মাধবী দাস

“রাত আর দিন এক হয়ে আছে ।/অনিশ্চয় জীবন,/ ফুরিয়ে আসছে আয়ু/ আনপ্রেডিক্টেবল বলে কেউ কেউ…/ আমার কবিতার খাতা চুপ/ প্রেমিকার ফুরিত রিবন স্থির, ঝুলন্ত/ গন্ধের গরিমা নিঃস্ব/ হাহাকার আমাকে ঠান্ডা ঘরে নিয়ে যায়/ আমি প্রলম্বিত অস্থিরতার মধ্যে/ নৈঃশব্দের গান শুনি/ প্রেমিকার হাসনুহানা/ দেখতে পাই না/ আমার অবাক চাহনি দিগন্ত ভেদ করে/ কোথাও হারিয়ে যায়”–এমন করেই কঠিন রোগে আক্রান্ত কোনও ব্যক্তি মৃত্যুর মুখ থেকে বার বার ফিরে আসার পর সেই ইমোশন রিকালেক্টেড ইন ট্র্যাঙকুইলিটি হয়ে প্রশান্ত রূপ লাভ করেছে কবি পুণ্যশ্লোক দাশগুপ্ত-র মৃত্যুর পর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘উডবার্ন ওয়ার্ড’-এ।

জীবনযে মুক্ত সত্যরূপে দেখার একটি জানালা মাত্র সেটি তিনি উপলব্ধি করেছিলেন। মৃত্যুচেতনা মানুষকে ক্ষণিকের জন্য হলেও দুনিয়ার প্রতি অনাসক্ত করে তোলে। এই সত্য ফুটে উঠেছে কবির প্রতিটি কথায় কিন্তু কবি পুণ্যশ্লোক আদতে সেই ঘরানার মানুষ ছিলেন না। রোগে বার্ধক্যে তিনি অপরাজিত যুবা। মানুষের ভালোবাসা, মানুষের প্রতি ভালোবাসা তাকে এমন অপরাজেয় শক্তি যুগিয়েছে হয়তো!

তিনি লিখেছেন– “ভালোবাসা কোন ড্রামা নয়/ কেন্নোও নয় যে মিশে থাকবে/ মাটির সিক্ততায় /ভালোবাসা ড্রামা নয় /একটি চমৎকার চাঁদ” ইন্দ্রিয় জগত অতিক্রম করে প্রায় কবিতায় দেখা যায় তাই ইন্দ্রিয়াতীত জগতের অনুভব–“খুলে ফেললাম মেঘের দরজা /নিঃসীম অন্ধকার যেন /একটি কালো ঘোড়া ছুটে চলেছে/ নগ্ন এই ক্যাটালগ, রং হীন/ বিষণ্ণ এক প্লেট রঙের মধ্যে আমি ঘুমিয়ে পড়লাম” তিনি আসলে বুঝতে পেরেছিলেন মৃত্যুকে আর ঠেকিয়ে রাখা যাবে না ।মনে মনে অনুভব করেছিলেন-“তোমারও অসীমে প্রাণমন লয়ে /যত দূরে আমি ধাই -কোথাও দুঃখ ,কোথাও মৃত্যু, কোথা বিচ্ছেদ নাই।

“রবীন্দ্রনাথের এই গানটি।তাই লিখছেন –“চল পানসি /চল অন্য কোথাও /আরো সুন্দর আছে/ অন্য ভালোবাসা আছে/ প্রেম পত্র আছে/ বর্ণময় সবুজ।” আবার পরক্ষণেই লিখছেন –“বেঁচে থাকাটা যে কত ভালো তা যদি মানুষ জানত /আমি চিৎকার করে উঠলাম যেন স্বপ্ন দেখছি/ ভুতুরে স্বপ্ন,আলেয়ার সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে আমার মধ্যে /আগুন আগুন/ মাঠের মধ্যে আগুন /আত্মহত্যার মধ্যে আগুন/ বেঁচে থাকার জন্য /বেঁচে থাকাটাও যে বড় দরকার।”—মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা হলেই বোঝা যায় বেঁচে থাকার তাগিদ।

