সম্পর্কে খুব বেশি কিছু বলার নেই, ইতিমধ্যে পিপলস এলায়েন্স পার্টির নজরের মধ্যে এসে গেছে এই জনপদটি। এই গ্রামের ভূমিপুত্র, তাকে নিয়ে গ্রামবাসীও গর্বিত, চিফ মারাকাস আবে, বিগত সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী, আশা করা যায় যে তিনি আবারও নির্বাচিত হবেন। তার বিরুদ্ধে নামা আর পচা নোঙড়া গোবরের স্তুপ সড়ানোর চেষ্ঠা করা একই ব্যাপার। জিতে না আসলে গ্রামের লোকেরাই অবাক হবেন।

সবাই জানে যে রুফ আগামী নির্বাচনেও মন্ত্রীর সাথেই থাকবে। মানুষের সাথে নিবিড় ভাবে মিশে থাকার কারণে যে কোনো নির্বাচনে, তা স্থানীয় পঞ্চায়েত হোক বা জাতীয় স্তরের ভোট হোক রুফ-এর অভিমত গুরুত্ব পাবেই। সে মানুষের মনের কথা জানে, তাই ভোটের হাবভাব আগেই বলে দিতে পারে সে। এই করণের মন্ত্রী মশাইকে সে আগেই সাবধান করে দিয়েছে যে সম্প্রতি তাদের উমৈফিয়ারের মানুষের মনে একটা পরিবর্তন এসেছে। তাদের ভাবনা চিন্তা আগের মত নেই আর। গ্রামের মানুষেরা গত পাঁচ বছরে দেখেছে রাজনীতি কত দ্রুত একজনকে সম্পদশালী করে তোলে, সে গ্রামের মাতব্বরের তকমা পায়, এমন কি অনায়াসে একজন রাজনীতির মানুষ কিভাবে ডক্টরেট উপাধিও কব্জা করে নেয়! তবে সরল গ্রামবাসীকে শেষের বিষয়টি বুঝিয়ে দিতে হয় কষ্ঠ করে। আমাদের আনেকেরই বিশ্বাস যে ডক্টর মানে যিনি চিকিৎসা করেন, এ যে উচ্চশিক্ষার উপাধি তা সরল মনের অর্ধ শিক্ষিত মানুষগুলোকে বুঝিয়ে দিতে হয়।

মারাকাস সম্পর্কে গ্রামের মানুষের মধ্যে নানা কথা ঘুসঘুস ফুসফুস হয়। আগে একটা মিশনারী স্কুলে পড়াতেন তিনি। শিক্ষক হিসাবে তাকে কেউ পছন্দ করতো এমন নয়। অনেকেই বলে যে সেই স্কুলের এক শিক্ষিকাকে গর্ভবতী করার করণে বাচার জন্য সে রাজনীতিতে ঢুকে পড়ে, না হলে সেই ক্যালেংকারির করণে তার চাকরিটাই থাকত না। সেই লোকটাই রাজনীতির গুণে আজ মাননীয় ‘চীফ’। আজ তার দু’দুটো বিলাসবহুল গাড়ি, বিরাট প্রাসাদোপম বাড়ি।

তবে এই সাফল্য মারকাসের এমনি এমনি আসেনি। মানুষের জন্য, তার এলাকার জনগনের জন্য কাজ করেছেন তিনি। রাজধানীতে পরে থেকে রাজকীয় সুখে নিজেকে ডুবিয়ে রাখেননি। সময় পেলেই নিজের এলাকায় এসেছেন, এলাকার মানুষের সুখ দুঃখে পাশে থেকেছেন, তাই আজ তার এত প্রতিপত্তি। এই গ্রামে ছিল না বিদ্যুৎ, ভালো রাস্তা। মারাকাস তার বাসার জন্য বিদ্যুতের প্ল্যান্ট বসিয়েছেন। তিনি ভাগ্যের চাকা কি ভাবে ঘুড়িয়ে দিতে হয় জানেন। মারাকাস সেই ছোট্ট পাখিটি নন যে ভোগ-বিলাসে নিজের বাস্তবতাকে ভুলে নিজেকেই বিপন্ন করে তুলবেন। তার নতুন বানানো সুবিশাল প্রাসাদের উদ্বোধন করিয়েছেন আর্চ বিশপ কে দিয়ে, নাম রেখেছেন গ্রামের নামের সাথে জুড়ে, ‘উমৌফিয়া ম্যানসন’। উদ্বোধনের দিন গ্রামের প্রতিটি মানুষকে পেটপুরে খাইয়েছেন, এই জন্য পাঁচটি ষাড় ও বেশ কয়েকটি পাঁঠা কাটা হয়েছিল।

