মাঝরাতে দরজায় একটা টকটক শব্দ হল।

দীপ শেখর চক্রবর্তী

একটা লেখা নিয়ে খানিক অন্যমনস্ক ছিলাম,টেবিল থেকে উঠে দরজাটা খুলে কাউকে দেখলাম না।এতে আশ্চর্য হওয়ায় কিছু নেই।মাঝে মাঝেই রাতে এমন হয়।অভ্যেস হয়ে গেছে।শুধু রাতের বেলা দরজায় নয়, প্রায় সারাদিন নিজের জীবনের সর্বত্র এমন দরজায় টোকা দেওয়ার শব্দ শুনি।খুলে দি দরজা,জানলা অথচ কাউকেই দেখতে পাইনা।জীবন এমন আশ্চর্য একটা খেলা খেলছে আমার সঙ্গে।একটা মস্ত কাঁচি নিয়ে বসেছে।ধীরে ধীরে কেটে নিচ্ছে আরেকটা শীতকাল,আরেকটা বসন্ত,অসংখ্য মানুষ তাদের মুখের শেষ ভালোবাসাটুকু।

চৈত্রের সন্ধেবেলা সমস্ত নারকেল গাছের উড়ন্ত চুলের মাঝে আমিও মাথা দোলাই।রেললাইনের দুপাশে চৈত্র সেল,অসম্ভব ভীড়,দমবন্ধ হয়ে যেত ছোটবেলায়।ভাবতাম,যখন আমি বড় হয়ে যাবো তখন আর মায়ের হাত ধরে এই ভীড়ে ঘুরে বেড়াতে হবেনা।এখন ভাবি, কি ভয়ানক ভুল ছিলাম আমি।গোটা জীবনটাই এমন এক বিশাল বড় চৈত্র সেল হয়ে গেছে,সে ভীড় ঠেলে বেরোনোর জন্য মায়ের হাতটা আর খুঁজে পাইনা।চারিদিকে কত দোকানি।’আমার দোকানে এলে সবথেকে বেশি ফায়দা’-এমন দাবী সবার।কাউকেই ঠিক বিশ্বাস করে উঠতে পারিনা।
এর মধ্যেই বুকের ভেতর কে একটা জেগে থাকে।মাথার পেছন দিকে বাজে একটা আশ্চর্য সুর।রোদের উত্তাপ বাড়ে আর সামান্য একটু ছায়ার জন্য মাথা কুটে মরি।তবে ছায়া কই?গাছ কই?গাছের মতো মানুষ কই?

শহরে পড়াশুনো করতে গেছিলাম।সাত আট বছর একটা অসম যুদ্ধ লড়ে গেছি,যেখানে যেই জিতুক না কেন,আমার হার নিশ্চিত।শহর বলেছে,ঠিক বা ভুল বলে কিছুই হয়না।কিন্তু আমার তো একটা ঠিক ভুল ছিল।তাকে তো ফেলে দিতে পারিনা।অথচ ঘরে ফিরে বুঝেছি, সবটাই যে বাঁচিয়ে রেখেছি এমন নয়।কিছু কিছু ফেলেও দিয়েছি নিজের অজান্তে।এখন কোথাও আটছে না।যেন শহরে যাওয়ার ফিরে আসার রেলগাড়িটার আমি অক্লান্ত যাত্রী।

আরেকবার দরজায় টকটক শব্দ হল।এবার মনের ভুল হতে পারেনা।বেশ স্পষ্ট।খুললাম,আবার কাউকেই দেখলাম না।তারপর বুঝলাম,আসলে আমার দেখার বৃত্তটা ছোট।আমার দরজার বাইরে ডানপাশে হাতের তালুতে মুখ রেখে বসে আছে ন যিনি সম্পর্কসূত্রে তিনি আমার প্রতিবেশী।আমার উল্টোদিকের ফ্ল্যাটটায় থাকেন নিজের স্বামীর সঙ্গে।অথচ বলতে গেলে তার থাকা একপ্রকার একাই।স্বামী মাসে এক দুদিন আসেন,প্রচন্ড ঝগড়া করে চলে যান।আমাদের এই ওপরতলাতে এই দুটি মাত্র ফ্ল্যাট,ফলে এই ঝগড়া আমার কাছে কালবৈশাখীর মতো আছড়ে পড়ে।তা নিশ্চয়ই শৈশবের আম কুড়োনোর ঝড় নয়।বাকিটা সময় তার কোন সাড়াশব্দ পাইনা।ঘরেই থাকেন,একেবারেই বেরোন না বাইরে।কথাবার্তাও তেমন বলেন না কারো সঙ্গে।তাকে এমনভাবে মেঝেতে বসে থাকতে দেখে কিছুটা আশ্চর্য হলাম।

