আদর্শ প্রেমিকা কেমন হবে? তার একটা ছাঁচ সব পুরুষেরই মনে থাকে৷ আর প্রেক্ষাপট বড় করে নিলে গোট পুরুষসমাজই  sulaya-Sinhaএক বিশেষ ছাঁচে বিশ্বাসী৷ সোশ্যাল মিডিয়ায় যদি আদর্শ গার্লফ্রেন্ডের স্ক্রোল শয়ে শয়ে লাইক পায় তবে তো আজও মানতে হবে পুরুষরা চান, নারীরা তাঁদের মনের মাধুরী মেশানো সেই ছাঁচেই পড়ুক?তাহলে আমরা এগোলাম কি? উত্তর খুঁজলেন সুলয়া সিংহ

প্রেমিকা দেখতে কেমন হবে? না চোখটা ঐশ্বর্য রাইয়ের মতো, হাসিটা মাধুরী দীক্ষিতের মতো…আর ফিগারটা শিল্পা শেঠির মতো….এবং স্বভাবটা অবশ্যই হবে মায়েদের মতো৷ এরকমটা হলে মন্দ কী হত! নাহ, আজগুবি কথা নয়, কেননা এরকম সর্বগুণসম্পন্না, অ্যাকুমোলেটেড গার্লফ্রেন্ডের খোয়াব হয়তো সব পুরুষই দেখে থাকেন৷ আসলে পুরুষসমাজ মুখে যতই নারীদের অর্ধেক আকাশের কথা বলুক না কেন, মনে মনে এখনও তাদের জায়গা   ছাড়তে নারাজ৷ সে নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় মজাও চলতে পারে স্ক্রোল বানিয়ে৷ তবে নিছক মজা হলেও, সমাজের ভিতর গেড়ে বসে থাকা আদিম মানসিকতার শিকড়টিই তা দেখিয়ে দেয়৷

‘পণ্যরূপে দ্রৌপদি লাঞ্ছিতা হয় দরবারে, সীতা দেয় অগ্নিপরীক্ষা’- দীপঙ্কর গোস্বামীর পংক্তিতে উল্লেখ্য নারীরা মহাভারত ও রামায়ণ-এর ‘নায়িকা’৷ তবে বিষয়বস্তু এক রেখে শুধু নামগুলোকে আধুনিক করে দিলে বর্তমান বাজারে কবিতাটি ছেড়ে দেওয়া যেতেই পারে৷ কারণ তথাকথিত সভ্য সমাজে নারীদের ‘পণ্য’মনে করার অভ্যেসটা এখনও যায়নি শুধু নয়, বরং নতুন মাত্রা পেয়েছে৷ 31

