শেখর ভারতীয়

কম্বাইন্ড ডিফেন্স সার্ভিস-এর পরীক্ষা দিতে দেরাদুন গিয়েছিলাম বছরখানেক আগে। ওখানেই মিলিটারি অ্যাকাডেমিতে পরিচয় হয়েছিল মিসেস কল-এর সঙ্গে। বয়স ৫০ এর উপরেই হবে। ছ’ফুটের কাছাকাছি লম্বা। টুকটুকে ফরসা। স্বামী কার্গিল যুদ্ধে মারা গেছেন। একা মেয়েকে নিয়ে দেরাদুনে থাকেন। পরীক্ষার সেন্টারে আলাপ হয়েছিল অমৃতার সঙ্গে, যেরকম লম্বা সেরকম সুন্দরী। আর চোখ, অদ্ভুত ছিল মেয়েটার চোখ দুটো। নাটোরের বনতলা সেনের সঙ্গে দেখা হয়নি কিন্তু মনে হয়েছিল বনলতা সেন পঞ্জাবি হলে এরমই হতেন।

তো যেটা বলছিলাম অমৃতা, অমৃতা কলের সঙ্গে আলাপের সূত্র ধরে ওদের বাড়ি যাওয়া। মিসেস কলের সঙ্গে পরিচিত হওয়া। মিস্টার কল কার্গিল যুদ্ধে শহিদ হয়েছিলেন। তারপর থেকে মা আর মেয়ের একার লড়াই। ওনাদের ঘরে গিয়ে বুঝেছিলাম শহিদের বাড়ি কিরকম হয়। পুরো ঘর জুড়ে মিস্টার কলের ছোট বড় ছবি, সেনামেডেল। নানা এনজিও ও লোকাল অর্গানাইজেশন থেকে দেওয়া পুরস্কার। আশেপাশের দশটা বাড়ির এই বাড়িটির প্রতি সম্ভ্রম, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা। শহিদ মিস্টার কল ও তার পরিবার দেরাদুনের এক পাহাড়ি কলোনির গর্বের কারণ ছিল। অবাক হয়ে গিয়েছিলাম এটা দেখে, যে মেয়ে যৌবনে স্বামীকে হারিয়েছেন বর্ডারে। তিনি বার্ধক্য ছু্ঁয়ে নিজের একমাত্র মেয়েকে সেনাবাহিনীতে যাওয়ার পারমিশন দিয়েছেন!

কিন্তু তারপরেও যেন আমার মনে হয়েছিল “নেই” কোথাও কিছু একটা নেই, কি যে একটা মিলছে না…


বছর দুয়েক আগের কথা অনেকেরই বোধহয় মনে আছে উরিতে ১৯জন সৈনিককে মেরে ফেলেছিল পাকিস্তানের টেররিস্ট ও সেনাবাহিনী মিলে। যার মধ্যে দুজন ছিল খোদ এই বাংলার ছেলে। দুটি ছেলের মধ্যে একজন গঙ্গাধর দলুই। বাড়ি হাওড়ার ধূলাগড়ের পাশে “বালিয়া” বলে একটি গ্রামে। নিজের বিবেকের টানেই ছুটে ছিলাম ছেলেটির গ্রামে। “বালিয়া” তখন শহিদের গ্রাম। হরেক রকমের নেতা, এনজিওর ভিড় ৫ বাই ৭-এর দর্মার বাড়িতে। বেশ কিছু টাকা ও ফুলের সম্বর্ধনা জুটছিল পরিবারটির কপালে। গ্রাম জুড়ে মিছিল বেরিয়েছিল, ‘গঙ্গাধর দলুই অমর রহে’। গর্বে বুক ভরে উঠছিল। মরতে তো একদিন সবাইকে হবেই, কিন্তু মৃত্যু যদি এরকম হয় তাহলে তা জীবনের চেয়ে গৌরবের। কিন্তু থমকে গিয়েছিলাম শহিদ গঙ্গাধর দলুইয়ের ছবির সামনের অন্ধকারে বসে থাকা এক মা’কে দেখে। এত গর্ব অহংকারের মাঝে যার পায়ের কাছে এলোমেলোভাবে পড়েছিল আমাদের মতো অনেকের নিয়ে যাওয়া ফুল, টাকা। প্রদীপের আলো যাঁর গায়ে লাগলেও চোখমুখ অবধি পৌঁছোচ্ছিল না।

দুটি শহিদ পরিবারের সঙ্গে আলাপ হয়েই মনে একগাদা প্রশ্ন ভিড় করেছিল।
ক) শহিদ পরিবারের অংশ হওয়া কি শুধুই গর্বের?
খ) যে লোকটা শহিদ হল সে তো এতো প্রশংসার ভাগীদার হতে পারল না?
গ) সেনাবাহিনীতে যোগদান আর পাঁচটা চাকরির চেয়ে আলাদা কোথায়?
ঘ) যদি হঠাৎ শহিদ হওয়া সৈনিক ফিরে আসে, তার সঙ্গে কেমন ব্যবহার করা হবে?


শহিদ উপন্যাসের গল্পটি আর্বতিত হচ্ছে অভিজিৎ নামের এক বাঙালি যুবককে কেন্দ্র করে। অভিজিৎ সেনাবহিনীতে চাকরি করে। বাড়িতে তার বিবাহিতা অন্তসত্ত্বা স্ত্রী। হঠাৎ করে খবর আসে এক সন্ত্রাসবাদীদের সঙ্গে লড়াইয়ে শহিদ হয়েছে অভিজিৎ। শহিদের নামে টাকা তুলে ঝেড়ে দেয় একদল লোক। এরপর মৃত অভিজিৎ-এর গরীব পরিবারের হাতে হঠাৎ বেশকিছু টাকা চলে আসে। সময়ের ফের নিজের বৌদিকে বিয়ে করে অভিজিৎ-এর ভাই। মৃত অভিজিৎ-এর আর এক ছোটভাই প্রেমিকার কথা রাখতে চুরি করে বৌদির টাকা। এরপরই খবর আসে অভিজিৎ বেঁচে থাকলেও থাকতে পারে…..
তারপর?

নাহ আর বললাম না এরপরটা আপনাদের বই থেকে পড়তে হবে। প্রতিটি চরিত্র মাপা। এবং গল্পের প্লটের সঙ্গে মানানসই। পুরো গল্পজুড়ে প্রেম, যৌনতা এবং সম্পর্কের টানপোড়েনের এক অদ্ভুত মিশেল রয়েছে। গরমের রবিবারের দুপুরে এ বই আপনার সঙ্গী হতেই পারে।


শহিদ
মৌমিতা
প্রতিভাস
৭০ টাকা