জীবনে ভয় কম নয়৷ কবিগুরু যতই অভয়মন্ত্র হিসেবে ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য’ লিখে রাখুন না কেন, ভয়হীন জীবন কেবল Himadri-Duttaস্বপ্নেই বুঝি সম্ভব৷ যতই অকুতোভয়ে বুকচিতিয়ে চলার চেষ্টা আমরা করি না কেন, ঠিক তীরে এসে তরী ডোবেষ এবং ভয়ের পাতা ফাঁদে আমরা পা দিয়ে ফেলি৷ আসলে পা না বোধহয় উপায়ও নেই৷সেইসব ভয়ের কথা নির্ভয়ে বললেন হিমাদ্রীশেখর দত্ত

        জন্মানোর সাথে সাথে প্রত্যেক শিশুর জন্যে একটা ভয় থাকে, তার মা  বাবা অথবা ডাক্তার নার্স বা ধাই’মা-র, যতক্ষণ না বাচ্চাটি জোরে কেঁদে উঠছে। কেউ কাঁদলে,সকলের মিলিত খুশী সারা জীবনে সেই একবারই ঘটে, যদিও শিশুটি তা জানতে পারে না। অসীম অন্ধকারের তরলে ভাসমান শিশুটি হঠাৎ করে পৃথিবীর কঠিন মাটিতে পা রেখে ভয়ে কেঁদে উঠবে, এ আর আশ্চর্যের কি। পরিবেশ বদলে গেলে কার না ভয় লাগে ? এখন থেকে তার প্রত্যেকটি মুভমেন্ট অন্যের দ্বারা কনট্রোলড। তা সে মা হলেও। জীবনের প্রথম দাসত্ব আর ভয়ের উৎপত্তির সূচনা হয়ে গেলো।

    যখন সবে টলমল পায়ে হাটা শুরু করি, তখন ছিলো কাবুলীওয়ালার ভয়।  শালিমারে যেখানে আমরা থাকতাম, সেখানে খুব কাবুলিওয়ালাদের যাওয়া আসা ছিলো। ওরা সাইকেলে করে ঘুরতো, আর আমাদের বাড়ির রোয়াকের কাছে এসে আমাকে দেখতোও। মা বলতেন, একদিন ঠিক ধরে নিয়ে যাবে, খবরদার একা একা বেরোবে না বাইরে কখনও। রবীন্দ্রনাথের কাবুলীওয়ালা যখন পড়ি, তখন আমার ছোটবেলার কাবুলীওয়ালাদের, আমি কতটা যে মিছে সন্দেহ করেছিলাম,  তা ভেবে, খুব খারাপ লেগেছিলো।

        Fearআরও একটু বড় হবার পরে ঠাকুমা/দিদিমার কাছে, বা বড় দিদিদের  কাছে বসে সারা রাজ্যের রূপকথার রাক্ষস খোক্কসদের ভয় পাওয়া। আর সাথে  ডাইনী রানীর ভয়। ঘুমের ঘোরে স্বপ্নের ভয়। দু হাত মুঠো করে, মায়ের গায়ের সাথে লেপটে গিয়ে তবেই সেই ভয় থেকে মুক্তি। পরীদের ম্যাজিক যেমন কল্পনার আর আনন্দের জগতে নিয়ে যেতো, ঠিক ততটাই ভয় পেতে হতো যখন কাজের মাসী মায়ের কাছে ছেলেধরাদের গল্প বলতো। জানো বৌদি,পঞ্চানন তলায় কাল এক ছেলেধরা ধরা পড়েছে, ছোট একটা মেয়েকে ধরে নিয়ে যাচ্ছিলো, এমন মার মেরেছে পাবলিক, এখন হাসপাতালে আছে। সবাই বলছে মেয়েটিকে কিছু খেতে দিয়াছিলো। আমাদের ছোট বেলায়,ছেলেধরার একটা বিশেষ ভয় আমাদের মধ্যে ছিলো। আরোও একটা ভয় তখন ছিলো,পরীক্ষার ভয়, রেজাল্টের ভয়। আমার বেশ মনে আছে, ক্লাস ফোরের বৃত্তি পরীক্ষা, সকলে বললে জলপাণি না পেলে নাকি এই পরীক্ষা দেবার কোন মানেই হয় না। অসহায় শিশুর প্রার্থনা ঈশ্বর নিশ্চয়ই শুনেছিলেন সে যাত্রা, তাই বেঁচে যাই।

