পারিজাত ব্যানার্জী

“সিডনি শহরে ঘুম থেকে উঠে জানালা দরজার ব্লাইণ্ডস সরিয়ে বাইরের দিকে তাকালে সবার আগে কি চোখে পড়ে?”

দু’মাস আগেও কেউ এই প্রশ্ন করলে উত্তর কি দিতাম স্পষ্ট মনে আছে। আমাদের বাড়িটা সিডনির পশ্চিম সাবার্ব ওয়েস্টমিডে। আদ্যপ্রান্ত শহুরে মেজাজ এই দিকটায় বেশ কম। এখনও এখানে বলা যেতে পারে বেশ একটা হালকা শহরতলি ছাপ আছে। প্রধানত অন্য দেশ থেকে আশা বিভিন্ন ভাষা ধর্মের মানুষ নিয়েই গড়ে উঠেছে এদিকটা। তাই যদিও সি বি ডি থেকে পঁয়তাল্লিশ মিনিট দূরত্বে অবস্থান করি আমরা, তবু ঘর থেকে বেরোলেই নানা ভাষাভাষির কথার ভিড়ে এবং রং বর্ণের মিশ্রণে এই নিরিবিলি অঞ্চলেও বেশ কিন্তু একটা বিশ্বপর্যটনের আভাসও মিশে থাকতে দেখা যায় তাই।

আর কি চোখে পড়ে? চারিদিকে চোখ পড়লেই দেখা যায় পরপর সাজানো সব বাংলো প্যাটার্নের বাড়ি, সবুজ কারপেটের মতো বেছানো সুবিস্তীর্ণ খেলার মাঠ, খেজুর গাছ আর বটলব্রাশের মতো অস্ট্রেলিয়ান আরও কত নাম না জানা নেটিভ উদ্ভিদ। তবে সবচেয়ে বেশি যা মন কেড়ে নেয়, তা হল— আকাশ। নীল অনাবিল বিস্তৃত নির্মল এই চাদরকেই এতদিন ভেবে এসেছিলাম এই মহাদেশের সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক রূপক।

এত বৃহৎ অম্বর দেখেই না বড় হয়েছে ষাট হাজার বছর ধরে চলে আসা প্রাচীন আদিম সভ্যতা, যাকে ঘর বানাতেই ইউরোপ ছেড়ে একদিন ‘ডাউন আণ্ডার’ চলে এসেছিল শয় শয় মানুষ বা আজও চায়না, ভিয়েৎনাম বা ভারত, মধ্যপ্রাচ্য থেকে নিয়মিত আসছে অনেকে তাদের ভাগ্য বদলাতে! সেই আকাশের দিকে তাকালে কি মনে হত জানেন? যেন ঈশ্বর প্রদত্ত এক বিশাল আয়নার দিকে মুখ তুলে তাকিয়ে রয়েছি আমি আর আমার পিছনে জমা হওয়া সর্বপ্রাচীন এক ইতিহাসের সমগ্র কোলাহল— এত স্বচ্ছ সে অভাবনীয় আদিগন্ত দর্পণ, যে সামান্য পাখির আঁচড়েই তার গায়ে ফুটে ওঠে প্রতিবিম্বদের নির্নিমেষ চিত্রকলা!

কোনও দিন ভাবিনি, সেই আকাশের গায়েও লাগতে পারে কালিমা, জং ধরতে পারে তার উদ্ভাসিত সূর্যালোকেও! কিন্তু বিধি বাম! পরিস্থিতি পালটাতে সত্যিই দেখলাম বেশি সময় কিন্তু লাগে না!

