জয় দাস

প্রতিটি মানুষ বাঁচে তিনটি সময়ের সঙ্গে– অতীতের অভিজ্ঞতায়, বর্তমানের দ্বন্দ্বে আর ভবিষ্যতের স্বপ্নে। কালের এখনরা আজ তখন হয়ে গেলেও অতীতের ‘দ্বৈত’দের মন আটকে রাখে বর্তমানের ‘অদ্বৈত’ মুহূর্ত রূপে। অনুভূতি প্রেম পুড়ে পুড়ে হয় নিখাদ, বদলায় শুধু প্রতিমারা… সারাজীবন অশান্তি ভোগ করার অভিশাপ পেয়েও, প্রেমিক যে অহংকারে বলে তার প্রেম চাই, সেই অহংকারকেই উৎসর্গ করেছে কবি দেবায়ন চৌধুরী তার ‘যা কিছু আজ ব্যক্তিগত’ কাব্যগ্রন্থটি:

‘যারা ভালোবাসে
কষ্ট পায়
আবার ভালোবাসে’

তাই ‘যা কিছু আজ ব্যক্তিগত’ কাব্যটি পড়তে পড়তে মনে হয় না এই অনুভূতি শুধুমাত্র কবির একান্ত অনুভব, মনে হয় এ আমাদেরও ‘গোপনীয় রং’… আদতে আমরা সকলেই ‘প্রেমস্থ বিড়াল’!

‘রাধাচূড়া কৃষ্ণচূড়া জানে/ বসন্তে আজ ফুল ফোটানোর মানে’- প্রেমিক মাত্রই জানে ভালোলাগা’কেই বসন্ত বলে… এই ঋতু এমন, দিনে দিনে রং হয় গাঢ়, ‘মেয়েরা নাকি অনেক কিছু বোঝে/ ওকে দেখেই পেয়েছিলাম টের।’ এই ‘টের’ পাবার অনুভূতিদের দেবায়ন ব্যক্ত করেছে তার টুকরো টুকরো কবিতার (দু’তিনটি বড় কবিতাও আছে) মাধ্যমে। আসলে মুহূর্তরা টুকরোই হয়। না পাবার বেদনা, স্বপ্ন– দেবায়নের কাব্যের শিরায় শিরায়। এই বেদনা কবিকে ধ্যানী করে তোলে, দেখার চোখ স্পষ্ট করে তোলে, যেমন- ‘দাঁত দিয়ে টুকরো একটা কামড়/ আলতো ভেজা, সূঁচের ভেতর সুতো’ কিংবা ‘দুপুর তখন মেয়েমানুষের আঁচল/ মুখ মুছে নেয় রান্না উনুন শেষে’ কিংবা ধরুন ‘নখে নখে চলে মন খারাপের ছোঁয়া’ এরকম আরো অনেক অনুভূতির বাহ্যিক প্রকাশ, বলা ভাল রসধ্বনির ব্যঞ্জনার উদাহরণ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে দেবায়নের স্মৃতির রোমন্থনে, তার কাব্যের শরীরে।

আমাদের সবার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মন কেমনের দুপুর, কোনও এক নির্জন পরিসরে আমরা হৃদয়ের তালা খুলি– ‘মনে পড়ে গন্ধেরা চিঠি বিলি করে/ ভাগ্যিস চাবি নেই হৃদয়ের ঘরে!’ আমাদের ‘হৃদয়ের জরা’র অনুভূতি আছে, ভাষা নেই, কিন্তু দেবায়নের ভাষা আছে তাই কবিতাগুলি পড়তে পড়তে মনে পড়ে ‘মাশকারা চোখ, আশকারা মন, স্বর্গচেরা…’ বহুদিন পরে যে মুহূর্তরা নাড়া দিয়ে যায় তারা দীর্ঘশ্বাসে বলে- ‘চোখের জলে পদ্য হবে/ পাথর হৃদয় আগুন জ্বালাক/ আমাদের যত ব্যর্থতা সব/ শান্তিমত সন্ততি পাক।’ চাওয়া পাওয়ার হিসেব মিলিয়ে যায় সম্পর্কের সিঁড়িভাঙায়, অকপটে বেরিয়ে আসে ‘একটা ঝিনুক, একটু হাসি’র কাহিনিরা। সম্পর্কের বাঁধা ছকের বাইরে দেবায়নের কবিতারা পাঠকের মন ছুঁয়ে যায়, তাতে থাকে না একটুও কলঙ্ক দাগ… কেননা কবির মতে- ‘ঠোঁটের পলি তুলতে গেলে জানায়/ স্মৃতির দাগে লজ্জা থাকতে নেই!’