গ্রামের প্রতিটি মানুষের মুখে তাঁর নাম। গ্রামের এক বয়স্ক মানুষ সে দিন বলছিলেন, ‘আমাদের ছেলেটি খুব ভালো মানুষ, সে খবর আসার আগেই মাটিতে দেহ পেতে দেয়’। খাওয়া দাওয়ার পরে যদিও কিছু মানুষকে ভিন্ন সুরে কথা বলতে শোনা গেল, গত বার তাদের ভোটের অপব্যবহার হয়েছে, এবার ঠিকঠাক দিতে হবে। কিন্তু ‘চিফ’ মারাকাস এই সবের জন্য প্রস্তুত নন, তিনি জনতার এই ভিন্ন সুরকে পাত্তা দিতে নারাজ। ভোটের খরচের জন্য তাঁর ৫ মাসের বেতন আগেই তুলে এনেছেন। কয়েক’শ পাউন্ডকে শিলিং-এ ভাঙিয়ে রেখেছেন। তাঁর ভোটের প্রচার যাঁরা করবেন তাদের জন্য পাটের ব্যাগ তৈরি করিয়েছেন। সারাদিন তিনি বক্তৃতা দিয়ে বেড়ান গোটা এলাকায়, আর রাতে তার প্রচারক বাহিনী বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচার পর্ব সাড়ে। এই প্রচারক বাহিনীর সবচেয়ে বিশ্বস্ত নাম রুফ।

ভোটের প্রচারে একদিন গ্রামের অভিজাত ও খেতাবধারী মাননীয় ওগবুয়েফি এজেননোয়ার বাড়িতে এক সভা ডাকা হয়েছিলো। সেখানে রুফ বক্তব্য রাখেন। বলেন, ‘আমাদের গ্রামের ভূমিপুত্র আজ মন্ত্রী, আমাদের জন্য এর চেয়ে গর্বের আর কি হতে পারে!’ সে সমবেত গ্রামবাসীর সামনে আরো বলে যে তারা চান বা না-চান এবারো পিএপি দলই ক্ষমতায় থাকবে। মারাকাসকে আমরা ভোট দেই বা না দেই। কিন্তু আমাদের গ্রাম এখন শাষক দলের সুনজরে আছে, মারাকাস না জিতলে সেই ভাল সময় আর থাকবে না। গ্রামের পানীয় জলের সমস্যার কথা তুলে ধরে সে বলে যে এই সমস্যা সমাধানের আশ্বাস পাওয়া গেছে, এই কাজ বাস্তবায়নের জন্য মারাকাসের জয় দরকার।

এই বৈঠকে রুফ ছাড়াও আরো পাঁচ ছয় জন বৃদ্ধ ছিলেন। মধ্যখানে ছিল একটি ভাঙা হারিকেন, ধোঁয়ার কালিতে ঢেকে থাকা সেই হারিকেনের চিমনি তার, এর ফলে আস্পষ্ঠ আলোয় একটা হলদে রহস্য ছড়িয়ে পরছিলো ঘরটিতে। বৃদ্ধ মানুষগুলো নিচে মাটিতে বসে আছেন, প্রত্যেকের সামনে ২ শিলিং করে রাখা আছে। বাইরের দরজাটা আটকানো, আকাশের রূপালী চাঁদটা ওপর থেকে সরল দৃষ্টিতে এইসব দেখছে।

