ধ্রুবজ্যোতি বাগচি

পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনার মত কলকাতায় এবার শীত পড়েছে জম্পেশ। প্রতিদিনই একটা নির্দিষ্ট তাপমাত্রার মধ্যে ওঠানামা করছে সর্বনিম্ন রৈখিক চালচিত্র। এমনই এক হিমেল সন্ধে বেলায় ভ্রাতৃপ্রতিম বন্ধু অলোক গোস্বামীর সঙ্গে বসা গেল অফিস পাড়ায়,পূর্ব নির্ধারিত এক পানশালায়। মদির আলোয় মুখোমুখি বসে শুরু হল কথাবার্তা পর্ব। ইচ্ছেটা কাজ করছিল দীর্ঘকাল যাবৎ। উত্তরবঙ্গে জন্মে পরবর্তিতে কর্মসূত্রে কিংবা অন্যকারণে যারা কলকাতাবাসী হয়ে লেখার জগতে স্বনামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, তাদেরই একজন অলোক গোস্বামীও। গল্পকার এবং ঔপন্যাসিক হিসেবে অলোক গোস্বামী ইতিমধ্যে সাহিত্য জগতে এক পরিচিত নাম। জীবনের অর্ধেকটা কাটিয়েছেন উত্তরবঙ্গে এবং তাঁর নিজের কথায়, জীবনের অধিকাংশ সময় কাটিয়েছেন উত্তরবঙ্গের শেকড়হীন মানুষদের সঙ্গে। সেই মানুষগুলোই তাদের জীবন চর্যাসহ স্বনামে কিংবা বেনামে প্রধান চরিত্র হয়ে দাঁড়ায় তার রচনায়। অলোকের এ যাবৎ প্রকাশিত গল্প সংকলন পাঁচটি- সময়গ্রন্থি, জলছবি, আগুনের স্বাদ, কথা কিংবা কাহিনি এবং দশটি গল্প। উপন্যাসের সংখ্যা দুটি– অদ্ভুত আঁধার এবং বাতিল নিঃশ্বাসের স্বর। সম্পাদিত গ্রন্থ–উত্তরায়ণ (উত্তরবঙ্গের লেখকদের গল্প সংকলন)। অজস্র পুরস্কার সহ ২০০৫ সালে পেয়েছেন বাংলা আকাদেমি পুরস্কার।

কথোপকথন

আমি- অলোক, আমার কলকাতায় চলে আসা ১৯৮৭ সালে। তুমি কবে এলে? চাকরি সুত্রে নাকি ট্রান্সফার নিয়ে। আমি যেমন মিউচুয়াল ট্রান্সফার নিয়ে চলে আসি নিজের তাগিদে। সংস্কৃতি জগৎ এবং সাহিত্য জগতে নিজেকে প্রকাশ করতে হলে কলকাতায় আসাটা জরুরি বলে মনে হয়। তোমার মতামত এবং কথা শোনা যাক এবার।

