manashi
মানসী সাহা

কে জানে কাল রাতে অফিস থেকে বাড়ি ফেরার পথে নোংরা হাতের ছোঁয়া পড়বে কি না আমার শরীরে! কে বলতে পারে আমার বোনকে স্কুল থেকে ফেরার পথে আম-বাগানে তুলে নিয়ে যাবে না কেউ। শুধুই শরীর নিয়ে মেয়েদের দেখার চোখ না বদলালে আমাদের ভয় কাটবে না কোনওদিন। প্রতি মুহূর্তে এই ভয় নিয়ে বেঁচে থাকার দিনে পড়ুক ইতি। এ সমাজকে জানানো খোলা চিঠিতে লিখলেন  মানসী সাহা

হে সমাজ,

পুরুষতন্ত্রের সরব অহংকারে নারীর অর্ধেক আকাশ আজও কালো মেঘে আচ্ছন্ন। তাইতো ডানা মেলে ওড়ার আগেই বারবার ছেঁটে দেওয়া হয় নির্ভয়াদের পাখা। ‘নির্ভয়া’ আজ আর কোন নাম নয়, প্রতিবাদের কন্ঠ। আন্দোলনের শরীর। justice for girl. Justice for her right. কুয়াশা ঘেরা দিল্লীর শীতের রাত ১৬ ডিসেম্বর ২০১২ ঘটে যাওয়া সেই গণধর্ষন আর তারপর নির্মম হত্যাকান্ড। যা প্রতিবাদের জোয়ার তুলেছিল ভারতের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে। যে আন্দোলনের জেরে বাধ্য হয়েছিল এদেশের সরকার ধর্ষন সংক্রান্ত আইনি সংশোধন আনতে। আজ সেই দেশেরই আইনই বাধ সাধল নারীর ইচ্ছার উড়ানে।

‘নির্ভয়া’ আন্দোলনকে চেহারায় ধরে রাখতে এক বিদেশী সাংবাদিক দেশ-পরিবার ছেড়ে টানা তিন বছর এদেশের মাটি কামড়ে তিল তিল করে গড়ে তুলেছেন এক তথ্যচিত্র। যেখান নির্ভয়া পরিচিতি পেল ‘ইন্ডিয়াজ ডটার’ নামে। তবে সব থেকে অপমানের কথা ভারতের এই কন্যাই মুক্তি পেল না তাঁর নিজের দেশে। ৮ই মার্চ আর্ন্তজাতিক নারীদিবসের দিন যখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেখানো হল ‘ইন্ডিয়াজ ডটার’, তখন আইনের গেরোয় এদেশে বন্দি নির্ভয়া। নেহাতই কিছু ঠুনকো অজুহাত, সেকেলে ধারণায় আটকে দেওয়া হল এদেশে ‘ইন্ডিয়াস ডটার’-এর মু্ক্তি। কিন্তু বিচার ব্যবস্থা আপনাদের জানিয়ে রাখি, আমরা যারা মনে প্রাণে চেয়েছি তাদের সবার হৃদয়ে জায়গা পেয়েছে নির্ভয়া তথ্যচিত্র-টি। কারণ ‘ইন্ডিয়াজ ডটার’ আজ এক নির্ভয়ার গল্প নয়, সমকালীন কয়েকশো কোটি নির্ভয়ার কাহিনি। সেই সঙ্গে আট থেকে আশি সেই সব মানুষের কথা যাঁরা ধর্ষণ, লাঞ্ছনা, মানসিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে পথে নেমেছিলেন, সরব হয়েছিলেন প্রতিবাদে।

ভাবতে অবাক লাগে আজও আমরা বুঝতে পারি না এ কোন ভারতের নারী আমরা। পদে পদে লাঞ্ছনা, অবজ্ঞা ও অপমানের শিকার হতে হচ্ছে  আমাদের, আর তার দায়ভার এসে পড়ছে আমাদেরই ঘাড়ে। কবে আর আমাদের ইচ্ছা, আমাদের চাওয়া, আমাদের স্বপ্ন গুরুত্ব পাবে? কেন বারবার আভিযোগের আঙুল উঠবে আমাদেরই দিকে? কেন নির্ভয়াকে শুনতে হল এদেশের বিচার ব্যবস্থার মুখ থেকে এমন অপমানজনক উক্তি:

