ঋষিগোপাল মণ্ডল

এরপর যারা ভেবেছিল কাশ্মীরে পাহাড়ের কোলে জমি কিনবে একফালি আর আপেল চাষ করবে অফুরান, তাদেরই একজন বৃষ্টি মাথায় আর অঙ্গশোভা বস্ত্রালয়ের চিকচিকি মাথায় সাইকেলে চলে গেল ডিম আনতে বেপাড়ার মুদির দোকানে। এ পাড়ার দোকান আজ বন্ধ। দোকানির ফুটো চাল দিয়ে সারারাত জল পড়েছে খাস আতপ চালের বস্তায়। সোনামুগ ঢেলে সেই চালের খিচুড়ি হবে আজ। বোঁটা সমেত লম্বা লম্বা বেগুন ভাজা। খেলনা গাড়ির গোল গোল চাকার মতো আলুভাজা। ডিমওয়ালা ইলিশ নিয়ে ফেরার পথে ডিম আনতে যাওয়া পড়শি সাইকেলের সঙ্গে দেখা হয়েছিল মুদির। দু’জনেই একসাথে বলে উঠেছিল, ‘আর বলিস না, ক’দিন ধরেই যা শুরু হয়েছে।’ বলে হেসেছিল দুজনই।

বাবা ইলিশ নিয়ে বাড়ি ঢুকতেই মুদির মেয়ে নেচে নেচে বলে উঠল, “আজ আমাদের ফিস্টিইইই।” পাড়ার লোক বলে এই মেয়েটিকে অনেকটা কাশ্মীরি বালিকার মতো দেখতে। ডিম আনতে যাওয়া আম আদমির ভিজে যাওয়া, বস্তা ভর্তি খাস চালের ভিজে যাওয়া, ডিমভর্তি ইলিশ নিয়ে ফেরা লোকের ভিজে যাওয়া আর কাশ্মীরী বালিকার মতো দেখতে সমতলের বালিকার খুশির ঈ-কার গুলো একসাথে ভিজে ঝুপ্পুস হয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর বৃষ্টি ধরে এলো।
তবুও পড়ছিল। ঝিরঝির।

বাড়ির গেটের উত্তর কোণে দেবদারু গাছটার উপর সেই ঝিরঝির হতেই পাড়াটা বিলকুল বা বাখুদা কাশ্মীর হয়ে গেল। ঝিরঝিরগুলো বরফকুচি। খুশির ঈ-রওয়ালা মেয়েটার নাম কী ছিল কে জানে! এখন থেকে, এই মুহূর্ত থেকে ও হয়ে গেল ইস্মাতারা। এর কিছু পর ৩৭০ ধারার বিন্দু বিসর্গ না জেনেই পাড়ায় অনেকক্ষণ পাড়ায় শ্রাবণ ঝরেছিল ঝিরঝিরিয়ে।

‘তাসের ঘর’-এর জানালা থকে ঋতুপর্ণ এসব দেখছিলেন আলগোছে। চিবুকে হাত। যেমন দেখেন। তেমনই। মাথায় বাঁধনির ওড়না পাগড়ির মতো জড়ানো। যেমন জড়িয়ে থাকে মায়া কৃষ্ণবর্ণ প্রেমিকের ঠোঁটে আর তর্জনীতে। তেমনই। ঋতুপর্ণ যেহেতু ফেসবুকে নেই তাই কাশ্মীর আর ৩৭০ নিয়ে ওখানে তার কোনও এক্সপার্ট কমেন্টও নেই। সন্ধ্যারঙের মলাটের এক ডাইরির পাতায় ঋতু লিখলেন, “সঘন শাওন লায়ি কদম বাহার মথুরা সে ডোলি লায়ে চার কাহাঁর।” এরপরই ঝেঁপে বৃষ্টি নামল। তোমরা হাওয়ামোরগরা আর তোমাদের হাওয়া অফিসরা যে বৃষ্টিকে মুষলধারে বলো। তেমনই।

বৃষ্টি মাথায় করে চারজন কাঁহার এসে দাঁড়ালো তাসের ঘরের দুয়ারে। মথুরা থেকে এসেছেন। কুসুমাস্তীর্ণ ডোলিতে ঋতুকে নিয়ে যাওয়ার সময় ঋতু মিষ্টি করে হাতফাত নেড়ে বললেন, “অ্যাই এক মিনিট দাঁড়া তো তোরা। আমি আসছি।” বলে ঘর থেকে ঋতুস্রাব নিয়ে ফেবু ফেমিনিস্টদের ‘সাহসী’ আর বদরক্তময় পোস্টের পাহাড় নিয়ে এলেন এক হাতে। অন্য হাতে ছোট স্তনের মেয়েদের কষ্ট। কষ্টগুলোকে বুকের সঙ্গে আঁকড়ে ডোলিতে বসে পড়লেন সুতানুটির সম্রাজ্ঞীর মতো। সাহসী পোস্টগুলো কাঁহারদের হাতে দিয়ে বললেন, “মথুরা ফেরত যাওয়ার পথে ধাপার মাঠ পড়বে, ওখানে ছুড়ে ফেলে দিস এক টান মেরে। কিরে চার মূর্তি, বুঝলি তোরা! যত্তসব!”

এই ঘটনার কিছুক্ষণ পর যখন বাংলা নিউজ চ্যানেল ব্রেকিং দিচ্ছিল “ঋতুপর্ণ ঘোষের প্রয়াণ” আর আলফাল বলছিল বাংলা চ্যানেলের বাচাল অ্যাংকর ঠিক তখনই দমকা হাওয়ার সঙ্গে তুমুল বৃষ্টি নামলো আবার। হাওয়ারা, ভেজা হাওয়ারা বিলাপ করে উঠলো…তু না আয়ে…তু না আয়ে…কেশরিয়া বালমা হামার…অঙ্গনা বঢ়া শুনশান…
কত একাকী উঠোন ভিজে যাচ্ছে এই শ্রাবণে, জানো!