অলোক–দেখুন,কোলকাতার সঙ্গে যোগাযোগ অনেক আগে থেকেই ছিল। বইমেলা সহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নিয়মিত আসতাম। উত্তরবঙ্গের পাট চুকিয়ে পাকাপাকি ভাবে চলে আসি ২০১০ সালে। অর্থাৎ আপনি হলেন কোলকাতাবাসী, আর আমি হলাম নিছকই নবীন আগন্তুক। কেননা ১২ বছর না কাটালে বোধহয় বাসিন্দা বলাটা যথার্থ হয়না। কিন্তু আমাদের দুজনের একটা মিল আছে, সেটা হলো আপনার মত আমিও রীতিমত তদ্বির করেই কোলকাতায় বদলী হয়ে এসেছি। আবার তাতেও দুজনের মধ্যে ফারাক আছে। আমি এসেছি অনেকটা বেশী বয়সে। যে বয়সে মানুষ গৃহঋণ শোধ করে ফেলে, বাড়ির পলেস্তারা মেরামত করে, ছাদে ফুল চাষ করে পুষ্প প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করে, সেই বয়সে আমি শুরু করেছি জীবনের নতুন পর্ব। এবং সেটাও কিনা একটা মহানগরে, মফস্বলের তুলনায় যেখানে জীবনচর্যা কিনা পুরোটাই আলাদা। যেখানকার মানচিত্র ঠিকঠাক বুঝে উঠতেই অনেকটা সময় পেরিয়ে যায়! এখন প্রশ্ন হলো, কেন এলাম? দিব্যি তো উত্তরবঙ্গে জাঁকিয়ে ছিলাম! সেক্ষত্রে আপনার সঙ্গে অর্ধেকটা সহমত আমি। আমার লেখক পরিচিতি কিন্তু উত্তরবঙ্গ থেকেই পৌঁছে গিয়েছিল কোলকাতায়। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লেখাপত্র ছাপা হোতে কোন অসুবিধে ছিলনা। এমন কী উত্তরবঙ্গ থেকে আমিই প্রথম বাংলা আকাদেমি প্রদত্ত পুরস্কার পেয়েছিলাম। আমার আগে দক্ষিণবঙ্গবাসী লেখকরাই এসব পেতেন। আমরা শুধু তাদের শুভেচ্ছা জানাতাম। আমাকে দিয়ে শুরু, তারপরে আরও কেউ কেউ পেয়েছেন। তবে এটাও ঠিক, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের দিক থেকে কোলকাতা তো অবশ্যই বাংলার অন্যান্য শহর থেকে অনেকটাই এগিয়ে। যদিও তারও নানা কারণ আছে কিন্তু আমি আপাতত সে প্রসঙ্গে ঢুকব না। শুধু এটুকুই বলব, এখানে যে সাংস্কৃতিক পরিবেশ আছে তার সংস্পর্শে আসার লোভই আমাকে কোলকাতায় টেনে এনেছে। আরো একটা লোভ কাজ করেছে, সেটা হলো বহুমাত্রিক জীবনকে দেখার লোভ। গদ্য সাহিত্য রচনা করতে হলে জীবনের বহুমাত্রিকতাকে চেনাটা জরুরি। নাহলে দেখাটা একপেশে হয়ে যায়।

আমি- তোমার লেখালেখি কবে থেকে? আমার মনে পড়ে, শিলিগুড়িতে আমরা সবাই লিখতাম লিট্‌ল ম্যাগাজিনে। আশির দশকে। তখন একটা জোয়ার এসেছিল…

অলোক– জোয়ারটা এসেছিল তারও অনেক আগে, যেভাবে সবখানেই এসেছিল। তবে আমি লিখতে এসেছিলাম ১৯৮৩ নাগাদই। তখনও জোয়ারটা ছিল বটে। স্বীকার করা ভালো, তখন আমি নিছকই জোয়ারে গা ভাসিয়ে ছিলাম। সাহিত্য নিয়ে ততটা সিরিয়াস ছিলামনা। কবিতাই লিখতাম তখন। সিরিয়াসলি সাহিত্য নিয়ে ভাবতে শুরু করি নয়ের দশক থেকে। গদ্যকার হিসেবে তখন থেকেই আমার যাত্রা শুরু।

আমি- শিলিগুড়ি বা উত্তরবঙ্গের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসে সাহিত্য সাধনা করে প্রতিষ্ঠা পাওয়া যায় বলে তোমার মনে হয়? যারা বিখ্যাত হয়েছেন, তাদের কথা বাদ দিয়ে বল..

