সানাইয়েsidhudaর সুর আর রজনীগন্ধার খুশবু পিতামহ ভীষ্মের মতো এক থেকে গেলেও, বিয়েবাড়ির মহাভারতে বিরাট পরিবর্তন৷ বিয়েবাড়িতে খেটে গামছা পাওয়ার মিঠে দিনকাল থেকে কর্পোরেট দক্ষতায় নিপুণ ম্যানেজমেন্টে বিয়েবাড়ির সমাপ্ত হয় এখন৷গত তিন দশকে বিয়েবাড়ির ভোলবদল ঘুরেফিরে দেখলেন সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়

‘‘এদের বুঝি পরিবেশনের লোক নেই৷,’’ – বছর ৩৫ আগে এক বিয়ে বাড়িতে খাওয়ার ব্যবস্থা বুফে হওয়ায়,  অনভ্যস্থ এক বয়স্ক মহিলার প্রশ্ন ছিল আজ হয়তো কলকাতায় বিয়ে বাড়িতে গিয়ে এমন বিস্ময়সূচক প্রশ্ন করবেন না কেউ ৷ গত তিন-চার দশকে বিয়ে বাড়ির খাওয়া দাওয়াতে অনেক পরিবর্তন এসে গিয়েছে ৷ বাঙালি মধ্যবিত্ত জীবনে নিজের বাড়িতে পর্যাপ্ত জায়গা না হলে বিয়ে বাড়ির অনুষ্ঠান নিছক আর একটা ভাড়া বাড়িতে সীমাবদ্ধ নেই৷ সেই সীমা ছাড়িয়ে ক্লাব কিংবা হোটেলের ব্যাংকোয়েটে তা পৌঁছে গিয়েছে ৷ তারই ‘সাইড এফেক্ট’ স্বরূপ বদলেছে মেনু কার্ডটাও৷

সেদিনের বিয়েবাড়ি

marriageএকটা সময় কেউ ভাবতেই পারত না অনুষ্ঠান বাড়িতে ক্যাটারার দিয়ে খাওয়ানোর কথা৷ কারণ গোঁড়া মানুষদের কাছে সেটা আতিথেয়তার অভাব বলেই গণ্য করা হত ৷ এমন ব্যবস্থাকে বাইরের লোককে দিয়ে অতিথি অ্যাপায়ন বলে মনে করা হত ৷ কিন্তু সময়ের সঙ্গে মানসিকতার বদল ঘটেছে৷ যৌথপরিবারের ভাঙন, বিয়ে বাড়িতে কাজ করার লোকের অভাব বাধ্য করেছে বিয়ের দিনের খাওয়া দাওয়ার ভারটা ক্যাটারারের উপর ছেড়ে দিতে৷ কিন্তু একটা সময় তো বিয়ে বাড়ি মানে বামুন ঠাকুরের ডাক পড়ত, ভিয়েন বসত বাড়িতেই৷ রান্নাবান্নার পাশাপাশি মিস্টিও তৈরি হয়ে যেত সেই সব যজ্ঞী বাড়িতে ৷ বাড়ির লোকেরা অথবা পড়শীরা মেতে থাকত পরিবেশনের কাজে ৷ অনুষ্ঠান বাড়িতে পরিবেশনের নিমিত্তে শ্রম দেওয়ার বিনিময়ে জুটত একটা গামছা৷ সেই গামছা প্রাপ্তিও তখন অনেকের কাছেই ছিল ওই কাজের স্বীকৃতি বা পুরস্কার স্বরূপ৷ আর খাওয়ার ব্যাচ বসলে তখন নিমন্ত্রিতদের তদারকি করতে একেবারে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যেন বাড়ির কর্তা বা সমতুল্য কাউকে৷ যারা খাচ্ছেন তাদের কাছে মুখ নিচু করে গিয়ে বলতে হত ‘‘ ঠিক করে খান৷ পাত ফাঁকা কেন? ওরে এদিকে একটু মাংসটা আর পোলাওটা নিয়ে আয়৷’’

