ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

মহিষাসুরমর্দিনী দুর্গাবৃত্তান্তের খলনায়ক হল অপরাজেয় দোর্দণ্ডপ্রতাপ মহিষাসুর। এবার সে কে ছিল? কীভাবেই বা তার জন্ম? বিপদে পড়লে দুর্গানাম জপতে বলাই বা কেন?
বরাহপুরাণ মতে, বিপ্রচিতি নামক দৈত্যের মাহিষ্মতী নামে একটি মেয়ে ছিল। ছোট মেয়ে খেলার ছলে সিন্ধুদীপ নামে এক তপস্যারত ঋষির সামনে গিয়ে মহিষের বেশে তাঁকে ভয় দেখাতে লাগল। ঋষির তপস্যা তো লাটে উঠল। ক্রুদ্ধ ঋষি ছোট মেয়েটিকে তখন ‘‘তাহলে মহিষ‌ই হয়ে যাও’’ বলে অভিশাপ দিলেন। সেই মহিষরূপী মাহিষ্মতীর গর্ভে যে পুত্রসন্তান হল তার নাম মহিষাসুর।
কালিকাপুরাণে বলে, মহিষাসুর হল রম্ভাসুরের পুত্র। প্রবল ক্ষমতাশালী রম্ভাসুর মহানন্দে এক সুন্দরী রমণীকে বিবাহ করে। বিবাহ করে ফেরার পথে আর এক অসুরের দ্বারা রম্ভাসুর নিহত হয়, আর তার নবপরিণীতা স্ত্রী কিছুদিন পর জন্ম দেয় মহিষাসুরের। যে কি না মহাদেবের আরাধনা করে দেবী দুর্গার সাযুজ্যলাভের বরলাভ করে। এ ছাড়া কঠোর তপস্যার দ্বারা ব্রহ্মার কাছ থেকেও সে অমরত্ব পায়। ব্রহ্মা যেমন মহিষাসুরকে অমরত্ব দিলেন তেমনই বললেন একমাত্র নারীশক্তিই তাকে বধ করবে।
একের পর এক বরলাভের পর এই মহিষাসুরের দাপট ক্রমশ বাড়তেই থাকে।
পুরাণ আর শাস্ত্রের পাতায় আমরা দেখি এক অসামান্যা নারীকে আবির্ভূতা হতে যাঁর একহাতে বরাভয়, অন্য নয় হাতে অস্ত্র। দশপ্রহরেণ সেই দেবীশক্তির হাতে পরাজিত হয় মহিষাসুর। এবার দেখা যাক এই দেবীশক্তির রহস্যের পিছনে কোন ঘটনা ছিল। পুরাণে একটি সুন্দর গল্প রয়েছে এই নিয়ে। সুরথ নামে অতি প্রাচীন বঙ্গে এক দয়ালু, প্রজাবত্সল রাজা ছিলেন। তাঁর রাজধানী ছিল বলিপুর (মতান্তরে বর্তমানের বোলপুর)। মার্কণ্ডেয় পুরাণ অনুযায়ী এই সুরথ রাজাই বঙ্গদেশে প্রথম দুর্গাপূজা করেছিলেন। (মহিষাসুরমর্দিনী দুর্গা: স্বামী প্রজ্ঞানানন্দ)
কাশ্মীরের যবন শত্রুদের আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে এই সুরথরাজা তাঁর অমাত্যগণ কর্তৃক রাজ্যপাট থেকে বঞ্চিত ও বহিষ্কৃত হন। (দুর্গা রূপে রূপান্তরে: পূর্বা সেনগুপ্ত)
তখন মনের দুঃখে ক্ষমতাচ্যুত সুরথ মৃগয়ার অছিলায় ঘোড়ায় চেপে গহন অরণ্যে পাড়ি দিলেন। সেই শ্বাপদসংকুল অরণ্যে তাঁর দেখা হল বৈশ্য সমাধির সঙ্গে। বৈশ্য সমাধিও জানালেন যে, তিনিও ধনী পরিবারের সন্তান৷ কিন্তু বর্তমানে আত্মীয়-পরিজনের দ্বারা বিতাড়িত ও ক্লিষ্ট। সুরথ বললেন, যদিও তিনিও তাঁর স্বরাজ্য থেকে বিতাড়িত তবুও এই পাণ্ডববর্জিত অরণ্যে এসেও তিনি ভুলতে পারছেন না রাজ্যের কথা। ঠিকঠাক রাজ্যপাট চলছে কি না, কর্মচারীদের বেতন দেওয়া হচ্ছে কি না, এইসব চিন্তা তাঁকে কুরে কুরে খাচ্ছে। সমাধি বৈশ্যও বললেন, তিনিও মন থেকে তাঁর আত্মীয় পরিবারকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারছেন না। এখন তাঁর মন উচাটন তাদের কুশলবার্তা লাভের জন্য। এভাবে দুজনের বিলাপ চলতে চলতে অবশেষে তাঁরা জঙ্গলের মধ্যে হাজির হলেন মেধাতিথি ঋষির আশ্রমে। দুজনেই ঋষি মেধাতিথিকে প্রশ্ন করলেন তাঁদের এই মানসিক টানাপোড়েন নিয়ে।