        খেলার মাঠে খেলতে গিয়ে ফেরার দেরী হয়ে গেলেও ভয়, বাড়ি ফিরে মা’য়ের বকুনি বা মারখাওয়া  ভাগ্যে আছেই। ভাই কোথায় খুঁজে পেতে আরোও  দেরী হয়,তখন সেই বকুনি বা মার আরোও বাড়তো। সে সব ভয়ের দিন গুলো এখনও মাঝে মাঝে মনে পড়ে যায় কোন এক অলস সন্ধ্যায়। খেলতে গিয়ে চোট পেলে বাড়ি ফিরে সুশ্রুষা পাবার আগে সেই চোটের ওপরে পাট খেতে হতো, এমন খেলার কি মানে যাতে চোট লাগে। আচ্ছা, বলুন তো খেলতে গেলে চোট লাগবে না ? এখন বুঝি সেই চোটের ওপরে পাট (মানে চোটপাট) ছিলো মায়ের আমাদের জন্যে দুশ্চিন্তার ফসল। বাবা বা মা না হলে সেটা বোঝা যায় না। কিন্তু শিশু মনে সেটাও একটা ভয়ের রুপেই ছিলো।


বাবা যেদিন অঙ্ক নিয়ে বসতেন,সেটা ছিলো আরোও একটা বিশেষ ভয়ের দিন। কেবল মাত্র ওই সময়েই চড় চাপড় খেতে হতো। অঙ্ক না পারার হতাশার সাথে ঠাস ঠাস চড়ের ফোঁড়ন, আমায় কেমন অসহায় করে দিতো।  আরো গুলিয়ে যেতো অঙ্ক। নিজের ওপরে অসহ্য রাগে, সে রাতে আমি কিছু খেতাম না, কিন্তু তা অত্যন্ত গোপনে। জানতে পারলে, সেটা আমার জন্যে মোটেও সুখকর হবে না। এটাও এক ধরনের ভয়।


          আরোও একটু বড় হলে যখন ক্লাস এইটের ফাইনাল পরীক্ষার সময় এলো, তখন সে কি সাংঘাতিক ভয়। এই পরীক্ষার রেজাল্টের ওপরে আমার ভবিষ্যত জীবনের লাইন পাতা হবে, যার ওপর দিয়ে আমার জীবনের রেল গাড়ি ছুটবে। সায়েন্স না পেলে জীবন বৃথা, সারা জীবন স্কুল মাস্টারী করে কাটাতে হবে। যেন স্কুল মাস্টারের জীবনটা জীবনই নয়। সেই থেকে ভেতোরে ঢোকানো হলো অ্যাম্বিশনের বা উচ্চাশার বীজ বা বিষ। অজানতেই। না বুঝেই। মাটির মূর্তির মতো আমাদেরও মনে রং চড়ে গেলো সায়েন্স, কমার্স বা আর্টসের। কোনটারই কিছু বুঝি না। কেবল এটুকু জানি সায়েন্স পড়লে ডাক্তার বা ইঞ্জিনীয়র  হওয়া যাবে, আর বাবা-মা তাই চান। যদি না পাই তাহলে এ জীবন বৃথা হয়ে যাবে। এর থেকে বড় ভয় আর কি হতে পারে? একটা ১৩/১৪ বছরের ছেলে বা মেয়ের জীবন,সায়েন্স বা কমার্সের দরজা খোলা বা না খোলার মধ্যে সীমিত করে দেওয়া হলো। অনেক পড়েও কিছু মনে থাকছে না টের পেয়ে, মা’র কথায় বাবা ছেলে বগলে ছুটলেন পাড়ার ঘোষ ডাক্তারের কাছে।schoolbook_2543053b ওষুধ লাগবে মনে হছে, ডাক্তার বাবু, কিছুই যেন মনে রাখতে পারছে না, সামনে এতো বড় পরীক্ষা।  সন্ধ্যার মুখে ডাক্তার বাবুর একটু আফিম নেবার অভ্যাস ছিলো। ঢুলু ঢুলু চোখে একবার আমাকে, একবার বাবার দিকে দেখে হাসতে থাকেন, আর হাসতে থাকেন।কিছুক্ষণ পরে, একটা কাগজ টেনে নিয়ে তাতে লেখেন, ওকে নিজের মতো থাকতে দিন। সব মনে থাকবে। এমন ডাক্তার আজকাল আর নেই, আমার শ্যালিকার মেয়ে একদিন ঘুম থেকে উঠে বাথরুমে লুকিয়ে বমি করতে গিয়ে তার মায়ের হাতে ধরা পড়ে যায়। ব্যাস তারপরে আর কি! সে বেচারা আগের রাতের বদহজমির মাশুল গুনলো পাক্কা সাতদিন ধরে, সাথে গ্রাম পজিটিভ, গ্রাম নেগেটিভ অ্যান্টিবায়োটিক আর পাতলা খিচুড়ি খেয়ে। অসুখ বিসুখের কথায় একটা সাংঘাতিক বার্ষিক ঘটনার কথা মনে পড়ে গেলো। সেটাও সাংঘাতিক বেদনার আর ভয়ের ছিলো। প্রতি বছর আমাদের বাড়ির সকলকে গরম কাল পড়বার ঠিক মুখে মুখে (এপ্রিলের সেকেন্ড উইক, কোলকাতায়), একটা করে  ইনজেকশান নিতে হতো প্রতিষেধক হিসেবে, তাতে ধুম জ্বর অবধারিত ছিলো, আর ছিলো হাতের যেখানে সূচ ঢুকতো সেখানে তীব্র ব্যাথা। বাবার মতো কঠিন লোকও ওই ইঞ্জেকশানে কাবু হয়ে পড়তেন।