আজকের বিয়েবাড়ি

এখন অবশ্য নিজেদের ক্ষমতা মত গৃহকর্তা ক্যাটারারের হাতে এই সব দায়িত্ব সঁপে দিয়ে নিশ্চিন্তে থাকতে চান৷ আসুন বসুন বলে খাওয়ানোর মানসিকতা বদলেছে ৷ আগে তো বাড়ি এসে নিমন্ত্রণ না করলে অনেকে আসতেনই না৷ কর্মব্যস্ততার কথা মাথায় রেখে এখন তো ফোন অথবা ফেসবুক- হোয়ার্টস অ্যাপ মারফতও নিমন্ত্রণ গ্রহণ করা হচ্ছে ৷ তবে ক্যাটারার বসিয়ে খাওয়ালেbuffet সেখানে বাড়ির কেউ অবশ্যই থাকেন তবে তাঁর প্রধান কর্তব্যটি হয়ে যায় প্রতি ব্যাচে কতজন খেতে বসেছে সেই হিসেবটা রাখা যাতে ক্যাটারারের লোকেরা প্লেটের সংখ্যায় কোনও কারচুপি না করে৷ আবার পুরনো প্রথা মেনে তাঁকে মাঝে মাঝে নিমন্ত্রিতদের কাছে গিয়ে কুশল বিনিময় করে ভাল করে খাওয়ার জন্য অনুরোধ করতেও দেখা যায়৷ যদিও বেশির ভাগ সময়ই ক্যাটারারের লোকেরা বিদ্যুৎ গতিতে পরিবেশন পর্ব সারতে চায়৷ যারফলে তাদের গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে অনেক সময় নিমন্ত্রিতরা খেয়ে উঠতে পারেন না৷ সেদিক থেকে বুফেতে খাওয়ায় সুবিধা আছে , নিজের ইচ্ছে মতো সময় ধরে খাওয়া যায় ৷ কিন্তু বুফেতে খেতে গিয়ে প্লেটে নিজে তুলে নিতে হবে সেটা এক সময় অনেকের কাছে অস্বস্তির বিষয় ছিল৷ ফলে বুফে হলেই হতাশ হতেন অনেক নিমন্ত্রিত ৷ তাছাড়া অনেক সময় বুফের জায়গাটা এতটাই ভিড় হয়ে যায় যে নিজের খাওয়ার প্লেট নিয়ে নড়াচড়া করাটাও বেশ কঠিন হয়ে পড়ে ৷ অর্থাৎ পরিস্থিতি এমনই যে মনে হয় গৃহকর্তার বার্তা – নিমন্ত্রিতরা এবার লড়ে খাও ৷ তবে আগে তেমন প্রচলন না থাকলেও এখন খাওয়ার জায়গায় ‘লাইফ কাউন্টার’ থাকতে দেখা যায় , যেখানে কোন নিমন্ত্রিত ব্যক্তি তার নির্দেশ মতো কোনও বিশেষ পদ রান্না করিয়ে নিতে পারেন ৷

