debjani-sarkarদুর্বার সমন্বয় কমিটির অফিসে একতলায় ঘরে বসে তিনি৷ সামনের টেবিলে খোলা কমপিউটর৷ সেখানে এলাকার সব মহিলাদের  খুঁটিনাটি  তুলে রাখেন৷ তাঁদের অভাব অভিযোগের কথা শুনতে শুনতেই কখন যেন তিনি নিজেই পাড়ি দিলেন তাঁর ফেলে আসা অতীতে৷ ফ্ল্যাশব্যাকের মতো তাঁর চোখে ভেসে উঠল অতীতের সেই দিনগুলি৷ যখন  চরম অভাবের মধ্যে ছিল দিন গুজরান৷ ছেলের দুধ কেনার মতো টাকাও কাছে ছিল না ৷ শেষ পর্যন্ত ঘরের সিলিং ফ্যানটাও তাঁকে  বিক্রি করতে হয়েছিল৷ চরম অভাবই তাঁকে বাধ্য করেছিল দেহব্যবসার পথ বেছে নিতে৷ একটা সময় এই জীবন থেকে বেরিয়ে আসতে চাইলেও শেষ পর্যন্ত  পারেননি৷ যৌন কর্মীদের ওপর দিনের পর দিন পুলিশ, মাস্তানদের নির্যাতন তাঁর জেদ আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল৷ যৌনকর্মীদের সঙ্ঘবদ্ধ করে পুলিশ, মাস্তানদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি৷ লড়াই-এ সফলতাও পেয়েছেন৷ তিনি  ভারতী দে৷ ভারতের অন্যতম বড় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন দুর্বার সমন্বয় কমিটির সম্পাদক৷ যৌনকর্মীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা এই সংগঠনের এখন তিনিই প্রায় শেষ কথা৷ কর্মসূত্রে বহু দেশ-বিদেশ এখন তাঁর ঘোরা৷ শহরতলির অনামী একটি স্কুলে দশম শ্রেণির গন্ডি টপকানো একদা এই দেহব্যবসায়ীই এখন  বিদেশী অতিথি-অভ্যাগতদের  কাছে দুর্বারকে  উপস্থাপিত করেন৷ জীবনের বহু চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আসা ভারতী দেবী  তাঁর অভিজ্ঞতা ভাগ  করে নিলেন কলকাতা২৪x৭ –এর প্রতিনিধি দেবযানী সরকারের সঙ্গে৷

 নৈহাটির এক স্বচ্ছল পরিবারে আমার জন্ম ৷ আমি বড় হয়েছি যৌথ পরিবারে ৷ আমাদের পারিবারের আর্থিক অবস্থাও বেশ স্বচ্ছল ছিল৷বাবা-জ্যাঠারা সবাই চাষ-আবাদ করতেন৷সত্যি বলতে কি ছোটবেলায় কষ্ট কী জিনিস সেটা  বুঝিনি৷বুঝলাম বাবা-মা মারা যাওয়ার পর৷ওরা চলে যাওয়ার পর  সৎ দাদারাই পরিবারের হর্তাকর্তা ৷ আমার পাঁচ দাদার মধ্যে কেউই চাইত না বাড়ির মেয়েরা পড়াশুনা করুক৷ ওরা সবসময় চাইত বোনেদের তাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়ে দিতে৷কিন্তু আমি তাড়াতাড়ি বিয়ে করতে চাই নি৷হঠাৎ একদিন মেজদির বিয়ে ঠিক হয়ে গেল৷নি৷আমি যেহেতু বাড়ির সেজো মেয়ে ছিলাম তাই মেজদির বিয়ের পরই আমি বুঝলাম এবার আমার পালা৷তখন আমি ক্লাস নাইনে পড়ি৷মেজদির বিয়ের পর দাদারা আমার পড়াশোনায় বাধা দিতে শুরু করল৷ওরা আমাকে বইকিনে দিত না৷বাধ্য হয়ে আমাকে স্কুল ছাড়তে হল৷ আমার ইচ্ছা ছিল মাধ্যমিক পরীক্ষাটা দেওয়ার৷তাই পাড়ার এক বন্ধুর থেকে বই নিয়ে পড়তাম৷পরীক্ষাও দিলাম৷কিন্তু এইভাবে তো বইপত্র চেয়ে পড়াশোনা হয় না৷আমি জানতাম পরীক্ষার পরেই আমাকে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হবে৷আমার খবরের কাগজ পড়ার খুব নেশা ছিল৷ হঠাৎ একদিন একটা সংবাদপত্রে দেখলাম  সেলস গার্ল চেয়ে  বিজ্ঞাপন দিয়েছে৷তখন তো পরীক্ষা শেষ৷ ভাবলাম মাস তিনেক কী করব?  একটা চাকরী-বাকরী করলে অন্তত বিয়েটা আটকানো যাবে এটাই তখন মাথার মধ্যে ঘুরছিল তাই বিজ্ঞাপনটা দেখে ওদের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম৷ওখানে গিয়ে

