Abin-Senআশালতা লজ

অবিন সেন

 

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

 

ম্যানেজার তড়িৎ পাল। পঞ্চাশের উপরে বয়স। মুখ ভর্তি পান। মাথায় বড় বড় কাঁচা পাকা বাবরী চুল।

অর্ক বলল

-এই মহিলা কখন এসেছিল?

-তা রাত সাড়ে নটা হবে।

-মহিলার ঘরে কেউ এসেছিল?

-ম্যাডাম এসেই এক বার বের হলেন। তার মিনিট দশেক পরে ম্যাডাম ফিরে আসে, সঙ্গে এক ভদ্রলোক।

-সেই লোককে আপনি আগে দেখেছেন?

-না, স্যার।

-সেই ভদ্রলোক কতক্ষণ ছিলেন?

-অল্প সময়। এই দশ মিনিট।

-তারপর আর অরুণাকে দেখেছিলেন?

-না, স্যার।

-সে রাত্রে খায়নি?

-সে ঘর নেবার সময়েই বলেছিল রাত্রে খাবে না।

প্রবাল বলল

-তা হলে তো সেই লোককে খুঁজে পেলেই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

সে মুচকি হসল।

প্রবাল বলল

-আপনি কি গান করেন ?

-তড়িৎ পাল বাবরী দুলিয়ে বলল

-না স্যার।

-আপনার গলাটি সুন্দর। তাই মনে হল। তা আপনি ছাড়া কে কে  কাজ করে এখানে ?

-কাজের লোক বাবলু, বাবলু কয়েকদিন হল এসেছে। আগে যে ছেলেটি ছিল সেটি ছেড়ে দিতে বাবলু কে রাখা হয়েছে। রান্নার ঠাকুর সহদেবদা। আর দিনের বেলা তিনজন ঠিকা কাজের লোক আছে।

-আপনার বাড়ি কোথায়?

-এটাই আমার ঘর বাড়ি স্যার। আমার তিন কুলে কেউ নেই। বিয়ে থা করিনি।

রিসেপসানে লজের মালিক সাধন দত্ত বসে ছিলেন। গোলগাল ভদ্র চেহারা।

প্রবাল বলল

-তড়িৎ বাবুই কি সমস্ত দেখাশুনা করে?

-একরকম তাই।

দত্ত বাবু বললেন।

-তবে তড়িৎ তো পাগলা। যাত্রা পাগল। মাঝে মাঝে দু চার দিনের জন্য উধাও হয়ে যায়। তখন আমাকেই দেখতে হয়। আমার ভাইপো বিজয় টুক টাক দেখা শুনা করে। সে আবার সিনেমা পাগল। ছবি পাগল। সেও দু চার দিন করে কোথায় চলে যায়। বলে গাঁ গঞ্জে গিয়ে সে ছবি তোলে। তবে তড়িতের সঙ্গে তার বোঝাপড়া খুব ভালো। ওদের নিয়ে আমায় কোথাও সমস্যায় পড়তে হয়নি।

-বিজয় কোথায়?

-দু দিন থেকে তার খোঁজ নেই। ফোন বন্ধ। সে এমনই।

-আপনারা তার খোঁজ করেননি?

-না, স্যার । সে মাঝে মাঝেই এমন দু-চার দিনের জন্যে উধাও হয়ে যায়। কাউকে বলে যায় না। ফোন বন্ধ থাকে।

-কোনো নেশা করে?

-তা, স্যার মদ বিড়ি সিগরেট খায়। আর কিছুর নেশা করে কিনা জানা নেই স্যার।

-মেয়েছেলের নেশা?

দত্তবাবু যেন একটু অপ্রস্তুতে পড়ে গেলেন। একটু আমতা আমতা করলেন। তার পরে ঘাড় নাড়লেন।

-ঠিক জানি না স্যার!

প্রবাল বলল

-তার মানে, এমন অভ্যাস তার থাকলেও থাকতে পারে! তাই না?