কয়েকটি পংক্তি হৃদয়ে দাগ কেটে যায় যেমন– ‘ওরা ঠোঁট দিয়ে মুখ বন্ধ রাখে/ বিশ্বাস হয় না পুরোপুরি ভালোবাসাটাকে!’ কিংবা ‘যত ঘুম ঘুমিয়েছি এ জীবনে জন্মান্তর হয়ে যেতো/ একবারও তবু মৃত্যু এলো না চেখে দেখবার মতো!’ তবে শুধু মৃত্যু ব্যর্থতার কথাই কবি আমাদের শোনায়নি, শুনিয়েছে আশার কথাও ‘ভালোবাসা আজ আমার সাথে থাকিস/ বিরহ তুই আসিস না হয় কাল’। মানুষের মধ্যে যে ‘অতলস্পর্শ বিরহে’রা আছে তারই কাব্যিক রূপ দিয়েছে কবি তার কাব্যগ্রন্থে- ‘পুড়তে পুড়তে গোটা শরীর হয়েছে ছাই/ উড়তে উড়তে শেষে তোমার দিকে যাই’ সেই পোড়ার জ্বালা আমরা ভালোবাসি তাই ভালোবেসে কষ্ট পাই আবার ভালোবাসি, কারণ আমরা জানি ‘শেষ ব’লে কিছু বুঝি শেষ হয় নাকো/ যেখানেই থাকো আর যেভাবেই রাখো।’

ছোট ছোট টুকরো মুহূর্তের সঞ্চয় হল দেবায়নের কবিতা, নামহীন, কেননা মুহূর্তরা ভূমিকাহীন। ছন্দও দুএকটি ক্ষেত্রে সাবলীল নয় তবে বিরহের সুরে ছুঁয়ে থাকে মন। ছন্দপতনের নির্দিষ্ট ছন্দ হয় নাকি কোনো? প্রচ্ছদও খুব সুন্দর। তিনটি রঙের খেলা, কালো সাদা আর নীল। সিঁদুরের মতো লাল রং দিয়ে গ্রন্থনামের ‘আজ’ কথাটি লেখা। আমরা জানি হৃদয়ের রং লাল। প্রচ্ছদটি যেন হয়ে ওঠে কাব্যগ্রন্থের আয়না। কবিতার বইটি বলা ভাল একবার শুরু করলে শেষ না করে রাখা দায়। এক একটি অনুভূতি কবিতা রূপে উপস্থাপন করে দেবায়ন; একটি কবিতা শেষের পর মন স্বভাবতই উৎসুক হয়ে ওঠে পরের অনুভূতিটি কী তা– জানার জন্যে। পাঠকের হৃদয়ের ভাঁজ খুলে খুলে দেবায়নের কবিতারা হাত দেয় মনের কোঠরে রাখা গোপন যন্ত্রণায়। ছোট হবার কারণে দু’একটি কবিতাদের চালান করা যায় SMS-এ মনখারাপের ঠিকানায় কিংবা Facebook Wall-এ। নিজের মনকেমনের সময়কে মিলিয়ে দেখুন দেবায়নের কবিতার সঙ্গে, দেখবেন আপনাদের অনুভূতিরা ভাষা পেয়ে যাবে…

‘আমাদের ভালোবাসা খড় ও খড়কুটো

কে যে কাকে ধরে অতীত ও আগত!’

—–
যা কিছু আজ ব্যক্তিগত
দেবায়ন চৌধুরী
প্রকাশক- কমলিনী
পরিবেশক- দে’জ পাবলিশিং
প্রথম প্রকাশ- সেপ্টেম্বর, ২০১৪
প্রচ্ছদ- দেবাশিস সাহা
মূল্য- ৬০টাকা