দীপঙ্কর দেবনাথ

পাতা ঝরার মরশুম
আমিও নেই আর বাগিচায়
গাছেদের দ্যাখো পরখ করে
কে-ই-বা থাকে আর ঋতুর অপেক্ষায়

গাছেরাই এখন আর প্রকৃতির নিয়ম মানতে পারে না। কাকে কখন কীভাবে বড়ো হতে হয়, পাতা খসাতে হয়, ফুল ফোটাতে হয় বুঝে উঠতে পারে না। কেউ আর স্বাধীন সত্তার স্বাদে লালিত হয় না। আমাদের নাগরিক উপনিবেশ তাদের অস্থি জুড়ে বিপরীত স্রোতের কামড় দিচ্ছে। এলোমেলো হচ্ছে ঋতুমাস।

আমাদের মনও যেভাবে বিকারগ্রস্ত তাতে নির্বাণের অশথ মরে যাচ্ছে দ্রুত। সমস্তরকম বিচ্ছিন্নতা, ধ্বংসের ভেতর আমাদের ইন্দ্রিয়ের ভেতর জেগে থাকা অল্প পরিমাণ কিয়ের্কেগার্দ বছর বছর দস্তয়ভস্কিকে খুঁজতে যায় গরমের ছুটি, ক্রিসমাসে। আমার কোথাও যাওয়া নেই। আমার ঋতুকে শরীরেই উপভোগ করার নেশা খুব। বহু প্রাচীন দেশীয় কবিদের রক্তে প্রথম ধরা পড়েছিল এ নেশা। চণ্ডীদাসের অভিসারে গেলে বৃষ্টি যে কেন ঝমঝমিয়ে নামে!

যক্ষ ভাবার্থ লেখার জন্য এত উত্তর-দক্ষিণ মেঘ যে কী করে পেল! জাতকের চোখ যে কী করে দেখল এত দূর অতীতে বুদ্ধ নবজাতককে! এক প্রকৃতি হয় গাছপালা, পরিবেশ আর এক প্রকৃতি হল নিয়ম। এই দুইকে ভালো রাখার জন্য আদম-ইভের আগে নিউটনের জন্মানো উচিত ছিল। অন্তত, জ্ঞানবৃক্ষের ফলটা মাটিতে পড়তে দিত। খেয়েই যত গোলমাল। যাইহোক, ফাল্গুনের রাতে ঝাউয়ের শাখার পেছনে চাঁদ উঠতে দেখে আমারও ইচ্ছে করে পাখনার পালক হতে।

সিজনাল রোগের মত প্রথমটায় ভেবেছি নিজেকে। তারপর বুঝলাম এ আমি ভেতরকার আমি জন্ম আগেও জন্ম পরেও। এরপর শত অন্ধকার অতীত খুঁড়ে খুঁড়ে দেখেছি সমস্ত অসুখের ভেতর একটা বেহুলার ভেলা ভেসে যায়। আমাদের যে চির আকাঙ্ক্ষার বস্তু– বসন্ত, তাকে ছুঁয়ে দেখার আগেই ওত পাতে প্রখর গ্রীষ্ম। ফর্সা রাতকে নিয়ে আমার কোনো দাবি নেই। রাতের উজ্জ্বল তারা তাই মিলিয়ে যাক ধীরে। বুকের ভেতরের নদীটাকে বোঝাব ভেলা ভেসে গেছে ফিরে আসবে।

আজ আমায় নেয়নি কাল নেবে। আমি পালক না হয়ে তখন বরং কোজাগরী হই। বসন্তকে নিয়ে লিখতে চাইছি কিন্তু এত নিরাসক্ত যে প্রেম ও ফুলকে বাদ দিয়ে জ্ঞান ফলাচ্ছি। বোঝাতে পারছি না যে, আমি বসন্ত বলব বসন্ত লিখব। হে পাঠক! আমি বসন্তের সৈনিক, বাসন্তিক আমার হাভভাব। এই আমিই কদিন পর সাদা কিংবা হলুদ পাঞ্জাবি পড়ব, রং খেলব, সেলফি নেব, বিভিন্নভাবে পোজ দেব, কবি কবি ভাব খাব।

