অরিজিৎ ভট্টাচার্য

যুগের বিভিন্ন সমস্যাই সাধারণত সাহিত্যে প্রতিফলিত হয়। রবীন্দ্র-পরবর্তী বা স্বাধীনোত্তর যুগের সমস্যা খুব জটিল। সমস্যাসঙ্কুল মানব-জীবনই এ যুগের উপন্যাসের গতি নির্ণয় করেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বের যে পরিবর্তন– বাঁচবার জন্য মানুষের যে কঠোর সংগ্রাম, যান্ত্রিক সভ্যতার সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক যে নতুন অবস্থান– এ সবকিছুই এই সময়ের কথাসাহিত্যকে বাস্তব প্রাধান্য দিয়েছে।

আর যাঁদের রচনায় এই বিষয়গুলি প্রবলভাবে উঠে এসেছে তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন বিমল মিত্র (১৮ মার্চ ১৯১২-২ ডিসেম্বর ১৯৯১)। সমাজের নানা স্তরের নরনারীর চরিত্র বিশ্লেষণে তাঁর পারদর্শিতা অবিসংবাদিত। তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাসগুলি হল– ‘সাহেব বিবি গোলাম’, ‘ছাই’, ‘দিনের পর দিন’, ‘পুতুল দিদি’, ‘কন্যাপক্ষ’, ‘মিথুন লগ্ন’, কড়ি দিয়ে কিনলাম’, ‘একক দশক শতক’, ‘তিন নম্বর সাক্ষী’, প্রভৃতি। নেতিবাচক বা আস্তিক্যবিরোধী কোনও বক্তব্য প্রকাশে বিমল মিত্র কোনওদিনও উৎসাহ বোধ করেননি।

বরং আবেগতপ্ত শরৎচন্দ্রীয় পরিচয়ে মূল্যবোধ সম্পর্কিত বক্তব্য প্রকাশে জনপ্রিয়তা অর্জনে সক্ষম এক শিল্পী, সাফল্য সমাসীন এক সাহিত্যিক। একজন ঔপন্যাসিক কেবল উপন্যাস লেখেন না, চরিত্র সৃজন করেন না, তিনি বাস করেন মানুষের মানচিত্রেও। সুতরাং বিমল মিত্রের উপন্যাসে মানুষের মানচিত্র, মানুষের ক্ষোভ ও বেদনার মিছিল থাকবে এটাই স্বাভাবিক।

তাঁর উপন্যাসে ইতিহাসের সঙ্গে মানুষ, মানুষের সঙ্গে জীবন যাপনের বিচিত্র শঠতা, নির্মমতা, প্রতিশোধস্পৃহা, একের ওপর অন্যের অধিষ্ঠান, মানুষের রক্তে মানুষের পা রাঙানো- সবই তিলতিল যত্নে তুলে ধরেছেন বিমল মিত্র। বিমল মিত্রের রচনা যে সবদিক থেকে নিখুঁত এমন দাবি অবশ্যই করা যুক্তিসঙ্গত নয়। তবু পক্ষ-প্রতিপক্ষের আলোচনা সমালোচনায় আলোড়িত বাংলা উপন্যাসের সমসাময়িক ইতিহাসে বিমল মিত্র বিশিষ্ট এক ব্যক্তিত্ব।