মাথা নীচু করে নিয়ে বললাম -‘কী হয়েছে আপনার?এখানে এভাবে…’
কোন সাড়াশব্দ পেলাম না।একজন ছাব্বিশ সাতাশ বছরের যুবতীকে এভাবে মেঝেতে ছড়িয়ে থাকতে দেখে প্রাণের ভেতরটা হুহু করছে।নাহ,কাল তো ওনার স্বামী আসেনি,কোন ঝগড়াঝাটির শব্দ পাইনি।আরেকবার সাড়া পাওয়ার চেষ্টা করলাম-

‘কী হয়েছে বলুন’
চোখ তুললেন তিনি।এমন অপূর্ব চোখের অতলে একটা বিরাট বড় শূন্য খাদ যিনি দেখেননি তাকে বোঝানোর মতো লেখনী প্রতিভা আমার নেই।দুটো চোখ যেন যুগ যুগ ধরে প্রবল ঝড়ের মধ্যে পথ হারানো কোন পথিক।মণিদুটো যেন মজে যাওয়া বুড়িগঙ্গার বুকে বিরাট পাল তোলা নৌকা।উদ্ধারের কোন পথ নেই।কিছুক্ষণ বিমূঢ় হয়ে রইলুম।তারপর আশপাশ একবার দেখে নিয়ে তার হাত ধরে তোলার চেষ্টা করলুম।তিনি আপত্তি করলেন না।তবে তার সম্মতি ও আমার সফলতার নধ্যে একটা তো ফাঁক থেকে আছেই।দ্বিতীয়বারে তিনিও কিছু সাহায্য করলেন।ঘরে নিয়ে গিয়ে বসালুম আমার এলোমেলো বিছানাতে।একগ্লাস জল হাতে দিয়ে নিজে এসে বসলুম চেয়ারটায়।

তিনি অর্ধেক গ্লাসখানা রাখলেন টেবিলের ওপর।কিছুক্ষণ মাথা নীচু করে বিছানার চাদর গুনলেন বোধহয়।
‘কী হয়েছে বলুন তো?’
‘কীই বা নতুন করে শুনতে চান?এতদিনে তো গোটাটাই তো বুঝে যাওয়ার কথা’।
সামান্য অপ্রস্তুত ও অপমানিত হলুম।উনি কি ভাবলেন ওনাদের ঝগড়ার কথা আমি এখানে বসে শুনি,তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করি?একটা কড়া কথা বলতে যাচ্ছিলুম,সময়োপযোগী হবে না ভেবে আটকে নিলুম নিজেকে।
‘তবে বাইরে থেকে কিছুই কেউ বুঝতে পারবে না।ও আমাকে খুবই ভালোবাসে,অথচ কাজের এতো চাপ।সময়ের অভাব।’

উনি কী কাজ করেন সেই নিয়ে একটা প্রশ্ন আমার ঠোঁটে এলো,রাতের মধ্যে দ্বিতীয়বার নিজেকে আটকে নিলাম আমি।বললাম-
‘ঠিকই তো,মানুষের কাজের চাপ,এমনভাবে চেপে বসে।’
‘আমি খুব ক্লান্ত।ওকে নিয়ে নয়।এই আমাকে নিয়েই।কেন যে কোন কাজ ঠিকঠাক মতো হতে ওঠে না আমার।সারাদিনে কিছুই,কিছুই ঠিক করে উঠতে পারিনা।আগেরদিন রাতে একটা তালিকা করে রাখি,পরের দিন
কী কী করবো,সকালবেলা উঠে সব নিয়ে বসি,অথচ দিনের শেষে কিছুই হয়না।উদ্যমই পাইনা।সারাদিন চুপচাপ বসে থাকি।কোন চিন্তাও মাথায় আসে না।’
-‘একটু বেড়িয়ে আসলেই তো পারেন’

