প্রচার এমন একটা কৌশল, আপনাকে বোকা বানাতে পারে, ধোঁকা দিতে পারে, তুচ্ছকে উচ্চে তুলে ধরতে পারে, তিলকে তাল করতে পারে, যে কোনও ভাল-মন্দকে প্রতিষ্ঠা দিতে পারে, আপনার মেধা থাকুক না থাকুক, যোগ্যতা থাকুক না থাকুক আপনাকে বিখ্যাত বানাতে পারে। আপনার প্রচার নেই, আপনি যতই ভাল, প্রয়োজনীয়, যোগ্য হোন না কেন আপনাকে অন্ধকারে থাকতে হবে।

অ্যালবার্ট অশোক

আপনি হারিয়ে যাবেন, আপনার কথা লোকে ভুলে যাবে। আপনার মূল্যায়ন হবে না। ফলে, যারা বিখ্যাত হতে চায়, তারা নানা কৌশলে, প্রচারে আসতে চায়, মানুষকে ম্যানিপুলেট করে বা কৌশলে বশে এনে বিখ্যাত হয় ও পুরষ্কার কুড়ায়। ইতিহাস সাক্ষী, অনেক গুণী মানুষ তার যোগ্য মর্যাদা পাননি। তেলবাজি প্রচারের এক কৌশল। বা কখনও, কোনও ঘটনা বিস্তৃত প্রচারের যন্ত্র হিসাবে কাজ করে। সাধারণ মানুষ, কোনও কিছুর গভীরে যাবার ক্ষমতা বা বিচার করার ক্ষমতা রাখে না। তারা যা প্রচার হয় তার কথাই মনে রাখে। প্রচার ক্ষতি কি ভাল নিয়ে আসে তা নিয়ে মাথা ব্যাথা করে না।

যেমন ধরুন, লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি। সারা পৃথিবী তার নাম জানে। ১৪৫২ সালের ১৫ এপ্রিল জন্ম, ও ১৫১৯ সালের ২ মে মৃত্যু। লিওনার্দোর জীবদ্দশায়, তার মতো, তার চেয়ে আরো শক্তিশালী শিল্পী কী আর ছিল না? আপনি কি আর কারও নাম জানেন? ইতিহাস শুধু চর্চিত বিষয়কে স্থান দেয়। সত্যি মিথ্যার ধার ধারে না। কিন্তু আপনি যদি ইতিহাসের গবেষক হোন, সময়কে খুতিয়ে দেখেন, তাহলে অনেক কিছু আপনার নজরে আসবে ও আপনি তাজ্জব হয়ে যাবেন, এই ভেবে, যে, যা ইতিহাস বেয়ে সাধারণের কাছে তথ্য হিসাবে পৌছানো জরুরি ছিল তা অন্ধকারে হারিয়ে গেছে, সাধারণের কাছে পৌঁছায়নি।

আমেরিকাতে (National Gallery of Art in Washington, DC) ২০২০ জানুয়ারি অব্ধি একটা প্রদর্শনী চলবে, শিরোনাম, ‘Verrocchio: Sculptor and Painter of Renaissance Florence’ তাতে Andrea del Verrocchio র ৫০ খানা কাজ, ড্রয়িং, পেইন্টিং ও ভাস্কর্য থাকছে। অ্যান্দ্রিয়া ডেল ভেরুচ্চিও ১৪৩৫ সালে, ইতালীর ফ্লোরেন্সে জন্মান, মৃত্যু ১০ অক্টোবর, ১৪৮৮ সালে, ইতালীর ভেনিস শহরে। তার উল্লেখযোগ্য দু’ছাত্র ও সহকারী হলেন লিওনার্দো ও পিয়েট্রো (Leonardo da Vinci and Pietro Perugino)। এখানে একটি পেইন্টিং দেখাচ্ছি, ভেরুচ্চিও তার দুই ছাত্র ও সহকারী নিয়ে ১৪৭০ থেকে ৭৪ সালে করেছিলেন। ছবির নাম Madonna and Child with Two Angels.

