সুমন গুণ

কবিতা, আমাদের জীবন থেকে সরে গিয়ে, আবার, জীবনেই ফিরে আসতে শেখায়। সুচারু এই কথাটি লিখেছিলেন Robert Lynd, ‘An Anthology of Modern Verse’ বইয়ের একটি ভূমিকা কথায়। তাঁর আরও, এবং সমান তাৎপর্যপূর্ণ একটি ভাষ্য ছিলঃ দ্বিতীয় প্রত্যাবর্তনটি না ঘটলে, প্রথমটির কোনো মর্যাদা নেই।
যখন প্রথম পড়েছিলাম, বারবার ভেবে ক্রমশ বুঝতে চেষ্টা করেছিলাম কবিতা, কীভাবে, জীবনের জন্য এই দুর্নিবার টান টান রচনা করতে পারে। পছন্দের বইয়ের সঙ্গে, খুলেছি সদ্যকবিতার সংখ্যাও, আবার নতুন করে পড়েছি এমন অনেক কবিতাও, যা আমার নিজের লেখালেখির শুরুবেলায় উতরোল অভিজ্ঞতা হয়ে আছে।
এবং, টের পেয়েছি, সেইসব অনতিক্রম্য উচ্চারণ থেকে তৈরি হচ্ছে এক ঘোর, এক চঞ্চল বিপর্যয়, আমার এবং আমার সঙ্গে সম্পর্ক আছে যা-কিছুর, তার মধ্যে গড়ে উঠছে এক আসক্ত উচাটন।
বাংলায়, এই মুহূর্তে, এমন কবিতা আর দুপ্রাপ্য নয় যা এইরকম অভিজ্ঞতায় আমাদের পৌঁছে দিতে পারে। গত দুদশকে যাঁরা লিখতে শুরু করেছেন তাঁরা উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছেন বহুমাত্রিক বাংলা কবিতার এক ঈর্ষণীয় ঐতিহ্য। ঠিক আগের যে-দুটি দশকের কবিদের সঙ্গে মেজাজের দিক থেকে তাঁদের মিল, তাঁরাই বাংলা কবিতায় অনপনেয় মোচড় দিতে পেরেছেন। কূটতার ঐতিহ্য, যদিও, বাংলা কবিতায় শুরু চল্লিশের রমেন্দ্রকুমার থেকেই। জমিল সৈয়দ একবার রমেন্দ্রকুমার থেকে প্রবুদ্ধসুন্দর নামে একটি তীব্র সঙ্কলন প্রকাশ করার সাহস দেখিয়েছিলেন। সেই সংকলনের ভূমিকায়, প্রসঙ্গত জানিয়েছিলেন তিনিঃ আমরা ধরতে চাইছি- একটি ভিন্নতর কবিতার ক্রমাগ্রসর মানসভূমিকে- যার সূত্রপাত রমেন্দ্রকুমার আচার্যচৌধুরীর হাত দিয়ে। সাম্প্রতিক লেখালেখির জগতে যে বিপুল শূন্যতা পরিক্রমণ, দূরমার্গগামিতা ও কল্পনানির্মিত, তা রমেন্দ্রকুমারের কাছ থেকেই পাওয়া। …প্রকৃত অর্থে, মিটিমিটি তারার ভিড়ে পরিপূর্ণ রাত্রিনীলে একটি উজ্জ্বল ও সুস্পষ্ট ছায়াপথকে অবলীলাক্রমে লক্ষ করা গেল… একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তের দিকে বয়ে যেতে। যার সর্বাগ্রে, রমেন্দ্রকুমার আচার্যচৌধুরী ছাড়া আর কে-ই বা শোভিত হবেন।