এনজোয়া কথা বললেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি তুমি যা বলছো তার সবটাই সত্যি, আমাদের সব ভোট মারাকাসই পাবেন। কেউওকি ওজো ধর্মীয় মহাভোজ ফেলে ভিখারিদের ভোজ খেতে যায়! তাই তুমি মারাকাসকে জানিও আমাদের তো পাবেনই সথে আমাদের বৌদের ভোটটাও পাবেন তিনি। কিন্তু এই যে দুই শিলিং তুমি দিচ্ছ এটা আমাদের খুব আত্মসম্মানে লাগছে। এই বলে তিনি সেই লন্ঠনটা উচু করে তুলে ধরলেন, যাতে নিচে রাখা শিলিংটার মূল্য পরিষ্কার দেখা যায়। তার পর আবার বললেন, ‘হ্যাঁ, দুই শিলিং খুব লজ্জার। মারাকাস যদি খুব গরিব হতেন, আমাদের বাপ ঠাকুর্দার নির্দেশ মতো এবারো সবার আগে ভোটটা তাকে বিনি পয়সায় দিয়ে আসতাম, আগে যেমন দিয়েছি। কিন্তু এখন মারাকাস অনেক সম্পত্তির মালিক, অভিজাতের মত থাকেন তিনি। আমরা সেদিনও তার কাছে দু-পয়সা দাবী করিনি। কিন্তু আজ আমাদের দিন, আজ আমরা ইরোকো গাছের মাথায় চড়েছি, তাই সব জ্বালানি কাঠ না নিয়ে মাটিতে নামবো না।’

রুফ সহমত এদের সাথে, সে এর প্রস্তুতি নিয়েই এসেছিল। পরিস্থিতি কি হতে পারে তার আগাম অনুমান সে করতে পারে। যেমন তার নিজের ক্ষেত্রেই হল, গতকাল মারাকাসের অনেকগুলো দামী জামার মধ্যে থেকে তার পছন্দ মতো একটি সে চেয়ে নিয়ে এসেছে। এর পর যখন সে রেফ্রিজারেটারে রাখা বিয়ারের স্টক থেকে পঞ্চম বোতলটি বের করে নিচ্ছিলো সে সময় মারাকাসের বউ এসে খুব চেচামেচি করে আপত্তি জানায়, সবার সামনেই স্বামীকে গালমন্দ করে, কিন্তু সে বিষয়টি ঠিক সামলে নিয়েছে। এই সেই মহিলা যার জন্য মারাকাস স্কুলে কেলেঙ্কারিতে ফেসে গিয়েছিল। মারাকাসের চারদিকের ঝামেলাগুলো রুফই সামলে দেয়, এর বিনিময়ে সম্প্রতি সে একটি জমিও বাগিয়ে নিয়েছে। এই করণে গ্রামের ধুরন্ধর বুড়োদের জন্য সে উপযুক্ত রসদ নিয়েই এসেছে।

‘ঠিক আছে’, বলে সে আশ্বস্ত করলো তাঁদের। এর পর আইবোকে বলল, ‘এই সব ছোটোখাটো ব্যপারে আমাদের মনমালিন্য হবে না’। সে উঠে দাড়িয়ে তার জামা ঠিক করে পাটের ব্যাগের দিকে এগিয়ে গেল। এরপর সেখান থেকে উঠে কিছুটা ঝুকে অনেকটা যাযকদের ভঙ্গিতে প্রত্যেককে আরো এক শিলিং করে হাতে ধরালো। তবে সেগুলো হাতে গুঁজে না দিয়ে মেঝেতে রাখলো। কিন্তু বুড়োগুলোর এতে মন ভরে না, তারা মেঝের দিকে তাকিয়ে থাকে আর নিরবে মাথা ঝাঁকাতে থাকে। রুফ আবারো উঠে গিয়ে ঝোলা থেকে আরো এক শিলিং করে বের করে সেখানে রাখে। এরপর সে বলে, ‘আমি আমার সাধ্যমত করলাম’। কিছুটা শ্লেষ নিয়ে আবার বলে, ‘এবার আপনারা সিদ্ধান্ত নিন’। এরপর কিছক্ষণ থেমে তাদের মুখের প্রতিক্রিয়া লক্ষ করলো সে, তার পর গলায় জোড় এনে বললো সে, “যদি মনে করেন শত্রুকে ভোট দেবেন তাহলে তাই দিন!” এবার সমবেত মানুষেরা বুঝলো যে বিষয়টা অন্যদিকে ঘুড়ে যেতে পারে তাই তারা সমস্বরে রুফকে শান্ত হতে বলে এবং তাদের মধ্য যিনি বয়স্কতম তার কথার মাঝেই সবাই মেঝেতে রাখা শিলিংগুলো তুলে নিতে থাকে।

