অ্যালবার্ট অশোক

কনসেপচুয়াল আর্ট, বাংলায় বলা যেতে পারে ধারণাগত বা ভাবনাজারিত শিল্প। এই ধারণাগত বা ভাবনা জারিত শিল্পটা কি? সংক্ষেপে যদি বলি, সংজ্ঞায়িত করি তাহলে বলতে হয়– শিল্পীর ধারণা বা ভাবনা বা কথা শিল্পে মুখ্য বিষয় হয়ে উঠে। মানে শিল্পের কাজ শিল্পীর ভাবনাকে বহন করা। তাতে চলতি শিল্প মূল্যবোধ, কলাকৌশল বা নান্দনিকতা গৌণ হয়ে যায়। দর্শককে আনন্দ বা কোন বিশেষ বার্তা বা ইঙ্গিত দেওয়াই মুখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

পৃথিবী এখন অনেক জটিল। তার রাজনীতি, অর্থনীতি ও মানুষের জীবনযাপন। এই সময় মানুষের সুন্দর জিনিসের প্রতি বিলাসিতার চেয়ে অধিক প্রয়োজন তার ভাবনা বিস্তৃত করা। সমাজ, রাষ্ট্রকে উন্নত স্তরে পৌছানো। ভাবনার আদান প্রদান করা। ছবি শুধু সুন্দর হবে এই ধারণাকে নস্যাৎ করে দেওয়া।

ষাটের দশকের মাঝামাঝি Marcel Duchamp (ফরাসি আমেরিকান, ভাস্কর), Yves Klein (ফরাসি, ৩৪ বছর বেঁচেছিলেন) Piero Manzoni (ইতালি, ৩০ বছর বেঁচেছিলেন) প্রমুখরা এই ভাবনাজারিত ছবির ধারা আনেন।

আমাদের ভারতে, অধিকাংশ শিল্পী, পটুয়া, দামী পটুয়া। তারা ছবিতে ভাবনা রাখেন কম। নাই বললেই চলে। দেবদেবতার ছবি আঁকেন, রং ক্যানভাস থেকে ফ্রেম অবধি টাকা লগ্নি করেন ও ব্যবসা করেন। অসুবিধার কিছু নেই, মানুষ যা ভালবাসে তা কেনে (এছাড়া এই পরিস্থিতির জন্য শুধু শিল্পীরা দায়ী নয়, বাংলার জনসাধারণও দায়ী, তারা অধিকাংশই চাকরি বা পেশার জন্য পুথিঁগত শিক্ষিত, মানসিক চাতনায় একদম অশিক্ষিত)।

কিন্তু শিল্পের একটা গতি আছে। স্রোত আছে। মানুষের মনের বিকাশ আছে। সেই বিকাশ কিন্তু পটুয়ারা আনেননা। বিকাশ আনে কিছু শিল্পী যারা মেধার চর্চা করেন, প্রকৃতি সমাজ, চলতি জগৎ, প্রতিদিনকার জীবন যাপন উপলব্ধি করে যারা সময় ব্যয় করেন। ছবি আঁকাটা একটা ভাষায় রুপান্তরিত করেন যে ভাষাতে পৃথিবীর সকল জনসাধারণ বুঝে নিতে পারে। অধিকাংশ শিল্পী যা করেন তা হল একটা অবয়ব সৃষ্টি, ভাস্কর্যে বা ছবি এঁকে। হয় দেব দেবতা, নয় মেয়ে মানুষের মুখ, না-হলে কিছু দৃশ্যগত চিত্র।

যারা দক্ষ তারা এই অবয়বের উপর কিছু টেকচার বা বুনোট তৈরি করে বা আরও কিছু আঁকিবুকি করে পণ্যতে পরিণত করে বাজারে আনেন। এই সব ছবি কিন্তু ভাবনা কেন্দ্রিক বা ভাবনা উদ্রেক নয়। চোখের কাছে বিলাসিতা। হ্যাঁ, আমাদের ঘরের দেওয়াল সাজাতে ছবির দরকার হয়। আমাদের মনেও তো ক্ষিধে তৈরি হয়। শুধু রুটি খেয়েতো বাঁচি না। মন ও ভাবনার জন্যও কিছু দরকার হয়।