ভার্চুয়াল কবিদের এখন অনেকেই আর সইতে পারছে না। অনেকের ঘর ভেঙেছে এই কবিদের জন্যে। এদের রসে টুইটুম্বুর দু-চারখানা কোয়ান স্বর্ণ গোধিকার মতো প্রকট হয়ে থাকে তারপর অবোধ নিরীহ তপোবনের আশ্রমিকদের কমলে কামিনী দেখিয়ে চলে যায় স্রোতে। সবাই অমন নয়। আমারই কি সবটা মন পাষণ্ড! আমার মধ্যে কুসুম প্রেমও আছে। শুধু তুমি ছিটমহল বলে আমি তোমার সবটুকু দেখা পাইনি। তোমার দোষ নাই। আমার খুব ইচ্ছে রঙ্গিন ছবি, ধারকরা ক্যাপশনে প্রচুর বান্ধবী হৃদয় হরণ করব।

জেনে রাখো এই সেরা সময় বসন্তকে নিয়ে কে কি লিখে গেছেন সেইসব চরম বাণীগুলো মুখস্থ করে রাখার। সময় মতো ঝেরে দেব। মাঝেমধ্যে দু-একটা শব্দ আপনাদেরই প্রিয় মানুষ, পোশাকের আবরণ থেকে বদলে নিয়ে নিজের করব। কত কি করব! সত্যিকারের ভালোবাসায় কি এতকিছু থাকে! কি জানি। শাম্ব সেজে একবার ইলাবৃতবর্ষ গেছিলাম। ওখানেও জরা লেগে আছে। গ্রিন হাউস এফেক্ট বোধ হয়! সঙ্গে এতটা পথের ক্লান্তি এখনো সইছি। আমার কাছে বসন্ত অসুখের ঋতু।

‘ফাল্গুনে বিকশিত কাঞ্চনফুল, ডালে ডালে পুঞ্জিত আম্রমুকুল’ যতই থাক আমি খুঁজে খুঁজে বার করি কোন গাছে এখনো মুকুল ধরেনি! কোন ফুলে এখনো মৌমাছি আসেনি! প্রকৃতি আমায় এসব দেখার দায়িত্ব দেয় নি কিন্তু আমিও একদিন কাঞ্চনফুলকে রবীন্দ্র-ভানু মঞ্চের সামনে ফুটতে দেখেছি ঝরে পড়তেও দেখেছি। তাই যখন দু একটা বাইক-সাইকেলের চাকা ছাড়া কেউ তাদের ছুঁয়ে দেখে না, সন্ধ্যার সাদা-আলোয় জোড়া জোড়া শ্বাস বাতাসে খাবি খায় অথচ কোনো খোঁপাই তার সুবাস ধরে রাখে না।

হ্যাঁ! তখনই আমার নৈতিক দায়িত্ববোধ জেগে ওঠে। ইচ্ছে করে সৌন্দর্যকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখাই। নাহ! থাক। আমি বেশ কয়েকবার নান্দনিক হতে চেয়েছিলাম। ভাষার ছাত্র বলে বুক থেকে চিত্রকল্প উপড়ে নিল এবং শিখলাম নৈঃশব্দই আসল ভাষা। আমার বাসন্তিক শৈলী এখন দুপুর হলে দুহাতে গন্ধপাতার ধোঁয়া উড়িয়ে লেবুজল খায়। পলাশের কথা বলা ভারি দরকার। ওই নামে এখন আমার ভাই ও ফুল দুইই ক্যাম্পাসে আছে। আমি ফুলের কথাই বলব। এটা বলেই নৈঃশব্দে যাব।

ক্যাম্পাসে পলাশের অবস্থা এম.এ ক্লাসের এক চেনা মেধাবী ছাত্রীটির মতো। ঠিক সুবিধামতো একটা ক্লিপে নিজেকে আটকে নিয়েছে, এখন দেদার নম্বরের ঝলকানিতে চোখ ছানাবড়া আমাদের। আমিও পলাশকে কাছ থেকে দেখতাম। কুড়োতাম। সকাল সকাল হাঁটতে হাঁটতে হোস্টেলের ছাদ থেকে মাইনাস করতে করতে অভিবাদন জানানো কার্সিয়াঙের টাওয়ারটাকে আরও একবার দেখে নিতাম মেঘে ঢাকা কিনা! যক্ষপুরীতে এই একটাই নন্দিনী ছিল সে হল পলাশ।