এখানে শত্রু বলতে বিপক্ষ পিওপি বা প্রগ্রেসিভ অর্গানাইজেসান-এর কথা বলতে চেয়েছে রুফ। সমূদ্রের তীরবর্তী অঞ্চলে থাকা অদিবাসী মানুষেরা এই দলটি তৈরি করেছে তাদের জীবন জীবিকার নিরাপত্তার স্বার্থের কথা বলে। দেশের বর্তমান চালু প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি অসন্তোষ ও বিরোধিতা থেকেই তারা সংঘটিত হয়েছে। দলের প্রতিষ্ঠা দিবসে ঘোষণা করেছে যে তারা সবধরনের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সক্রিয় থাকবে। যদিও দেশের শাসক পিওপি-র সাথে তারা লড়াই করে পারবে না, কিন্তু তবুও বিরোধিতায় নেমেছে। একে অনেকেই বোকামী বলে মনে করছে। তারা স্থানীয় কিছু ভবঘুরে ও বেকার যুবকের জন্য মাইক ও গাড়ির বন্দোবস্ত করে দিয়েছে। তারা তা নিয়ে চেচামেচি করছে যত্রতত্র। পিওপি এই উমৈফিয়াতে নির্বচন উপলক্ষে কত টাকা বিনিয়োগ করেছে তার হিসাব কেউ বলতে পারবে না, তবে সবাই বলাবলি করছে যে অংকটা বিপুল। এই বিপুল অর্থের থেকে স্থানীয় নেতারাও বেশ কিছু টাকা কামিয়ে নেবে এবার।

রুফের পরিকল্পনা মতই সব ঠিকঠাক চলছিল। গতকাল পর্যন্ত কোনো ব্যতিক্রম ঘটেনি। কিন্তু হঠাতই পিওপি-র এক নেতা গোপনে রুফের সঙ্গে দেখা করতে আসে। যদিও তার সাথে আগেই সে পরিচিত ও বন্ধু। কথাবার্তা বিশেষ কিছু নয়, সরাসরি সে রুফের সামনে পাঁচ পাউন্ড রেখে বলে যে, ‘এবার তোমার ভোটটা আমাদের চাই’। আচমকা এমন কথা শুনে রুফ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়, বিদ্যুতের ঝটকা লাগে যেন। সবার আগে দড়াজার দিকে ছুটে যায়, দেখে সেটি ভালোভাবে বন্ধ করা হয়েছে কিনা। নিজের চেয়ারে ফিরে আসে। এই সময়ের মধ্যে সে ব্যাপারটা বুঝে নিতে চায় । কথা বলতে বলতে তার নজর মেঝেতে ছড়ানো তারা তারা নোটের দিকে পড়ে থাকলো। সরলমতি কৃষকের মতো সে যেন ক্ষেত থেকে তুলে আনা তার কাটা ফসল দেখছে, এমনই সম্মোহন করে রেখেছে সেই টাকার বান্ডিলগুলো।

নিচু স্বরে সে বলে, ‘আমি যে মারাকাসের কর্মী তা তো তুমি জানো বন্ধু। আর এই কাজটি উচিতও হবে না।’
-“আরে দোস্ত, তুমি যখন ভোট দেবে তখন তো আর মারাকাস সামনে থাকবে না! আর, রাতে আমাদের আরো অনেক কাজ আছে, সেগুলো সামলাই। তুমি বলো আমাদের প্রস্তাব নেবে কি না!’
-“কথাটা ঘরের বাইরে যাবে না তো!’ রুফ জানতে চায়।
-‘আমরা ভোটের জন্য এসেছি, ফালতু গল্প করার জন্য নয়’।
-‘all right’ ইংরেজিতে বললো রুফ।

এর পর আরো ঘনিষ্ঠ হয়ে আগন্তুক বন্ধুটি তার সঙ্গীকে কিছু একটা ঈশারা করলো। সে লাল কাপড়ে পেচানো একটা কিছু নিয়ে এলো। মাটির পাত্রে পালকে জড়ানো কিছু একটা রাখা। কাপড়টা সড়াতেই চোখ ছানাবড়া। ‘এটি মাবান্টার কাছ থেকে এসেছে। এই অর্থ তুমি ভালোই জানো। শপথ করে বলো যে তুমি মাদুকাকে ভোট দেবে। যদি তা না হয় তবে আইয়া তোমাকে মনে রাখবে, ছেড়ে দেবে না।’