-‘কোথায় বেড়াবো?এখানে?এই শহরে?কিছুই চিনতে পারিনা এখানকার।অলিগলি সব একরকম লাগে।বেশ কয়েকবার নতুন রাস্তা চিনতে গিয়ে ভুল করেছি।হারিয়ে গিয়েছি।খুব ভয় লেগেছে।কই,যখব ইশকুলে পড়তাম তখন কত রাস্তায় হারিয়েছি একা একা।একবারও তো ভয় করেনি।’
তার ভয় কিছুটা কাটাতে গিয়ে বুঝলুম আমার ভয় নিয়েই কথা হচ্ছে বেশি।এ তো আমার কথা।এমন তো আমার সঙ্গে হয়।

এই কথাটিতেই হারিয়ে গেলাম সবথেকে বেশি।বাকি অনেক কথা বললেন উনি,অথচ এই কথাটিতেই হারিয়ে গিয়েছি।ভয় করে,এখন হারাতে খুব ভয় করে।এই চৈত্রের রাতে ছাদে দাঁড়িয়ে কোন দূর থেকে ভেসে আসা কীর্তন শুনতাম।সন্ধেবেলা কোথাও না কোথাও মাটিতে ত্রিপল পেতে নাটক বা যাত্রা হত।সারারাত সেসব শুনে ভোর ভোর বাড়ি ফিরে ঘুম।বন্ধুদের সঙ্গে সাইকেলে চেপে কোথায় কোথায় চলে গেছি।বসন্ত শেষের এই বিকেলগুলোতে কোন বাড়ির ফুলজামা পড়া মেয়ে দোতলার বারান্দা থেকে আমাদের দেখে হেসেছে।এমন সুন্দর তো আর কোথাও পেলাম না।প্রিয়তমার জন্য অপেক্ষা করতে করতে কত সন্দেহ চোখে পড়েছি,কড়া কথা শুনেছি।স্বপ্ন ছিল একটা গানের দল হবে, গান গেয়ে বেড়াবো দেশ বিদেশে।

কথার মাঝে এরকম হারিয়ে যাওয়াই আমার অভ্যেস।বুঝলুম যিনি সামনে বসে আছেন তিনি কিছু একটা প্রশ্ন করেছেন।আমার উত্তর না পেয়ে কিছু একটা সন্দেহ করেছেন।আমি অবস্থা সামলানোর চেষ্টা করে বিফল হলুম।
‘ঘুম পেয়েছে আপনার?আমি তবে যাই’
‘নানা,আসলে আমি কিছু কথা ভাবছিলাম।তাই একটু অন্যমনস্ক হয়ে গেছিলাম’-এই বলে আমি সমস্ত আবেগের কথা তাকে জানালুম।

বলার পর কিছুক্ষণ নীরবতায় কাটলো
‘জানেন আমাদের পাড়ায় চৈত্র মাসে একবার নাটকের দল আসতো।সেটা দেখার জন্য আমরা দু তিনজন মেয়ে আগে থেকে সামনের আসনে গিয়ে বসে পড়তাম।বড়রা অনেক বকাবকি করেও আমাদের ওঠাতে পারতো না’
এ কথা বলে যেন মনের মধ্যেই সেই ছবিটা একবার দেখে নিলেন তিনি।হাসির একটা আলগা স্রোত আচমকা ঠোঁটে সমুদ্র গড়ে মিলিয়ে গেলো।

মাঝে মাঝে আমার মাথায় একটা একটা পাগলামো এমন চাপে বলে বোঝাতে পারবো না।আসলে যার বালকত্ব যায়নি কিন্তু শরীর বেমানান ভাবে বড় করে তুলেছে সে নানা বিপদে পড়ে।সবথেকে বড় বিপদ হল নিজেকে সামলাতে না পারা।ভেতরে ভেতরে খুব একা একটা মানুষ তখন বেপরোয়া হয়ে যায়।নিজের জন্য নয়।অপরের সামান্য ব্যাথাও তখন আমাকে উন্মাদ করে তোলে।এই উন্মাদনার নানা বিপদ আছে।অথচ বিপদ আমার ভালো লাগে।সমস্ত নিয়মের মধ্যে থেকে আমি অনিয়মের চ্যালা।