ষোড়শ শতাব্দীতে যখন রেনেশাঁ শিখরে পৌঁছেছে তার পিছনে ভেরুচ্চিওর অনেক অবদান (technical and conceptual contributions) ছিল। অথচ আপনারা তাকে চেনেন না, তার ছাত্র লিওনার্দোকে চেনেন। এখানে কয়েকটা কাজের নমুনা দেখলে আপনারা বুঝবেন যে ভেরুচ্চিও কতটা শক্তিশালী ছিলেন লিওনার্দোর চেয়েও। লিওনার্দো তাকে অনুসরণ করেই বড় হয়েছিল।

ভেরুচ্চিওর বাবা (Michele di Francesco Cioni) একজন টালি ও ইট প্রস্তুতকারক ছিলেন, পরে কর সংগ্রহ করতেন। ভেরুচ্চিওর শিক্ষা প্রথমে এক স্বর্ণকারের অধীনে হয়। পরে ফ্রা ফিলিপো লিপ্পির, একজন ইতালীয় পেইন্টারের অধীনে (Fra Filippo Lippi) পেইন্টিং এর শিক্ষা নবিশী করেন। তারপর ডোনাতেল্লোর (Donatello) কাছে পেইন্টিং ও ভাস্কর্যের শিক্ষা নেন। ৩০ বছর বয়সে তিনি বিখ্যাত শিল্পী ও ভাস্কর হয়ে উঠেন এবং মেডিসি পরিবার (Lorenzo de’ Medici and his son Piero), যারা তৎকালীন সময়ে ফ্লোরেন্সের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায় ছিলেন, তাদের নজরে আসেন ও নানা কমিশন কাজ পান।

ভেরুচ্চিওর একটা ছবি ভাস্কর্য করার স্টুডিও ছিল, যেখানে সেই সময়ের বহু নামী শিল্পী, ভেরুচ্চিওর অধীনে শিক্ষানবিশী করতেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি, লরেঞ্জো ডি ক্রেডি, ডোমিনিকো ঘিরল্যান্ডিও, ফ্রান্সেওকো বত্তিচিনি ও পিয়েট্রো পেরুজিনো (Leonardo da Vinci, Lorenzo di Credi, Domenico Ghirlandaio, Francesco Botticini, and Pietro Perugino). লিওনার্দো অল্প বয়স থেকেই ভেরুচ্চিওর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন ও ২৬ বছর বয়েস অবধি ভেরুচ্চিওর সঙ্গে থাকেন। তৎকালীন শিল্পীদের গিল্ড বা সমিতির (the Guild of St Luke) সদস্যও ছিলেন ভেরুচ্চিও। ভেরুচ্চিওর প্রভাব পরবর্তী ফ্লোরেন্স ও ইতালীর শিল্পীদের উপর পড়েছিল। সাদা কালো চখ (black chalk) বা চারকোলের টোনাল কোয়ালিটির সার্থক ব্যবহার তিনিই প্রথম করেন। তার উদাহরণ Head of a Woman with Braided Hair (c. late 1470s) সে সময়ে ব্রোঞ্জ কাস্টিং (bronze casting) খুব কম লোকেই জানত, ভেরুচ্চিও যেভাবে ব্রোঞ্জকে ব্যবহার যোগ্য করে সহজ করে তুলেছিলেন তা উল্লেখযোগ্য। তার ব্রোঞ্জের কাজের উদাহরণ Sleeping Youth (c. 1470–1480).

জর্জিও ভাসারিকে (Giorgio Vasari) বলা হয় ইতালীয় চিন্তাবিদ, শিল্প ঐতিহাসিক ও পন্ডিত। তিনি বহু শিল্পীর কথা তার ইতিহাস রচনায় লিখেছেন। এবং একেকটা যুগের একেকজনকে তুলে ধরেছেন তার খেয়াল খুশিতে, বাকিদের অবজ্ঞা করেছেন। তিনি ভেরুচ্চিও সম্পর্কেও উদাসীন থেকেছেন।

সবশেষে, আলেজান্ডার দ্য গ্রেট (Alexander the Great)-এর একটি মার্বেল মূর্তির দিকে চোখ রাখলে বোঝা যাবে ভেরুচ্চিও কতটা শক্তিশালী ভাস্কর ছিলেন। কাজটি Lorenzo de’ Medici কূটনীতিক চাল হিসাবে, হাঙ্গারির রাজাকে উপহার হিসেবে দিয়েছিলেন।