দেবাঞ্জনা মুখার্জি ভৌমিক

পাবলিক বাসে ড্রাইভারের কেবিনে বাঁ দিকের সিটে বসে রয়েছি। ওপরে লেখা লেডিস সিট। পাশে কলেজ ফেরত অল্পবয়সী মেয়েটি কানে হেড ফোন গুঁজে গান শুনে চলেছে। আর আমি দুপুর দেড়টার দৌড়ে দুচোখে মেপে নিচ্ছি কলকাতা শহরের ইঞ্চি থেকে ইঞ্চি। এক একটা করে স্টপ আসছে আর বাসের শরীরে জুড়ে যাচ্ছে আরও কিছু মানুষের শরীর। মনগুলোও ওঠা-নামা করছে। রোদ পিছলে যাচ্ছে অনেক ঘেমে যাওয়া ফর্সা কিংবা গম রঙা সুশ্রী সুন্দর মুখে।

কালো থেকে কালো হয়ে যাচ্ছে ছাতার পরোয়া না করা আরও কিছু নারী পুরুষের বাদামী ত্বক। সানগ্লাস আর ওড়নায় পুরো মুখ ঢেকে সূর্যের আলোর সঙ্গে আড়ি করে প্রয়োজনীয় বাসের নম্বরের অপেক্ষায় বেশ কিছু মুখ। আর এমন সব মুখেরাই বাসে উঠে দৌড়ে নিচ্ছে জীবনের আরও কিছুটা সময়। গন্তব্য এক এক জনের এক এক জায়গা। মাঝের সময় টুকুতে শুধু কয়েক মুহূর্ত আমরা একই বাসের সহযাত্রী। সারা জীবন কারও সঙ্গেই কোনও দিনও দেখা হবে না কারও।

আমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটি সানগ্লাস মাথায় তুলে রেখেছে। ‘হ্যাঁ’, ‘আচ্ছা’, ‘না তো’, ‘বেশ’, এইসব শব্দের সহায়তায় উত্তর দিয়ে চলেছে। এক পারের কথা শুনে শুনে ওপার থেকে কী ভেসে আসছে বোঝা কোনও ভাবেই সম্ভব নয়। বোঝার প্রয়োজনও নেই। সামনাসামনি দাঁড়িয়ে এ ভাবে একপাক্ষিক কথোপকথন শোনা তো পাবলিক বাসে নতুন কিছু নয়।

কিন্তু, এক হাতে ফোন আর এক হাতে বাসের রড ধরে ব্যালেন্স করতে করতে বাসের দুলুনিতে পথ চলতে থাকা মেয়েটির ধীর স্থির গলায় যেই শুনলাম ‘ঠিক আছে বল, কি চাস তুই?’ মুখের দিকে তাকিয়ে ফেললাম মেয়েটির।

ওদিক থেকে কি উত্তর এল জানতে পারলাম না, শুধু দেখলাম হঠাৎ কিছুতেই আটকে না রাখতে পেরে দু’চোখ ছাপিয়ে গাল বেয়ে নেমে আসছে জল। বাধাহীন, সীমাহীন।

আমারও কেমন গলার কাছটা দলা পাকিয়ে যাচ্ছে। মেয়েটার হাতটা ধরে ভীষণ বলতে ইচ্ছা করছে ‘কিচ্ছু হয়নি, সব ঠিক হয়ে যাবে।’ কিন্তু বলতে পারছি না। আমার চেয়ে অনেক ছোট হবে মেয়েটা, কাঁদছে, নিঃশব্দে, ব্যাগ থেকে রুমাল বার করার অবকাশ নেই। টি-শার্ট আর জিন্সের পরিধানে ওড়নার আভরণ নেই যেটুকু দিয়ে আগল খোলা এই জলটুকু মুছে নেওয়া যেত। অথবা মুছত না।

কে বলতে পারে হয়তো সালোয়ার কামিজ আর ওড়না থাকলেও আড়াল করতে ইচ্ছাও করত না ওর এই অনন্ত অশ্রু আবেগ। কে বলতে পারে কি চেয়েছে ছেলেটি?

একটা ফেস টিস্যু পেপার বার করে দিতে গিয়েও থেমে গেলাম। এবার চোখাচোখি হয়ে গেল মেয়েটির সঙ্গে। বললাম ‘কাঁদো। ভেতরের সবটুকু বার করে কেঁদে নাও।’ চোখের ভাষাতেই বললাম। শব্দহীন।

তারপর ‘ঠিক আছো তো?’ জিজ্ঞেস করে শক্ত করে চেপে ধরলাম হাত। মেয়েটি বোঝাতে চাইল একদম ঠিক আছে সে। আর আরও একটু কান্নায় ভিজিয়ে ফেলল গম রঙের রোদে পোড়া গাল। আর তারপরই পরের স্টপেজে স্নানগ্লাসে ভেজা চোখ ঢেকে বাস থেকে নেমে যাওয়ার সময় পাদানিতে পা পিছলে পড়ে গেল একদম রাস্তায়। না, বাস চলে যায়নি পায়ের ওপর দিয়ে। বাস ছেড়েও যায়নি। ওই স্টপেজেই যে ছেলেটি সব চেয়ে আগে এগিয়ে এসেছে, হাত বাড়িয়ে দিয়েছে উঠে দাঁড়ানোর জন্য, তার মুখেও একটা অনন্ত আশ্বাস। কিছুই হয়নি। না না পা ভাঙেনি। মচকেও যায়নি। অন্যমনস্ক হয়ে নামতে গিয়েই বিপত্তি। আসলে ও পারের সেই কি চাস তুই বল এর উত্তরে যে কান্নার শুরু, সে কান্না এখনো জমে আছে অনেকটা। কি চেয়েছে ওপর প্রান্তের মানুষটি?

বাস ছেড়ে দিচ্ছে। দেখলাম সেই হাত বাড়িয়ে দেওয়া ছেলেটি পাশের দোকানের সামনে হাত ধরে বেঞ্চে বসিয়ে এক বোতল জল কিনে হাতে ধরিয়ে দিল মেয়েটির। মেয়েটির মুখে স্মিত হাসি। থাক এ হাসি লেগে থাক। আমি যেন এক লহমায় অনেক কিছু দেখতে পেলাম। কেন জানি না দেখলাম এবার পুজোয় দুজনে হাত ধরে ঠাকুর দেখতে বেরিয়েছে। আর একটা নতুন গল্প শুরু হয়েছে ওদের দুজনে।

কলকাতার রাস্তায় মিলিমিটার থেকে মিলিমিটার এগিয়ে যাচ্ছে বাস, জানলার কাঁচ দিয়ে উদ্ধত ৪২-এর উচ্চতা মেপে নিতে চাইলাম। শরতের মেঘ চিরে হঠাৎ বৃষ্টি নামল বলে। মনে মনে চেয়ে নিলাম নীল আকাশের কাছে- নতুন এ গল্পে দুজনের কি চাস তুই বলের উত্তরগুলো হয়ে যাক একই….