দত্তবাবু কিছু বলনেন না। ঘাড় নীচু করে বসে থাকলেন।

অর্কর তত্তাবধানে SI সামন্ত লজের বাকি বোর্ডারদের জেরা করছিল। এই লজে যারা আসেন তারা বেশীরভাগই এক রাত্রের জন্য আসেন। অনেকই সকালে চলে যান। দুই, তিন আর পাঁচ নাম্বার ঘরের বোর্ডাররা তখনো বের হননি। সামন্ত তাদের জেরা করলেন। এক আর চার নাম্বার ঘরের বোর্ডার সকালেই বেরিয়ে গিয়েছিলেন। সামন্ত, রেজিস্টার থেকে তাদের নাম ধাম ডাইরিতে লিখে নিলেন।

প্রবাল বলল

-অর্ক, এই দু জনকে একটু বাজিয়ে দেখতে বলিস। অবস্য যদি সঠিক নাম ঠিকানা দিয়ে থাকে।

অর্ক বলল

-দেখা যাক!

 

সেখান থেকে বের হতে হতে অর্ক বলছিল

-কি বুঝছিস?

-দ্যাখ, খুনের মোটিভ কি? অরুণা কেন খুন হল সেটা আগে আমাদের খুঁজে বার করতে হবে। তুই সকলের জবানবন্দীর ফাইলটা আমাকে পাঠিয়ে দিস। ওটা ভালো করে পড়ে দেখতে হবে। আর দেখে মনে হচ্ছিল কেউ যেন অরুণার কামিজটা কোন ক্রমে কোমর পর্যন্ত তুলে দিয়েছে। রেপ করবার চেষ্টা হয়েছিল কি? পোস্টমর্টেম রিপোর্ট  না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

তুই নিজে রুনু লাহিড়ীকে জেরা করিস।

-তুই কি ওনাকে সন্দেহ করছিস?

-নয় কেন? তা ছাড়া অরুণা কেন সেদিন ওখানে থাকতে এল? বাড়ি ফিরে গেল না কেন? সেটা জানা দরকার। কিংবা ওই লজেই কেন? সব থকে বড় কথা মোটিভ কি ?

 

 

দুই

 

বড় রাস্তা থেকে একটা গলি। সেই গলি পেরিয়ে আরো একটা অন্ধ গলি। সেই অন্ধ গলির একেবারের শেষের দুটো বাড়ির আগে বাড়িটি খুঁজে পেল প্রবাল আর তনুকা। আজ প্রবালের সঙ্গে তনুকা এসেছে। তনুকা নিজে থেকেই এসেছে। আজকাল সে প্রবালের অ্যাসিস্ট্যান্ট হয়ে গিয়েছে তদন্তের কাজে।

বাড়িটি দো-তলা। বহু পুরানো। জীর্ণ। কয়েক দিনের টানা বর্ষণের পরে আজ রোদ উঠেছে। ইচ্ছে ছিল সকালেই আসবার, কিন্তু নানা কাজে তাদের দেরি হয়ে গিয়েছে। জায়গাটা বারাসাত স্টেশন থেকে বেশ কিছুটা ভিতরের দিকে। যদিও তারা গাড়িতে এসেছে তবু জায়গাটা খুঁজে পেতে তাদের বেশ বেগ পেতে হয়েছে।

পড়ন্ত বিকেলে গলিটি বেশ ছায়া ছায়া।

তনুকা কাঠের দরজার লোহার বালাদুটি ধরে নাড়া দিল। বেশ কয়েকবার নাড়া দিল। কয়েক মুহূর্ত পরে ভিতর থেকে এক মহিলার গলা শুনতে পেল তারা। ভিতরের মহিলার কণ্ঠস্বর বললেন—“ অনিমা দেখ তো কে এলো?”