ছবির মধ্যে একটা জায়গা আছে তা হল নান্দনিকতা। আপনার রুচি বোধ শিক্ষাদীক্ষা এর মূল উৎস। সমাজের নীচু স্তরে, যারা অশিক্ষিত, শ্রম বিক্রী করে তাদের একরকম চাহিদা ও জীবনবোধ। আবার যারা অট্টালিকায় থাকে, মগজ বা অর্থ নাড়িয়ে চাড়িয়ে সুখে থাকে তাদের একরকম চাহিদা ও মূল্যবোধ। আপনার অবস্থান শিল্পসাহিত্যের আঙ্গিনায় এসে নিরূপণ করা আগে দরকার। না হলে আপনি এগুতে পারবেন না।

সমীর আইচ (১৯৫৬) তাঁর জীবনের শুরুর দিকে অ্যাপ্লাইডআর্ট বিজ্ঞাপন জগতে বহুদিন সার্থক ভাবে কাজ করেছেন। তিনি জানেন মানুষের অন্তরে প্রবেশ করতে হলে ক্যানভাসটাতে দর্শকের মনকে বেঁধে দিতে হবে। তার ছবিতে দেখুন কি মোলায়েম রং, জাদুকরীর স্বপ্ন মাখা থাকে। ওইরকম সন্মোহন পড়াশুনা ছাড়া, চর্চা ছাড়া করা যায় না।

ছবি দুটি দেখুন। তার রংয়ের ব্যবহার। জাগতিক সীমা পেরিয়ে এক কল্প জগতের হাত ছানি। এই রং আর ক্যানভাসের পট তৈরি খুব সহজ নয়। আসল ছবির সামনে দাড়ালে দেখবেন, তার ছবিতে একটা বুনোট বা টেকচার থাকে। এই বুনোট বা টেকচারগুলির ব্যবহার দর্শকের চোখে অসীম প্রভাব বিস্তার করে। আর রং? আপনাকে সবসময় বানিয়ে নিতে হবে। এ রেডিমেড টিউব খোলা নয়। দেখুন যতটুকু আকৃতি তিনি এঁকেছেন তার নির্মাণ ও তার অসীম সৃজনশীলতা প্রকাশ করে। সমীর আইচ, ১৯৭৮ সালে গভর্ণমেন্ট আর্ট কলেজ থেকে বেরিয়ে প্রথমে বাস্তব ঢঙে ছবি আঁকতেন।

কিন্তু তারপর তিনি অবয়ব ভেঙে বিমূর্ততার চলে গেলেন। আমরা বিমূর্ত ছবি অনেক দেখেছি, সমীর আইচের বিমূর্ততায় আছে ভাবনা ও ধারণার মুখ্য উপজীবিকা। তাঁর ছবির সামনে দর্শককে একটু দাড় করিয়ে রাখে। হঠাৎ অন্ধকারে আলোর প্রক্ষেপণ, সেই আলো ধরে আপনি তার ছবির ভিতরে চলে যান। আছে সামাজিক ব্যঙ্গ, এসমস্ত কিছুই শৈল্পিক রীতিতে। তিনি একটি শিল্প আন্দোলন আনতে চেয়েছিলেন, ৯০ দশক থেকেই তার ছবি ভাবনা জারিত, সেই ভাবনায় আছে নান্দনিকতা ও বস্তুকে অন্য পরিপ্রেক্ষিতে দেখা।

আমার ব্যক্তিগত, বোধবুদ্ধিতে সমীর আইচের কাজের সমান্তরাল আর কাউকে এই বাংলায় দেখি না। ছাত্র ছাত্রী যারা ছবি আঁকেন, তাঁরা হয় গণেশ পাইন, প্রকাশ কর্মকার, যোগেন চৌধুরী বা আর কয়েকজনের ছবির প্যাটার্ন নকল করে বাঁচতে চান। তাঁদের ভাবনাকে অনুশীলন করেন না। পড়াশুনা করেন না।

আপনি দু’জন তেমন শিল্পীর সঙ্গে কথা বললেই বুঝে যাবেন তিনি কি প্রকৃতির শিল্পী। দরকার তো ভাবনাকে আগে স্থান দেওয়া। আমার নজরে পরেনি কেউ সমীর আইচকে স্টাডি করতে। কেন? এখানে মেধার প্রয়োজন হয় বলে? কনসেপচুয়াল আর্টের পুরোধা সমীর আইচ, হয়ত আরও দু-একজনের নাম বলতে পারব, কিন্তু সমীর আইচের শিল্প ভাবনা অনেকটাই উন্নত।