রুফের বুকটা গুরুগুরু করতে লাগলো। আইয়া-টাকে চোখের সামনে এভাবে দেখে সে স্তম্ভিত হয়ে যায়, এই ব্যাপারে মাবান্টার ‘সুনাম’ সে জানে। খুব দ্রুত সে এই সিদ্ধান্তে আসে যে মাদুকাকে গোপনে ভোট দিলে তার কিছু যায় আসবে না, কারণ এমনিতেই মারাকাস জিতবেই।

সে শপথ নিলো যে মাদুকাকেই ভোট দেবে। ‘তাহল সে কথাটাই থাকলো’ এই বলে আগন্তুক উঠে দাঁড়ায় ও তাদের সেই সঙ্গীকে গাড়িতে জিনিসটা রেখে আসতে বলে। তাদের এগিয়ে দিতে দিতে রুফ বলে ‘তোমরা তো জানো মারাকাসের বিরুদ্ধে জেতার কোনো সম্ভাবনা নেই’।

চিনুয়া আচেবে

-‘এবারের মত অল্প কিছু ভোট পেলেই চলবে। পরেরবার আরও বেশি পাবে। মানুষ জানবে যে মাদুকা পাউন্ডে ভোট করে, শিলিঙে নয়। জেনে রেখো, অর্থই মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করে।’

ভোটের দিন সাতসকালে একটা উৎসব উৎসব ভাব আসে এলাকায়। পাঁচ বছর পর পর এই বিশেষ দিনে নাগরিকেরা তাদের অধিকার প্রয়োগ করার সুযোগ পান। এই সময় জনগনকে প্রভাবিত করতে বাড়ির দেওয়াল, টেলিগ্রাফের পোস্ট থেকে গাছে গুড়ি সর্বত্র পোস্টারে পোস্টারে ছেয়ে ফেলা হয়। যারা পড়তে পারেন তারা অন্যদের তা পড়ে শোনান। কোথাও ‘প্রগ্রাসিভ অর্গানাইজেশান পার্টিকে ভোট দিন, আবার কোথাও পিওপি-কে ভোট দিন । কিছু পোস্টার ছিড়ে ফেলা হয়েছে, যেগুলো ছিল আরো অর্থবহ।

ভোটের মাঠে ক্ষমতাসীন মারাকাস ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা রাজকীয় ভাবে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছিলো। সে জন্য নগর থেকে ব্যান্ড ভাড়া করে নিয়ে এসেছেন। এই ব্যান্ড ও তাদের তাবুকে ভোট কেন্দ্র থেকে আইন মেনে নিরাপদ দূরত্বে রেখেছেন মারাকাস। গানের তালে তালে গ্রামের অনেক মানুষ, যুবা তরুণ সেখানে নাচছিল। তাদের ব্যালট পেপার যদিও বুথে পৌঁছে গিয়েছিলো। মারাকাস ইবে তৃপ্ত ভঙ্গিতে তার সবুজ গাড়িটাতে বসে এইসব দেখছিলেন আর হাসছিলেন। অনেকেই তার কাছে এসে হাত মিলিয়ে অভিবাদন করে যাচ্ছিলো।

ভোট কেন্দ্রের কাছে রুফ ও তার সাথীরা আগাম আনন্দে মেতে ছিল আর ভোটারদের শেষ মুহূর্তের উপদেশ দিচ্ছিলো। একজন খুব বেশি উৎসাহী অশিক্ষিত এক মহিলার উদ্দ্যেশ্যে বললো, ‘এই দেখো আমাদের মার্কা গাড়ি”।
-‘মারাকাস যে গাড়িটায় বসে আছেন সেটার মতো, আমাদের চিহ্ন ‘গাড়ি’।”
রুফ তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বললো, ‘মা, ঠিক তো, একই রকম গাড়ি আমাদের মার্কা’। বাক্সের গায়ে গাড়ির মার্কা দেওয়া বাক্সটিই আপনার। মাথাওয়ালা অন্য কোনো দিকে তাকাবেন না, যাদের মাথায় গোলমাল আছে তাদের জন্য ওই সব চিহ্ন’।