সেদিন সোশাল নেটওয়ার্কিং সাইট ঘাঁটতে ঘাঁটতে একটা ছবি চোখে পড়ল৷ একই নারী ভিন্ন চরিত্রে ধরা দিয়েছেন৷ ছবির ওপরে লেখা, ‘আদর্শ গার্লফ্রেন্ড হতে গেলে কী কী গুণ থাকতে হবে৷’ হে মহিলা সমাজ, গুণগুলি মন দিয়ে শুনে নিন৷ ১. আপনার স্বামী অথবা বয়ফ্রেন্ড নিজের বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে রাত কাটালে, আপনি একদম রাগ দেখাবেন না৷ ২. আপনার বয়ফ্রেন্ড অন্য মেয়ের সঙ্গে ‘ফ্লার্ট’করলে দয়া করে কিছু মনে করবেন না৷ তবে আপনার ক্ষেত্রে নিয়মটা খানিকটা পাল্টে যাবে৷ ‘ফ্লার্ট’ শব্দটি অভিধান থেকে মুছে দেবেন এবং কোনও পর পুরুষের সঙ্গে কথা বলবেন না৷ দেখলেই মুখ ঘুরিয়ে নিন৷ ৩. শপিং করতে ইচ্ছে করছে? ‘নো প্রবলেম৷’ একাই বেরিয়ে পড়ুন৷ স্বামী বা বয়ফ্রেন্ডকে কষ্ট দেবেন না৷ যতক্ষণ খুশি কেনাকাটা করে বাড়ি ফিরে যান৷ ৪. রেস্তরাঁয় প্রেমিকের সঙ্গে খেতে গিয়েছেন? ভালো কথা৷ তবে খাওয়া শেষে বিল এলে হাত গুটিয়ে বসে থাকবেন না যেন! তাহলেই আপনার আদর্শ ‘ট্যাগ’ চলে যাবে৷ আপনি না কর্মরতা আধুনিক মহিলা৷ স্বামীর পায়ে পা মিলিয়ে এগিয়ে চলেছেন৷ তাহলে তা প্রমাণ করার পালা৷ বেটার হাফের দিকে কার্ড বা ক্যাশ বাড়িয়ে দিন৷ উনি ‘ফিফটি-ফিফটি’ হিসাব করে নেবেন৷ ৫. এবার আপনার মাতৃসুলভ রূপ প্রদর্শনের পালা৷ এই রূপ ছাড়া তো নারী অসম্পূর্ণা৷ শ্বশুরবাড়ির ধাঁচে নিজেকে গড়ে নিন৷ আদর্শ বৌ হওয়ার পাশাপাশি আদর্শ বৌমা হওয়ার কর্তব্যও তো আপনারই৷ পতিপরমেশ্বরের জন্য ভালো-মন্দ রান্না করুন৷ তবে না, তিনি আপনার গুণ গাইবেন৷ খবরদার…এই সময়ে কিন্তু ভুল করেও মনের কোণে এ প্রশ্ন আনবেন না যে, এক্ষেত্রে আমি এবং সে সমান নই কেন? তাহলে যে আপনার স্বামী ‘আদর্শ’ হতে পারবেন না৷
ছবিগুলি নেহাৎই ব্যাঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে দেখানো হয়েছে৷ তবে কোনও পুরুষ ছবিগুলো দেখে মনে মনে একবারও কি বলেননি, ‘একদম মনের কথা তুলে ধরেছে৷’ তা নিয়ে সন্দেহ আছে৷ যাঁরা এ ছবি বানিয়েছেন, তাঁরা ডিসক্লেমার দিয়ে জানিয়েছেন, এ তাঁদের মতবাদ নয়, সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠের মনোভাবেরই প্রতিফলন মাত্র৷ তবে কি পুরুষ সমাজই ঠিক করে দেবে ‘আদর্শ গার্লফ্রেন্ড’-এর সংজ্ঞা কি হওয়া উচিত? আধুনিকতা ও সেকেলেপনা, দু’য়ের সংমিশ্রণে গড়ে উঠতে হবে নারীকে৷ পতিপরমেশ্বরের ইচ্ছেগুলো সম্মান দিয়ে পূরণ করতে হবে৷ আর ইচ্ছেপূরণ না হলেই সম্পর্ক বিচ্ছেদের সব দায় নারীর৷