মনে আছে প্রথম সেই সকালের সব গল্প— গল্পই তো, তবে তার প্রতিটি পৃষ্ঠা যেন অন্ধকারবৎ! এ গল্প জানি সত্যি, তবু ‘শেষের সে দিন’এর সত্য তখনও বুঝিনি কতখানি বিভীষিকাময়! কতদিন হবে, হ্যাঁ দু’মাস তো হয়েই গেছে কবে, ঘুম থেকে উঠে পর্দা সরাতে প্রথমে মনে হল, বৃষ্টি হবে– তাই মেঘলা আকাশ। তারপরেই ভালো করে ঠাহর করতে বুঝলাম, ঠিক মেঘলা না, কেমন যেন কুয়াশায় ঢেকে গেছে চারদিক। মোড়ের মাথায় যে বড় কলেজ বিল্ডিংটা তৈরি হচ্ছে, অন্যদিন স্পষ্ট দেখা যেত আমাদের বাড়ি থেকে।

কিন্তু সেদিন তার সমস্ত কাঠামোই যেন কোনও জাদুবলে দেখলাম, উবে গেছে একদম। আশ্চর্য লাগল! এখানের প্রকৃতি আমাদের ভারতবর্ষের থেকে একদমই বিপরীতপন্থী— তখন নভেম্বর মাসের শুরুতে ভরা বসন্তকাল। গ্রীষ্মের আগে পরে তো কুয়াশা পরে না? দরজা খুলে বাইরে দাঁড়াতেই নাকে চাপা পোড়া গন্ধ ভেসে এলো। বর তখনও বিছানা ছাড়েনি। তাড়াতাড়ি ডাকলাম ওকে। বললাম, “এই দেখো না কাছাকাছি কোথাও আগুন লেগেছে বোধহয়! কি অবস্থা! দরজা বন্ধ করে চাটা গ্যাসে বসিয়ে টিভি চালালাম। আর সেই প্রথম পেলাম খবরটা।”

বুশফায়ার অস্ট্রেলিয়ায় নতুন কিছু নয়। এখানের শুকনো আবহাওয়া ও অত্যধিক গাছপালার ফলে প্রায়ই ঘটে এরকম বিপর্যয়। বহু গাছ এই আগুনের তেজের মাধ্যমেই তাদের বিজ দূরে বপন পর্যন্ত করে থাকে নিয়মিত। ইংরেজরা আসার আগে থেকেই এখানের আদিবাসিন্দারা নিয়মিত শুকনো গাছপালা ঠিকঠাক সময় পুড়িয়ে এই ভয়াবহ দাবানলের দুর্বিষহ পরিণতির হাত থেকে বাঁচাতেন সমগ্র প্রকৃতিকে। পরে ইংরেজরাও এসে বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে এই ভয়াবহতাকে আয়ত্ত করার নানাবিধ চেষ্টা করে এসেছেন। কখনও পেরেছেন, আবার কখনও হয়তো পারেনওনি!

কিন্তু এবারের পরিস্থিতি একেবারে আলাদা। বিগত এক বছর ধরে চরম খরায় বিপর্যস্ত অস্ট্রেলিয়ার বিপুল অংশ। নিউ সাউথ ওয়েলস, ভিক্টোরিয়া, কুইনসল্যাণ্ড, সাউথ অস্ট্রেলিয়া— কোনও রাজ্যই প্রায় বাদ যায়নি এর প্রকোপ থেকে। ফলে রুক্ষতা গ্রাস করেছিল এতদিন যেই বিপুল জঙ্গলময় প্রান্তর, গ্রীষ্মের শুরুতে তাপমাত্রা যেই বেড়েছে, তা সৃষ্টি করেছে দাবানলের। আর তারপর যতদিন গেছে বা এখনও যাচ্ছে, তার আগ্রাসন ততগুণই চলেছে বেড়ে। ইতিমধ্যে শুধু সাউথ অস্ট্রেলিয়া স্টেটের ক্যাঙ্গারু আইল্যাণ্ডেই বিধ্বংসী আগুনে নিঃশেষিত হয়েছে সেখানকার পঁচিশ হাজার নিরীহ কোয়ালা এবং আরও বহু প্রাণীর। বিশেষজ্ঞদের মতে এই দাবানলের জেরে হয়তো অবলুপ্ত হয়ে যাবে বহু প্রাণীই। অনেক জঙ্গলও হয়ে যাবে একেবারে নিঃশেষিত।

