শাশ্বত কর

চিমনিচাটা এমন এক একটা দিন আসে মাঝে মাঝে! যা করব বলে মনের ভিতর উদ্দীপনা গুড়্গুড় করে, অযাচিত আপদের আদিখ্যেতায় সেই ইচ্ছে একেবারে গুঁড়োগুঁড়ো হয়ে যায়। মনে হয় দাঁত খিঁচিয়ে বলি, ‘অনামুখো আপদ বিদেয় হ!’, কিন্তু বিনয় নামক অন্তঃস্থিত এক দামড়া মুখ টিপে দেয়। দাঁত খিঁচোনোর জায়গায় দাঁত বিছরিয়ে বলি, ‘হেঁ হেঁ! কী পরম সৌভাগ্য আজ আপনি এলেন! ক’দিন ধরে আপনার কথাই তো ভাবছিলুম! কী আশ্চর্য টেলিপ্যাথি!’

টেলিপ্যাথি না কেঁদোহাতি! যাই হোক, তিনি হয়তো উঠলেন, অমনি ‘উনি’ হয়তো এসে বসলেন! ব্যস! কম্ম কাবার! সপ্তাহ ভর আমার অকাজের আর অকর্মণ্যতার ঝাঁজে ভরা ফিরিস্তি! বেগুনে কটা পোকা, মাছের আঁশটে গন্ধ থেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় স্পেশাল লাইক দান- একের পর এক শেল! ‘এত্ত বড় সাহস তুমি ওকে ঠিক ফ্রেন্ডলিস্টে নিলে? পইপই করে বারণ করেছিলাম না!’ পাঁইপাঁই করে গঙ্গাপাড়ে ছুটতে ইচ্ছে করে! খোলা আকাশের নিচে বাদাম ভাজা চিবুতে চিবুতে হাঁটবো- এই আকাশে আমার মুক্তি আলোয় আলোয়! আলো থেকে সটান আলু্তে! ‘আলু নিয়ে এসো দোকান থেকে, সকাল থেকে তো কলম চিবুনো আর আড্ডা! অনেক তো হলো!’

এই রকম আকাশ থেকে মাটিতে আছড়ানো জীবন! তবে কালারফুল বটে! এই বৈপরিত্য আছে বলেই না বাতাস বয়, ফুল ফোটে। আদতে সব কিছুরই গুরুত্ব আছে, দরকার কেবল খানিক পেশেন্স! পেশেন্সের এসেন্স একবার যদি মিশে যায়, তা হলেই আইটেম দাঁড়িয়ে গেল। এই যে ধরুন না, সকাল থেকে কী লিখি কী লিখি বলে কলম চিবুচ্ছিলুম, অথচ সম্পাদক বিষয় দিয়ে সময়ে অলরেডি বিষ ঢেলেছেন! এমন সময় এই সব আপদের ফলশ্রুতিতেই না লেখাটা যা হোক দাঁড়ালো!

ভাবতেই পারেন আলু আনতে গিয়ে আবার কোন লেখার পা শক্ত হয়! হয়, সুজন পাঠক, হয়। এ দুনিয়ায় আমার মত অবহেলিত, নিষ্পেষিত, কশায়িত, দাঁত কিড়কিড়িত পাব্লিক তো আর কম নেই! কাজেই আলু আনতে গিয়ে সেই রকম অ্যালাভোলা অ্যাশোসিয়েসানের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়ে গেল, আর বাঙালি তো, কাজেই দু দণ্ড আলাপচারিতার পরেই দোকান থেকে চেয়ার বেরোলো, টুল বেরোলো, সিগারেট জ্বললো, বিশুর দোকানে কেতলি চড়ল, ধুমায়িত কাচের গেলাসে তরলিত জাতীয় পানীয় এলো! ব্যস! আর কী চাই! ঝোঁপ বুঝে খোপে পুরে দিলাম লেখার বিষয়খানা! সে নিয়েই আড্ডা ফুটলো বগবগ করে! লে পাগলা আর কী চাই!

এক সময় চেয়ার কাঁপিয়ে ধনাদা বলে উঠলেন, ‘আরে ছোঃ! এই না কি কনজিউমারিজম! শালা দু মিনিট পরপর নোটিফিকেশান। ফোন ভর্তি হয়ে গেল! আমাদের স্টোরে ইস্তিরি ফ্রি! আমাদের মলে তিনশো টাকায় ডাবের সরবত কিনলে ক্যাস্টর অয়েল বিনি পয়সায়!’