        বাবা যেদিন অঙ্ক নিয়ে বসতেন,সেটা ছিলো আরোও একটা বিশেষ ভয়ের দিন। কেবল মাত্র ওই সময়েই চড় চাপড় খেতে হতো। অঙ্ক না পারার হতাশার সাথে ঠাস ঠাস চড়ের ফোঁড়ন, আমায় কেমন অসহায় করে দিতো।  আরো গুলিয়ে যেতো অঙ্ক। নিজের ওপরে অসহ্য রাগে, সে রাতে আমি কিছু খেতাম না, কিন্তু তা অত্যন্ত গোপনে। জানতে পারলে, সেটা আমার জন্যে মোটেও সুখকর হবে না। এটাও এক ধরনের ভয়। সেই সময়ের মহলে, বাড়িশুদ্ধ সকলেই এক ভয়ের বায়বীয়তায় মুহ্যমান থাকতো। সে সব দিন মনে করে একটুও ভালো লাগছে না। আমার মেয়েদের জন্যে এমন দিন আমি কখনও সৃষ্টি করি নি। এইটুকুই আমার সান্ত্বনা। ১৯৬২ থেকে ১৯৭৩ সমাজের এমন একটা সময় ছিলো, যখন ভুল করলে শাস্তি পেতেই হতো। তা সে স্কুল বা বাড়ি যাই হোক না কেন। হয়তো বাবার কাছে কোন অল্টারনেটিভ ছিলো না। কিন্তু যে যাতে দূর্বল তাকে সেখানে সবল করে তুলতে বোধহয় ক্রোধের চেয়ে ভালোবাসাই বেশী শক্তিশালী। কি জানি, কোনটা ঠিক আর কোনটা ভুল।


বিবাহের পরে দাম্পত্য জীবনের ভয় কী কী তা নিয়ে ডিটেলেসে যাবার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। সম্পর্ক পালন করা এক বড় দায়িত্বের কাজ। সে এক বড় পরীক্ষার ব্যাপার। তাতে মন যেমন বোঝার দরকার, তেমনই কিছু সাংসারিক কিছু টুকিটাকি থাকে যা অবশ্য পালনীয় হয়ে পড়ে। আর সেখানেই যত গন্ডগোল। এক আধ বার মিস করলে শ্রীমতী কিছু বললেন না, কিন্তু বার বার হলে গৃহযুদ্ধ অবধারিত।


