তুষ্টি ভট্টাচার্য
তুষ্টি ভট্টাচার্য

পাগলের সঙ্গে আমার বরাবরের সুসম্পর্ক। দুনিয়ার যত পাগল চট করে আমার বন্ধু হয়ে যায়। তাহলে এটা ভাবার কোন কারণ নেই যে, রতনে রতনে বন্ধুত্ব হয়েছে! আমি মোটেই পাগল না। আমি আসলে পাগলদের নাড়ি নক্ষত্র সব জানি, বুঝি। এক রকম পাগল আছে যারা রাস্তা ঘাটে ছেঁড়া জামা পরে বা না পরেই ঘুরে বেড়ায় কিম্বা পাগলা গারদে থাকে। তাদের সঙ্গে অবশ্য একটা দূরত্ব থেকে যায় আমার। আসলে কামড়ে দিতে ভালবাসি তো, তাই কামড় খেতে মন চায় না। আরেক ধরনের পাগল আছে যাঁরা ধোপদুরস্ত জামাকাপড় পরেন, নিয়মিত দাড়ি কাটেন, দাঁত মাজেন, চুল আঁচড়ান, বিউটি পার্লারে যান, স্নান করেন, খান এবং নিশ্চিন্তে ঘুমোন। মানে যাঁদের ওই আগের দলে ফেলা চলে না আর কী! কিন্তু আদপে এঁদের মধ্যে এক একটি মহা পাগল ঘাপটি মেরে বসে থাকে। কীভাবে চেনা যায় এঁদের? আচরণে অবশ্যই। এঁরা আমাকে দেখলেই মিষ্টি করে হাসেন। তাঁদের হাসি দেখলেই আমি বুঝে যাই, আরেক পাগলের খপ্পরে পড়লাম আবার!
আমার দেখা এরকম পাগলদের মধ্যে সেরা পাগল আমার বাবা। মুখেচোখে অত্যন্ত ভাল মানুষ টাইপ, সাত চড়ে রা কারেন না। অথচ এঁর পাগলামির সমস্ত সাক্ষ্য প্রমাণ আমার কাছে মজুত আছে। প্রথমত ওঁর নিশ্চিত ধারণা যে তিনি গত জন্মে গিরিশ ঘোষ ছিলেন। আর সেই থেকে ক্যানসারের কারণে তাঁর এ জন্মেও গানের গলাটা তেমন খুললো না! দ্বিতীয়ত উত্তম কুমারের কাছে দিলিপ কুমার, অমিতাভ তো ছার, সিন কোনারিও ধারে কাছে আসে না। আর এ জন্মে তাঁর গলাটা যদি ঠিক মত খুলত, তাহলে উত্তমের লিপে উনিই সব থেকে ভাল গাইতেন। হেমন্ত, কিশোর কেউ ধারে কাছে আসত না। আর শ্যামলের ওই পুতুল নেবে গো… গানটা কিসস্যু হয় নি। মানবেন্দ্রকে তবুও ধর্তব্যের মধ্যে রাখা যায় – দোলে রাই দোলে ঝুলনায় ঠিকঠাক গেয়েছে। আর ইন্ডিয়ার সেরা ক্যাপ্টেন ধোনি টোনি না, এক এবং একমাত্র সৌরভ। সৌরভ চলে যাওয়ার পর থেকে ইনি ইন্ডিয়ার অপোনেন্ট টিমকে সাপোর্ট করেন সব সময়ে। গদ্দার কাঁহিকা! যাই হোক, এঁর কথা আর বাড়ালাম না। এঁর কথা বলতে গেলে পাগলদের মহাভারত আঠাশ কান্ডে শেষ হত।
এক চেনা ভদ্রমহিলা আছেন, মানে আমি যেচে চেনাচিনি করি নি কিন্তু, তিনি নিজেই নিজের জাত চিনিয়ে ছেড়েছেন আমাকে। কিছু কাজের কথার পরে তিনি আমাকে প্রশ্ন করলেন, ‘আচ্ছা কিভাবে শ্যাম্পু করব বলুন তো?’ আমার সহজ আর ছোট্ট উত্তর ছিল – ‘যেভাবে করে।‘ এতে আরও তেতে গিয়ে বলতে থাকলেন, ‘কিভাবে, কিভাবে??’ আমি তখন দীর্ঘসূত্রে গেলাম। কিছুটা সন্তুষ্ট হয়ে ঠেস দিয়ে বসলেন। কিছুক্ষণ কী যেন ভাবলেন। তারপর আবার প্রশ্ন – ‘আচ্ছা কিভাবে দাঁত মাজি বলুন তো?’ আমার তখন ঠকঠক করে দাঁত নড়তে শুরু হয়েছে। ভাবছি, এবার যদি কামড়ে দেয়!! কিন্তু উত্তর না দিয়ে উপায় নেই বলে আবার খুব লম্বা জ্ঞান দিয়ে গেলাম। এবার উনি সত্যিই সন্তুষ্ট হয়ে এক গাল হেসে উঠে দাঁড়ালেন। এরপর আমার ফোন নাম্বারটি চেয়ে নিয়ে সেদিনের মত চলে গেলেন। তারপর থেকে রোজ সকাল দশটা-সাড়ে দশটায় আমার নিত্য কর্মের মধ্যে ফোনে ওই শ্যাম্পু আর দাঁত মাজার পদ্ধতি বোঝানো ঢুকে পড়ল।
আরেকজন মহিলা আছেন, তাঁকে অবশ্য আমায় কিছু বোঝাতে হয় না। কারণ বোঝানোর সুযোগ আসে না। তিনিই কানের কাছে মিনিমাম ঘন্টা দেড়েক বকবক করে ক্লান্ত হয়ে চলে যান। সেদিনের মত আমি কালা হয়ে যাই তারপর। আরেকজন পুরুষ আছেন, যিনি খোনা গলায় কথা বলেন। চেহারাও তাঁর অসম্ভব রোগা। আর ওই কন্ঠস্বর আর রোগা চেহারায় খুব রেগে রেগে আমাকে হাত পা নেড়ে কার বিরুদ্ধে যেন কিসব বলে যান। মনে হয় গত জন্মে উনি স্বদেশী করতেন। তবে ইনি বেশিক্ষণ থাকেন না, যেমন অসম্ভব রেগেমেগে বলেন, তেমনই আচমকা একেবারে ঠান্ডা মানুষ হয়ে সরে পড়েন। ইনি এলে আমি দুর্দান্ত চার্জড হয়ে যাই। মনের ভেতরে হাজারে হাজারে আগুনের স্ফুলিঙ্গ ফুটতে থাকে। আরেকজন আছেন, যিনি অতি পন্ডিত মানুষ, মাঝবয়েসী। শুনেছি অতিরিক্ত জ্ঞানের ভারে তাঁর মাথাটা নাকি গেছে! আমি অবিশ্যি তাঁর মাথা মাথার জায়গাতেই দেখতে পাই, খুব শান্ত ভাবে আমাকে মাঝেমাঝে এসে মশলার গুনাগুণ বোঝাতে আসেন। আমি লক্ষ্মী মেয়ের মত শুনি। সব শেষে উনি বলেন, ‘কি সব বুঝেছ তো?’ আমি ঘাড় নাড়লেই উনি মিষ্টি হেসে চলে যান।
আর রাস্তার এক পাগলির কথা বলি। তার সঙ্গে আমার ভাব নেই। রোজ দুবেলা তাকে দেখি কখনো ছেঁড়া বস্তা বা ব্যাগের মধ্যে দুনিয়ার কাগজ বা কাপড় ভরে আপন মনে বকবক করতে করতে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। সে এমনিতে শান্ত থাকে। কেউ খেতে দিলে খায়, না দিলে খায় না। কিন্তু কেউ যদি ‘শিবু’ বলে ডাক দেয় ওকে, প্রচন্ড রেগে গিয়ে অশ্রাব্য গালিগালাজ করতে থাকে। লোকমুখে শোনা গেছে শিবু নামে ওর এক ছেলে ছিল, যে মরে গেলে ও পাগল হয়ে যায়। আর কিছু মানুষ এখনও ওকে ওর এই নিরাময় অযোগ্য ক্ষতে নুন ছিটিয়ে মজা নিয়ে যাচ্ছে। এই বর্বরতা দেখলে যেমন চোখে জল আসে, তেমন ওই পাগলির জন্য মায়ায় মন ভরে আসে। এরকম কত আঘাত সইতে না পারলে তবেই না মানুষ এমন উন্মাদ হয়ে যায়! আমরা আর কজনের খোঁজ রাখি!