ফস করে বলে ফেললুম-‘ চলুন ভোরের গাড়ি ধরে আপনার বাড়ি ঘুরে আসি।’
কথাটা বলার পর বুঝলাম কথাটা না বললেই হত।অন্তত যুক্তিতে।বলে যে খুব দু:খ পেলুম এমন নয়।
কিছুক্ষণ দুটো চোখ আশ্চর্য ভাবে তাকিয়ে রইলো আমার দিকে।
‘আমার বাড়ি?’
‘হ্যাঁ, আপনার বাড়ি,আপনার পাড়া,আপনার সেই নাটক দেখার জায়গাটা।আমাকে নয় দেখাবেন।গল্প করবেন অনেক সেই নিয়ে।চলুন,এতে করে আপনার মন ভালো হয়ে যাবে।এই শহরে কেউ ভালো থাকতে পারে কিনা বলুন তো?বাজে শহর। তার চেয়ে বরং ভোরের গাড়ি ধরে…’
চোখের মধ্যে যেন একটা আলো দপ করে জ্বলে উঠে আবার অন্ধকার হয়ে গেলো।চুপ করে থাকা সময় গুলো বাড়ছে।ঘড়িতে আড়াইটে তখন।
-‘না,সেখানে আপনার সঙ্গে যাওয়া হবে না আমার।’কেন,তা নিয়ে একটা কথাও বললেন না।
ঘড়িতে দুটো বত্রিশ।
‘বরং চলুন,অন্য কোথাও যাই ঘুরতে’-কথাটা বলেই সামান্য আটকে নিলেন তিনি।যেন কোন কিশোরী হঠাৎ কোন খেলা পেয়ে আনন্দে নেচে উঠলো।তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন-‘যদি আপনার কোন আপত্তি বা অসুবিধে না থাকে।’

সে কথা ঠিক হয়ে গেলো।আমরা ঘুরতে চলে যাবো পুরুলিয়া।অযোধ্যা পাহাড়ে।এই প্রবল আলোর মধ্যে থেকে পালিয়ে একটু অরণ্য,একটু অন্ধকার খুঁজে নেবো।আর কেউ আমাদের কোন খোঁজ পাবে না।
ভোরের আলো ফুটতে তখনো ঘন্টা দুই বাকি।ওনাকে এগিয়ে দিয়ে এলাম ঘর অবধি।এই প্রথম ঘরের ভেতরটা দেখলাম।আশ্চর্য রকমের সাজানো,অথচ খুব প্রাণহীন মনে হল।সমস্তকিছুর মধ্যে হয়ত কিছু একটা নেই।হয়ত তা এতক্ষণের গল্পের জন্য আমার মনে হয়েছে বেশি করে।উনি ভেতরে আসার জন্য নিমন্ত্রণ জানালেন।আমি অন্যদিন হবে জানিয়ে ট্রেনের সময়টা বারবার মনে করিয়ে দিলাম।

ঘরে এসে লেখাটা বন্ধ করে বিছানায় ভাসিয়ে দিলাম নিজেকে।বেশ হাল্কা লাগছে।কেন লাগছে তার কারনটা খুব ভালো করে বুঝে উঠতে পারছিনা বা চাইছিনা। এই না বোঝাটাই একটা ভালো লাগা হয়ে থেকে গেছে আমার কাছে।ঘুম যে কখন এলো তা ঠিক বুঝলাম না,শুধু বুঝলাম তাড়াতাড়ি ঘুমিয়েছি।

সকালে উঠতে বেশ দেরী হল।খাওয়াটা আর হল না।রান্না করতে ইচ্ছে করছিল না। বাড়ি থেকে বেরোতেও। বিছানায় শুয়ে শুয়ে কাল রাতের ঘটনাগুলো পরপর মনে করার চেষ্টা করলাম।ঘুম থেকে উঠে আগের রাতের সবকিছুই কেমন স্বপ্নের মতো মনে হয়।সত্যি বলে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয়না।কোনক্রমে বিছানা ছেড়ে স্নানে ঢুকলাম।বাইরের রোদটা জানলা দিয়ে দেখেই মাথা ঘুরে যাওয়ার মতো অবস্থা।।পেপারের খবরের দিকে বিশেষ নজর নেই আজ।এক অন্যরকম যাত্রার আবেগে মনটা কেমন আছন্ন হয়ে আছে।

একবার কি ওনার সাথে দেখা করে আসবো?সকালে কিছু খেয়েছেন কিনা?কখন বেরোবেন?নাহ,এসব অতিরিক্ত হিয়ে যাবে।কিছুক্ষণ বিছানায় বসে একটা বই তুলে নিলাম হাতে।তারপর সেটা ফেলে সোজা বেরিয়ে গেলাম দরজা খুলে।