কেন তাঁদের এমন মানসিক অবস্থা? যারা তাঁদের ত্যাগ করেছে তাদের জন্য কেন এখনও অনুশোচনা জাগছে? তাঁরা নিজেরা তো কোনও অন্যায় করেননি।
ঋষি মেধাতিথি তখন তাঁদের প্রশ্নের উত্তর দিলেন।
মহামায়ার স্বরূপ ব্যাখ্যা করলেন তিনি, চণ্ডীর রূপে যা আজও পরিচিত। মেধাতিথি বললেন, যে বিষয়সমূহের জন্য আপনাদের আজ এত দুঃখ, তার নাম‌ই হল মায়া। সমগ্র জীবকুল এই মায়ার কাছে পরাজিত। জীবগণের সংসারমোহ, প্রিয়জনের প্রতি মমত্ববোধ সব কিছুই মহামায়ার প্রভাবে হয়। এই মহামায়াই হলেন বিষ্ণুর যোগনিদ্রা থেকে উত্পন্ন এক শক্তি। যা সকল জাগতিক শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে। রাজা সুরথ তখন কৌতূহলভরে মেধাঋষির কাছে জানতে চাইলেন মহামায়ার উত্পত্তি সমূহ আখ্যান।
মেধাঋষি বলতে শুরু করলেন:
যেহেতু ব্রহ্মার বরে মহিষাসুর দেবাসুর-দানবের অবধ্য হলেও স্ত্রীশক্তির দ্বারা বধ্য হবে তাই বুঝি ঋষি কাত্যায়ন সকল দেবতার তেজ এবং ক্রোধানলের শক্তি ও দিগন্তব্যাপী সংহত তেজ দিয়ে তৈরি করলেন এই কাত্যায়নীকে।
গভীর গর্জনে আকাশ-বাতাস ধ্বনিত হল। দেবীর সিংহনাদে দশদিশি কম্পিত হল। পৃথিবী ও পর্বতসকল বিচলিত হল। দেবগণ সানন্দে সিংহবাহিনী দেবীর জয়ধ্বনি দিলেন। মুনিগণ দেবীর স্তব শুরু করলেন। অসুরগণ দেবতাদের মারতে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ধেয়ে এল। শুরু হল প্রবল যুদ্ধ।
বিন্ধ্যপর্বতে এই তিলোত্তমা দেবী মহামায়া বা কাত্যায়নী সসৈন্যে অগ্রসর হয়ে অচিরেই বধ করলেন মহিষাসুর নামক দোর্দণ্ডপ্রতাপ দৈত্যকে। আর, মহিষাসুর বধ করেই দেবীর অপর নাম হল মহিষাসুরমর্দিনী।
মেধাতিথি বললেন, বিপদে ও সংকটে মহামায়ার শরণ নিলে জীবের সকলপ্রকার ভীতি নাশ হয় ও তিনি জীবকে শুভবুদ্ধি দিয়ে সত্পথে চালিত করেন। অতএব রাজা সুরথ ও বৈশ্য সমাধি যেন এই মহামায়ারই শরণ নেন। তবেই তাঁদের সকল দুঃখ ঘুচবে। মেধাতিথির মুখে মহামায়ার এই আখ্যান শুনে এবং তাঁর উপদেশে রাজা সুরথ ও সমাধি বৈশ্য মহামায়ার কৃপালাভের উদ্দেশ্যে নদীর তীরে তপস্যা শুরু করলেন। মাটি দিয়ে দেবীমূর্তি তৈরী করে নিয়মিত মন্ত্রজপ ও কঠোর তপস্যার জীবনযাপন শুরু করলেন। তাঁদের তপস্যায় মহামায়া অবির্ভূতা হলেন। মৃণ্ময়ী দেবী চিন্ময়ী রূপ পেলেন। সমাধি বৈশ্য মহামায়ার কাছে ঐহিক সংকট থেকে মুক্তি চাইলেন। আর রাজা সুরথ তাঁর হৃত সিংহাসন ফিরে পাওয়ার জন্য প্রার্থনা জানালেন। দেবী বৈশ্য সমাধিকে মোক্ষ ও রাজা সুরথকে বাসনা পূরণের বর দিলেন৷