মনে হতে পারে, কত মানুষের প্রাণ গেছে ইতিমধ্যেই। কত লোক হারিয়েছেন তাঁদের সমস্ত পুঁজি, বাড়িঘর, সবকিছু। তাদের ক্ষতিয়ান না দিয়ে আমি আগে গাছপালা এবং জন্তুজানোয়ারের হিসেব দিচ্ছি কেন। জঙ্গলের নিয়মই যদি হয় ‘সার্ভাইভাল অফ দ্য ফিটেস্ট’, তাহলে যারা বিপর্যয়ের মোকাবিলা করতে পারবে না, তারা অবলুপ্ত হবে, এতে আর এমন আশ্চর্যের কি আছে? মানুষই তো তথাকথিত শ্রেষ্ঠ জীব, তাদের বাঁচা মরার খতিয়ানের থেকে বড় তাই আর সত্যিই কিছু হয় কি? আসলে কি জানেন তো, চোখের সামনে যখন দেখতে পাচ্ছি অপরাধীদের, তখন মনে হচ্ছে, বাকিদের কথা তো অনেকেই বলবে, বলছেও।

আমারও গভীর সহানুভূতি রয়েছে দমকল বাহিনী এবং সরাসরি এই পরিস্থিতির সঙ্গে লড়াই করে চলা প্রতিটি সাধারণ মানুষের সঙ্গে যাঁরা মাসের পর মাস সব আনন্দ এবং ছুটির আয়োজন ভুলে শুধুমাত্র মেতে আছেন অন্যদের সাহায্য করায়,প্রকৃতির এই বিধ্বংসী রূপের ফলে এরই মধ্যে প্রাণ হারিয়েছে ২৩ জন বীরের। ঘরছাড়া হাজারেরও উপর।ইতিমধ্যেই নেভি নেমে পড়েছে মালাকুটার মতো দাবানল কবলিত বহু এলাকা থেকে শয়ে শয়ে মানুষ উদ্ধারের জন্য। বায়ুসেনা আকাশ থেকে ছড়াচ্ছে গোলাপি অগ্নি নির্বাপক কেমিক্যাল।এত খারাপের মধ্যেও ভালো এই যে মানুষ সব ভুলে দাঁড়াচ্ছেন অন্য মানুষের পাশে নির্দ্বিধায়। ওই অবলা জীব এবং উদ্ভিদের হয়ে বলার এই মুহূর্তে হয়তো নেই কেউ। তাই তাদের হারিয়ে ফেলার শোক নাহয় শুধু ধরা থাক আমার কলমেই!

আগুনের ফলে শুধু যে সেই নির্ধারিত কিছু অংশই প্রভাবিত হয়েছে, তা কিন্তু নয়। তার থেকে সৃষ্ট ধোঁয়া এবং পোড়া গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে প্রায় সমস্ত অস্ট্রেলিয়া জুরেই। এমনকি, প্রশান্ত মহাসাগর পেরিয়ে তার ভ্রূকুটি হানা দিয়েছে পার্শ্ববর্তী নিউজিল্যান্ডেরও সাউথ আইল্যান্ডে। হাওয়ার অভিমুখ যেই দিকে ঘুরছে, দাবানলের আভাস সঙ্গে সঙ্গে ধেয়ে চলেছে সেই অভিমুখেই। তার জেরেই অসময় হঠাৎ হঠাৎ তীব্র ধোঁয়ার গন্ধ এবং চাদর ঢেকে দিচ্ছে এই মহাদেশের বিভিন্ন পকেটস্। দু’মাস আগে দেখা সেই ধোঁয়াশা এখন এখানে প্রায় রোজকার ঘটনা। উৎস ঘরের কাছেই জ্বলতে থাকা পাহাড়ি অঞ্চল, ব্লু মাউণ্টেন্স। বিক্ষিপ্ত পাঁচ পাঁচটি দাবানল একযোগ হয়ে যেখানে তৈরি করেছে ‘মেগাফায়ার’ এর। অনেকেই মাস্ক পরে ঘুরছেন দুরূহ দূষণের সাত থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্যে। বলতে লজ্জা নেই, আমরাও এই সাবধানীদের দলেই কিন্তু পড়ি।