অলোক- ‘প্রতিষ্ঠা’ শব্দটা কিন্তু বিপজ্জনক ধ্রুবদা। কোনটাকে বলবেন প্রতিষ্ঠা? বই বিক্রির হিসেবকে? নাকি জনপ্রিয়তাকে? কোলকাতায় এসে এমন অনেক লেখককে দেখেছি যারা জনপ্রিয়, যাদের বিভিন্ন সভা সমিতিতে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয় অথচ তাদের বই বিক্রির অনুপাত তেমন কিছু নয়। পাবলিশার জোগার করতে তাদেরও ঘাম ঝরে। অথচ দূর থেকে আমরা তাদেরকে সফল ভেবে ঈর্ষা করি। আসলে মূলকথাটা হলো এমন কিছু লেখা ( অন্তত দুই চারটে হলেও) লিখে যাওয়া যেটা কিনা পাঠক মনে দাগ কেটে যায়। যেহেতু মননশীল পাঠকের সংখ্যা চিরকালই কম, এখন তো রীতিমত খরা চলছে, সুতরাং এমন লেখকদের বই বিক্রির সংখ্যা অবধারিত ভাবেই কম। জনপ্রিয়তাও কম। তা তারা যতই কোলকাতার বাসিন্দাই হোন না কেন। তবে এটাও ঠিক, শহর কোলকাতার একটা কূপমন্ডুকতা রয়েছে। অধিকাংশেরই ধারণা যা কিছু সেরা সবই কোলকাতার। বাংলার অপর নাম কোলকাতা। এই দৃষ্টিভঙ্গীর একটা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট আছে। বলতে পারেন এটা এক ধরণের পোস্ট কলোনিয়াল সিনড্রোম। পাশাপাশি এটাও সত্যি যে কোলকাতাকে আমরাই তোল্লা দিয়ে এসেছি বরাবর। কোলকাতায় বৃষ্টি হলে প্রত্যন্ত বাংলার তো বটেই, এমন কী অসম, ত্রিপুরার কালচারাল বাঙালিও বাড়ি থেকে ছাতা নিয়ে বের হয়। চিত্রটা যদিও বদলাতে শুরু করেছে তবে মোদ্দা কথা এটাই।

আমি- এখানে সাহিত্য জগতে প্রকাশের ক্ষেত্রে তোমার কাছে সবচেয়ে সহায়ক হয়েছে কোন্‌ পত্রিকা? লেখা ডাকে পাঠাতে পাঠাতে কি প্রতিষ্ঠিত কাগজগুলোয় সুযোগ পেলে?

অলোক–প্রতিষ্ঠিত কাগজ বলতে তো আনন্দবাজার হাউজকেই বোঝায়। হ্যাঁ, সেখানে আজও ডাকে লেখা পাঠানোটাই নিয়ম। কেউ পৌঁছে দিতে ওদের অফিসে যেতেই পারেন তবে সেখানেও একটা বাক্সে লেখা জমা করে আসতে হয়। ভেতরে ঢোকার নিয়ম নেই। আমি অন্তত এমনটাই জানি। কারো কারো ক্ষেত্রে এই নিয়মের ব্যতিক্রম আছে কিনা সেটা আমার জানা নেই। দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত আমার প্রথম গল্পটা ডাক মারফতই পাঠিয়ে ছিলাম। যেহেতু তখন আমারও ধারণা ছিল যে পরিচিতি না থাকলে লেখা মনোনীত হয়না তাই ওই গল্পেরই আরেকটা কপি জমা করেছিলাম স্থানীয় সংবাদপত্রে। দেশ কিন্তু আমাকে মনোনয়ন সংবাদ জানায়নি। হঠাৎই ওদের বিজ্ঞাপনে আমার নাম দেখে তাড়াতাড়ি স্থানীয় সংবাদপত্র থেকে গল্পটা তুলে নিয়েছিলাম। ওটা একটা রাজনৈতিক গল্প ছিল। দেশ-এ প্রকাশিত হওয়া মাত্র শোরগোল পড়ে গিয়েছিল। কোলকাতা থেকে প্রকাশিত এক পার্টি সংবাদপত্রে আমাকে যাচ্ছেতাই গালাগালি করা হয়েছিল যেটা কিনা অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজে এসেছিল।

আমি- দেশ,আজকাল,বর্তমান,সাপ্তাহিক বর্তমান, সানন্দা, তথ্যকেন্দ্র প্রভৃতি পত্রিকায় তোমার গল্প পড়েছি। এছাড়া বিভিন্ন লিট্‌ল ম্যাগাজিনে তো লিখছই। আমার জানা নেই এমন কিছু পত্র- পত্রিকার নাম জানতে ইচ্ছে করছে যে সব জায়গায় তুমি লেখ।

