প্রযুক্তিগতভাবে আমাদের দেশ যখন অনেক উন্নত দেশকে টেক্কা দিচ্ছে তখন  সেই দেশের অনেক  গ্রামের বসবাসকারীদের debjani-sarkarএখনও খোলা মাঠে শৌচকর্ম করতে হয়৷আক্ষেপ এটাই, একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে স্বচ্ছ ভারত মিশনের এই সচেতনতামূলক প্রচার সরকারকে করতে হচ্ছে৷ এরই মধ্যে উদাহরণ হয়ে এগিয়ে এসেছেন দেশের কয়েকজন নারী৷ নাহ, বিজ্ঞাপনে হয়তো তাঁদের নাম থাকে না, কিন্তু বিজ্ঞাপন থেকে বাস্তবের পথটি দেখিয়েছেন তাঁরাই৷ লিখলেন দেবযানী সরকার 

যেখানে ভাবনা, সেখানে শৌচালয়৷টেলিভিশনের দৌলতে কেন্দ্রীয় সরকারের স্বচ্ছ ভারত অভিযানের এই বিজ্ঞাপনটি এখন লোকের কাছে বেশ পরিচিত৷তবে বিদ্যা বালনের মুখে এই কথাগুলো শুনে গ্রামের অনেক মেয়েরাই তা হৃদয়স্থ করে নিয়েছেন৷ তা না হলে পুরুলিয়ার অযোধ্যা গ্রামের লিপিকা মাহাতো কিংবা  মহারাষ্ট্রের আন্দুরা গ্রামের মেয়ে চৈতালি গালাখ তাদের বাবাকে কি বলতেন যে, “দামী শাড়ি, গয়নার দরকার নেই৷ বিয়ের যৌতুকে একটা শৌচালয় হলেই চলবে৷”আজ্ঞে হ্যাঁ৷ বিয়ে ঠিক হওয়ার পর বাবার কাছে এমনই আবদার করেছিলেন চৈতালি গালাখে৷ প্রথমে মানতে চাননি বাবা-কাকা৷ গয়না ছাড়া মেয়েকে বিয়ে দেওয়া যায় না বলেই স্পষ্ট জানান তারা৷ চৈতালিরও এক গোঁ, “শ্বশুরবাড়িতে শৌচাগার নেই৷ তাই অলঙ্কার বা অন্যান্য যৌতুকের চেয়ে শৌচাগার অনেক বেশি প্রয়োজনীয়৷”
শেষপর্যন্ত মেয়ের কথাই মেনে নিলেন চৈতালির বাবা৷ গত শুক্রবার মহারাষ্ট্রের আন্দুরা গ্রামের মেয়ে চৈতালি গালাখের সঙ্গে বিয়ে হল দেবেন্দ্র মাকোড়ের৷ প্রায় বিনা অলঙ্কারে সজ্জিত চৈতালির বিয়ে হল সাদামাটাভাবে৷ তবে মেয়ের ইচ্ছেপূরণ করতে ও প্রয়োজন মেটাতে সংসারে ব্যবহৃত জিনিসপত্রের সঙ্গে একটি অস্হায়ী শৌচাগার মেয়েকে উপহার দিয়েছেন বাবা৷ বিয়েতে আমন্ত্রিত গ্রামবাসীরা দেখলেন জলের ট্যাঙ্ক, বেসিন, আয়না লাগানো শৌচাগারটি৷ মেয়েদের জন্য শৌচালয় কতটা দরকারি তা নিয়ে আলোচনা করতে করতে ফিরলেন তারা৷

চৈতালি জানিয়েছেন, “বিয়ে ঠিক হওয়ার ৫দিন পর জানতে পারলাম আমার শ্বশুরবাড়িতে শৌচাগার নেই৷ তখনই বাবা-কাকাকে বললাম বিয়েতে আমাকে গয়না না দিয়ে শৌচাগারের ব্যবস্হা করে দিতে৷” সুলভ ইণ্টারন্যাশনালের কর্তা বিন্ধ্যেশ্বর পাঠকের যে গ্রামে অধিকাংশেরই বাড়িতে শৌচাগার নেই, স্বাস্হ্যের জন্য এর প্রয়োজনীয়তা বোঝার বোধ নেই বেশিরভাগের সেখানে চৈতালির এই সাধ ও স্বপ্ণপূরণ চোখ খুলে দিল বহু মানুষের৷