আরো কিছুক্ষণ পরে দরজা খুলে এক কিশোরী দাঁড়াল। প্রবাল দেখল কিশোরীর মুখে অরুণার মুখের আদল স্পষ্ট। অনিমা কিছু বলার আগেই তনুকা ঝলমলে কণ্ঠে বলল—

অনি, তুমি আমাদের চিনবে না, আমি তোমার দিদির বন্ধু, তনুকা।

এই ধরনের অভিনয় করতে তনুকার খুব খারাপ লাগছে। কিন্তু প্রবাল এমনটাই প্ল্যান করেছে।

অনিমা এক মুহূর্ত ছবির মতো দাঁড়িয়ে থাকল, তারপর মৃদু গলায় বলল—

ভিতরে আসুন না দিদি।

Ashalota-lodgeদরজার ভিতরে একটা উঠোন। উঠেনে কাদা। কাদায় যাতে পা ফেলতে না হয় সেই জন্যে কয়েকটি ইট পেতে রাখা আছে। উঠোন পেরিয়ে অনিমা তাদের একটা ছোট ঘরে নিয়ে গিয়ে বসাল। ঘরে একটি ছোট চৌকি পাতা। চৌকির উপরের বিছানাটি ময়লা। ঘরে বসার মতো আর কিছু নেই। প্রবাল আর তনুকা সেই চৌকির উপরে বসল। সারা ঘরে নিদারুণ দৈন্যের ছাপ লেগে আছে। দেওয়াল থেকে মাঝে মাঝে প্লাস্টার খসে গিয়েছে।

অনিমা কি বলবে খুঁজে পাচ্ছিল না। সে একটা ছবির পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে ছিল।

তনুকা কথা বলল—

তোমার দিদি তো আমাদের বিয়েতে যায়নি। তাই বরকে নিয়ে আমিই এখানে এলাম। সে ইঙ্গিতে প্রবালকে দেখাল।

তনকা দেখল, অনিমার মুখ বেদনায় বর্ণহীন হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। আস্তে আস্তে তার বড় বড় চোখদুটি জলে ভরে আসছিল। তখনি ঘরের বাইরে থেকে “কে এলো রে অনিমা” বলতে বলতে এক পৌঢ়া দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন।

অনিমা আর নিজেকে সামলাতে পারল না, ঝর ঝর করে কেঁদে ফেলল। মা’র গলার মধ্যে সে মুখ গুঁজে দিয়ে কান্না জড়ানো গলায় বলল—

এনারা দিদির সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন মা।

তার পরে মহিলাও চোখে জল ধরে রাখতে পারলেন না। কাঁদলেন খুব করে। তার পরে কান্না জড়ানো স্বরে অরুণার কথা বললেন।

সবাই একটু স্বাভাবিক হলে তনুকা বলল—

আমি তো বিশ্বাস করতেই পারছি না মাসীমা। অরুণা কি নতুন কোনও চাকরি পেয়েছিল ? আমাকে তো বলেনি!

মাসীমা বললেন—

ও তো সব কথা আমাকেও খুলে বলত না। তবে মাস তিনেক আগে সে একটা ভালো চাকরি পেয়েছে বলেছিল। বলেছিল অনেক মাইনে দেবে।

-ও কি মাঝে মাঝে কলকাতায় থেকে যেত ?

-না, না। সে দিন শুধু ফোন করে বলল, জরুরি কাজে আটকা পড়ে গিয়েছে। ফিরতে পারবে না।

অরুণার মা আঁচলে চোখ মুছলেন।

-মাসীমা, ও কোথায় চাকরি করত জানতেন ? কোন ঠিকানায় ?

-না, আমাকে তো কিছু বলেনি।

তিনি অনিমার দিকে তাকালেন। অনিমা বলল—

-দিদি একবার বলেছিল তার অফিস শিয়ালদার ওদিকে।

-কোনও ঠিকানা বলেছে?

-না, না। তবে দিদির ডাইরিতে লেখা থাকতে পারে। দেখব ?