নির্বাচনের অন্য, তুলনার ভঙ্গুর, একটি ব্যাখ্যাও দিয়েছিলেন সম্পাদকঃ খ্যাতি ও অখ্যাতির প্রশ্নে যাঁরা নিরুত্তর ও নিস্পৃহ, প্রাতিষ্ঠানিক শংসাপত্রকে যাঁরা কোনোদিন কাঙ্ক্ষ্যা করেন নি, জনসমাগম ও জনসংযোগ থেকে যাঁরা যোজনদূরত্বের অধিবাসী, তাঁরাই যে ঐ উজ্জ্বল আকাশগঙ্গাটিকে দীপ্যমান করে রেখেছিলেন, এমন একটি সুবিধেজনক বিশ্বাস কাজ করায় সঙ্কলনটিতে এমন অনেক লেখাই সমাদর পায় যা সঙ্গের বেশির ভাগ নির্মম কবিতার গুরুত্ব অনেকটাই নামিয়ে দিয়েছে। আবার অন্যদিক থেকেও, ঈষৎ ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন নজর এদিক-ওদিক পেয়েছেন এমন অনেকের কবিতাই একই দ্বিধায় গ্রহণ করা যায়নি। এমনকি রমেন্দ্রকুমারও তো আর এখন তত অপ্রচলিত নন। গোঁসাই ঘরানার নয়দশকেও একটি সমান্তরাল কবিতার ধারা- কবি ও পাঠকসহ- বেড়ে উঠেছে, যার মেধাবী সূচনা যে রমেন্দ্রকুমারই করেছিলেন, তা এখন একটি সুপ্রচারিত তথ্য।
রমেন্দ্রকুমার সম্পর্কে নানাসময়ে আমার ভাবনা আমি জানিয়েছি নানা জায়গায়। আগে-বলা কয়েকটি কথা আমি আজও অপরিবর্তিত জানাতে পারিঃ রমেন্দ্রকুমারের কবিতার লক্ষণ হল শব্দের তির্যক মোচড়ে, পরিসর আর বিরতিচিহ্নের পেশল ব্যবহারে বহুমাত্রিক উচ্চারণ। এটা, তিনি বিভিন্নভাবে করেছেন। কখনও প্রকাশ্য বিন্যাসে, কবিতাটি পড়ার প্রায় আগেই পাঠক তৈরি হয়ে ওঠেন এক বন্ধুর ও বিস্তৃত অভিজ্ঞতার জন্য। কোনো অনুমোদিত নির্ণয় থাকে না। প্রথমে, একটি গচ্ছিত প্রসঙ্গের রাশ শুধু খুলে দেন তিনি। প্রায়ই অনুচ্চ কৌতুক আর কথার ছলিক একটি উদ্বিগ্ন অনুষঙ্গ রচনা করে। যা, প্রার্থিত বিষয়ের দিকে মেলে দিতে থাকে বাহু, এবং যার অস্থির বৈভব বুঝে নিতে নিতে পাঠককে এগোতে হয়, ক্রমশ। যে-ঘরানার শুরু রমেন্দ্রকুমারে, নব্বই দশকের আগে পর্যন্ত তার একটা সর্বাত্মক গতিশীলতা ছিলো। গত দশকের শেষে কৃষ্ণনগরে আয়োজিত সক্রিয় ও আত্মবিশ্বাসী কবি-সম্মেলনের কথা কোনোদিন ভোলা যাবে না। আমার আয়ত্তে গত কুড়ি-পঁচিশ বছরে প্রকাশিত কবিতাগুলির তালিকা ছাপিয়ে দিলেও টের পাওয়া যাবে নব্বইয়ের অব্যবহিত ঐতিহ্য কী বিপুলভাবে বিচিত্র, সুদূর ও জটিলঃ স্মৃতি বিস্মৃতির চেয়ে আরও বেশি, ব্যান্ডমাস্টার, জলে স্থলে অন্তরীক্ষে, যুবকের স্নান, শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা, গৌরীচাঁপা নদী, বালক জানে না, হিমযুগ, ক্রীসমাস ও শীতের সনেটগুচ্ছ, মানুষের মূর্তি, লাল স্কুলবাড়ি, গামছা ও অন্যান্য কবিতা, চরাচর, আমাদের, হে বদ্ধ কাপালিক কলম্বাসের জাহাজ, প্রতিশ্রুতি সময় স্বদেশ, অন্নপূর্ণা ও শুভকাল, শব ও সন্ন্যাসী, টেবিল, দূরের সন্ধ্যা, পাঠক, অক্ষরগুলি, একশৃঙ্গ অশ্ব, আলিবাবার দস্তানা, ঋক্ষ মেষ কথা, সময়, সবুজ ডাইনি, সাক্ষাৎকার, এই দেশ দারুহরিদ্রার, টক আঙুরের কথা, চটি ছুরি আগুন ও প্রার্থনা, চিরহরিৎ অরণ্য অঞ্চল, এই স্যানাটেরিয়ামে শব্দ হয় গান হয়, অষ্টবসুর বিভা, ভবিষ্যৎ, গাঁয়ের নাম পরব, অবিদ্যা, ব্রহ্ম ও পুঁতির মউরি, জলতরঙ্গ, নীল ব্যালেরিনা, জলপাই কাঠের এসরাজ, সমাচার দর্পণ, মাতা ও মৃত্তিকা, অধিবাস মণিকর্ণিকা, মেঘবর্ণ রাখাল, বর্ষাতি নেই, ব্যক্তিগত স্মৃতিস্তম্ভের পাশে, ছাইফুলস্তূপ, ধরে রাখতে চাই, সূত্রধারের স্বীকারোত্তি, মৃত্যুঞ্জয়, বাঁশফুল ও এইসব নির্জনতা, শুভেচ্ছাসফর, বিজ্ঞাপনের মেয়ে, অন্ধকার প্রিয় স্বরলিপি, হে নিদ্রাহীন, শ্রাবণশ্রমিক, জন্মবীজ, পাখিওয়ালার ভাষা, শিকল আমার পায়ের গন্ধে, অন্ধকারের নৌকো, অসমাপ্ত রূপ, অন্যযুগের সখা, পরীর জীবন, যাত্রামন্ত্র, আঁধার জননী, রৌদ্রদেবতা, অন্ত্যকালকথা, সহ্য করো, বাংলাভাষা, নিরুক্ত বর্ণ, কলা বৌ, অসম্পূর্ণ জলরেখা, পাঠ/ভারতবর্ষ, তোর মুখ দেখতে চাই, ধাত্রিকাহিনী, দক্ষিণবাংলার জন্ম, মানুষের জন্য, ক্ষেত্রজ ভারতবর্ষে, চৈত্রের নলকূপ, শব্দভেদী, সহচর, উজানের টানে, বোধ, মাতৃভাষার, সহজপাঠ, চন্দনপিঁড়ি, শ্বাসাঘাত তাঁতকল পুরনো হরফ, হীরকজন্ম, ভূভারত সুধাময়, সীজারিয়ান ও অন্যন্য কবিতা, নিশীথমুরলী, সমুদ্রের বিস্তারের মত তুমি।
এমন বৈভব যে-দশকের শিয়রে, দশক শেষ হবার মুহুর্তেও, নানা গোত্রেতা বিকশিত হয়েছে। দুরূহ ও অনিশ্চিত উত্তেজজনায় আচ্ছন্ন হয়ে উঠেছে এই সময়ের কবিতা, নানা ভাবে।
নিন্দাসুখ দিই আমরা সকলকে। সুযোগ বাড়িয়ে দিই হাতে
তোমরা এই নিয়ে থাকোঃ সুখে থাকো ম্যাক্সিপরা বউয়ের কেচ্ছায়
অফিসফেরত ঐ ডানাকাটা বউটির চোখের তলার কালি থেকে
কাহিনী খামচিয়ে নাও, দাঁতে-কাটবার-মত তবু কিছু পাচ্ছে না তেমন
অক্ষরবৃত্তের বুনেটি থাকলেও যশোধরা রায়চৌধুরীর এই কবিতাতেও আছে তাঁর চেনা কথাবলার ধরন। ঘটনার একটা বিন্যাস থাকেই তাঁর কবিতায়, ছব্দের টানেও তা ধেয়ে আসে, ম্যাক্সিপরা বউয়ের কেচ্ছা বা বউটির চোখের তলার কালির মত টুকরো একটি কৌণিক স্বাচ্ছল্য আনে।
কাহিনির এই গমক রূপক চক্রবর্তীর কবিতারও একটি নাছোড় বৈশিষ্ট্য। কখনো কৌতুকে, কখনো রাগে বা আবেগে দ্রুত তাঁর কবিতা।
ওপাশে কে যেন জন্মদিনের সাঁইত্রিশ ধাপ অন্ধকারের নীচে চুপ করে
বসে সিগারেট খাচ্ছে আর দেখছে অস্পষ্ট স্রোতে আনন্দের অক্ষর
ব্যবহার। তন্মূমূর্তে, সিগারেট নাড়তেই, এহেঃ ছাই পড়ল-
কে খাচ্ছ কে খাচ্ছ সিগারেট। ওকে অ্যাশট্রে দাও।
ছাই ছাই জীবন উড়ে উড়ে পড়ছে।
জীবনস্মৃতিতে এত ধুলো মানায়!
এখানে আছে কৌতুকের তৎপর দাপট। কে খাচ্ছ কে খাচ্ছ… তে এক ঝলক নাটকীয়তাও ধাক্কা দেয়, আবার শেষ লাইনটির বিপরীত দার্শনিকতায় তা আরও সচকিত হয়ে ওঠে।
অক্ষরবৃত্তের নিরুপদ্রব বিন্যাসে কবিতা লিখতে পছন্দ করেন সুদীপ্ত মাজিও। ভেতরে-ভেতরে থাকে চকিত ও উচ্ছ্রিত মোচড়ঃ
যে নক্ষত্র, নীহারিকা আজো আমাদের চোখে বিভা রাখে
প্রকৃতপ্রস্তাবে হয়ত, ষোল-শ বছর আগে
তার ডানা নষ্ট হয়ে গেছে
তৎপর অথচ মগ্ন দীপঙ্কর বাগচীর কবিতা। যা বলার, দুর্মূলা ইঙ্গিতে জানাতে পারেন তিনি। তাঁরও প্রিয় আশ্রয় অক্ষরবৃত্ত। উচাটনহীন এই ছন্দে তিনি সরল দাক্ষিণ্যে কথা বলেন। প্রায়ই রচনা করেন সচ্ছল কিছু ছবিঃ
পরীরা ডেকেছে তাকে শহরের আশেপাসে রাত
নেমে যায় আজ বড়ো, ঘন রঙ ছড়িয়েছে পাশে
কারা আসে স্বপ্ন নিয়ে কারা ভাঙে স্বপ্নের দেওয়াল
একা নদী চলে যায় ভাঙা আয়না জোড়া দিতে দিতে
কথা জানানোর ঝোঁক, অসরল উদ্যমের সঙ্গে চেহারা পায় নাসের হোসেনের কবিতায়। দ্রুত উদযাপনে শেষ পর্যন্ত গড়িয়ে যাবার ডৌল তাঁর কবিতার একটি চেনা ধরন, যা একই সঙ্গে দৃঢ় ও গতিময়ঃ
দূরদূরান্ত থেকে উড়ে আসতে থাকে পাখি, পাখির পালকের
সুদৃশ্য বিভা, সেই বিভার মধ্যে সহস্র জন্তুর থাবার ছোঁয়া-
নাসেরের এই কবিতাটি গদ্যে লেখা। গদ্যেও অনেকেই লিখছেন এই সময়, তবে মোটামুটি মাপা ছন্দেই বেশি লিখতে চাইছেন এখানকার কবিরা। একজন আলোকিত অগ্রজের প্রত্যক্ষ বা লুকানো প্ররোচনায় তাঁরই মতো ঘন চাতুরির কবিতা লেখার ঢলও নেমেছে গত কয়েক বছরে, একথা মনে হচ্ছে অনেকেরই। মনে হচ্ছে, কিন্তু একই কামনায় লিখে সে-কথা জানাচ্ছেন না কেউই। এ বড়ো বিপর্যয়ের পালা চলছে বাংলা কবিতায়। বিষয়টা আরও বেশি জটিল হয়েছে এই কারণে যে, যাঁরা এই কাণ্ডটি করছেন তাঁরা প্রায় সবাই ছন্দে নির্ভূল, গড়নে পরিপাটি স্বাচ্ছল্য আছে তাঁদের কবিতার, কিন্তু পড়ার সময়ের মন-কেমন-করা মোহ পড়ার পরে খুঁজে পাওয়া যায় না। বাংলা কবিতা এখন এতটাই ভরে উঠেছে যে, ঈষৎ কাণ্ডজ্ঞান আছে, কবিতা-টবিতা পড়েন, কবিদের সঙ্গ পান আর মকশোবিদ্যা জানেন- এমন যে-কেউ চাইলে পাঠযোগ্য, স্বাদু একটি কবিতা বানিয়ে ফেলতে পারেন। এমন দুএকজন সবসময়েই ছিলেন, কিন্তু আশির মাঝামাঝি বা শেষ থেকে কারও কারো ব্যবহারেরও দাপট এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে এক প্রতারক মনষ্কতাকে মর্যাদা দিল, নানা বিপরীতমুখী ডালাপালা নিয়ে যা স্বীকৃতিও পেয়েছে।
যাই হোক, সবাই নিশ্চয়ই এই আত্মমর্যাদাহীন অধিকারে তৃপ্ত হতে পারেন না। যাঁরা পারেন, তাঁদেরও সুদূর ব্যক্তিত্ব কখনও কখনও ধরা পড়েই। এই দুরকম প্রবণতার কবিতা নিয়েই সম্পূর্ণ নয়ের কবিতা।
যে-ছন্দেই লিখুন না কেন, এই সময়ের তরুণতর কবিরা কবিতায় কথাবলার অনারোপিত ঝোঁক রাখতে ভালোবাসেন। পৌলোমী সেনগুপ্তের মাত্রাবৃত্তে লেখা এই কবিতাতে ছন্দের বিশেষ দোলাটিকে একেবারে না এড়িয়েও আছে সংলাপের নৈকট্যঃ
খুশি জ্বলে ওঠে রাজশ্রী তোর বাড়ি
মার ঘরে তবু এখনো নেবানো আলো
ফার্স্ট ডিভিশান হলে এই ব্যতিটাই
দশগুণ হয়ে আনন্দে লাফ দিত।
পুরো গদ্যটানেই মউলি মিশ্রের কবিতাও, ঈষৎ রহস্যকৌণিকে, এভাবে কথা বলেঃ
তোমার ঘরে ঢুকে তোমার বই-এর পাশে তোমার কলম,
তোমার সাদা কাগজ, নীল চিঠি
তোমার দৃঢ় ডায়েরির পাশে বসি নিবিষ্ট, তোমার হয়ে, কয়েকমুহূর্ত
ঘামমুকুরের ধোঁয়া তোমার শরীর থেকে মুছিয়ে দিয়ে বলি আস্তে আস্তে
এবার গ্রীষ্মে তোমাকে অসময়ের মৌসুমী এনে দেব
আরেকরকম মজা করেছেন সন্দীপ চট্টোপাধ্যায়, কথাচ্ছলেই, ছন্দের প্রকাশ্য আশ্রয় নিয়েওঃ
শ্যামের স্তাবকেরা শ্যামের অনুচর
তারাই সব ঘাট নিয়েছে ইজারায়-
তোমার যত বাঁধা গোপন খেলা বুঝি
কখনও বলব না কখনও বলব না।
বলব না বলব না বলেও সন্দীপ বলেই দিয়েছেন খুলে এই সময়ের বাংলা কবিতার ঘাটদখলের প্রকরণ, স্তাবক-অনুচরদের নিয়ে সন্ধানী শ্যামগোঁসাইয়ের আগ্রাসী মাতব্বরি।
রোশেনারা মিশ্রর কবিতায় এই মজা সবসময়ই তির্যক তা়ৎপর্য পায়। তাঁর কবিতার আলদা কোনো অংশের দিকে বিশেষভাবে তাকানোর মানে হয় না, গোটা কবিতাটাই শুরু থেকে শেষ এমনভাবে অবধারিত থাকে যে হঠাৎ কোথাও থামা যায় না। গঞ্জের নাম হলদী নদী, মেয়েটির নাম ভুল- এমন অবাক-করা নাম ছিল তাঁর একটি কবিতার, মনে আছে।
বেশ কিছুদিন কোনো কবিতা পড়ছি না অর্ণব সাহার। তাঁরই সমসাময়িক শাশ্বত গঙ্গোপাধ্যায়ও প্রধানত নীরব ছিলেন। সমরেশ মুখোপাধ্যায়, রুদ্র পতি, আবীর সিংহও তাই। বিপ্রতীপ দে, সমীর মজুমদার, সার্থক রায়চৌধুরী, সাম্যব্ত জোয়ারদার, বাপ্পাদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায়, সুবীর মণ্ডল, অগ্নিবর্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়, অহনা বিশ্বাস, জয়ন্ত ভৌমিক, অয়ন চক্রবর্তী, অনির্বাণ বন্দ্যোপাধ্যায়রাও খুব উচ্চকিত নন। কখনও কোথাও তাঁদের অপ্রতিরোধ্য একটি-দুটি কবিতা পড়ার সুযোগ পেলে উৎকর্ণ হয়ে উঠে। সম্প্রতি মেঘপিঞ্জর শিরোনামে অনির্বাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের চারটি কবিতা পড়লাম, মিশ্রবৃত্তের নির্মম সৌজন্য রক্ষা করে লেখা অর্থময় চারটির লেখা। প্রসুন ভৌমিক, বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভাস রায়চৌধুরী আর মন্দাক্রান্তা সেনের কবিতা সম্প্রতি পড়ার সুযোগ ঘটেছে অনেক বেশি। মন্দাক্রান্তার সুঠাম ছন্দবিন্যাস আর শব্দের কচিৎ মোচড় খেয়াল করার মতো…।
দিগন্তের অল্প একটু উপরেই ঈশ্বরের মুখ
জমে আছে, পৃথিবীতে নামতে চাইছে, অথচ কী ভয়
দুজনের মধ্যবর্তী জলবায়ু বড় অসম্মত
অসম্মত শব্দটির মতোই বহুতল একটিমাত্র শব্দে রূপান্তরিত কবিতা পড়েছিলাম সুমনা সান্যালেরঃ
শহরের তাঁজে তাঁজে মেঘ জমে, নৈশ সংক্রমণে
মেয়েটি সজল হয়, মফস্বলী ছেলেটিও
দাবি করে প্রণয়স্বভাব, রাত এসে
ছুঁয়ে যায় এই গান, আস্ত জনপথ
শব্দটি, বাহুল্য বলা, সংক্রমণে।
কবিতায় সাবলীল একটা ধরন বজায় রেখেও বিভাস রায়চৌধুরীর কবিতা ভেতরে ভেতরে নানা ঘূর্ণীতে ভর্তি থাকে। নানা প্রবণতাকে একই সঙ্গে ধারণ করতে পারেন তিনিঃ
যে কবিতা কেঁদেছে অনেক
তার পাশে বসে থাকলাম
দশক দশক পার… তুমি।
দুঃখী মেয়ে, বাংলার গ্রাম।
হিন্দোল ভট্টাচার্য কবিতায় অশ্বরবৃত্তের স্বাভাবিক চাল বজায় রেখেই কথা বলতে চান, সাধারণত। শব্দ ও ছন্দের স্বাভাবিক গতিময়তার মধ্যেই থাকে নানা মোচড়ঃ
আমি জানি তার মুখ সরল আধারে ঢাকা, ভিতরে প্রান্তর
শতাব্দীবিহীনভাবে পড়ে আছে, তীক্ষ্ন হেঁটে গেছি
মেঘের গ্রীবার নীচে পাখির ঝাঁকের মত তাই…
সে রাখে চোখের মধ্যে দুটি হাত, শান্ত আকাশের।
শ্বেতা চক্রবর্তীর কবিতা এক মেধাবী ও উ়ৎসুক মনের রক্তমাংসময় পর্যটন। ছন্দে তাঁর স্বচ্ছন্দ দখল, যা তিনি কাজে লাগান তাঁর ইচ্ছার নানা প্রকরণকে মাত্রা নেবার জন্য। গ্রহণ কবিতায় যেমনঃ
দূরের ঈগল তুমি- উড়ে যাচ্ছ কোনমতে
আমি দেখছিলাম
যতদূর খুঁড়িয়ে গিয়েছ
সেখানে ঠেকিয়ে মাথা
চেটে নিচ্ছি যাবতীয় ধুলো
এই মেধার বুনন গড়ে ওঠে অংশুমান করের কবিতাও। তাঁর কবিতাও গঠনের দিক থেকে খুব ঘোরানও পথ ধরে চলতে চায় না, কিন্তু বলার দার্ঢ্য আর দাপট তাঁর কবিতাকে শাণিত করে তোলেঃ
এগিয়ে দিই
জলের দিকে এগিয়ে দিই…
একদিন পরে এসে
আমাকে পাবেনা
ছন্দে যেমন, তেমনি গোটা গদ্যযাপনেও কৌণিক সঞ্চার ঘটিয়ে দিতে পারেন চিরঞ্জীব বসুঃ
আমাদের বন্ধুদের মধ্যে কানামাছি একটি অত্যন্ত প্রিয় খেলা
আমি বন্ধুর চোখ বেঁধে দিই বন্ধু লুকিয়ে পড়ে বন্ধুর বন্ধু
থেকে। আমি চোর হই বন্ধু পুলিশ।…
এইরকম করে কবিতাটি ক্রমশ জটিলতর মজায়, নিঃশব্দে, উন্মেচিত হয়ে ওঠে।
জটিলতার প্রসারণশীল ধরন সব্যসাচী ভৌমিকের কবিতারও বৈশিষ্ট্য। গদ্যের বিন্যাস যখন খুলে রাখেন তিনি, তখন তা আরও ছড়ানো মাত্রা পায়ঃ
সেই কবে পেতে রাখা ফাঁদ টপকাতে গিয়ে
ঢুকে পড়েছিলাম আরো অন্ধকারে
তারপর শুকনো পাতার রাশি সরিয়ে উঠে দাঁড়াতেই
আলো আর অন্ধকারের ধারণা
জড়িয়ে গেল মাথার ভিতর, তখন থেকেই
এক জল থেকে অন্য জলের মধ্যে আমাদের ডুবসাঁতার
এইরকম গদ্যজটিল ধরনেই সপ্রতিক ছবি বুনে ওঠে রজতেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের কবিতায়ঃ
একদিন মধ্যাহ্নে
নক্ষত্র-সমুদ্রের পাশে এসে দাঁড়ায়
একটি কৃষ্ণকায় বাইসন
তাঁর চোখের সামনে প্রসুতি সমুদ্রের ফুলে উঠা সামুদ্রিক পেট
পিনাকী ঠাকুর অনেকদিন থেকেই লিখছেন তাঁর নির্জন ব্যাকরণে, তবে গত কয়েক বছরে তিনি আলোকিত হলেন। শিবাশিস মুখোপাধ্যায়ের কবিতা এই সময় খাত পালটালো, শব্দ আর ছন্দের ঝকঝকে দাপটে তাঁর কবিতা মোহিত করতে জানেঃ
ফুরফুর বাতাস নাচে গৃহস্থের পকেটে পকেটে
জামা কাচলে দেখা যায় ডি-রোয়ের দুখানা টিকিট
জ্যোৎস্নারাতে বনে গেলে ভরা আসরের তাল কেটে
পলেস্তারা খসে গিয়ে দাঁত বার করে হাসে ইট!
এই মুহূর্তের কবিদের আলোকিত প্রাপ্তির দিকে সর্বস্ব নজর- এমন এক সমবেতপ্রায় নির্ণয়ের জবাবে এই সময়েরই এক কবি সহাস্যে জানিয়েছিলেন একদিন, এক স্বেচ্ছাচারী আড্ডায়ঃ এই প্রবণতার কারণ তিনদশকের বামফ্রন্ট শাসনের পাইয়ে-দেবার রাজনীতি! নিছক মজা করার জন্যই বলা, কিন্তু একজন-দুজনের চকিত মনোযোগও পেয়ে গিয়েছিল কথাটি। সমাজতাত্ত্বিকদের সঙ্গে কবিরাও প্রসঙ্গটি নিয়ে খেলে দেখতে পারেন।
এই সময়ের কবিবন্ধুদের উদ্দেশে, সবশেষে, আমার কয়েক টুকরো কবিতার গমকঃ
১.
স্কুল থেকে বাড়ি ফিরছে অনুরাধা নামের মেয়েটি,
কী করে জানলাম ওর নাম? নীল-পাড় শাড়ি
যাঁহাতে একটু তুলে, পা টিপে টিপে, ডানহাতে
সাইডব্যাগ সামলে একা যেভাবে সে হেঁটে যাচ্ছে পিছল রাস্তায়-
এই বিকেলে, এই মেঘলা, ভিজে আর দূরের বিকেলে

আমার যে কেন দেখে মনে হলো স্কুলে ওকে শাস্তা দিদিমণি
রোল-কলে এভাবে ডাকেনঃ ১২, অনুরাধা, কাল আসোনি কেন?…
২.
কলকাতা থেকে কত দূরে
এই বাড়ি, এই গাছ, যে-মেয়েটি ঘুরে
আমাকে দেখছে, তার চাদরে যে-আলো
আমাকে এ-শহরের ঠিকানা জানাল

হয়ত অনেকদিন পরে অন্য কোনও
শহরের পাশ দিয়ে যেতে যেতে হঠাৎ কখনও
চোখে পড়বে সামান্য রাস্তায়
বিকেলের আলো এসে পড়েছে সে-মেয়েটির গায়

আবার আমাকে দেখে হাসবে সে, অনেকদিন পরে,
চলে যেতে যেতে আমি বলব আবার কোনও দূরের শহরে…