অ্যালবার্ট অশোক

বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়। আমাদের পরের প্রজন্মের কাছে বাংলার পরাম্পরা ও ঐতিহ্য পৌঁছে দেওয়ার কাজ অনেক আগেই বন্ধ করে দিয়েছে সরকার। আমরা পাশ্চাত্য শিল্পের জন্য মুখিয়ে থাকি। আসলে মুখিয়ে থাকি পাশ্চাত্যের জন্য নয়, মুখিয়ে থাকি রোজগার ও ভালো জীবিকার জন্য। সত্যি হোক আর মিথ্যে হোক, আমাদের ভাবনা পশ্চিমী শিল্প সংস্কৃতি অধিক অর্থোপার্জন করাতে সক্ষম। প্রতিষ্ঠা দিতে সক্ষম। তাই উপনিবেশিক সংস্কৃতি, ভাষা আমাদের অস্ত্র। নিজের দেশ যখন ভাত দিচ্ছে না স্বাভাবিক বিকল্প ব্যবস্থা ভাবতেই হয়। ফলে আমাদের এই অবিভক্ত বাংলায় আমাদের পূর্বপুরুষরা যতই পথ দেখিয়েছেন তাদের সে পথ আমরা চিনতে চাই না।

বিনোদবিহারী, আমার মনে হয়েছে, অবনঠাকুর ও নন্দলালের চেয়েও অধিক শক্তিশালী চিত্রশিল্পী, যিনি সরাসরি বাংলার মাটির গন্ধতার ছবিতে তুলে এনেছিলেন। তাঁদের অনেক পরে জয়নুল আবেদিন (১৯১৪-১৯৭৬), কামরুল হাসান(১৯২১- ১৯৮৮), এস এম সুলতান(১৯২৩ -১৯৯৪) প্রমুখ বাংলার নিজস্ব রূপ বন্ধন বা রূপ নির্মাণ করতে যথেষ্ট পরীক্ষা নিরীক্ষা করে গেছেন।

অবনঠাকুর, ঋণ করে এনেছেন অজন্তা বা বুদ্ধ সংস্কৃতির কুয়াশা মাখা ধোওয়া ধোওয়া ছবি। নন্দলাল বসু অনেকটা অবনঠাকুরের মতো অজন্তার রূপ ব্যবহার করে গেছেন। যেমন ভাদোদরার পৌরাণিক গল্পের উপর ফ্রেস্কোগুলি। মহাত্মা গান্ধীর নির্দেশে ১৯৩৮ সালে হরিপুরা ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসের মিটিংয়ের জন্য যে বিশেষ ছবির প্যাটার্ন নন্দলাল করেছিলেন তাতে বাংলার পরাম্পরা বা ঐতিহ্য ছিল। আমাদের ঐতিহ্যে, পরাম্পরাতে বাংলাদেশের সরা চিত্র, পটচিত্র ইত্যাদিতে বাংলার রূপ ছিলই। সেগুলিকে একটু উন্নত করতে গিয়ে শিল্পীরা পশ্চিমীকে টেনে না আনার দরকার হয় না।

১৯৩০-৪০, সময়টা এমন মন্দা যাচ্ছিল সারা পৃথিবী জুড়ে, মহাত্মা গান্ধীর পথে স্বাধীনতার সংগ্রাম, রবিঠাকুরের সাংস্কৃতিক পুনঃজাগরণ আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর, ওই রকম একটা সময় শান্তিনিকেতনের বৃত্তে শিল্পীরা নানা ভাবনায় ঐতিহাসিক প্রসঙ্গতায় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিবর্তন খুঁজছিলেন। Contextual modernism এবং the Bengal School of Art দু’টি এক আন্দোলন নয়। বেঙ্গল স্কুল অব আর্ট, অবনঠাকুর প্রাচ্যের ভাব ধারায়, পশ্চিমীকে বিসর্জন দিয়ে এক নতুন ভারতীয় বা বাংলা রীতি দৃশ্যকলাতে খুঁজেন। স্বদেশী শব্দটা ছিল প্রাণ।

প্রাসঙ্গিক আধুনিকতায় বা কনটেকচুয়াল মডার্নিজমে শিল্পীরা স্বদেশি হবেন, বা পশ্চিমী ভাব বিসর্জন দেবেন এমন মনে করতেন না। নন্দলাল বসু, রবিঠাকুর, রামকিঙ্কর বেইজ, এবং বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়ের কাজ প্রত্যেকের আলাদা আলাদা। তারা কোন চিহ্নিত ঘরানা, বা প্যাটার্ণ নিয়ে মাথা ঘামাননি। মাথা ঘাননি তাদের সামনে আন্তর্জাতিক কোনও আঙ্গিক বা আধুনিকতার কোন প্রভাব বা ছায়া। যদিও তখন অবনঠাকুরের আদর্শে বেঙ্গল স্কুল ঘরানা ও ঐতিহ্যের অনুসারক হয়ে অনেকেই কাজ করেছেন, কিন্তু শান্তি নিকেতনের এই মাস্টার শিল্পীরা ঐতিহ্যের আঙ্গিকের ধার না ঘেঁষে ভাবনার পিছু ছুটে স্বতন্ত্রতা নির্মাণ করেন।