-চলো আমি তোমাকে হেল্প করি।

সে অনিমার সঙ্গে গেল।

অরুণার ঘরটি বেশ বড়। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে গোছানো। ঘরে আসবাব বলতে একটি বড় তক্তপোশ। আর একটি পুরানো আমলের আলমারি কাম আলনা। আলনার নীচার তাকে বেশ কছু বাই খাতা পরিপাটি করে গোছানো। আলনায় সাধারণ কাপড় জামা। আলমারির কাঠের পাল্লায় চাবি ঝুলছিল।

বই খাতার মধ্যে গোটা দুই ডাইরি। তনুকা একটা ডাইরি টেনে নিয়ে উল্টে পালটে দেখছিল। দেখল ডাইরি তে ধারাবাহিক ভাবে কিছু লেখা নেই। মাঝে মাঝে কিছু কিছু লেখা। কোথাও কয়েকটি ফোন নাম্বার। পাশে নাম। কোথাও কয়েকটি ঠিকানা। তনুকা লেটেস্ট ডাইরিটা দেখছিল। একটা জায়গায় তার চোখ আটকে গেল। দেখল, যে লজে অরুণা খুন হয়েছে সেই লজের ঠিকানা লেখা। পাশে ফোন নাম্বার। আরও কয়েকটি শিয়ালদা এলাকার ঠিকানা লেখা দেখল।

তনুকা বলল—

-অনিমা, তোমার দাদা কি করে?

-দাদা, কিছু করে না তেমন। MA পাশে করে বাসে আছে। চাকরি কিছু পায়নি। পার্টি করে এখন। হোল-টাইমার। অল্প স্বল্প কিছু পায়। তাতেই আমাদের চলছিল। দিদি চাকরি পেতে আমাদের অনেক উপকার হয়েছিল।

-তোমার দাদা কখন বাড়িতে থাকে?

-দাদা কখন বাড়িতে থাকে তার কোনও ঠিক ঠিকানা নেই। সকালে চা খেয়ে বেরিয়ে যায় আর সেই রাত্রে বাড়ি ফেরে। দাদা খুব ভালোবাসত দিদিকে । দিদির এই ঘটনা ঘটার পরে দাদা একে বারে পাগলের মতো হয়ে গিয়েছে। সারাদিন পাটির নেতাদের কাছে দৌড়া-দৌড়ী করছে দিদির খুনি যাতে ধরা পড়ে।

অনিমার গলা কান্নায় বুজে এলো আবার।

-অনিমা আমায় একটু জল খাওয়াবে?

অনিমা জল আনতে গেলে তনুকা দ্রুত হাতে আলমারি খুলল। আলমারির ভিতরে শুধু কাপড় জামা। মেয়েলি পোশাক আসক। তনুকা সেগুলির ভিতরে হাত গলিয়ে দ্রুত হাতড়াতে লাগল। কাপড় জামার ভিতরে একটা কভার ফাইল খুঁজে পেল সে। ফাইলটা খুলতেই কয়েকটি কাগজ একটি ছবিতে তার চোখ আটকে গেল। সে সেই কাগজগুলি দ্রুত হাতে তার হ্যান্ড ব্যাগের  ভিতর ঢুকিয়ে নিলো। অরুণার লেটেস্ট দুটো ডাইরিও সে ব্যাগে ভরে নিলো দ্রুত। সে অনিমার পায়ের শব্দ শুনতে পেল। তনুকা বিছানায় গিয়ে বসল।

অনিমা একটি প্লেটে চারটে রসগোল্লা ও একটি কাচের গ্লাসে জল নিয়ে এসেছে।

-আবার মিষ্টি আনতে গেলে কেন?

অনিমার পিছনে পিছনে অনিমার মা এসেছিলেন। তিনি বললেন

-তুমি প্রথম বার এলে। জামাইকে নিয়ে। মিষ্টিমুখ না করলে হয়।

ফেরার পথে তনুকা ড্রাইভ করছিল।

প্রবাল গাড়ির মধ্যে আলো জ্বেলে অরুনার ডাইরিটা পড়ার চেষ্টা করছিল। সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছে । আকাশে আবার মেঘের ঘন-ঘটা। বৃষ্টি এল বলে।