খোঁপায় গুজে দিয়েছি কত। চা-বাগানের এক কোনায় এখনো ফুটে আছে। তার কাজ তিনি সম্পূর্ণ করেছেন। মাতৃভাষাদিবসের প্রভাতফেরিতে যেতে যেতে সবগুলো পলাশ গাছকেই চোখে পড়ল। কিন্তু বিষয় হল- কেউ লাইনচ্যুত হয়ে কুড়োতে গেল না। নিয়মের শাসন বলেও কিছু আছে। আমি মানি নাই বলিয়া অন্য কেহ মানিবে না ইহা হয় না। কুড়ানো দূরে থাক। চোখ গেল! মন গেল! থেঁতলে যাওয়া একটা পলাশ হাতে নিয়ে দেখলাম শিবের জটাটুকু অবশিষ্ট, গৌরীর গৈরিক বসন হারিয়ে গেছে।

আমি নিশ্চিত তিনটে সিঁদুরের ফোটা দেওয়া একটা রক্তজবা একটা লেবুসহ রাস্তায় পরে থাকলে অমন দশা হত না। সহজ ধর্মে খোঁচা দিলাম। এত সুন্দর ফলফুলে ভরা ক্যাম্পাস তাহলে কি লাফিয়ে লাফিয়ে রাস্তা পার হবে! আজ্ঞে না। ফুলগাছতলায় ফুল পড়ে না থাকলে প্রকৃতিও রাগ করে আর বাতাস দেবে না। তখন তোমার ঝরাফুলের দেশে নতুনকে কি করে চিনবে! কিন্তু চিমটি মেরে খামচিয়ে রাস্তায় ফেলার কি দরকার!

আমার সমস্যাটা হল- ঠোঁটে চুমু খাওয়ার জন্য খোঁপায় জোর করে ফুল গুজে দেওয়ার মানে কি! কত এলোমেলো বাতাস দেখেছি, চুল উড়ে উড়ে আকাশটাই অন্ধকার করে দিল কিন্তু যে ঠাকুর ভক্ত সেজে বসে থাকে তার চোখে মুখে অন্য বসন্ত- গুটিবসন্ত। এ ভারি অন্যায়। আমার সমস্ত কথাকে আবোল তাবোল বলবেন না প্লিজ! সেও এক বিখ্যাত বই। বলছিলাম যে, কবি বলেছেন বসন্ত উদাসীন, গৃহত্যাগী। আমি প্রমাণ দেব বসন্ত গৃহমুখী। সেদিন দুপুরে চা খেতে ল মোড় হয়ে আড্ডাখানায় ঢুকলাম। সুদর্শনদা নেই।

চা দিতে কোন বিভাগে গেছেন। দেখলাম ডালিমতলায় নিরুদ্দেশ ঘরবাড়ির ভাঙ্গা ইটের ওপর বসে নতুন দুই মুখ বসন্তের বাতাসে কাপে কাপে খুনসুটি করছে। বুঝলাম ওরা কাপল। ভারি ভালো লাগল। কিছুক্ষণের জন্য নিজেকে বিরহী যক্ষ মনে হল- কর্তব্যে অবহেলার পরিণামে বেদনা-ঘন কালো থোকা থোকা আঙুরের মতো আকাশে উড়তে। ঠিক বর্ষাতে পারছে না। ওদের কাপে কি সুন্দর চা-পাতা দিয়ে গেছে সময়। আমার জল গরম হয়ে কালো ঘন বেদনাতে মেলাচ্ছে। সুদর্শন দা আজ এখন আর না ফিরুক আমি ফিরছি। কিস্তির সাইকেলটা ধরে ধীরে ধীরে ঘরমুখো হলাম। পেছনে পরে রইল তোমাদের অলকা হতে রামগিরি। আমার তো

লেনিনপুর হতে লাসকা।…..
শীত ছেড়ে গেছে বহুদিন
গাছেরা একা হয়ে আছে
একে অন্যের দিকে তাকিয়ে দেখে
কে কি পেল! কার বুকে কি ফুল ফুটল!
শুকনো পাতা পুরানো দুঃখের মত মচমচে হয়ে উড়ে যেতে চায়
বাতাস নির্বিকার।
যে পাখি যে ডালে বসে বছর বছর
অতীতাশ্রয়ী চোখও তারে খুঁজে পায় না
অথচ আমি দিন-মাস-কাল সেজে বসে আছি
পিঠের মধ্যে সমস্ত রোমকূপ জাগিয়ে- বসন্ত আসবে একবার ছুঁয়ে দেবে।