এই কথায় সেখানে সবাই হো হো করে হেসে উঠলো। রুফ একবার মন্ত্রীর দিকে তাকালো, মাথা নাড়লেন তিনিও।
এতে সে আরো উৎসাহিত হয়ে চিৎকার করে উঠলেন, ‘গাড়ি চিহ্নে ভোট দিন, ভোটের পর গাড়িতে চড়ুন’।
-‘মাওরা না চড়তে পাড়লেও আমাদের বাচ্চারা গাড়ি চরবেই’।
ব্যান্ডের ছেলেরা তখন একটা নতুন গান ধরে, ‘হে সাথী, গাড়িতে চড়তে পাড়লে হাটবেন কেনো?’

মারাকাস শান্তভাবে এইসব দেখছিলেন আর নজরদারি করছিলেন অক্লান্তভাবে যাতে ভোট ভালো হয়। তিনি যদিও জেতার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী, খবরের কাগজগুলোও আগাম ঘোষণায় তাকে বড় ব্যাবধানে বিজয়ী হিসাবেই চিহ্নিত করেছে। কিন্তু অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের ফাদে পড়তে রাজি নন তিনি। তাই ভোটারদের ঢল নামার আগেই তার ছেলেদের ব্যালট বাক্সে ব্যালট পেপার ফেলার নির্দেশ দেন।

-‘রুফ, তুমিই বরং সবার আগে ভোটটা দিয়ে এসো’।

রুফের বুকটা আশঙ্কায় কেঁপে উঠল। কিন্তু কাউকে সে কিছু বুঝতে দিল না। সারা সকাল সে ব্যাস্ততার মধ্য থেকে তার এই দুশ্চিন্তাকে ভুলে থাকার চেষ্টা করছে। সবটা সে কিছুতেই বিশ্বাস করে উঠতে পারছিল না, কেমন অবিশ্বাস্য। দ্রুত লাফ দিয়ে সে ভোটকেন্দ্রের দিকে এগিয়ে গেলো। ভোট কেন্দ্রের পাহারাদার পুলিশ তাকে পরখ করে ভেতরে যাওয়ার অনুমতি দেয়। তারপর নির্বাচন কর্মী তাকে দুটো ভোট বাক্স সম্পর্কে বুঝিয়ে বলেন। ভোট দিতে যাওয়ার সময় তার সেই দ্রুততা আর নেই। ভেতরে ঢুকে দুটো ভোট বাক্সের সামনে দাঁড়ায়, তাকায় সেদিকে। পকেট থেকে ব্যালট বের করে, ভালো করে চোখের সামনে তুলে ধরে। মারাকাসের সাথে বেইমানি করবে সে! তা যতই গোপন হোক, বিবেকের কাছে কি জবাব দেবে? একবার সে ভাবে টাকাটা ফেরত দিয়ে আসে। পাঁচ পাউন্ড… এখন যদিও তা আর সম্ভব নয়। সে আইয়ার কাছে প্রতিজ্ঞা করেছে! চোখের সামনে সেই কড়কড়ে নোট ভেসে ওঠে, আর তা ছাপিয়ে সেই বোকা কৃষকটার মুখ।

এই সময় তার কানে আসে সেই পাহারাদার পুলিশটার গলা, সে ভোট কর্মীর কাছে জানতে চাইছে, লোকটা এতক্ষন ভেতরে কি করছে?
চমকে উঠে সে, মাথার মধ্যে যেন বিদ্যুৎ বয়ে যায়। সে ব্যলটটা ভাজ করে বরাবর দুভাগ করে ছিঁড়ে ফেলে, এর পর প্রত্যেক বাক্সে একটা করে টুকরো ফেলে দেয়। সবধানে একটি টুকরো মাদুকার বাক্সে ফেলে বলে ‘ভোটটা আমি তোমাকেই দিলাম’।
তারপর ভোটকেন্দ্রের লোকেরা তার মধ্যমায় বেগুনি কালি লাগিয়ে দেয়। অমোচনীয়। যেভাবে ভোট কেন্দ্রে এসেছিলো সে সেভাবেই বেরিয়ে যায়।