ড. অরিজিৎ ভট্টাচার্য

উত্তরাধুনিকবাদীরা কখনই স্বীকার করেন না যে অতীত-বাস্তবতার পুনঃনির্মাণ সম্ভব। তাঁদের মতে, প্রকৃত রচনায় অতীত সম্বন্ধে যা লিখিত হয়ে থাকে (ইতিহাসের উপাদান) তা অতীত ঘটনা নয়। বরং তা হল ঘটনা সম্পর্কে নানান বিচ্ছিন্ন ভাবনা ও ধারণা। অর্থাৎ নানান ডিসকোর্স। এই ভাবনা ও ধারণাগুলোর আড়ালে কোনও পুনরুদ্ধারযোগ্য বাস্তব-জগৎ পড়ে নেই, যেখানে রচনাকার তাঁর অধ্যাবসায় ও কৃৎকৌশল দিয়ে পৌঁছাতে পারবেন।

কিথ জেনকিন্স তাঁর ‘রিথিংকিং হিস্ট্রি’ গ্রন্থে লিখেছেন, “‘truth’ and similar expressions are devices to open, regulate and shut down interpretations. Truth acts as a censor-it draws the line. We know that such truths are really ‘useful fictions’ that are in discourse by virtue of power… and power uses the term ‘truth’ to exercise control: regimes of truth.”

অর্থাৎ সত্য কিংবা অসত্য এইসব ধারণার মধ্যে নিহিত থাকে একধরনের ক্ষমতার স্বর। উত্তরাধুনিকপন্থীরা ‘সত্য’-এর বাস্তব অস্তিত্বই স্বীকার করেন না। তবে প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, লিখিত তথ্যের ভিত্তিতে ইতিহাস লেখার যে ইউরোপীয় ধারণা তাকে আজ আমরা প্রামাণ্য হিসেবে গ্রহণ করি না। মৌখিক সত্য, গল্প, কথাও ইতিহাসের উপকরণ। মহারাষ্ট্রের ওয়ারলি আদিবাসি জাতি ঘরের দেওয়ালে আঁকে তাদের ইতিহাস, তাদের সাহিত্য। এই ছবিই তাদের ইতিহাস, তাদের নিয়ে লেখার উপকরণ।

মহাশ্বেতা দেবী একবার বলেছিলেন, ঝাঁসিতে তিনি সাধারণ মানুষের মুখে ইতিহাস আর ঐতিহ্য বিষয়ে যে গল্প শুনেছিলেন, সে সত্য তিনি কোনো লেখ্যাগারে পাননি, যা তাকে সেই স্থান ও সময়ের ইতিহাস বুঝতে অনেক সাহায্য করে। আমাদের মনে পড়ে যায় মৃণাল সেনের ‘মৃগয়া’ চলচ্চিত্রের কথা। যেখানে আমরা দেখি, গাঁয়ের মোড়ল এ-প্রজন্মের মানুষের কাছে শোনায় বিরসা মুন্ডার কথা, এ যেমন একদিকে তাদের অনুপ্রেরণার ইতিহাস তেমনি নিজেদের সাহিত্যও।

ইতিহাস ও সাহিত্যের সম্পর্কের বিষয়ে বলতে গিয়ে অধ্যাপক অশীন দাশগুপ্ত বলেছেন, “সাহিত্যিকের অধিকার ঘটনার ভিতর প্রবেশ করার; জীবনের আভ্যন্তরীণ সত্য বোঝবার চেষ্টা সাহিত্যেই সম্ভব। সাংবাদিকের কথা বলতে পারবনা। কিন্তু ঐতিহাসিকেরা সাহিত্যকে সম্পূর্ণ ছাড়েননি। অনেক যশস্বী ঐতিহাসিক বলে গিয়েছিলেন যে মানুষের মন বুঝতে না পারলে ঘটনাকে ঠিকভাবে বোঝা যায় না।ইতিহাস যে সাহিত্য, এই উপেক্ষিত বক্তব্য কিন্তু উপেক্ষনীয় নয়।”