অরুণার খুন হবার পরে ১৭ দিন অতিক্রান্ত হয়ে গিয়েছে। পুলিশ এখনো কোনো ব্রেক-থ্রু জোগাড় করে উঠতে পারেনি। কোনও অ্যারেস্ট হয়নি। সবথেকে বড় কথা মার্ডারের কোনও মোটিভ খুঁজে পায়নি। তারা। পোস্টমার্টেম রিপোর্ট অনুযায়ী শ্বাস রোধ করে খুন করা হয়েছে অরুণাকে। খুনের সময় মোটামুটি রাত দশটা থেকে রাত বারোটার আশে পাশে। রেপ বা কোনও রকম যৌন নিগ্রহের চিহ্ন পাওয়া যায়নি।

প্রবালও গত পনেরো দিন অফিসের কাজে পুনা চলে গিয়েছিল। গতকাল সে কলকাতায় ফিরেছে। ফিরেই সে অর্কর কাছ থেকে এই কেসের সমস্ত কাগজ পত্র চেয়ে পাঠিয়েছে।

তনুকা বলল

-অরুণার ডাইরির মধ্যে কিছু ক্লু পাওয়া যেতে পারে।

-আমি সেটাই খোঁজার চেষ্টা করছি। সবথেকে বড় কথা কথা অরুণা খুন হবার কোনও কারণ তো খুঁজে পাচ্ছি না। আমি অরুণার মা’র সঙ্গে অনেক্ষন কথা বললাম। অরুণার ব্যাক গ্রাউন্ড একেবারে পরিষ্কার। প্রেম ঘটিত কোনও অন্ধকার দিক আপাতত খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। অরুনা সকালে অফিস বের হত আর ঠিক সময়ে ফিরে আসত। প্রথমে ভেবেছিলাম অরুণা অধঃপাতে যাওয়া একটি মেয়ে। কিন্তু, অরুণা ডাকসাইটে নেতা রুনু লাহিড়ীর অফিসে কাজ করত। অন্তত তার ডাইরি আর চাকরির একটা নিয়োগপত্র সে রকমই বলছে। রুনু লাহিড়ীর একটা ছবিও তো দেখছি অরুণার ফাইলের মধ্যে আছে। অর্থাৎ অরুনার দিক থেকেও একটা সফ্ট কর্নার ছিল রুনুবাবুর প্রতি। এখন এই অ্যাঙ্গেল থেকে কোনো মোটিভ পাওয়া যায় কি না দেখতে হবে।এখন নেতা জবানবন্দীতে কি বলেছে সেটা দেখতে হবে। আজ রাতে অর্ক কে আসতে বললাম, সমস্ত কাগজপত্র নিয়ে।

 

রাত্রি প্রায় নটার সময় অর্ক এল প্রবালের বাড়িতে। আজ তার ডিনারেরও নিমন্ত্রণ। ডিনারের পরে তারা বসার ঘরে বসে আলোচনা করছিল।

প্রবাল বলল

-তদন্তের আপ টু ডেট রেজাল্ট বল।

-বিগ জিরো, ডিয়ার। কোনও ক্লু খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তুই যে ভাবে বলেছিস সেই ভাবে গলির মোড়ের সমস্ত দোকানদার, হকার সবাইকে জেরা করা হয়েছে। কিন্তু অরুণার ঘরের সেই আগন্তুকের ব্যাপারে কোনও তথ্য পাওয়া যায় নি।

-কেউ দ্যাখেনি ?

-ওই গলিতে তো অনেক লোককেই দেখা গিয়েছিল। কিন্তু ঠিক কে অরুণার ঘরে গিয়েছিল সেটা পাওয়া যাচ্ছে না।

-সে দিন কি সন্ধ্যার পরে বৃষ্টি হয়েছিল?