‘কেন পুরোনো জামা কাপড় বদলির খবর?’ নববাবু গলা খাঁকড়িয়ে বলে উঠলেন।

‘সত্যি!’ পরাণদা আক্ষেপ করলেন, ‘গন আর দ্য ডেইজ! সে এক দিন ছিলো মশাই! বড়দার জামা ছোটো হতে মেজদা! মেজদা থেকে সেজ দা! সেজদা থেকে ন’দা হয়ে ছোড়দা ঘুরে আমি! মায়ের শাড়ি মেয়েরা! আর তারপর ফেঁসেফুঁসে গেলে বাসন কোসন! আর এখন দেখুন, পার ফ্যামিলি ওনলি ওয়ান ইস্যু! দেওয়া থোয়ার বালাই নেই! খুড়তুতো মাসতুতো ভাই বোনেরা যে পড়বে তাতে চক্ষুলজ্জা! আবার প্রাণ খুলে কাউকে দেবেও না! মাঝখান থকে ফায়দা লুটছে বেটাচ্ছেলে মল! পুরোনো জামা কাপড়ও নিচ্ছে, আবার বদলিতে যে কুপন দিচ্ছে তাতে পোশাক কিনলে হরে গড়ে একই দাম! পাওয়ার মধ্যে পাওয়া কেবল এ.সির হাওয়া আর সুবেশী ছেলেপুলের মুখে স্যর স্যর শুনে নিজেকে খানিক কেউ কেটা ভাবা!’

‘একজ্যাক্টলি! এটাই তো ওদের পলিসি!’ খোকন বলে উঠল, ‘প্রয়োজনের বেশি সম্মান দেখাও, চোখের সামনে লোভ ঝুলিয়ে লোভ দেখাও, হাতে বাস্কেট ঝুলিয়ে কম জিনিস নিতে লজ্জা পাওয়াও! ব্যস! তাহলেই সকাল সন্ধ্যে লেড়োয় কামড় দেওয়া পাব্লিক কুকিজ কিনে কেতা দেখাবে!’

সুযোগ বুঝে ঝেড়ে দিলুম, ‘তা ঠিক! তবে আমাদেরও নিজস্ব কিছু পলিসি কিন্তু ছিল। যেমন চৈত্র সেলই ধরুন না!’

‘ঠিক বলেছো মাস্টার!’ পরাণদা চেঁচিয়ে বললো।

‘কী ঠিক বললো! এই সব লোক নাচানো কারবার আর চৈত্র সেল এক হলো? এ তো জল আর জলপাই!’ বটাদা বেশ নাটকীয় ভঙ্গীতে কথাটা বললেন।

বললুম, ‘একটু বুঝিয়ে বলুন’

‘বোঝানোর কী আছে বলো তো! এ তো পুরো শ্রেণির তফাৎ! চৈত্র সেল মূলত মেহনতি মানুষের, খেটে খাওয়া মানুষের- সাধ্যের মধ্যে আনন্দ লাভ! আর আগে যা সব বলা হলো সে তো বুঝতেই পারছো কোন শ্রেণির’

‘কিন্তু দাদা! সব শ্রেণিই তো এখন সেদিকে ঝুঁকছে!’

‘ঝুঁকবেই তো! এই তো ভোগবাদের মজা! ঝুঁকবে না! সকাল বিকেল নিউজ পেপার, খবর, তারপরে সব চেয়ে বেশি যেটা- সিরিয়াল! সব কিছু আসলে এক একটা সিরিঞ্জ! তাতে লোভ পুরে পুরে নিয়ম করে ইঞ্জেকশান দিচ্ছে মানুষকে। রেহাই নেই! কারো রেহাই নেই! আমি, তুমি গোটা সমাজ ধীরে ধীরে ওদের ইশারায় নাচবোই!’

‘তবে এখনও চৈত্র সেলে ভিড় ভাট্টা হয়’। নারায়ণবাবু শোনপাঁপড়িতে আলতো কামড় দিয়ে ফতুয়ায় পড়া পাঁপড়িগুলো ঝাড়তে ঝাড়তে বললেন।

‘সে তো হবেই। তবে চৈত্র সেলও পোশাক বদলেছে!’ নবদা বললেন।

‘সে তো বদলেছেই। আগে চৈত্র সেলের মূল জায়গা ছিল সম্ভ্রান্ত দোকানগুলো। সারা বছরের স্টক ক্লিয়ারিং! তারপর কাটতির বহর দেখে চৈত্র সেল ছড়িয়ে পড়ল। রেল স্টেশানের আশপাশের মার্কেটগুলোয় সেলের ঠেলায় সন্ধ্যের পরে হাঁটা দায়!’