ইতিহাস এবং কথাসাহিত্যকে পৃথক করার আগ্রহও আসলে বহুদিনের। এই দুয়েরই অন্বিষ্ট বাস্তব জীবন, যার মধ্যে আছে বিশেষ ও নির্বিশেষ। কখনও ইতিহাস প্রসিদ্ধ ব্যক্তি হয়ে ওঠে উপন্যাসের প্রধান, কখনও একটা কাল ছড়িয়ে পড়ে উপন্যাসের সমগ্র পরিসরে।

পল হ্যামিল্টনের মতে, নান্দনিক অভিজ্ঞতা “constitutes a common culture, automatically including us in a historical community of shared values.” আর কার্ল মার্ক্সের মতে, অতীত অনুধাবন ঘটনা পরম্পরাকে কীভাবে রাখা হচ্ছে তার ওপর নির্ভর করে। ইতিহাসকে যখন সাহিত্যেও প্রত্যক্ষভাবে ব্যবহার করা হয় তখন পাঠক শনাক্ত করে ‘সীমাবদ্ধ প্রেক্ষিত’ এবং ‘আংশিক প্রেক্ষিত’ যা বিবরণকে করে তোলে।

আসলে সাহিত্যও ইতিহাসকে নির্মান করে। ইতিহাসের কেবল রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক চর্চা থাকেনা, থাকে তার সাহিত্য চর্চার দিকও। ইতিহাস তথ্যনিষ্ঠ। তথ্য-বিশেষ বা তথ্য-সত্যকে প্রকাশ করাই ইতিহাসের লক্ষ্য। অন্যপক্ষে, সাহিত্য তথ্যকে নিষিক্ত করে কল্পনায়। ইতিহাস ‘বিশেষ’কে গ্রহণ ও ব্যক্ত করে; সাহিত্য ‘বিশেষ’কে দেয় ‘নির্বিশেষ’ বা ‘সামান্য সত্যে’র মর্যাদা।

বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে এবং একুশ শতকে সাহিত্য ও ইতিহাসের দ্বান্দ্বিক সম্পর্ককে কেন্দ্র করে আখ্যানতত্ত্বের ক্ষেত্রে যুগান্তকারী পরিবর্তন ঘটেছে। আজ ইতিহাসের তথ্যগত সত্যতাই একমাত্র বিবেচ্য নয়। রবীন্দ্রনাথ একসময় বলেছিলেন, ইতিহাসের সংশ্রবে উপন্যাসে যে বিশেষ রস সঞ্চারিত হয়, ইতিহাসের সেই রসটুকুর প্রতি ঔপন্যাসিকের লোভ, সত্যের প্রতি তাঁর কোনও খাতির নেই – এই বয়ানও আজ তাই প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়ে।

যে কোনও নির্মানের মতোই ইতিহাসও এক নির্মান মাত্র। এই নির্মিত সত্য নিয়ত পরিবর্তমান একটি ধারনা যা চিরন্তনও নয়, মহানও নয়, নিত্য ভঙ্গুর ও ক্ষণস্থায়ী। এই নশ্বরতাকে স্বীকার করে নিয়েই আজকের ইতিহাসের যাত্রা।

বাণী বসুর লেখা ‘মৈত্রেয় জাতক’ (১৯৯৬) একটি সময়কালের পুনর্নিমাণ, যে কাল আজকের বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়েও নিঃসন্দেহে ফিরে দেখার যোগ্য। কল্পনাশ্রয়ী এই নির্মাণ ঐতিহাসিক তথ্যসমূহকে অবমাননা করে নয়। গৌতম বুদ্ধের জীবৎকাল এবং ভারতবর্ষের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সময়কে লেখিকা এই উপন্যাসে ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন। এই কাহিনির পটভূমি একদিকে যেমন ছুঁয়ে আছে বর্তমান ভারতবর্ষের মধ্যাঞ্চলের ইতিহাস, তেমনি অন্যদিকে ছুঁয়ে আছে মানুষের চিরজটিল মনোলোক।