-হ্যাঁ, সন্ধ্যা থেকে প্রায় ভোর রাত পর্যন্ত একটানা বৃষ্টি হয়েছে।

-তা, হলে অরুনা কি ভিজে ভিজে এসেছিল? নিশ্চয়ই না। তা হলে তার ঘরে একটা ছাতা পাওয়া যাবার কথা। কিন্তু অরুণার ঘরে কোথাও বা তার ব্যাগে কোনো ছাতা খুঁজে পাওয়া যায়নি।

-তাইতো! তবে এমনটাও তো হতে পারে যে আগন্তুক অরুণার ঘরে এসেছিল সে সেই ছাতাটি নিয়ে গিয়েছে।

-হতে পারে। তবে তাই কি ? সেটা নিয়ে পরে ভাবা যাবে, এখন বল নেতা রুনুবাবু কি বলল?

-রুনুবাবুর সঙ্গে আমি নিজে কথা বলেছি। রুনুবাবু পারফেক্ট জেন্টলম্যান। আর পাঁচজন রাজনৈতিক নেতার মতো না। উচ্চ শিক্ষিত। সমঝদার। বারাসাতে একটা রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে গিয়ে অরুণার সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। তার পর অরুণা একদিন শিয়ালদায় এসে রুনুবাবুর সঙ্গে দেখা করে একটা চাকরির কথা বলেন। রুনুবাবু তার অফিসেই অরুণার চাকরির ব্যবস্থা করে দেন। অরুণা যথেষ্ট কাজের মেয়ে ছিল। অরুণা পরের দিকে রুনুবাবুর সেক্রেটারির কাজ সামলাত। রুনুবাবু স্বীকার করেছেন, উনি ধীরে ধীরে অরুণার প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন। অরুণাও সে কথা জানত। তারও সায় ছিল। রুনুবাবু প্রকৃতই খুব দুঃখ পেয়েছেন। এবং উনি ড্যাম ডিটারমাইন্ড টু ফাইন্ড দ্যা কিলার। উনি ক্রমাগত ভিতরে ভিতরে সিপি সাহেবকে চাপ দিয়ে চলেছেন।

-হুম! এ তো কলিযুগের ধর্মপুত্র মনে হচ্ছে। বাই দ্যা ওয়ে, যে দিন ঘটনা ঘটে সে দিনের ব্যাপারে রুনুবাবুর বক্তব্য কি?

-ওই দিন কাজে কাজে অরুণার দেরি হয়ে গিয়েছিল।তার উপর একটানা বৃষ্টি পড়ছিল। আবার পরদিন ভোরেই রুনুবাবুর সঙ্গে তার বর্ধমান যাওয়ার পোগ্রাম ছিল। সে কারণে রাত্রে কোথাও থেকে যাবে বলে ঠিক করে অরুণা। পাছে অরুণা কিছু ভাবে তাই রুনুবাবু অরুণাকে নিজের বাড়িতে থাকতে বলেনি। অরুণা বলেছিল তার একটা চেনা লজ আছে সে সেখানেই থেকে যাবে। আর লজটা তো রুনুবাবুর অফিসের কাছেই।

-অরুণার ডাইরি থেকেও জানা যাচ্ছে অরুণা আগে থেকেই ওই লজের খবর জানত। আগে হয়ত সে এখানে থেকে থাকতে পারে। তেমন সম্ভাবনাই বেশী।

-ওই ঘরে হাতের আর পায়ের ছাপের রিপোর্ট কি বলছে?

-মোট বারো জনের পায়ের ছাপ পাওয়া গিয়েছে ওই ঘরে। তার মধ্যে তুই, আমি আর আমাদের লোক মিলিয়ে সাত জানের পায়ের ছাপ আছে। আর দুটো ছাপের একটা তড়িৎবাবুর আর একটা লজের কাজের লোক বাবলুর। আর দুটো পায়ের ছাপ আইডেন্টিফাই করা যায়নি।

-স্ট্রেঞ্জ! অরুণার কোনো পায়ের ছাপ নেই?

অর্ক বলল

-হতে পারে অন্যদের পায়ের ছাপে তার পায়ের ছাপ মুছে গিয়েছে।

-তা হলেও দুটো অচেনা পায়ের ছাপ কেন? তবে কি অচেনা দু-জন লোক অরুনার ঘরে গিয়েছিল? আচ্ছা, লজের আর সব লোকের পায়ের ছাপের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়েছে?