‘শুধু স্টেশান মার্কেট কেন হে, হাতিবাগান, গড়িয়াহাট, ধর্মতলা? সবখানে তো একেবারে হইহই কান্ড রইরই ব্যাপার! এ ওটা খাবলাচ্ছে, ও ওটা তুলছে! সেলসম্যান ‘সেল সেল’ বলে চিল্লাচ্ছে! মধ্যিখানে চ্যাপলিন ছাতা বেচছে, ধর্মেন্দর সানগ্লাস বেচছে, রণ-পা পরে দোকানের প্ল্যাকার্ড নিয়ে পেল্লায় লম্বু হাঁটছে! পেপসি- কোল্ড্রিঙ্কস- কাটাফল- ঘুগনি- সস্তার আংটি- কাচের গেলাস- চিনেমাটির কাপ- বিছনার চাদরের পাহাড়- ডাইনিং টেবিলের কাভার- ফ্রিজের কভার- শোলার হ্যাট- বাহারি ক্যাপ- বটুয়া- পার্স! বাপ চেঁচাচ্ছে- মা খ্যাদাচ্ছে- বাচ্চা কাঁদছে, ট্রাম ঘন্টা দিচ্ছে, গাড়ির হর্ণ! সেও মশাই এক কম্পলিট প্যান্ডিমোনিয়াম!’

‘মফস্বলে তো বড় বড় মাঠে চৈত্র সেলের মেলা বসত। কত স্টল! শান্তিপুরের তাঁত, ধনে খালি, ফুলিয়া! বেলডাঙা, বসিরহাটের গামছা! ফতুয়া থেকে আচার হয়ে চপ্পল- সব পাওয়ার সে এক হট্টমালার দেশ!’ ধনাদা বললেন।

‘সে মেলার কথা আর বোলো না!’ পরাণদা বললেন, ‘আমাদের উনি তো খাবলাখাবলি করে একবার বোনেদের চুড়িদার, ভাইদের ফতুয়া পাঞ্জাবী-এই সব কিনলেন। গোটা রাস্তায় আমায় বলে চললেন- কেমন জিতলুম বলো, কত কম দাম! তারপর বাড়ি ফিরে যাকে যারটা দেওয়ার দিন তিনেকের মধ্যে জেতার বহর টের পেলেন!’

‘কেন? কী হলো?’ বললুম

হাসতে হাসতে পরাণদা বললেন, ‘আর বোলো না, যেটাই যে পড়তে যায়, যায় ফেঁসে নয় টেঁসে! সেলাইয়ের তো মা বাবা নেই! কোনো রকমে জাস্ট জুড়ে দিয়েছে! গিন্নি তো রেগে আগুন! বললাম, আরে! রাগ করে কী হবে এ তো আর স্টক ক্লিয়ারিং সেল না, এ তো সেলের মাল! আলাদা করে তৈরি করা! ওরম হবেই! তাতেও তিনি বলেন, ‘ছি ছি ছিঃ! এমন করে ঠকায় অনামুখোর দল! আর কখনো যাবো না সেলে!’ কিন্তু বললেই হলো? এ টান এমন টান, বছর ঘুরে চৈত্র এলেই ঠিক যাবে সুড়সুড় করে!’

নবীন বাবুর আবার রবীন্দ্রনাথ ঠোঁটস্থ। উনি বললেন, ‘তা যা বলেছেন। এ টান তো স্বাভাবিক। একটা বছর শেষ করে আরেকটা বছরের আরম্ভ হতে চলেছে। সারা বছরের কত দুঃখ, কত সমস্যা- সব ঝেড়ে ফেলে মানুষের মন আবার নতুন করে শুরু করতে চাইছে। গাছপালা সবাই বসন্তে নতুন করে সেজে উঠে বৈশাখকে স্বাগত জানায়, মানুষও তো তেমনই। সাধ্য মতো সেজে উঠতে তো চাইবেই। কবিগুরু বলেছেন-
‘ওই মহামনব আসে;
দিকে দিকে রোমাঞ্চ লাগে
মর্ত ধূলির ঘাসে ঘাসে।
সুরলোকে বেজে ওঠে শঙ্খ,
নরলোকে বাজে জয়ডঙ্ক-
এল মহাজন্মের লগ্ন।

তবে ভাবুন, সময়ের নতুন শিশুর এমন মহা জন্ম, তাতে মানুষের মন সাজবে না?’

‘ওরে বাবা! আপনি তো আড্ডাটাকে বেশ ভারি করে তুললেন হে!’ পরাণদা বলে উঠলেন। আরে বাবা! আমরা নেহাতই জাগতিক লাভ, লোকসানের চোখে চত্রি সেলকে দেখছি মশাই, দর্শন টর্শন নয়!’

‘তবে পরাণদা!’ নববাবু বললেন, ‘চৈত্র সেল মানেই যে অমন ফৈতা জিনিস, সব সময় তা কিন্তু নয়! ভালো কিছুও থাকে। একটু দেখে শুনে কিনে নিতে পারলে খারাপ অতটা হয় না!’