একি ওনার দরজায় তালা কেন?আশ্চর্য হলাম।কোথায় গেলেন?
নিজেকে শান্ত করলাম।নিশ্চয়ই কিছু কেনাকাটা করার রয়েছে।
ঘরে ফিরে এলাম।মন থেকে অস্বস্তিটা গেলো না।আরেকবার স্নান করলাম।দরজাটা খোলা রাখলাম যাতে উনি পার হলে খোলা দরজা দিয়ে দেখা যায়।পায়চারি করলাম করিডোরে কিছুক্ষণ।

তারপর নীচে নেমে এলাম চায়ের দোকানে।সকাল থেকে কিছু খাওয়া হয়নি,এমনকি চা টাও নয়।যতক্ষণ সময় অতিক্রম করা যায়।তারপর ক্লান্ত পায়ে ঘরের দিকে ফিরে আসা।এখনো তালা বন্ধ।

সেদিন সন্ধে ছটা অবধি এভাবে কাটলো অস্থিরতায়।তারপর গোটাটা যেন বুক থেকে পায়ে নেমে গেলো।শান্ত হলাম।ঘরের দরজা বন্ধ করলাম।কাজকর্ম নিয়ে বসলাম কিছুটা।কাল রাতের ঘটনাগুলো বারবার মনে আসতে লাগলো।সত্যি ছিল নাকি স্বপ্ন?কিন্তু কেন এরকম করলেন উনি?আমাকে না বলে দিলেই হত।সকাল সকাল পালিয়ে যাওয়ার কী অর্থ।খুব অপমানবোধ হল একটা।রাগ হল।সে চিন্তাগুলোকে যথাসম্ভব মাথা থেকে বের করে দিতে চাইলাম।এসে দাঁড়ালাম ব্যালকোনিতে।

চৈত্রের শেষের হাওয়া এই শহরে এসেও কিছু পৌঁছয়।মনে পরে যায় পাড়াগায়ের অরুণিমা সান্যালের মুখ?মায়ের সেলের বাজারে হাত ধরে থাকা।সেই জীবনের প্রথম বড় পরীক্ষার শেষে সিগারেট মুখে বড় হয়ে যাওয়া।আর নারকেল গাছেদের মাথা দোলানো সন্ধেগুলো।লোডশেডিং হলে হ্যারিকেনের আলোয় পড়াশুনো,জানালার বাইরে ঝাঁপিয়ে পড়া অন্ধকার।সেই পুরোনো ধানের গোলার ওপর শিমুল গাছটার গায়ে আমার ও তিস্তার নাম লিখে আসা।রঙিন কাগজে। কত কথা…

মধ্যরাত।একটা নতুন গল্প লিখছি।আমার গল্প।চারিদিকের শহরের শব্দ তখন বেশ খানিকটা কমেছে।খুব কান্না পাচ্ছে আমার।অথচ এই পাওয়াটাকেই কেমন বুকের মধ্যে জড়িয়ে রাখতে ইচ্ছে করছে।
আচমকা দরজায় শব্দ হল- ঠক ঠক ঠক…
বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠলো যেন।সমস্ত হাত পা অবশ হয়ে এলো।
ঠক ঠক ঠক…

শব্দ হয়েই যাচ্ছে,কিছুতেই থামছে না।আমি কোনক্রমে দরজা অবধি এগিয়ে এসে দাঁড়ালুম।চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলুম,দরজা খুললাম না।তেমন শব্দ হয়ে যাচ্ছে ক্রমাগত,অবিরাম।মনে হচ্ছে যেন টোকাটা দরজায় নয়,বারবার এসে পড়ছে আমার বুকের ওপর।

প্রবল কান্না পেলো।শুষ্ক কান্না। বুকের মধ্যে চেপে বসেছে একটা বিরাট কান্না। পাথরের মতো কান্না।দরজাটা খুলে দিলেই হত।অভিযোগ করা যেত।অভিমান করা যেত।
অথচ দরজাটা খোলা হল না।

কতটা সময় কেটে গেলো জানিনা।একসময় দরজার টোকা বন্ধ হয়ে গেলো। তারপর একটা আত্মহত্যার মতো নিস্তব্ধতা।

এরপর আমি বৈশাখীর কাছ থেকে একবারই চিঠি পেয়েছি একটি। তাতে কোন অক্ষর লেখা ছিল না।