debjani-sarkarনিদারুন দারিদ্র থেকে বাঁচতে দেহব্যবসাকেই পেশা করেছিলেন৷মস্তানদের হাতে মার খাওয়া থেকে পুলিশ লক আপে রাত কাটানো-বাদ যায়নি কিছুই৷ কিন্তু সে তো জীবনের মাত্র একটা দিক৷ দেওয়ালে যখন পিঠ ঠেকে, তখন থেকেই পাল্টা লড়াইয়ের শুরু৷ সেই লড়াইয়ের জোরেই ভারতী দে আজ দুর্বার সংগঠনের প্রধান৷ নিজের ভাগ্যবিড়ম্বিত জীবনের অভিজ্ঞতাতেই তিনি রুখে দেন আরও অনেক ভাগ্য বিপর্যয়ের সম্ভাবনা৷ সেই জেদ, সেই দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই তাঁর জীবনের প্রতি পদক্ষেপে৷ সে জীবনকথা তুলে আনলেন দেবযানী সরকার

ছোট থেকেই আমি  খুব জেদী৷ তাই দাদাদের ওই চিঠিটা পাওয়ার পরেই আমি মনস্থির করে ফেলেছিলাম জীবনে যত যাই ঘটে যাক না কেন আর কোনওদিন বাড়িতে ফিরব না৷ প্রেগন্যান্ট অবস্থাতেও আমি একবারের জন্য ভাবিনি বাড়ি ফিরে যাওয়ার কথা৷ এই পেশাতে আমি মানিয়ে নিতে পারব কিনা সেটার বোঝার জন্য বলেছিলেন, তুই কয়েকদিনের জন্য আমার বোনের সঙ্গে গিয়ে থাক, তারপর তোর যদি মনে হয় তাহলে তুই এই পেশাতে আসবি৷উনিই ওনার ছোট বোনকে বলে সব কিছু ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন৷ওনার ছোট বোন কুসুম ব্যারাকপুরের তালপুকুর যৌনপল্লীতে থাকত৷  সেদিন বাড়িওয়ালির পরামর্শে আমি ওনার ছোট বোনের সঙ্গে গিয়ে মাসতিনেক ব্যারাকপুরের তালপুকুরে থাকি৷ তখন সাত মাস৷ওখানেই আমার ছেলে হয়৷ তিন মাস পর আমি ওখান থেকে ফিরে আসি৷ওই যৌনপল্লীতে মেয়েদের ওপর পুলিশ- মস্তানরা এত অত্যাচার করত, সেটা দেখে আমি ঠিক করে ফেলি এখানে আমি থাকব না৷ সেইসময় আমার কাছে  ছেলের দুধ কেনার মতো  টাকা নেই৷বাধ্য হলাম এই পেশা বেছে নিতে ৷কিন্তু ওখানে গিয়ে যৌনকর্মীদের ওপর পুলিশ-মাস্তানদের অত্যাচার দেখে আমি চুপচাপ বসে থাকতে পারতাম না৷আলাদাভাবে এক জন, দু জন মেয়েদের সঙ্গে  কথা বলতাম৷তাঁদের কাছে ওখানকার সব হালচাল জানতাম৷ তখন ওখানকার সবাই আমাকে বলত যা করতে এসেছিস, চুপচাপ সেই কাজ কর৷ আমি ওখানে নতুন ছিলাম ঠিকই কিন্তু  যেহেতু আমি যার কাছে থাকতাম তাঁর ছেলেই ওখানকার মাস্তান ছিল তাই আমার সঙ্গে ওরা কেউ কিছু করত না৷কিন্তু মেয়েদের ওপর অত্যাচার দেখে আমার রাগ, জেদ দ্বিগুন হয়ে গিয়েছিল৷ঠিকই করে নিয়েছিলাম, এই মাস্তানদের আমি হটাব৷এরপর দুর্বার ওখানে সংগঠন করল৷প্রথমে দুর্বারের সঙ্গে আমি যুক্ত হতে চাই নি৷পরে রাজি হয়েছিলাম৷দুর্বারের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর ওখানকার মাস্তানদের কাছে আমি মারও খেয়েছি৷২০০৩ সালে তিন দিন লক আপেও কাটিয়েছি৷