BHARATI-02
নিজের অফিসে ভারতী দে

জানতে পারলাম কোম্পানিটা কসমেটিকস বিক্রি করে৷ইন্টারভিউতে আমি সিলেক্ট হয়েছিলাম৷ওরা আমাদের ২৬ জনকে ভাগলপুর পাঠাবে বলে ঠিক করল৷বাড়িতে এসে যখন বললাম চাকরী করতে বাইরে যাচ্ছি, কী অদ্ভুদ জানেন, তখন বাড়ির কেউ  আমাকে একবারও আটকালো না৷৷খুব কষ্ট হয়েছিল সেদিন৷রাগে কষ্টে বাড়ি ছাড়লাম ৷এই প্রথম বাড়ি থেকে এত দূরে৷জানিনা সেদিন কোথা থেকে এত মনের জোড় পেয়েছিলাম৷এখন ভাবলেই কীরকম গায়ে কাঁটা দেয়৷জানেন তো,  ওখানে গিয়ে  কসমেটিক্স বিক্রি করতে আমার একদম ভালো লাগতো না৷ওখানকার ছেলেরা আলতাওয়ালি , সিঁদুরওয়ালি বলে খ্যাপাত৷আমার খুব খারাপ লাগত৷এরপর একদিন আমার বাড়ি থেকে একটা পোস্ট কার্ড এল৷ তাতে লেখা ছিল, তুই সেকেন্ড ডিভিশনে পাশ করেছিস৷ব্যস৷ মাত্র এই কয়েকটা শব্দ৷ এতোদিন পর দাদাদের চিঠি তাও আবার মাত্র কয়েকটা শব্দ! আমি সেদিন এত ভেঙে পড়েছিলাম, বোঝাতে পারব না৷ ওই দিনের চিঠিটা আজও ভুলতে পারি নি৷

আমার জীবনে কত ঘটনা! কত আর বলব! কোথা থেকে শুরু করব আর কোথায় শেষ করব বুঝতে পারছি না৷যাইহোক এরমধ্যে ওখানে একজনের সঙ্গে আমি একটা সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ি৷উনি বিবাহিত ছিলেন৷কিছুদিন পরে আমি বুঝতে পারি আমার গর্ভে সন্তান এসেছে৷আমি একা কলকাতায় ফিরে আসি৷কত বছর আগেকার কথা৷তখন তো সবকিছু এখনকার মতো নয়৷ একা একটা মেয়েকে দেখে কেউ ঘর ভাড়া দিত চাইতো না৷অবশেষে একজন মহিলা আমাকে  ঘর ভাড়া দিয়েছিলেন৷ পরে জানতে পেরেছিলাম উনি চন্দননগরের যৌনকর্মী ছিলেন৷ওই সময় আমি খুব আর্থিক কষ্টে ছিলাম৷টাকা রোজগারের জন্য কিছু তো একটা করতে হবে৷ ভাবলাম নার্সিং শিখি৷কিন্তু সেটা শিখতেও তো টাকার দরকার৷আচারের প্যাকেট করা শুরু করলাম৷১০০০টা প্যাকেট করলে আড়াই টাকা পেতাম৷কিন্তু এতে কি আর চলে! তখন আমার এতটাই অভাব যে ঘরের সিলিং ফ্যানটাও আমাকে বিক্রি করে দিতে হয়েছিল সেদিন৷আমার আর্থিক কষ্ট দেখে এরপর একদিন ওই বাড়িওয়ালিই আমাকে ডাকলেন৷ ডেকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, এই পেশায় আমি আসতে পারব কিনা৷ সত্যি বলতে কি, তখন আমার কি করা উচিত আর কি উচিত নয় সেটা বোঝার ক্ষমতা আমি হারিয়ে ফেলেছি৷

(পরবর্তী অংশ আগামী সপ্তাহে)