অলোক–এভাবে তো নাম বলা সম্ভব নয়। বিগত উনত্রিশ বছরে পশ্চিমবঙ্গ, অসম, ত্রিপুরা সহ বাংলাদেশের অজস্র পত্র পত্রিকায় লিখেছি। সব নাম মনে রাখা সম্ভব নয়। বিশেষ কিছু নাম উচ্চারণ করে বাদবাকিদের ছোট করাটা অর্থহীন। যারাই আমাকে সম্মান দিয়ে আমার লেখা প্রকাশ করেছেন তাদের সবার কাছে আমি কৃতজ্ঞ।

আমি–বাংলা আকাদেমি পুরস্কার পেয়েছ কোন্‌ গ্রন্থের জন্য? অনুভূতি কেমন?

অলোক–২০০৫-এ আগুনের স্বাদ গল্প সংকলনটির জন্য পুরস্কার পেয়েছিলাম। যদিও সাহিত্য পুরস্কার বলে কিছু হয়না। পুরস্কার তো একমাত্র পাঠকই দিতে পারেন, লেখা পড়ে এবং মনে রেখে। কোনো সংস্থা শুধু স্বীকৃতিটুকু জানাতে পারে। তবে যেকোনো কাজের স্বীকৃতিটুকুও তো অপরিহার্য। মনে আছে সম্প্রতি প্রয়াত কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তির হাত থেকে চেক, মানপত্র এবং পদক নিয়েছিলাম। সামনের দর্শক আসনে বসে ছিলেন আমার বৃদ্ধ পিতা, স্ত্রী এবং শিশু কন্যা। ওঁদের চোখে গর্বের ঝিকিমিকি দেখে আবেগ বিহ্বল হয়েছিলাম বৈকি।

আমি- তোমার ‘অদ্ভুত আঁধার’ পড়ে আমি মুগ্ধ হয়েছি। নিজে শিলিগুড়ির ছেলে হয়েও ওই উদ্বাস্তু কলোনির কাহিনী খুব সামনে থেকে না দেখলে লেখা অসম্ভব। এটা আমার মত। এই উপন্যাস লিখতে কত সময় লেগেছে? এবং চরিত্রগুলো, কাহিনীর প্রেক্ষাপট, রাজনৈতিক পটভূমি- সব ভীষণ বাস্তব। জানতে ইচ্ছে করে, এই উপন্যাস লেখার প্রেক্ষাপট।

অলোক–একটা সময় আমি ওই শ্রেণীর মানুষদের সঙ্গেই কাটিয়েছি। একদম ওদের স্বজন হিসেবে।ওতোদ অঞ্চলের ছেলেমেয়েদের প্রায় সন্ধ্যাতেই পড়াতে যেতাম। স্বেচ্ছায় ওই দায়িত্ব নিয়েছিলাম। সেই সুযোগে ওদের পরিবারের সংগে নিবিড় ভাবে মিশতাম। বুঝতে চেষ্টা করতাম ওদের। ওরাও আমার ওপর আস্থা রাখতো। যেকোনো সমস্যায় আমার পরামর্শ চাইত। বলাবাহুল্য কোনো রাজনৈতিক দাদারাই পছন্দ করতেননা আমার ওই যাতায়াত এবং ভূমিকা। আমার উদ্দেশ্যকে সন্দেহ করতেন। দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত আমার প্রথম গল্পটাও ছিল ওই বস্তির মানুষদের নিয়েই। মেহনতি মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করার নামে দুই কমিউনিষ্ট কিভাবে পরস্পরের সঙ্গে লড়াই করে সেটাই ছিল গল্পের বিষয়বস্তু। এ প্রসঙ্গে বলি, ওই গল্পের প্রধান চরিত্র, জানকিবালাকে গল্পটা দেখিয়ে ছিলাম। পরবর্তীতেও পথে ঘাটে জানকিবালাকে দেখলে কখনও এড়িয়ে যাইনি। এগিয়ে গিয়ে গল্প করতাম। আমার শ্রেণীর মানুষরা ব্যাপারটাকে সুনজরে দেখত না। না দেখুক, পরোয়া করিনি। কারণ আমি জীবন লিখি, নিছক গপ্পো নয়।