যে কোনও অ্যাপোক্যালিপ্টিক সাইফাই সিনেমায় দেখানো হয় খেয়াল করবেন, ভবিষ্যতের প্রজন্মরা অক্সিজেন মাস্ক ছাড়া বেরোতে পারছেন না পৃথিবীর যে কোনও জায়গায়। তার শুরুর বীজ কিন্তু এরই মধ্যে বপন করে দিয়ে গেল দাবানল। তাই আর আমার ভোরগুলো নীল আকাশ দেখতে পায় না। সূর্যের তেজ মরে গিয়ে কমলা আগুনে আলো হয়ে টিমটিম করে জ্বলতে থাকা মরা সব ঝাপসা রাস্তায়। নিজেদের প্রাণ দিয়ে তিলতিল করে গড়তে থাকা সমস্ত কোটর বা বাসা হারিয়ে যায় প্রকৃতির এই অবাধ্য খেলায়। তবু তাকে দোষ দেওয়ার ধৃষ্টতা অন্তত আমাদের মানবজাতির মানায় না। যথেচ্ছাচার করে এসেছি আমরা তার উপর এতদিন ধরে। নষ্ট করেছি তার সমস্ত অকথিত নিয়মাবলী এবং ভারসাম্য। এবার হয়তো তাই ছবির এই ‘সিকোয়েল’ নিজেকে রক্ষা করার তাগিদেই বিধ্বংসীভাবে হানা দিচ্ছে আমাদের ঘরের পাড়ায়! এখনও যদি চোখ বুঁজে মাটিতে মুখ লুকিয়ে বসে থাকি কোন ঘরের কোণে, বা পালিয়ে যাই অন্য কোনও ঘরের সন্ধানে, কতখানি সত্যিই যে পাল্টাবে কিছু,সেই প্রশ্ন দেখলেন, শেষ অবধি, থেকেই গেল কিন্তু!

যাক গে, উঠি কেমন? বাইরে জামাকাপড় মেলে এসেছি। নাকের উপর মাস্ক ঝুলিয়ে বরং বেলা থাকতে থাকতেই নিয়ে আসি তাদের। সবুজ ঘাসেরা হলুদ হয়েছে, তাপমাত্রা গেল শনিবার ৪৯ ছুঁয়েছে, বিপদমুক্ত এখনও হয়নি বহু এলাকা, তাতে কি! এগুলোকে অগ্রাহ্য করলেই তো আর এসব থাকে না, তাই না! সেই-ই ভালো! ভালোই তো!

এখন শুধু দেখার আর কতদিন এভাবেই খোঁড়াতে খোঁড়াতে চলা সম্ভব! ও হ্যাঁ, আর ধর্ম বর্ণ নিয়ে মারামারি কিন্তু বন্ধ করবেন না কেউ কোথাও আবার অস্ট্রেলিয়ার দাবানলের খবরে জর্জরিত হয়ে— সময় থাকতে এভাবে অপব্যবহার করে নিই যতটা পারি বরং! যেভাবে আর্টিকে বরফ গলছে, নিউজিল্যান্ডে মারা যাচ্ছে মানুষ অগ্নুৎপাতের ফলে, ডুবছে ভেনিস, হারিকেনে ধ্বংস হচ্ছে আমেরিকা জাপান ও আরও বহু দেশ, সমগ্র তাপমাত্রা বেড়েই চলেছে হু হু করে, বন্যা খরা লেগেই রয়েছে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে,পাল্টে যাচ্ছে ঋতুদের ভারসাম্য, আবহাওয়ার প্রকৃত রূপ ঠিকঠাক বোঝার আগেই আমাদের মাত দিয়ে চলেছে একের পর এক জায়গায় — ফিল্মি ঢংয়ে সেখানে প্রশ্ন কিন্তু নাতো থেকেই যায় “ক্যা পতা, কল হো না হো!”