            হায়ার সেকেন্ডারি দেবার পরে, যতদিন না আবার ফাইনাল পরীক্ষা আসছে, ততদিন কোন ভয় নেই। সদ্য কৈশোর পার হয়ে তখন আমরা সকলেই ভয়কে জয় করার বিশ্বাসে বিশ্বস্ত। দুনিয়ার এমন কোন ব্যাপার নেই যেটা নিয়ে মত দিতে আমাদের তখন আটকায়। তা সেটা রাজনীতি, ধর্ম, সেক্স, যাই হোক না কেন। বন্ধুদের মধ্যে কিছু ঘ্যাম ছেলে মেয়ে সব জায়গাতেই থাকে, যারা মেপে  কথা বলে, আর তাদের কথা সকলে সমীহ করে। আমার দেওয়া মতামত যদি তাদের সাথে মিলে গেলো, তবে সেদিনের মতো আমিও ঘ্যামের পর্যায়ে। ইন্টারনাল টেষ্ট নিয়ে একটা কচি ভয় থাকতো, সেরকম একটা টেষ্টে আমি একবার দশে শূণ্য পেয়ে রেকর্ড করেছিলাম। তাতে আমার চেনা প্রাণের বন্ধুরা যা আওয়াজ দিয়েছিলো, আজও তা মনে আছে। তবে সেটা ভয়ের থেকে উপভোগের ব্যাপার বেশী ছিলো। পার্ট ওয়ান আর পার্ট টু-এর সময় সবচেয়ে ভয়ের ছিলো, সাবসিডিয়ারি সাবজেক্টে পাশ করা। অনার্স ক্লাস নিয়ে আমরা এতো মশগুল থাকতাম, সাবসি গুলো পরীক্ষার আগের দিন চ্যাপ্টার ওয়াইজ আর নম্বরের ডিস্ট্রিবিউশন ওয়াইজ তৈরী করতে হতো। তাতে পড়ার থেকে চান্স আর ক্যাল্কুলেশানের ব্যাপার বেশী থাকতো, আর সেটাই হতো ভয়ের প্রধান কারণ। যদি প্রিপারেশান অনুযায়ী পেপার না হয়, তবে শিবের বাবারও অসাধ্য আমাদের পাশ করায়। কোলকাতা  ইউনিভার্সিটির নিয়ম অনুযায়ী সাবসি গুলোতে মিনিমাম ৪০ শতাংশ পেতেই হবে। এটা একটা বিরাট ভয়ের ব্যাপার ছিলো, কেননা অনার্স থাকলেও পরের সেশানে তো বসতে পারবে না, যতদিন কম্পার্টমেন্টাল ক্লীয়ার হচ্ছে। বাড়ি আর বন্ধুদের হেয় দৃষ্টি তো সাথে ফাউ হিসেবে থাকতোই। আমাদের বন্ধুদের মধ্যে এক দুজনেরই এমন দুর্ভাগ্যের মুখোমুখি হতে হয়েছিলো।

গ্রাজুয়েট হয়ে যাবার পরে যখন জীবন যুদ্ধে পা রাখতে যাবার উপক্রম হলো, তখন এক বিশেষ বোধের আক্রমণে আমরা কয়েক জন আক্রান্ত হয়ে ছিলাম। সেটা সময়ান্তরে বিশেষ সুখের ঘটনায় যদিও পর্যবসিত হয়েছিলো, কিন্তু সেই সময় সেটা বড়ই ভয়ের ছিলো। এই বিশেষ বোধ ছিলো প্রেমে পড়া, আর যারা এই ব্যাপারে একবার আক্রান্ত, তারা অবশ্যই জানেন, যে যতক্ষণ না প্রেমাস্পদের কাছ থেকে কনফারমেশান লেটার আসছে, ততক্ষণ সব সময়ই মনের মধ্যে ধুকু পুকু। এই সময়ে যদি সেই তাকে দেখা যায় অন্য কারোও সাথে হেসে কথা বলতে, তাহলে তো সেদিনের রাতের ঘুম গেলো। এখনকার মতো মোবাইল ছিলো না তখনকার প্রেমের মতি গতি, তাই ভয়ের সাথে দুশ্চিন্তা উপরি পাওনা হিসেবে বইতে হতো। আর এই বেদনা কোথাও ভাগ করে নেওয়া যেতো না। না বাড়িতে, না বন্ধুদের সাথে। একমাত্র যে ভদ্রলোককে চোখে দেখা যায় না, কেবল অনুভবে পাওয়া যায়, তাঁর কাছেই আবেদন পত্র জমা হতে থাকে, যেন আমার সাধের পাত্রীটি মন না বদলায়। অভিজ্ঞতা হিসেবে বড় কঠিন হলেও এর স্বাদ যে বা যারা পেয়েছে তারাই জানে, এই আগুনে সোনা হওয়া আর পুড়ে কালি হয়ে যাওয়ার মধ্যে একটা সূক্ষ্ম রেখা আছে, যা চোখে দেখা যায় না বটে, কিন্তু চোখে পড়া যায়। আর সেই পড়তে পাওয়া বা দেওয়াই আসল চাবিকাঠি। এই ভয় আমায় বেশ কিছুদিন জ্বালিয়েছে।