কতটা পথ হাঁটলে পথিক বলা যায়? কতটা চর্চা করলে একজন শিল্পী হয়ে উঠেন? তা মানুষই ঠিক করেন। এগুলি একটা ফর্মুলেটেড সমীকরণ। ভাবার মতো, উপলব্ধির মতো বিষয়। একটা মুখের ছবি, বাস্তবিক বা আলোক চিত্রের মত করে যদি আঁকেন, আপনি কতক্ষণ দেখবেন? আপনার চোখ আর মগজ মুখটা কিছুক্ষণ দেখে ক্লান্ত হয়ে পড়বে।

একটা দৃশ্যচিত্র যাকে আমরা ল্যান্ডস্কেপ বলি তাতে আপনি কতক্ষণ দেখবেন, কি দেখবেন? দৃশ্যে যা থাকে, গাছপালা, নদীনালা, জমি, আকাশ, পাহাড়। এসব আপনার চোখ আর মগজ দশ মিনিট দেখেই ক্লান্ত হয়ে যাবে। কারণ এইধরণের ছবিতে রস বেশি থাকে না। কিন্তু যেই ছবি আমি আপনাকে দেখালাম তা নির্মাণ করতে, শিল্পীকে ভাবতেও অনেক সময় নিয়েছেন। কোনও সামাজিক ঘটনা তাকে বিষয়টা দিয়েছে। শিল্পী একটা ভাষা রচনা করে সমাজকে ব্যঙ্গ করেছেন, সমাজের রূপ দেখিয়েছেন। একটা সংহত প্রতিবাদ করেছেন।

একটা শিল্প যখন নির্মীত হয়। তখন সেটি অনেক মাত্রা বা পরিপ্রেক্ষিত সৃষ্টি করে। ভিন্ন ধরণের মানুষের মেধা ও বাস্তবিক অভিজ্ঞতার স্তর থেকে সেটি প্রতিফলিত হয় হীরক খন্ডের মতো বহু মাত্রিকতায়। শিল্পী বা কবি হতে পারে একটি বিষয় নিয়েই শুরু করেছিলেন কিন্তু কাজটি সম্পন্ন হওয়ার পর দশজন দর্শকের মনে দশ রকমের ছবি সৃষ্টি হল। এটা শুধু ছবির ক্ষেত্রে নয়। গান নাটক, কবিতা সবক্ষেত্রেই। স্রষ্টার সৃষ্টি তার ভাবনাকে ছাপিয়ে ছড়িয়ে পড়ে। নানা মানুষের মনে নানান ভাবে ধরা দেয়। এটা কিন্তু দুর্গা কালী ইত্যাদির বাস্তবচিত্র বা দৃশ্যচিত্র আঁকার ক্ষেত্রে হয় না।

সমীর আইচ তাঁর কলেজ জীবনে রিয়ালিস্টিক/ বাস্তববাদী ঢঙে ছবি শুরু করেন। সেই সময় থেকে আজও তাঁর ছবিতে সামাজিক ও রাজনৈতিক বিদ্রোহী ও ব্যাঙাত্মক ছবিগুলি তাঁর ভাবনায় স্থান পায়। আস্তে আস্তে, তাঁর ছবির ভাষা ও রীতি আমূল পরিবর্তন হয়ে যায়। ছবিতে চরিত্র স্থান না পেয়ে ভাবনা স্থান পেতে লাগল। বিমূর্ত ভাবে রেখা ও রং ভাবনাকে প্রকাশ করতে লাগল। তাঁর ছবিতে অবচেতন মনের যৌনতা, অন্ধকারের মধ্যে হঠাৎ এক ঝিলিক আলো হয়ে ফুটে উঠেছে। তারপর ছবিতে এসেছে পশুর গ্রোটেক্স বা ভয়ঙ্কর কুৎসিত কিছু আকৃতি। আস্তে আস্তে ছবিতে রাজনৈতিক বাংলার কালো ছায়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ভাষা ক্রমশ প্রকট হচ্ছে।

শেষে রাজনৈতিক সচেতন সমীর আইচের অস্থির সমাজের ছবি দিয়ে আমার লেখা আপাতত এখানেই শেষ করছি। নীচের ছবিগুলি দেখুন। সার রিয়ালিস্ট বা অবচেতন মনের সামাজিক অস্থিরতা ও আতঙ্ককে কেমন ছবিল রূপ দিয়েছেন।