ভাংচুর(১৬)

অভীক দত্ত

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

Abhik-Dutta(কৌশিকের জ্যেঠু লিভার ক্যানসারে ধরা পড়ল৷ জ্যেঠুকে দেখতেই হাসপাতালে এল মধুশ্রী৷  মধুশ্রী তাকে ছেড়ে চলে গিয়েছে৷ অনেকদিন পর মধুশ্রীর সঙ্গে কথা হল কৌশিকের এই সূত্রে৷ একটু বাধো বাধো, একটু পুরনো স্মৃতি ফিরে দেখা৷ এদিকে ডাক্তারদের সব চেষ্টা ব্যর্থ৷ জ্যেঠুকে আর ফেরানো যাবে না বুঝে গিয়েছে কৌশিক৷ মধুশ্রীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও যেন অন্যদিকে মোড় নিয়েছে ক’দিনে৷ তারপর…)

১৮)

“বাবা মারা যাবার পর আমার মনে হয়েছিল প্রত্যেকটা মানুষের এক্সট্রা ম্যারিটাল অ্যাফেয়ার থাকা দরকার বুঝলে কৌশিক?” মধুশ্রীর বাবা তার থেকে কাউন্টার নিয়ে কথাটা বললেন। মধুশ্রী কৌশিকের মায়ের কাছে গিয়ে বসেছে।

কৌশিক ভদ্রলোকের এই কথাটা শুনে একটু অবাকই হল। বলল “কেন বলুন তো?”

মধুশ্রীর বাবা তার দিকে তাকিয়ে করুণভাবে হেসে বললেন “বাবা যখন হসপিটালে ভর্তি, আমি তখন সবে চাকরিতে ঢুকেছি। মা আমাকে নিয়ে যেত, এদিকে আমার তো অফিস। অনেকদিন যেতেই পারতাম না। মা বাইরে একা একা বসে থাকত অসহায়ের মত। তখন আমার মনে হত, মার যদি একটা এক্সট্রা ম্যারিট্যাল অ্যাফেয়ার থাকত, সেই ভদ্রলোক অন্তত মাকে সঙ্গ দিতেন। একা থাকতে হত না মাকে”।

bhanchurকৌশিক বলল “আপনার চিন্তা ভাবনা দেখছি সেই যুগেও বেশ বৈপ্লবিক ছিল”। ভদ্রলোক তার দিকে তাকিয়ে বললেন “কোন যুগে? সত্তরের শেষ দিক? আমার তো মনে হয় এই সময়ের থেকে ঐ সময় অনেক বেশি আধুনিক ছিল। আজকাল তুমি চারদিক চোখ কান খোলা রাখছ কি? মানুষের টেস্ট বল, পলিটিক্যাল পার্টির লিডার দের কথাবার্তা বল, শিক্ষা দীক্ষা বল, খেলাধুলা বল, কোনটা ঐ সময়ের ধারে কাছে আসে? কলকাতায় এত হনুমান মন্দির দেখেছ আগে? শনি ঠাকুরের মন্দির তো দিনে চারটে করে গজিয়ে উঠছে চারদিকে। আমার তো মনে হয় সময়টা এখন এগোচ্ছে না। বরং আমরা অনেক বেশি পিছিয়ে যাচ্ছি”।

কৌশিক বলল “কিন্তু সেটাও তো পলিটিক্যাল কারণেই?”

ভদ্রলোক সিগারেটে টান দিয়ে বললেন “সব ব্যাপারেই পলিটিক্সকে দোষ দিয়ে আমরা পার পেয়ে যেতে চাইছি আসলে। এটা আমাদের মজ্জাগত দোষ। আমরা আসলে ডিগ্রেড করে যাচ্ছে কোয়ালিটির দিক দিয়ে। সরাসরি আমরা সেটা স্বীকার করছি না বটে। কিন্তু অবচেতন মনে আমরাও জানি, এই মোবাইল ইন্টারনেটের যুগে স্মার্ট ফোন সবার হাতে থাকলেও আসলে আমরা অনেকখানি আনকুথ হয়ে পড়েছি। তুমি দেখ না, একটু টাকা থাকলে তুমি তোমার রিলেটিভকে হাসপাতালে দেবার কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারবে না। কারণ তুমি জান তার অবস্থা কি। আমরা আসলে আমাদের হার শিকার করে নিতে চাইছি। ঠিক এরকম কিছু তো আমরা কেউ চাইনি”।