লেখিকা খুব যত্ন সহকারে তাঁর এই দুই পর্বে বিন্যস্ত সুবিশাল উপন্যাসে চিত্রিত করেছেন কিভাবে ক্ষমতার ভরকেন্দ্রের পরিবর্তন ঘটছে। “গান্ধার-মদ্র-কুরু-পাঞ্চালের জায়গায় কোশল-বৈশালি-মগধ, পুরনো সাম্রাজ্যবাদের নীতির সঙ্গে ঘটেছে নতুন মৈত্রী ভাবনার সংঘাত। এই সংঘাতের কেন্দ্রে যেমন আছেন লোকবিশ্রুত গৌতম বুদ্ধ, আছেন ভারতের ভারতের প্রথম ঐতিহাসিক সম্রাট বলে খ্যাত বিম্বিসার, কোশলপতি প্রসেনজিৎ ও নানান ধুরন্ধর রাজপুরুষবর্গ, তেমনই আছেন তক্ষশিলার বিদগ্ধ যুবক চণক, গান্ধারের বিদুষী নটী জিতসোমা, সাকেতের সন্ধিৎসু রাজন্যকুমার তিষ্য ।”

পরিবর্তন ঘটেছে অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্তরেও। ধনই হয়ে উঠেছে প্রকৃত ক্ষমতার উৎস। মূলত বণিক ও ধনজীবিদের কেন্দ্র করে বৃহত্তর জনজীবনে কৃষিজীবী, বৃত্তিজীবী, ভুমধ্যকারী নাগরিক, ছোট ব্যবসায়ী, কবি, নটী, দাস প্রমুখের ক্ষেত্রে চলেছে এক শাশ্বত জীবনচর্যা। আধুনিক জীবনের চোখে প্রাচীন জীবনের আপাত সরলতার মিথকে ছিন্ন করে এক অতি জটিল আবেগ-অনাবেগ, প্রেম-অপ্রেম, চেতন-অবচেতনের দ্বন্দ্বময় ব্যক্তি ও যৌথ জীবনের কথা। যথোচিত ভাষায় এবং যথাযোগ্য আঙ্গিকে।

বাণী বসু স্বয়ং এই উপন্যাসের ভূমিকাংশে উল্লেখ করেছেন যে, “‘মৈত্রেয় জাতক’ বুদ্ধর জীবন কথা নয়। ঐতিহাসিক রোম্যান্স তো নয়ই। এই জাতক একটি সময়কালের পুনর্নিমাণ, যে কাল আজকের সংকট মুহূর্তে ফিরে দেখার যোগ্য। অবশ্যই কল্পনাশ্রয়ী এ নির্মাণ, কিন্তু ঐতিহাসিক তথ্য সমূহকে অবমাননা করে নয়। ইতিহাসের গর্ভে যেখানে যেখানে অনিশ্চয়তা, পরস্পর বিরোধ ও নীরবতা, যুক্তিসিদ্ধ কল্পনা সেই ফাঁকগুলোতেই স্বেচ্ছাচারী হয়েছে।

যেমন বিম্বিসারের বংশ নির্ণয়, অভয় বা জীবকের পরিচয়, আনন্দের বয়স, এবং সাধারনভাবে ছোট ছোট ঘটনার কালক্রম। ঘটনাবলীর পেছনের মোটিভ নির্ণয়ও ছিল গবেষণার কেন্দ্র, যদি একে ন্যূনতম গবেষণার মান দেওয়া যায়। এই চিত্র পূর্ণ এমন দাবি করি না।

বিশেষত জাতৃক পুত্র বর্ধমান মহাবীরকে তেমন কোনও তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকায় দেখানো গেল না, এ দুঃখ রয়েই গেল। কিন্তু ইতিহাস, কথাকাহিনী, এমন কি বিজ্ঞানের জগতেও কোন চিত্রই বা পূর্ণ ? আসল কথা যথাসম্ভব খোলামন ও মুক্ত দৃষ্টি নিয়ে কাজ করা গেছে কি না।” আর আমাদের মনে হয়, এই লক্ষ্য পূরণে তিনি বহুলাংশে সফল।

 

*প্রাবন্ধিক পূর্ব বর্ধমান জেলার মানকর কলেজের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক।