দেবায়ন চৌধুরী


শুনেছি আমার ঠাকুরদা দেশ ছেড়ে এসে আসামে চা-বাগানে চাকরি নিয়েছিলেন। তারপর চলে আসেন কোচবিহারে। নুন আনতে পান্তা ফুরোনোর যোগাড়। স্কুলে করণিকের কাজ জুটিয়ে কোনওক্রমে দিন কাটানো। ঠাকুরদা যেদিন মারা যান, সেদিন রাতে কচুর লতি খেয়েছিলেন। আর হ্যাঁ, সিন্দুক থেকে বেরিয়েছিল প্রচুর লটারির টিকিট। কোনও নম্বর মেলেনি কখনোই…


বাবা ছিল বড়ো ছেলে। দীর্ঘদিন যৌথ পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়েও আমাদের ছাড়তে হল বাড়ি। পুকুর লাগোয়া যেখানে আমরা ভাড়া থাকতাম, মা ভয় পেত খুব। একমাত্র ছেলে যদি হাঁস চলার পথ ধরে জলে গিয়ে পড়ে…

ভাড়াবাড়ি পাল্টে যায়। পাল্টে যায় ঠিকানা। নতুন জায়গায় গেলে প্রথম প্রথম খেলা নিতে চায় না। পরে ভাব হয়ে যায় কিন্তু ভাড়াটিয়া পরিচয় আর মোছে না। চাঁদার রসিদে ওরা নিজের মতো ভাড়াটিয়া কথাটি লিখে রাখে। আমরা খারাপ পাই না। সব অভ্যেস। শুধু পূর্ণিমা রাতে জ্যোৎস্না দেখতে দেখতে মনে হয় এই আকাশটা আমাদের নয়। এই বারান্দা আমাদের নয়। আমাদের শুধু বাড়িওয়ালার মুখে ‘আর রাখব না’ বলার ভয়।


অসমে আমার মামাবাড়ি। স্বাধীন দেশের নাগরিক হয়েও সর্বদেহেমনে অস্বস্তি। যেন ভুল জায়গায় থেকে যাওয়া কিছু মানুষ। অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে করতে ভালোবাসার বর্ণমালা ভুলে যাবার যোগাড়। এখন আবার অতীত খুঁড়ে কাগজ বের করতে হবে। সবাই প্রমাণ চায়। বেঁচে থাকার কষ্টের প্রমাণ অনন্ত নীরবতা।


কলকাতায় পড়তে এসেছি। মেসে থাকি। মাসি না এলে হোটেলে লাইন দিতে হয়। শীতের কুয়াশার মধ্যে দেখি ভাত ফুটছে তো ফুটছেই। মায়ের কথা মনে পড়ে খুব। বুঝে গেছি আর কোনোদিন বাড়ি ফিরতে পারব না। আমার ঠাকুরদা আর বাবার আলাদা দেশে বাড়ি—আমার অবশ্য তা নয়। কিন্তু আমার মেয়ে যে আমার ছেলেবেলার উঠোন দেখতেই পারবে না। ফ্ল্যাট হয়ে গেছে যে!


বরানগরে পুরনো দিনের এক স্কুল দেখেছিলাম, যার সামনে ঝরা পাতার পাহাড়। শীতের রোদ খেলা করছে ভাঙা সিঁড়িতে। খোঁজ নিয়ে দেখলাম এই অসামান্য দ্বিতল প্রাসাদ কোনও এককালে বাংলা মাধ্যমের স্কুল ছিল। গল্পের মতো ইস্কুলবাড়ি… ভাষা আর বাসা যে বড়ো কাছাকাছি!


এ বড়ো সুখের সময় নয়। শাসকের বিরুদ্ধে মানুষ নেমে পড়েছে রাস্তায়।

এদিকে পোড়া বাসের সামনে ফুলের শরীরের ছবি চোখ থেকে কিছুতেই যাচ্ছে না। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ কি শুধু অভিধানেই মানায়? জানি না। আমরা কেউ কারো কথা শুনি না। বহুস্বর আশ্রয় পাবে কোথায়?


হ্যাঁ প্রতিদিন ভয় পাই। ভাষা হারানোর। ভালোবাসা হারানোর। পূর্বপুরুষের দেশ ছাড়ার ট্রমা এখনও আমাকে ছেড়ে যায়নি। অবচেতনে এমনভাবে বসে আছে যে স্বপ্নে ফিরে ফিরে আসে। ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ডরায়। সবকিছু স্বাভাবিক হতে কত সময় লাগবে ঈশ্বর জানেন। নিজের মনেই হাসি। উদ্বাস্তুর আবার ঈশ্বর থাকে নাকি? সেও তো পালিয়ে পালিয়ে বেড়ায়!