আইনজীবি: এম. এল শর্মা

  • আমাদের সমাজ-সংষ্কৃতি সন্ধ্যার পর একা নারীকে বাইরে বের হওয়ার অনুমতি কখনও দেয়না। কিন্তু নির্ভয়া সেই সীমা লঙ্ঘন করেছে। রাতের অন্ধকারে একটি ছেলের সঙ্গে সিনেমা দেখতে গিয়েছিল সে। আসলে আজকাল মেয়েরা ফিল্মি ক্যারেকটার হয়ে উঠেছে। ভুলে যাচ্ছে তাঁদের সীমা। মনে রাখছে না প্রতি মুহূর্তে তাদের প্রয়োজন সুরক্ষার।
  • আমাদের সংষ্কৃতি কখনও একটি ছেলে-মেয়ের বন্ধু্ত্বকে মান্যতা দেয় না। যৌন সম্পর্ক ছাড়া আর কোনও সম্পর্ক নারী পুরুষের মধ্যে গড়ে উঠতে পারে না।
  • নরী সব সময় প্রলোভনের বস্তু। যে কারণে সংযত হয়ে চলাই তাঁদের শ্রেয়। কেননা মেয়েরা ফুলের মতোই নরম ও কোমল। তাই ফুল মন্দিরে রাখলে যেমন পবিত্রতা পায় ও নর্দমায় ফেললে অপবিত্র হয়ে যায়। ঠিক সে কারণে নারীদের উচিত তাঁদের লক্ষ্মণরেখা নির্ধারণ করা।

আইনজীবি: এ.পি সিং

  • খুব দরকার বা প্রয়োজন না হলে মেয়েদের বাড়ির বাইরে পা রাখার কোনও দরকার নেই।
  • আজ যাঁর পার্লামেন্টের ঠান্ডা ঘরে বসে নির্ভয়ার বিচার করছে, তাঁরা কি সাধু? বেশির ভাগই নয় ডাকাতি, নয় ধর্ষণ কান্ডে জড়িত কই তাঁরা তো শাস্তি পাচ্ছে না। তাদের আগে শাস্তি দেওয়া হোক। আমার মক্কেল দুর্বল বলে শুধু শাস্তি পাবে?
ছবি-মিতুল দাস
ছবি-মিতুল দাস

মথুরা থেকে মধ্যমগ্রাম গল্পটা একই। নারীর কোনও মন নেই যেন শুধুই শরীর। আক্রমণের মাত্রাও ভিন্ন ভিন্ন। ধর্ষকের বক্তব্য, আইনের বক্তব্য, রক্ষকের বক্তব্য-এতো অবমাননাকর যে ভাবতে অবাক লাগে। মেয়েদের অস্তিত্ব এখানে শুধু সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র হিসাবে, যৌন কামনা মেটানোর বস্তু হিসাবে। মেয়েদের মন আছে, ইচ্ছে আছে, স্বপ্ন আছে এসব সবলে অস্বীকার করছে এমন এক দুনিয়া সে দুনিয়া নির্লজ্জ পুরুষতন্ত্রের। নির্ভয়ার স্বপ্ন দেখা, স্বপ্নকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লড়াই এদেশের কোটি মেয়ের সঙ্গে মিলে যায়। চার দেওয়ালের গন্ডি ভেঙে রান্না ঘরের হাতা-খুন্তি ছেড়ে নানা পেশায় আসছে আজ মেয়েরা। নিজেদের আর দুর্বল বলে ভাবতে রাজি নয় তাঁরা। জলে-স্থলে-অন্তরীক্ষে খুঁজে নিচ্ছে চ্যালেঞ্জিং পেশা।

২০১৪ সালে ন্যাশানল ক্রাইম ব্যুরো-এর রিপোর্ট অনুযায়ী প্রায় ৯০ জন মহিলা ধর্ষিত হয় প্রতিদিন। তাহলে মামুলি ধর্ষণ থেকে কেন আলাদা হয়ে উঠল নির্ভয়ার ঘটনা, কেন দেশ জুড়ে আন্দোলনে জড়ালেন লক্ষ মানুষ জাতি-ধর্ম-লিঙ্গ নির্বিশেষে। কোনও রাজনৈতিক দল ছাড়াই যেভাবে আন্দোলন ছড়াল ছাত্র-ছাত্রী, চাকুরিজীবীদের মধ্যে- সেই আন্দোলনের ভাষা  খুঁজেছেন পরিচালক লেসলি তাঁর তথ্যচিত্রে। ক্যামেরাবন্দি করেছেন ভারতের পুরুষতন্ত্রের জঘন্য নোংরা মুখ।

জ্ঞানে, বিজ্ঞানে, প্রযুক্তিতে দেশ এতো এগিয়ে যাচ্ছে মানসিকতা বদলাচ্ছে কই। এদিকে সরকার ডাক দিচ্ছে ‘বেটি বাঁচাও’ আন্দোলনের অন্যদিকে নির্বিকার ভাবে ঘটে চলেছে আনার কিলিং। ‘খাপ’ পঞ্চায়েতের রায়ে বিবস্ত্র করে নারীকে ঘোরানো হচ্ছে গোটা গ্রাম। রক্ষণশীল, মনুবাদী, মৌলবাদী এই সব নিয়মকে চ্যালেঞ্জ জানানোর সময় হয়েছে বলে মনে করছেন সমকালীন মেয়েরা, তাঁদের বন্ধুরা। আমিও তাঁদের শরিক। তবে তথ্যচিত্রের মুক্তি বন্ধ করে আটকানো যায়নি দেখা। আমি দেখেছি, সবাইকে বলব দেখতে।