১৯৯২তে সোনাগাছি প্রজেক্ট শুরু হওয়ার পর আমি সেই প্রজেক্টে পিআর হিসাবে জয়েন করি৷তারপর দুর্বারে অ্যাসিস্ট্যান্ট  সুপারভাইজার, ক্লিনিক অ্যাসিসট্যান্ট,সিস্টার, প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর হিসাবে কাজ করি৷২০০৬ সালে প্রমোশন হয়ে দুর্বারের প্রজেক্ট ডিরেক্টর হই৷

নিজের অফিসে ভারতী দে৷
নিজের অফিসে ভারতী দে৷

ওখানকার সবাই আমাকে বলত যা করতে এসেছিস, চুপচাপ সেই কাজ কর৷ আমি ওখানে নতুন ছিলাম ঠিকই কিন্তু  যেহেতু আমি যার কাছে থাকতাম তাঁর ছেলেই ওখানকার মাস্তান ছিল তাই আমার সঙ্গে ওরা কেউ কিছু করত না৷কিন্তু মেয়েদের ওপর অত্যাচার দেখে আমার রাগ, জেদ দ্বিগুন হয়ে গিয়েছিল৷


পাঁচ বছর ডিরেক্টর পদে থাকার পর এখন আমি দুর্বারের সেক্রেটারি৷তবে কি জানেন, এই জায়গাতে আসার পরেও আমি কিন্তু আমার বাড়ির কারোর সঙ্গে কোনও যোগাযোগ রাখি না৷২০০৬ সালে আমি যখন প্রজেক্ট ডিরেক্টর হই, তখন অনেক সংবাদপত্রে আমাকে নিয়ে লেখা বেরিয়েছিল৷ এত দিন আমার কথা ওদের মনে ছিল না ৷সংবাদপত্রের খবর দেখা আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল৷আমাকে বাড়ি যাওয়ার জন্য বলেছিল৷ আমি যাই নি৷পুরনো সব কথা আমি কীভাবে ভুলে যাব বলুন?  তবে আমি খুব কৃতজ্ঞ ড: জানার(স্মরজিৎ জানা, দুর্বার সমন্বয় কমিটির প্রতিষ্ঠাতা)কাছে৷কাজে এখন আমাকে মাঝে মধ্যেই বিদেশে যেতে হয়৷ওখানে গিয়ে প্রেজেন্টটেশন , স্পিচ দিতে হয় কিংবা এখানে যখন বিদেশী ডেলিগেটসরা আসেন তাঁদের সঙ্গে কথা বলা, এই সব কিছুই আমি শিখেছি ড: জানাকে ফলো করে৷

তবে পদোন্নতির সঙ্গে দায়িত্ব অনেক বেড়েছে৷ এখন এটা ভেবে ভালো লাগে যে যৌনকর্মীদের ওপর পুলিশ আর মাস্তানদের অত্যাচার আগের থাকে অনেক কমেছে৷ মেয়েরা এখন প্রতিবাদ করতে শিখেছে৷তবে এতকিছুর পরেও আমি তো মা৷তাই ছেলের কথা ভেবে একটু খারাপ লাগে৷আমি জানি ওর আমার ওপর অভিমান আছে৷কিন্তু সেদিন আমার সত্যিই কিছু করার ছিল না৷তবে জানেন তো, আমি একটা ছেলে জন্ম দিয়েছি কিন্তু আমি সবাইকে বলি আমার দুটো ছেলে৷আমার বোন মারা যাওয়ার পর, বোনের ছেলেকেও আমি নিজের ছেলের মতোই মানুষ করেছি৷একটা কথা আজ আমার স্বীকার করতে কোনও দ্বিধা নেই যে, সারা জীবনে ছেলেদের থেকে আমি দুর্বারকেই বেশী প্রায়োরিটি দিয়েছি৷ তবে এখন ওরা বড় হয়ে গেছে, আমার আর কোনও চিন্তা নেই৷ এখন আমি আগামী ১০ বছর  দুর্বারের কাজেই মন দিতে চাই৷

আগের পর্বের লেখা পড়তে ক্লিক করুন:

বাড়িওয়ালিই প্রথম দেহব্যবসার কথা বলেন: ভারতী দে