আমি- উপন্যাসের নায়ক বিজুর ফাঁসি সাম্প্রতিক অতীতের একটা ভয়ংকর ঘটনাকে মনে পড়ায়। …সে প্রসঙ্গ থাক। কিন্তু, সর্বহারা কলোনি, প্রমোদনগর কলোনি, উদ্বাস্তু কলোনির বাসিন্দাদের ভাষা, জীবন যাপন- খুব কাছে থেকে না দেখলে লেখা অসম্ভব।

অলোক–উত্তরটা আগেই তো দিলাম। তবে ইচ্ছাকৃত ভাবেই আমি অনতি অতীতের সঙ্গে উপন্যাসের পরিণতিটা মিলিয়েছি। কারণ এধরণের মানুষরা যে জীবন যাপন করে সেটা যেহেতু অদ্ভুত আঁধারে ডুবে থাকে তাই এরকম পরিণতি ঘটাটা আশ্চর্যের কিছু নয়। প্রচ্ছদটা খেয়াল করবেন, সেখানেও বিষয়টা বুঝিয়ে দিয়েছি। এমন কী বইটা উৎসর্গও করেছি রবীন্দ্রনাথের শাস্তি গল্পের নায়িকা চন্দরাকে, যাকে সমাজ এবং সম্পর্ক ফাঁসীতে ঝুলে পড়তে বাধ্য করেছিল। অনেকটাই আমার উপন্যাসের প্রধান চরিত্র বিজুর মতই।

আমি–এখনকার সাহিত্য সম্পর্কে কি মত?

অলোক–সাহিত্যের এখন তখন হয়না। সাহিত্য যেহেতু জীবনাশ্রয়ী তাই জীবন যাপনের বদলের সঙ্গে সঙ্গে সাহিত্যের আঙ্গিকটুকু বদলায় মাত্র, মূল বিষয় একই রয়ে যায়।

আমি–এখনকার কোন্‌ কোন্‌ কবি, লেখক, প্রাবন্ধিকের লেখা ভালো লাগে ?

অলোক–অনেকেই আছেন। শুধু তো দেশী নয়, বিদেশী লেখাও পড়ি। পড়ি এপার ওপার দুপার বাংলারই লেখা। কোনো কোনো রচনা পড়ে মুগ্ধ হই, আবার সেসব লেখকেরই কোনো কোনও রচনা দাগ কাটে না। তবে ইলিয়াসের কোনো লেখাকেই বাদ দিতে পারিনা। বিদেশী সাহিত্যের ক্ষেত্রে বলি,বেশ কিছুদিন হলো মিলান কুন্দেরায় মুগ্ধ হয়ে আছি।

আমি- বইমেলায় কোনও বই এবার বের হল?

অলোক–পুনশ্চ প্রকাশনী থেকে বেরিয়েছে দশটি গল্প।

আমি–ঘুরতে ভালবাসো জানি। পাহাড় না সমুদ্র-কোন্‌টা টানে?

অলোক–পাহাড় এবং সমুদ্র, একটাকে বাদ দিয়ে অপরটা গ্রহণ করা যায় নাকি। দুটোতেই অনির্বচনীয় তৃপ্তি। তবে যেহেতু পাহাড়ের দেশের লোক তাই যতটা পারি সমুদ্রের কাছেই যাবার চেষ্টা করি।

আমি–আবার শিলিগুড়ি বা উত্তরবঙ্গে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে?

অলোক–একবার কোনো জায়গা ছেড়ে এলে সেখানে আর কোনোদিন ফেরা যায়না। সম্ভব নয়। কারণ স্মৃতি কাতরতা একটা আকাঙ্খা তৈরি করে বটে কিন্তু ফিরে গেলে দেখা যায় সেই অনুভূতি, ভালো লাগা সবকিছু ঠিকঠাক মিলছে না। কোথায় যেন বেসুরো বাজছে। তখন আফশোস জাগতে বাধ্য। তারচে আকাঙ্খাটা বুকে চেপে রাখাই ভালো।

আমি– লিটল ম্যাগাজিন নাকি বাণিজ্যিক পত্রিকা, কোনটা এখন তোমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ? কেন?