শুনেছি পাগল না হলে নাকি কবি হওয়া যায় না। অথচ বাস্তবে দেখলাম কবিরা মোটেই পাগল না। সেয়ানার হাড়ে দুব্বো গজালে এক একজন কবির জন্ম হয়। আর তাদেরই মধ্যে যারা পিএইচডি সেয়ানা, তারা পাগলামির ভান করে মাত্র। আর আমরা আম আদমি তাদের সত্যি পাগল ভেবে বসি। কোন কোন কবি শুনেছি প্রেমে পাগল হয়ে গিয়ে টপাটপ কবিতা লেখেন। আবার কোন কোন কবি বিরহে লেখেন। এই প্রেম, বিরহর মত উপাদান তাঁরা রীতিমত খেটেখুটে কালেক্ট করেন। মানে প্রেম না করেই প্রেম করার মত, প্রেমে ব্যর্থ না হয়েও বিরহী সাজার মত একটা স্টেজে নিজেদের দাঁড় করিয়ে নিজের গায়ে প্রেমিক বা বিরহী মার্কা লেবেল সেঁটে দেন। এই লেবেল আবার সুবিধে মত ইধার উধার করে ফেলতেও তাঁদের জুড়ি মেলা ভার। আর কুচুটেপনায় তাঁরা সব সময়ে টপ, টপ অ্যান্ড টপ। এর সঙ্গে অবশ্য পাগলামির কোন সম্পর্ক নেই। তাই আমার সঙ্গে কবিদের ভাব নেই তেমন।
মানুষের মত পাগলের বাইরেও অনেক পাগল থাকে। তারাও দেখি আমার কাছে এসে হেসে হেসে গপ্প করে। আমাদের পাড়ার এক বিখ্যাত কালো পাগলা কুকুর আছে, যার কামড় বা তাড়া খায় নি, এমন লোক এ তল্লাটে কেউ নেই। সেও দেখি আমার কাছে এসে দিব্যি লেজ নেড়ে ভেউ ভেউ করে নিজের দুঃখের কিস্যা শোনায়। আমিও তেমনি মহা অমায়িক, চুপচাপ শুনে যাই। আরে কুকুর তো নাহয় মানুষের গা ঘেঁষা পাবলিক। সেদিন দেখি এক পাগলা গাধা দাঁত বের করে ইংরিজিতে গিটকিরি শোনাতে এল আমায়! আমি যত বলি, ওরে থাম, থাম… আমি এমনিতেই ইংরিজিতে ফেল করেছিলুম মাধ্যমিকে, আর গান বলতে সেই ফ্রক পরে হারমোনির পাঁজর টিপে টিপে ‘আলো আমার আলো ওগো’ এটুকু মাত্তর শিখেছি। তাই আমার বিদ্যেয় তোর ওই ধামার, তায় আবার ইংরিজিতে কুলোবে না। সে তো তবু কিছুতেই থামে না, খটাখট গেয়েই চলেছে, গেয়েই চলেছে। আমি তখন সহ্য ক্ষমতাকে চূড়ান্তে এনে ভাবলাম, এত কালের মুখ বুজে বোঝা বওয়া গাধা যদি আমাকে দেখে একটু গিটকিরি সেধে সুখ পায়, আহা পাক না! যা গাইছে গাক গিয়ে। আমি সোনা মুখ করে নাহয় না শুনি। আর তারপর যথারীতি বাঙালির জ্ঞান দেওয়ার বাসনা জেগে উঠল। আমি ওকে বললুম, ওরে শোন, তোর কোষ্ঠ সাফ হয় না বুঝতে পেরেছি। রোজ সকালে উঠে ঈষদুষ্ণ জলে এক গ্লাস ইসবগুল মেরে দিবি। তারপর দু তিনবার যাবি, আসবি, যাবি আসবি… ব্যাস্‌, দেখবি আর ডবল ধামার বেরচ্ছে না। আর একটা কথা – তোর ওই বিলিতি
কাগজ-টাগজ না, জল দিয়ে শৌচ করিস। তবেই দেখবি তানসেন থেকে একেবারে ভানুসিঙ্গি হয়ে গেছিস।
সত্যি বলতে কি, এই সব পাগলরা আমাকে বড় সুখ দেয়। আমার ছন্নছাড়া মতিকে কান ধরে টেনে এনে আমার কাছে ফিরিয়ে দেয়। এরাই আমার পরম মিত্রোঁও। এদের ছাড়া জীবন যেন নুন ছাড়া আলুভাতে, ঝাল ছাড়া মাংস। এরাই হল আমার জ্বর ছেড়ে যাওয়ার পরে তেঁতো উচ্ছে ভাজা আর ঝাল ঝাল আলু মরিচ। সো, দুনিয়ার পাগলরা একসঙ্গে থেক আর আমার কাছে কাছেই থেক। কখনই ভাল হয়ো না।