বিচার ব্যবস্থার এই ধারণায় আজ আমি ও আমার মতো বহু মেয়েই হতাশ। এ কোন সমাজ, এ কোন সংষ্কৃতির কথা বলছেন বিচার বিশেষজ্ঞরা! বলতে বাধ্য হচ্ছি, আপনারা কি ভুলে গেলেন বৈচিত্রময় আমাদের এই ভারতভূমি। আমাদের এই দেশে কি মুসলিম নেই, বৌদ্ধ নেই, জৈন নেই, খ্রীষ্টান নেই, আদিবাসী সমাজ নেই? আর তা যদি থেকে থাকে তাহলে তাঁদের সংষ্কৃতির জায়গাটা কোথায়? কেন শুধু ‘মনুবাদী’ বুলি ফুটে উঠছে আপনাদের মুখে? তাহলে কি বৃথাই কবি বলে গেলেন “বিবিধের মাঝে দেখ মিলন মহান”।

তবে আপনাদের জানিয়ে রাখি ঠুনকো ভারতীয় সংষ্কৃতির নামে, আপনারা যাঁরা মেয়েদের পায়ের নীচের জমি কেড়ে নিতে চাইছেন, তা আপনাদের পৌরুষত্বের বৃথা প্রচেষ্টা। মেয়েদের দুর্বল ভাবা আপনাদের নির্বুদ্ধিতা।

এবারই প্রজাতন্ত্র দিবসের দিনে ভারতের পতাকা এক নারীর হাতেই তুলে দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। সেবা থেকে দেশের সীমারক্ষা সর্বত্রই নারীরা আছেন। ‘ইন্ডিয়াস ডটার’-এর মুক্তি আপনারা আটকেছেন কিন্তু নির্ভয়াদের কন্ঠ তো আটকাতে পারবেন না। আজ এক ‘নির্ভয়া’র কন্ঠরোধ করলে খুলবে হাজার হাজার নির্ভয়ার মুখ।AP-2015-Indias-daughters-2

তবে একজন ভারতীয় নারী হিসাবে নয়, শুধু ‘নারী’ এই পরিচয়ে আমি দেখতে চাই ‘ইন্ডিয়াস ডটার’। কারণ এটা আমার গল্প। আমাদের গল্প। আমরা যাঁরা নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে, এক বুক আশা নিয়ে পাখা মেলে উড়তে চাই নীল দিগন্তে তাঁদের কাহিনি। একটু একটু করে সাহস সঞ্চয় করে পাড়ি দিতে চাই এই জীবনের বিভিন্ন প্রান্তে, উপভোগ করতে চাই নিজের মতো করে, স্বপ্ন দেখতে চাই আর সেই স্বপ্নকে বাস্তব করে তুলতে চাই আমরা। তাই এই গল্প আমার-আমাদের। হ্যাঁ আমরা ‘ইন্ডিয়াজ ডটার’।

কিন্তু যে প্রতিবাদের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে ‘নির্ভয়া’ তাকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব আমাদের। বেঁচে থাকব প্রতিবাদে, প্রতিরোধে। পুরুষতন্ত্রের ধারণা যদি না বদলায় তা হলে যে আমরা ডানা মেলে ধরার আকাশ পাবো না। কারণ কে জানে কাল রাতে অফিস থেকে বাড়ি ফেরার পথে নোংরা হাতের ছোঁয়া পড়বে কি না আমার শরীরে! কে বলতে পারে আমার বোনকে স্কুল থেকে ফেরার পথে আম-বাগানে তুলে নিয়ে যাবে না কেউ। শুধুই শরীর নিয়ে মেয়েদের দেখার চোখ না বদলালে আমাদের ভয় কাটবে না কোনওদিন। প্রতি মুহূর্তে এই ভয় নিয়ে বেঁচে থাকার দিনে পড়ুক ইতি। উদয় হোক নতুন সূর্যের, যার উজ্জ্বল কিরণে আমরা ‘ইন্ডিয়াজ ডটার’রা  পাব নতুন করে বাঁচার আলো। ঘুড়ির মতো উড়ব আকাশ জুড়ে। এমন একটা দিনের প্রতীক্ষায়, যেদিন সমসুরে বলে উঠতে পারব- we are proud to be an india’s doughter………..

ইতি,

এক ‘ইন্ডিয়াজ ডটার’