কৌশিক কী বলবে বুঝতে পারল না। এইসব কথাবার্তা সে বরাবর এড়িয়ে চলে। একটু বয়স্ক কেউ হলেই তাদের সময়কে গ্লোরিফাই করার জন্য অনেক কিছু বলে ফেলেন, কিন্তু সে তো আর বলতে পারছে না, তার নিজের কি করার আছে এই সময়ে দাঁড়িয়ে। তাকে এই কম্প্রোমাইজগুলি করতেই হবে। কারণ কিছুই করার নেই তার।

উপন্যাসের আগের কাহিনি এই লিঙ্কে

ভাঙচুর

সে কথা ঘোরানোর চেষ্টা করল “আচ্ছা রাজুদা কাল পৌঁছালে জ্যেঠুর সাথে দেখা করানোর ব্যবস্থা করা যাবে তো? মানে বাইরে থেকেও যদি দেখতে পায়”।

ভদ্রলোক বললেন “ভিজিটিং আওয়ারসের বাইরে বলছ তো? সে ব্যবস্থা করে দেওয়া যাবে। শেষ অবস্থায় নিয়ম কানুন নিশ্চয়ই কিছুটা শিথিল করা যাবে। দেখব কাল কথা বলে। জার্মানিতে আছে না ওনার ছেলে?”

কৌশিক মাথা নাড়ল। ভদ্রলোক বললেন “তোমার জ্যেঠু লোকটা ভাল ছিলেন বেশ। তোমাদের বিয়ের দিন মধুর মা তো টেনশনের চোটে ভুলেই গেছিল গয়নাগাটি কোথায় রেখেছিল। দেরী দেখে তোমার জ্যেঠু আমায় জিজ্ঞেস করলেন। আমি বললাম এই ব্যাপার। উনি বললেন ‘গয়নাটা একটা ব্যাপার হল মশাই? বিয়েটা শুরু করুন ঠিক পাবেন। আমরা কি গয়না নিতে এসছি নাকি?’ আমি হাঁ করে ওনার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। এইসব লোকও আজকাল আছে নাকি মার্কেটে? কত বাড়িতে দেখেছি ক্যাশ না মিললে বিয়ের স্টেজেই তোলে না ছেলেকে। অনেক শিক্ষিত বাড়িতেই দেখেছি। এবং সেটা কোন গ্রামে গঞ্জে নয়। কলকাতাতেই। ভাবা যায় না।“

কৌশিক অবাক হয়ে বলল “এই ব্যাপারটার কথা আমি জানতাম না তো”।

মধুশ্রীর বাবা বললেন “তোমার বাবা মাও জানেন। ওনারাও তোমার জ্যেঠুর কথাটাই রিপিট করেছিলেন। আমি সেদিন বেশ অবাক হয়েছিলাম জান। বুঝেছিলাম আমার মেয়ে এমন একটা বাড়িতে যাচ্ছে যেখানে ওর কোন অসুবিধা হবে না অন্তত”। দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ভদ্রলোক। কৌশিক বুঝল দীর্ঘশ্বাসটা তাকে খোঁচা দেবার জন্য ফেলেন নি ভদ্রলোক, নিজে থেকেই বেরিয়ে গেছে। খানিকটা সংকুচিত হল সে। তারপর মরিয়া হয়ে বলল “হবে না। মধুশ্রীর আর কোন সমস্যা হবে না। আমি বলছি”।

ভদ্রলোক তার দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন “জানি। বয়স তো কম হল না। মধু যখন চলে এসছিল তখনও জানতাম আসলে এই রাগারাগি সাময়িক। কষ্ট পাচ্ছ তোমরা দুজনেই। অবশ্য একদিক থেকে ভালই হয়েছে বুঝলে? সম্পর্কে মাঝে মাঝে একটু দূরে থাকা ভাল। বেশি কাছে থাকা, সারাক্ষণ একসাথে থাকার থেকে আমার তো তোমাদের মডেলটাই বেশি পছন্দ হয়েছে। দূরে না থাকলে ভালবাসা বাড়ে নাকি? ধুস”।

কৌশিক হেসে ফেলল ভদ্রলোকের কথা শুনে।