দেশের পিছিয়ে পড়া জায়গাগুলোতে পুরুষতান্ত্রিকতার প্রভাব আরও নৃশংসভাবে ফুটে ওঠে৷ পরপুরুষের সঙ্গে স্ত্রীর সম্পর্কের কথা প্রকাশ্যে এলে গাঁয়ের মোড়লের নির্দেশে, সেই মহিলাকে উলঙ্গ করে সারা গ্রাম ঘোরানো হয়৷ স্বামী এমন কাণ্ড ঘটালে তা অবশ্য মোড়লের কান পর্যন্ত পৌঁছয় না৷ পণ পাওয়ার হাতিয়ার হিসেবে নারী যে কীভাবে পণ্য হয়ে ওঠে, তার উদাহরণ তো প্রায় প্রতিদিনই খবরের কাগজের পাতায় দেখতে পাওয়া যায়৷ নারী-পুরুষ সমান অধিকারের কথা বললেও বাস্তবে তা হয় কোথায়! অদৃশ্য লক্ষ্মণরেখাটা থেকেই যায়৷ তাই তো কোনও মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েকে বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে রাত কাটানোর অনুমতি দেওয়া হয় না৷ ছেলেদের ক্ষেত্রে অবশ্য স্থান, কাল , পাত্র – কোনওটাই গুরুত্ব পায় না৷
পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নারীদের আজও হয় সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র নয়তো বিনোদনের পুতুলের চেয়ে বেশি কিছু মনে করে না৷ শিক্ষিত সমাজকেও বাদ দেওয়া যাবে না৷ বর্তমানে ছবির পরিচালকদের দৃঢ় বিশ্বাস, ছবিতে একটা ‘আইটেম নাম্বার’ ঢোকাতে পারলেই কেল্লাফতে৷ গল্প যাই হোক, লাস্যময়ী নারীর স্বল্পবাসে নৃত্য দেখতে দর্শকরা প্রেক্ষাগৃহে আসবেনই৷ এই ভাবনাই তো সমাজকে নারী সম্পর্কে সেই বদ্ধমূল ধারণা থেকে বেরোতে দিচ্ছে না৷
তবে শুধু পুরুষতান্ত্রিক সমাজের ওপর এর দায় চাপিয়ে দিলে 11014840_1577424732522635_8403594116376690176_nএকপেশে কথা বলা হয়ে যাবে৷ নারীদের পিছিয়ে থাকার কারণ হিসেবে নারীদের ভূমিকাও নেহাৎ কম নয়৷ বাপ-ঠাকুরদার আমলে নারীদের বোঝানো হত, ঘোমটা টেনে বাড়ি থেকে বাইরে বেরোতে হবে৷ লজ্জাই নারীর ভূষণ৷ নারীদের এটা করতে নেই, ওটা করতে নেই৷ ওখানে যেতে নেই, এটা দেখতে নেই৷ সেই নির্দেশগুলোকেই বেদবাক্য ধরে নিয়ে নিজের সন্তানদের ওপরও তা চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায় তাঁদের মধ্যে৷ আধুনিক ভাষায় একে ‘ব্রেনওয়াশ’ বলা যেতেই পারে৷ অর্থাৎ পরোক্ষভাবে নিজেদের বল প্রতিষ্ঠায় ফের একবার সফল পুরুষ সমাজ৷ সম্প্রতি ‘এনএইচ টেন’ নামের ছবিতে সেই ঘটনাই রক্তমাংসের চেহারা পেয়েছে৷ মেয়ে প্রেম করে বিয়ে করেছে! এর চেয়ে বড় অপরাধ আর কী হবে পারে৷ মা নির্দেশ দিচ্ছেন মেয়েকে হত্যা করার৷

‘আদর্শ পুরুষ’ হওয়ার সংজ্ঞা কী তবে নারীর প্রতি বল প্রতিষ্ঠা করা? মা, বোন, স্ত্রী, কন্যা সব রূপে নারীদের লেটার মার্কস পেতে হবে৷ পান থেকে চুন খসলেই আদর্শের পর্দাটা ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে যাবে৷
চিত্রাঙ্গদা অর্জুনকে বলেছিলেন, ‘নহি দেবী নহি সামান্যা নারী.. পূজা করি মোরে রাখিবে উর্ধে সে নহি নহি …হেলা করি মোরে রাখিবে পিছে সে নহি নহি …. যদি পার্শ্বে সংকটে, সম্পদে…সম্মতি দাও যদি কঠিন ব্রতে..সহায় হতে…পাবে তবে তুমি চিনিতে মোরে’৷

হায় রবীন্দ্রনাথ! কোনওকালেই কি চিত্রাঙ্গদাদের চিনে উঠতে পারবেন না অর্জুনরা!

(ছবি সৌজন্য- স্ক্রোলডোল ফেসবুক পেজ)