Vidya-Balan চৈতালীর মতই নজির পাওয়া গেল পুরুলিয়ার বাঘমুণ্ডি ব্লকের অযোধ্যা গ্রাম পঞ্চায়েতের সাহারজুড়ি গ্রামে৷ কৃষ্ণ কিশোর মাহাতোর মেয়ে লিপিকার বিয়ে ঠিক হয়েছে আগামী ২০ জৈষ্ঠ অর্থাৎ ৪ জুন ৷ বিয়ের কথাবার্তা পাকা হওয়ার পরই একদিন লিপিকার কানে আসে, তাঁর শ্বশুরালয়ে শৌচালয় নেই৷এই খবর শুনেই বেঁকে বসে বসে লিপিকা৷হঠাৎ তাঁর মনে পরে যায় বিদ্যা বালনের ওই কথাটা৷বাড়িতে যখন শৌচালয় নেই, তাহলে বৌমাকে ঘোমটা দিতে দিও না৷এতটুকু দেরি না করে বাবাকে সে বলে, তাঁর শ্বশুরবাড়িতে একটা শৌচালয় বানিয়ে দিতে৷

শুধু তাই নয়, গত এপ্রিল মাসে মধ্যপ্রদেশের একটা প্রত্যন্ত গ্রামের দুঃস্থ দিনমজুরের ১১ বছরের তারা অনশনে বসে শুধুমাত্র শৌচালয়ের জন্য৷সেই একরত্তি মেয়েটিকে পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য ব্যান্ড অ্যামবাসাডার করার কথা  ভেবেছে প্রশাসন৷

বিয়ে করতে চাইলে আগে শৌচাগার তৈরি করতে হবে৷এইরকমও জোড়ালো আওয়াজও শোনা গেছে মহিলাদের গলায়৷রাজস্থানের আলওয়ার ও কোটা এলাকায় মহিলা ঝাড়ুদাররা স্লোগান তুলেছেন, শৌচালয় নেহি, দুলহন নেহি৷জানা গিয়েছে, বিয়ের পরেও অনেক মহিলাকে এই ধরনের কাজ করতে হয়৷এতে অনেক সময়ই অসুস্থ হয়ে পড়েন তাঁরা৷তাই তাঁরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবার থেকে এমন পুরুষকেই তাঁরা বিয়ে করবেন টার বাড়িতে শৌচালয় আছে৷

 মধ্যপ্রদেশের অনিতা নারে বাড়িতে শৌচাগার না গড়ে দেওয়ায় স্বামীর বিরোধিতা করেছিলেন৷ অনিতার সাহসকে কুর্নিশ করে তাকে সাত লক্ষ টাকা দিয়েছিল সুলভ ইণ্টারন্যাশনাল৷ উত্তরপ্রদেশের সদ্য বিবাহিতা তরুণী প্রিয়াঙ্কা ভারতীও একই কারণে শ্বশুরবাড়িতে প্রতিবাদ করেছিলেন৷ বাড়িতে শৌচাগারের প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে এখন এদেরই প্রচারের মুখ করা হচেছ৷ মহারাষ্ট্রের সঙ্গীতা বিয়ের মঙ্গলসূত্র বিক্রি করে বাড়িতে বানিয়েছিলেন শৌচাগার৷ ‘সুলভ’-এর প্রচারক হিসাবে তিনিও এখন গ্রামে গিয়ে মেয়েদের সচেতন করছেন৷ গ্রামের মানুষদের গৃহে শৌচাগার নির্মাণে উদ্বুদ্ধ করছেন৷

প্রযুক্তিগতভাবে আমাদের দেশ যখন অনেক উন্নত দেশকে টেক্কা দিচ্ছে তখন  সেই দেশের অনেক  গ্রামের বসবাসকারীদের এখনও খোলা মাঠে শৌচকর্ম করতে হয়৷আক্ষেপ এটাই, একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে স্বচ্ছ ভারত মিশনের এই সচেতনতামূলক প্রচার সরকারকে করতে হচ্ছে৷ তবে আনন্দের বিষয় এটাই যে,এতদিন যে বৌমারা চুপচাপ সবকিছু সহ্য করে শ্বশুরবাড়িতে সারাক্ষণ  ঘোমটা দিয়ে  থাকার সন্ধের অন্ধকারে পর মাঠে শৌচকর্ম করতে যেতেন সেইসব বৌমারাই সাহসের সঙ্গে সুস্থ সমাজ গড়ে তুলতে এগিয়ে আসছেন৷

বিজ্ঞাপনের নায়িকা তো অনেকই হন, কিন্তু বিজ্ঞাপনকে যাঁরা এভাবে বাস্তবে পরিণত করতে পারেন, তাঁরাই আসলে জীবনের নায়িকা৷