মেনুর রদবদল

আগে লুচি, বেগুন ভাজা, ছ্যাঁচড়া দিয়ে শুরু হত খাওয়া দাওয়া৷ তারপর মাছ মাংস পোলাও কালিয়া ঘুরে শেষ পাতে আসত মিস্টি আর দই৷ কিন্তু বেশ কিছুদিন ধরেই আইসক্রিমের সঙ্গে পেরে উঠছে না বেচারা দই৷ প্রথম প্রথম যখন শেষ পাতে আইসক্রিম দেওয়া হত, তখন সেটার প্রতি একটা আলাদা fush-dishআকর্ষণ থাকত ৷এখন ভোজসভায় কদাচিৎ দইয়ের দেখা মিলছে ফলে উল্টে এর আকর্ষণ বেড়েছে ৷ তবে দই যত ইচ্ছে নেওয়া গেলেও প্রথম দিকে যখন আইসক্রিম খাওয়ানো শুরু হয় তখন সেটা একটাতে সীমাবদ্ধ থাকতে হত৷ ইদানিং অবশ্য আইসক্রিমের জন্য অনেক বাড়িতেই আলাদা কাউন্টার বসে সেখানে নানা রকম আইসক্রিম যত ইচ্ছে খাওয়ার সুযোগ থাকে ৷আগে মিষ্টি বলতে রসগোল্লা, সন্দেশ, পান্তুয়া, দরবেশ, বোঝা যেত৷ এই মিষ্টিগুলোর একছত্র অধিকার আর নেই বরং সেই জায়গা দখল করতে এসে গিয়েছে মালপোয়া, জিলিপি, গোলাপজাম, রাবরিসহ মিহিদানা ইত্যাদি৷
গত ২০-২৫ বছর ধরে বাঙালি জীবনে বিরিয়ানি আলাদা স্থান করে নিয়েছে৷ আর এই মোগলাই খানার চাপে অনুষ্ঠান বাড়ির ভোজে পিছু হটতে হচ্ছে পোলাওকে ৷ 2012-11-11 22.53.28কোনও কোনও বাড়িতে ফ্রাইডরাইস চিলিচিকেনও থাকে মেনু কার্ডে৷ আগে একটা সময় মুরগী ঢুকত না অনেক বাঙালি বাড়িতেই৷ সেই মতো বিয়ের বাড়ির ভোজে মাংস বলতে পাঁঠাকেই বুঝত লোকে ৷ তখন কোনও বাড়িতে মুরগীর মাংস হলে একদল যেমন তা খেত না তেমনই আবার এই খাদ্যটির প্রতি একটা আলাদা আকর্ষণ থাকত বেশ কিছু লোকের মধ্যে ৷ মুক্ত অর্থনীতি প্রবেশের পাশাপাশি ’৯০দশকে বাঙালির ঘরে ঘরে মুরগী প্রবেশের মাধ্যমে খাদ্যাভাসে একটা বিপ্লব ঘটে যেতে দেখা যায়৷ এদিকে আবার শারীরিক কারণে পাঁঠা খেতে ডাক্তারের নিষেধ থাকায় বাড়িতে মুরগী খাওয়ার চল বেড়ে গিয়েছে ৷ ইদানিং খাওয়ার সুযোগ কমায় বিয়ে বাড়িতে পাঁঠা খাওয়ার লোভ থাকে অনেকের মধ্যে ৷ আগে বর্ষাকালে বিয়ে হলে পাতে ইলিশ মাছ পড়ত কিন্তু এখন যেভাবে এই মাছের দাম বেড়েছে তাতে ইচ্ছে থাকলেও সে ইচ্ছে সংবরণ করতে হচ্ছে অনেককে ৷

শেষপাতে

রজনীগন্ধার খুশবু, পাটভাঙা জামাকাপড়ের খসখস, গহনার রিনরিন, হাস্য, কলরোল, ইয়ার্কি-ফাজলামি, চাপা গুঞ্জন, মৃদু টেনশন-এসব অবশ্য বিয়েবাড়ির নিত্যকালের সঙ্গী৷ সেদিনের হইহই অ্যামেচারিস্ট নিমন্ত্রণবাড়ি সামলানোর বদলে এখন এসেছে নিপুণ পরিপাটি ম্যানেজমেন্ট৷ আহারে, বাহারে বদল এসেছে  অনেক৷ তবু  কোনও কোনও বিষয়ের নিরিখে বিয়েবাড়ি বোধহয় আদি ও অকৃত্তিম৷যেমন ওই সানাইয়ের সুর৷ আর কিছু হোক না হোক, সানাইটি না বাজলে আবার কীসের বিয়েবাড়ি!  নহবত না বসুক রেকর্ডই সই৷ শত রদবদলেও ওই একটি সুরেই বোধহয় আটকে আছে বিয়েবাড়ির স্পিরিট৷