আকাশ পেরোনো নিঃসঙ্গতা নিয়ে বুকের কাছে বারান্দায় চেয়ারে বসে বৃদ্ধ মায়ের মুখটাই তাই ভেবেছেন –“মা ডাকছেন শুনতে পাচ্ছি/ বাবার ডিসপেনসারি ডাকছে শুনতে পাচ্ছি…মা বলতেন কাছে কাছে থাক খুব দূরে যাস না কখনও/ এখন মা ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে আটকে থাকেন/ তিনি বিকারগ্রস্থ কখনও ছিলেন না /এখন শুধু পরিতাপ করেন/ একে একে সবাই চলে গেল /আমি আর কত দুঃখ সইবো বল/ এই বিকট চেহারার রাত্রি/ আর যেন না আসে /একটি মানুষ না ঘুমিয়ে /কাটিয়ে দিচ্ছে একটি রাত”—এত বিষন্নতা বাতাসে এত নিঃসঙ্গতা তবুও কবিতার খাতায় ঘুরে ফিরে এসেছে কবির প্রিয় ডুয়ার্স। কবি লিখেছেন–” বাঁচাও আমাকে/ সরিয়ে নাও অক্সিজেন মাস্ক /খুলে ফেলো লাইফ সাপোর্ট/ আমার নিশুতি রাত /দার্জিলিং মেল/ আমার রেইনট্রি চা ফুল /চলন্তিকা তিস্তার পানি /ব্রেড আর বাটারের বাতাস /আমার ডিম ডিমা নদী /জলঢাকা উদ্বাস্তু কলোনির ঘুম/ওহে জাগরন স্পৃহা/ মদির মহোৎসব কবিতার সংসার /আমাকে বাচাও ভাইরাস..”নাম কবিতা সিরিজে ঘুরে ফিরে এসেছে উডবার্ন ওয়ার্ডের নানারকম চিত্রকল্প ।অসুস্থ কবি শারীরিক সমস্ত যন্ত্রণা ভুলেও কবিতা বুনে গেছেন যুগান্তরের কবির মতো। হয়ে উঠেছেন ত্রিকালদর্শী। কবি লিখেছেন–“দূরে রেড রোড ,এলিজাবেথ টেলর /ডাবল ডেকার /উডবার্ন ওয়ার্ড নীল নীলিমায় ভেসে বেড়াচ্ছে /রিস্তা আর কাকে বলে /খুলে যাচ্ছে পাহাড় /মেঘ এসে ঢুকে পড়ছে আমার চোখে”কিংবা চাকা ঘুরিয়ে দিল সিস্টার/ ব্যাকরেস্ট, ইলেকট্রিক কেটলির চা/ লেখার কাগজ/ চিন্তার স্রোত/ আমি বেশ আছি”

“চারু বাবু ঘুম এনে দাও’ সিরিজেও দেখা যায় জীবন-মৃত্যুর দোলাচলে কবি স্মৃতি রোমন্থনে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। নিজের স্বভাবকে তুলে ধরেছেন –“সাঁকো থেকে অন্য সাঁকো প্রজন্মের টোটো কোম্পানি।”আবার ডুপ্লেক্স থেকে চাঁদ সিরিজে তিনি লিখেছেন-” রূপসী জুলুম করো না/ আমি আজ টিলার ওপর বসে কবিতা শোনাবো”
কবির শেষ বয়সের প্রচুর স্বপ্ন ছিল তাঁর সম্পাদিত পত্রিকা ‘গোল্লাছুট’ নিয়ে ।সেই কথাও তিনি এই কাব্যগ্রন্থের অনেক কবিতায় লিখে গেছেন–“জানুক সকলে গোল্লাছুট স্কোপ” কিংবা গহনে জানু পেতে/ বসে আছে বীতকাম ঈশ্বরের দূত/শরীরের রুধীরে তার গোল্লাছুট”

এই কাব্যগ্রন্থের ‘নিখিলেশ সিরিজ’, ‘রানীনগর সিরিজ’, ‘মেডিটেশন পর্ব’ এমন প্রত্যেকটি সিরিজেই দেখি একটা অদ্ভুত বিষণ্নতা যেন কবিকে গ্রাস করেছিল ।তিনি যেন মৃত্যুর সঙ্গে দেখা করে মৃত্যু আর আত্মার চক্রাকার ঘূর্ণিত বৃষ্টিতে চোখ ধুয়ে নিয়েছিলেন ।লাভ করেছিলেন দিব্যদৃষ্টি ।সেই দৃষ্টি দিয়ে মনস্তাত্ত্বিকের মতো মানুষের মনের ছবি এঁকেছেন একের পর এক।আবার কখনও অসহ্য শারীরিক যন্ত্রণায় কাবু হয়ে লিখেছেন -“খুলে দাও /ফেনায় ফেনায় বুঁদ/এনে দাও রঞ্জিত চমৎকার ঘুম ” কিংবা “ফিরে ফিরে আসে মমি মুখ/ ত্রিভুজের অদৃশ্য মিনার /একশত বছরের ঘুম/ খোলা থাক কবিতার পাতা”– কবিতার পাতা খোলা রেখে; বহু বাসনায় বঞ্চিত হয়েই চলে গেছেন বাংলা ভাষার শক্তিশালী কবি পুণ্যশ্লোক দাশগুপ্ত তার সৃজন প্রবণতা বাংলা ভাষার একটি অভিনব দিক। কথায় বলে শেষ ভালো যাঁর সব ভালো তাঁর- এই ‘উডবার্নওয়ার্ড’ কাব্যগ্রন্থ সেই আপ্তবাক্য কেই স্মরণ করিয়ে দেবে পাঠক মনে।

সবশেষে একটি কথা না বললেই নয়, কবির মৃত্যু পরবর্তী গ্রন্থপ্রকাশ যথেষ্ট কঠিন কাজ। এই কঠিন দায়িত্ব পালন করেছেন ‘উত্তর শিলালিপি’ প্রকাশনার পক্ষে অরুণাভ রাহারায়। বাংলা সাহিত্যে এমন একটি কাব্যগ্রন্থ আমরা পেতাম না তাঁর সাধনা ও সহায়তা ছাড়া। বর্ণ সংস্থাপন ও প্রচ্ছদেও নজর কাড়া মুন্সিয়ানা দেখিয়েছে উত্তর শিলালিপি। বইটি উৎসর্গ করা হয়েছে কবি সুবোধ সরকার ও ইন্দ্রনীল সেনকে। মূল্য ১০০ টাকা।