অলোক–এক কথায় ‘কোনটা‘ কিংবা ‘কেন’র উত্তর দেয়া সম্ভব নয়। আপাতত বলতেও ইচ্ছে করছে না। পরে কখনো। তবে এটুকু বলি, ঝড় ঝঞ্ঝায় কই মাছ কখনও সখনও পুকুর পাড়ের তালগাছ বেয়ে উঠে পড়ে কিন্তু তাবলে কইমাছকে কেউ বৃক্ষবাসী বলেনা। সম্প্রতি সাহিত্য অকাদেমি আমাকে বক্তা হিসেবে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল, বিষয় ছিল লিটল ম্যাগাজিনের স্থানাঙ্ক নির্ণয়। এই আমন্ত্রণ আমাকে সম্মানিত করেছে। মনে হয়েছে, এ যেন আমারই স্থানাঙ্ক নির্ণয়। আর একটা কথা, আমি এখনও লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত আছি। তবে বাণিজ্যিক কাগজে লিখলে যেহেতু অনেকের কাছে পৌঁছাতে পারা যায় তাই ওখানেও খানিকটা মায়া রয়েছে। সাহিত্য জগত নির্মাণের ক্ষেত্রে বড় পত্রিকারও ভূমিকা রয়েছে।

আমি- এখনও কি লিখতে চাও! মানে কোন বিষয়ে এখনও লেখনি?

অলোক–কোন বিষয়েই বা ঠিকঠাক লিখে উঠতে পারলাম! ছাপা হওয়ার পর নিজের লেখা নিজেই পড়তে পারিনা। অজস্র ত্রুটি পীড়া দেয়। ভাবি, কবে আর লিখতে শিখব? তবে শিখতে হবেই। ব্যক্তি জীবন, রাজনীতি, যৌনতা, মৃত্যুকে বিষয় করে সার্থক লেখা লিখতেই হবে। তবে এপ্রসঙ্গে একটা কথা বলি, কি লিখতে চাইনা সেটা কিন্তু জানি।

আমি- কি সেটা?

অলোক–মানুষ ভোলানো লেখা।

আমি- অনেক ধন্যবাদ অলোক সময় দেওয়ার জন্য । এবার কিছু সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন করব। এক কথায় উত্তর দেবে।

র‍্যাপিড ফায়ার-

ক) শিলিগুড়ি যাওয়া হয়?

–তাতো হয়ই। পথঘাট ডাক পাঠায় যে!

খ) শিলিগুড়ির জন্য মন কেমন করে?

–দিনে নয়, রাতে ঘুমের মধ্যে শিলিগুড়িতেই ঘুরে বেড়াই।

গ) উত্তরের কোন্‌ কোন্‌ কাগজ, পত্র-পত্রিকা এখন ভালো লাগে? ‘উত্তর বঙ্গ সংবাদ’-এ লেখো?

–এখন আমন্ত্রণ ছাড়া কোথাও লিখিনা। উত্তরবঙ্গ সংবাদ যখন আমন্ত্রণ জানায় তখন লিখি।

ঘ) উত্তরের সম্ভাবনাময়, প্রতিশ্রুতিমান কবি, লেখক কারা এখন?

–তেমন কোনো নাম মনে পড়ছে না।

ঙ) অবসর বিনোদন?

–বই, গান, ভ্রমণ এবং অবশ্যই পানীয়।

চ) কফি হাউজ এবং শিলিগুড়ির বই পাড়া, বা সাহিত্যকেন্দ্রিক আড্ডার মধ্যে ফারাক খুঁজে পাও?

–বিস্তর ফারাক।

ছ) নিজের লেখার কোন গুণটা তোমার পছন্দ?

–কথনভঙ্গী।

আমাদের আলাপচারিতা এদিনের মত শেষ হলো। অফিস পাড়ার ব্যস্ততা এখন নিবু নিবু। দুজনেই সেন্ট্রাল মেট্রো স্টেশন থেকে দু দিকের গন্তব্যে রওনা দিলাম। আমি যাব উত্তরে । অলোক দক্ষিণে। তবে আবার দেখা হবে। এভাবেই ফের বসব দুজনে। প্রচুর কথা হবে।