‘সে দেখাশোনার সময় তোমায় অন্য খদ্দেররা দেবে? ঠেলা গুঁতোয় তো ‘পাঁজরে দাঁড়ের শব্দ’ তুলে কালসিটে ফেলে দেবে!’

‘না! ও তো আপনার ঠাট্টার কথা। আমরা তো কিনি। চলেও তো খারাপ না’।

‘কী জানি বাবা! আমি তো পারি না, তোমরা পারো, ভালো কথা!’

‘পরাণদা! তুমি এবার ডানলপে আমার দোকানে এসো, ভালো জিনিস দেবো’, তপনদা বলে উঠলো।

‘তোর আবার দোকান কবে হলো? তুই তো ব্রোকারি করতিস না?’

‘আরে সে তো করিই। কিন্তু এই সময়টায় দোকানে দোকানে কিছু লোক নেয় জানো তো? আমি প্রত্যেক বার মাস দুয়েক এই সময় ডানলপে একটা দোকানে সেলসম্যানি করি’।

‘বাঃ! চৈত্রসেলে কর্ম সংস্থান! বেড়ে ব্যাপার! ভাগ্যিস! নেতাদের নজরে আসেনি! নইলে কর্ম সংস্থানের লিস্টিতে ঠিক ঢুকিয়ে দিইয়ে মাইক ফাটাতো!’

যে দোকানের সামনে আড্ডা চলছে, সেই বিলেদা হঠাৎ বলে উঠলো, ‘পরাণদা! তোমার কথায় মনে পড়লো, এবার তো আবার নির্বাচন! সেলের মার্কেটে নাকি নীল শাদা চটি আর চৌকিদার ফতুয়া না কি হেব্বি চলছে। ওই তো কাল মিঠুদা বলছিল!’

‘রাখ তো চৌকিদার ফতুয়া! আমাদের বাংলায় ও তো কবে থেকেই আছে! শুধু নামটা বদলে দিয়েছে আর পাব্লিক হামলে পড়ছে!’ বটাদা বলে উঠলো।

‘এটাই তো মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি বস!’ সিগারেটের ধোঁয়ায় রিং ছাড়তে ছাড়তে অনন্তবাবু বললেন, ‘এই কাজটাই শপিং মলে লার্জ স্কেলে করে, পেরিফিরিটা এক্সপ্যাণ্ডেড, এই যা! বলতে পারো ব্যবসার ইভোলিউশান!’

‘সেই! টের পাবে। যাক আরও কয়েক বছর’। ধনাদ বললেন।

‘কিচ্ছু টের পাবে না কেউ ধনাদা!’, অনন্তবাবু মুডে, ‘সবাই ভাত খায়, ওষুধ খায়, তেল মাখে, টেরি কাটে- যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী। মার্কেট কাজেই চলবে, পাব্লিকও কিনবে! দেখো না মলগুলোও এখন চৈট্র সেল দেয়! বাঙালি আবেগকে ওরা কাজে লাগাবে না ভেবেছো?’

বলতে না বলতেই আমার ফোন বাজলো! অচেনা নম্বর! হ্যালো বলতেই মিষ্টি গলা ওপার থেকে, ‘নমস্কার স্যর! আর্লি এক্সপেন্স মল থেকে বলছি। আমাদের এখানে চৈত্র সেল চালু হয়ে গেছে, তাই আপনাকে ইনফর্ম করলাম’।

ফোনটা কনে জোরে চেপে ঘাড়টা কাত করে জিজ্ঞেস করলুম, ‘কী রকম অফার চলছে?’

‘ওই তো দাদা! তিনটে কিনলে দুটো ফ্রি! যে কোনো ওয়্যার! আর তাছাড়া পুরোনো কিন্তু ফ্রেশ জামাকাপড়ের বদলে পার কে.জি.তে আড়াইশোর কুপন। নিউ অ্যারাইভালে মিনিমাম বারোশো পঞ্চাশের কেনাকাটায় ওই ছাড় পাবেন! এছাড়াও আরও অনেক অফার আছে! একটি ভিজিট করবেন স্যর!’

‘নিশ্চয়ই’ বলে ফোনটা কেটে উঠলাম। বললাম, ‘আমি উঠি বুঝলেন! আলু না পেলে ও দিকে আবার..হেঁ হেঁ!’

যাই! খবরটা দিলে দেরিটা মাফ তো হবেই, উলটে পয়লা বৈশাখে নির্ঘাৎ নতুন কিছু ডান্সিং অন মাই ফোরহেড! তাছাড়া রবীন্দ্রনাথও তো বলেছেন, ‘সম্মুখ-পানে নবযুগ আজি মেলুক উদার চিত্র’। নতুন যুগের নয়া চৈত্রসেলের প্রতি না হয় খানিক উদার হলুমই। তাতে কী আর এসে গেল!