বিনোদবিহা্রী মুখোপাধ্যায়ের জন্মের সময় থেকেই তাঁর চোখের সমস্যা ছিল। এই সমস্যা নিয়েই তিনি ছবি আঁকতেন, মিউরাল বানাতেন। ১৯১৯ সালে বিশ্বভারতীর আর্ট ফ্যাকাল্টিতে, কলাবভনে ভর্তি হন। তিনি তৎকালীন বিখ্যাত ভারতীয় শিল্পী নন্দলাল বোসকে শিক্ষক হিসাবে পান। এবং গুরু হিসাবে নোবেল জয়ী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে। এবং বন্ধু ও সহযোগী হিসাবে বিখ্যাত ভাস্কর রামকিঙ্কর বেইজকে পান। ১৯২৫ সালে কলাভবনে শিক্ষক রূপে যোগ দেন।

তাঁর অনুপ্রেরণা পেয়েছেন, জহর দাশগুপ্ত, রামানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায়ম কে জি সুব্রাম্মনিয়ম, বেওহার রামমনোহর সিং, সোমনাথ হোড়, রিতেম মজুমদার ও বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়। ১৯৪৯ সালে তিনি কলাভবন ছেড়ে নেপাল সরকারের কাঠমান্ডুর মিউজিয়ামের কিউরেটর হিসাবে যোগদেন। ১৯৫১-৫২ রাজস্থানের বনস্থলী বিদ্যাপীঠে শিক্ষকতা করেন। ১৯৫২ সালে মুসৌরিতে স্ত্রী লীলাকে নিয়ে একটা আঁকার স্কুল শুরু করেন। আর্থিক অসুবিধার জন্য স্কুলটা চালাতে পারেননি। ১৯৫৮ সালে আবার কলাভবনে ফিরে আসেন। ও সেখানকার প্রিন্সিপাল বা অধ্যক্ষ হন। ১৯৭৯ সালে তাঁর বাংলা লেখা আত্মহীবনী ‘চিত্রকর’ প্রকাশিত হয়।

১৯৪৭ সালে শান্তিনিকেতনের হিন্দী ভবনের যে বিশাল বিশাল মিউরাল বানান তাই তাঁর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বড় কাজ। বিষয় হিসেবে ছিল, মধ্যযুগের ভারতের সন্তদের জীবন। ঋণ করেছেন ইতালীর Giotto এবং জাপানী Tawaraya Sotatsu শিল্পীদের কাজ, অজন্তা ও মামল্লপুরম প্রভৃতি স্থানের ছায়াও আছে। মূলত পশ্চিমীর সাথে প্রাচ্যের মিশ্রণ ঘটিয়ে এক নতুন শিল্প ভাষা, উপস্থাপনা করাই ছিল তাঁর আঙ্গিক।

তিনি ক্যালিগ্রাফি, চিন ও জাপানী জলরঙের ধৌত কৌশল মুগল ও রাজপুতদের সময়কালের মিনিয়েচার পেইন্টিং, ঘণকবাদের ব্যবহার ও স্পেস তৈরি করা– ইত্যাদি শিখেছিলেন। ১৯৩৭-৩৮ সাল নাগাদ কয়েক মাস তিনি জাপানে ছিলেন কিছু জাপানী শিল্পীর সঙ্গে যেমন Arai Kampō র নাম উল্লেখ্য।

প্রাক স্বাধীন ভারতে বাংলার দৃশ্যকলার বিবর্তনে তিনি উল্লেখযোগ্য নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। সেই সময় বাংলায় শিল্প চেতনা ও আন্দোলনকে পুরাণো ঐতিহ্য দিয়ে নবজন্ম দেওয়ার চেষ্টা চলছিল (Bengal Revivalist School), বিনোদবিহারী সেই আন্দোলনকে এড়িয়ে অন্য একটি আরও আধুনিক ভাবনার আন্দোলন শুরু করেন। আগের গোষ্ঠীরা, পুরাণ থেকে দেব দেবী বা সাহিত্যের থেকে বিষয় আহরণপন্থী। বিনোদবিহারী সেই সকল এড়িয়ে রেখা, রং ও বুনট বা টেকচারের উপর জোর দিয়ে ছবিকে একটা মহত্বপূর্ণ দিক এনে দিতে চান। তার জীবনের ৫০ বছর জুড়ে তাঁর আঁকা ছবিতে এসেছে, নানা বৈচিত্র ও পরিবর্তন। তিনি মিউরাল থেকে কোলাজ murals to collage, উডকাট থেকে ক্যালিগ্রাফি, from woodcuts to calligraphy, জলরং থেকে তেল রং from watercolors, oil paint, কালি কলম থেকে ক্রেয়ন ও গ্রাফিক ink and crayons to graphics সবরকম মাধ্যম নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করেন।

তাঁর দুর্বল চোখের দৃষ্টি থাকা সত্ত্বেও তিনি প্রচুর জায়গায় ঘুরেছেন। এবং তিনি চোখে যা দেখেছেন, সে সূর্যমুখী ফুল হোক, কি শালুক ফুল বা হিমালয়ের পাহাড়ি দৃশ্য হোক, রং রেখাতে, টেকচারে তিনি সে দৃশ্য এঁকে ফেলতেন। চলচ্চিত্র নির্মাতা সত্যজিৎ রায়ের উপর তার গভীর প্রভাব ফেলেন। ১৯৫৭ সালে তিনি একেবারে অন্ধ হয়ে যান। ১৯৭২ সালে তাঁর ছাত্র চলচ্চিত্র নির্মাতা সত্যজিৎ রায় তার উপর এক তথ্যচিত্র তৈরি করেন নাম ‘ইনার আই’। ১৯৭৪ সালে তাকে পদ্মবিভূষণ পুরস্কার দেওয়া হয়। বিশ্বভারতী তাকে দেশিকোত্তম উপাধিতে ভূষিত করেন। ১৯৮০ সালে রবীন্দ্র পুরস্কার পান। ১৯৮০ সালে দিল্লীতে ৭৬ বছরে তিনি মারা যান।