সাবালক পোষ্ট গ্রাজুয়েটের পরে এবার উপযুক্ত চাকরির অনুসন্ধান। সেটা একটা বড় কাজ। এই কাজের বোঝা দ্বিগুণ হয়ে যায়, যদি বাবা রিটায়ার করে গিয়ে থাকেন, ঘরে বোনের তখনও বিয়ে দেওয়া হয়ে ওঠেনি, আর সব শেষে নিজেও একজনকে অপেক্ষায় রেখেছি। কম্পিটিটিভ পরীক্ষায় বসা, ভালো করা এগুলো সব নিজের হাতে। কিন্তু ইন্টারভিউ কল পাবার পরে সবটুকু আর নিজের হাতে থাকে না। যিনি ইন্টারভিউ সেদিন সেই মুহুর্তে নেবেন, তার মানসিক স্থৈর্য্য আর কো-অপারেশানের ওপর নির্ভর করে। আজকাল টিভি তে একটা বিজ্ঞাপন প্রায়ই দেখায়, যাতে যে ইন্টারভিউ দিতে এসেছিলো, সে ফাইনালি জিজ্ঞাসা করেই ফেলে, আপনারা কি জানতে চান, আমি কি জানি না, না কি আমি কি জানি? সে রকম বোর্ড মেম্বারের কাছে যদি পড়তে হয় তাহলে বাবার রিটায়ারমেন্ট পলিসির থেকেই আরো কিছুদিন খরচ চালাতে হবে। এটাই এক সাংঘাতিক ভয়। তখনও ডিউ পানীয়ের আবিষ্কার হয়নি, নয়তো বন্ধুরা হাতে ধরিয়ে দিতো তার একটা বোতল, ভয়ের আগে এগিয়ে গিয়ে জয়কে পাবার জন্যে।

o-FEAR-OF-CHANGE-facebookবিবাহের পরে দাম্পত্য জীবনের ভয় কী কী তা নিয়ে ডিটেলেসে যাবার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। সম্পর্ক পালন করা এক বড় দায়িত্বের কাজ। সে এক বড় পরীক্ষার ব্যাপার। তাতে মন যেমন বোঝার দরকার, তেমনই কিছু সাংসারিক কিছু টুকিটাকি থাকে যা অবশ্য পালনীয় হয়ে পড়ে। আর সেখানেই যত গন্ডগোল। এক আধ বার মিস করলে শ্রীমতী কিছু বললেন না, কিন্তু বার বার হলে গৃহযুদ্ধ অবধারিত। এ সব ছাড়াও, কিছু ইম্পরটেন্ট ডেটস ভুলে যাওয়া, বিয়ের দিন মনে না রাখা, ওনার ওষুধ খাবার সময় মনে না করিয়ে দেওয়া, এরকম অজস্র ভয়ের সাথে আপনাকে ঘর করতে হয়। আমার কাছে আরও একটা বড় ভয় আছে, আর সেটা হলো উপযুক্ত উত্তরাধিকারি রেখে যাওয়া। সেটা বড় কঠিন কাজ, আর ৯০ শতাংশ আমরা সেটাতে অবশ্যই পাশ করতে পারি না। যুগের সাথে   তাল মিলিয়ে ছেলে মেয়েকে তৈরী করা আর সাথে নিজের সংস্কার দেওয়া এ দুটোর তাল মিল আমরা প্রায়শই মেলাতে পারি না, তাই উত্তর পুরুষের কাছে আকাঙ্খাও কিছু থাকে না। সম্পর্কের আবর্তনে তখন সব কিছু হারানোর এক তুমুল ভীতি আমাদের চারপাশে শাখা প্রশাখা ছড়াতে থাকে। সারা জীবনের সব কিছুর সার এক নিমেষে পঞ্চ ভূতে মিলে যেতে থাকে। এই হারানোর ভয় আমার মতে জীবনের সবচেয়ে মহত্বপূর্ণ ভয়। এই ভয় থেকে মুক্তির পথ খুঁজে পাওয়াই আমার মতে জীবনের মূল উদ্দেশ্য। চারিদিকের চাকচিক্য আর উপভোগের পসরায় আমরা পথ হারিয়ে ফেলি। যখন জাগি, তখন আর সময় নেই। শরীর আর বইতে রাজী নয়, মন ক্লান্ত। শুধু আফশোষের নিঃশ্বাস হাওয়া ভারী করে। জীবন যদি কেবল আর একবার সুযোগ পেতো !

জীবন তা দেয় না, এক জীবন, এক মরণ। সময়ান্তরের মধ্যিখানে আমরা কি ভরবো, কিভাবে ভরবো, সেটাই থেকে যায় ভয়ের খোলসে মোড়া। এই খোলস থেকে ভয়কে মুক্ত করার উপায় রপ্ত করার নাম বেঁচে থাকা। চলুন, চেষ্টা করি। আর কত ভয় পাব ?