-সে আর বলতে! তবে কারো পায়ের ছাপের সঙ্গে ও দুটো ছাপ মেলেনি।

-আচ্ছা যে ব্যক্তি ফোন করে খুনের খবর দিয়েছিল তাকে ট্রেস করা গেল?

-নাহ! ওটা একটা পিসিও থেকে ফোন করা হয়েছিল।

প্রবাল জবানবন্দীর উপর চোখ বোলাচ্ছিল। বলল—

-কাল একবার ওই লজে যেতে হবে। অরুণা যে ঘরে খুন হয় সেই ঘরটা নিশ্চয় সিল করা আছে?

-তা, আছে।

-অরুণার ঘরে যে তোয়ালেটা পাওয়া গিয়েছিল সেটা তুই ফরেনসিক ল্যাবে পাঠিয়ে দে। এবং এক দিনের মধ্যা রেজাল্ট চাই।

প্রবাল দেখল, লজের অন্যান্য ঘরে যে সব লোক ছিল তাদের জবানবন্দী থেকেও দরকারী কিছু পাওয়া যাচ্ছে না।

অর্ক বলল

-প্রবাল, এই খুনের কোনও মোটিভ খুঁজে পাচ্ছিস তুই?

প্রবাল ঘাড় নাড়ল। সেও কোনো মোটিভ খুঁজে পাচ্ছে না। সে বলল

-সেটা খুঁজে পেলেই এই কেসর সমাধান হয়ে যাবে।

 

 

তিন

 

পরদিন তারা আবার “আশালতা লজ”-এ গেল। প্রবাল, তনুকা, অর্ক আর এস.আই. সামন্ত। তাদের দেখে ম্যানেজার তড়িৎ-বাবু হেঁ হেঁ করে এগিয়ে এল। আজকেও তড়িৎ বাবুর মুখ ভর্তি পান। তনুকা গিয়ে কাউন্টারের সামনে একটা চেয়ার টেনে বসল। বুকিং রেজিস্টারটা টেনে নিয়ে পাতা ওলটাতে শুরু করল।

প্রবাল বলল—

-সামন্ত বাবু, আট নাম্বার ঘরটা খুলুন।

পুলিস ঘরটা সিল করে দিয়ে গিয়েছিল। সামন্তবাবু গিয়ে তালা খুললেন।

প্রবাল বলল

-অর্ক, আন-নোন পায়ের ছাপ গুলো কোন কোন পজিশনে পাওয়া গেছে তার একটা স্কেচ করতে বলেছিলাম করেছিস?

-এই যে।

অর্ক একটা ফাইল খুলে একটা হাতে আঁকা স্কেচ বার করে প্রবালকে দিল।

প্রবাল হাঁটু মুড়ে বসে ছাপগুলোর পজিশনের জায়গায় একটা করে চক দিয়ে পায়ের ছাপ আঁকতে থাকল। ছাপ বেশী নয়। কয়েকটা মাত্র। বাকি ছাপগুলো আরো পায়ের ছাপে মুছে গিয়ে নষ্ট হয়ে গিয়েছে। এই ভাবে বহুক্ষণ ধরে অভিনিবেশ সহকারে সেই অচেনা দু জনের পায়ের ছাপের পজিশনগুলো সে আঁকল। একটা পায়ের ছাপকে সে “এক্স” দিয়ে চিহ্নিত করল আর আর একটা ছাপকে “ওয়াই” দিয়ে দাগাল। এবার সে বাথরুমে গিয়ে সেখানে ক’জনের পায়ের ছাপ পাওয়া গিয়েছে সেটা সে তার মোবাইলে নোট করল। সে দেখল হিসেব মতো পাঁচ জনের পায়ের ছাপ পাওয়া গিয়েছে ।

এবার সে একটা ছোট স্কেল দিয়ে “এক্স” আর “ওয়াই” এর পায়ের ছাপের মধ্যে দূরত্ব গুলো মাপতে থাকল আর মোবাইলে একটা ওয়াড পেজ খুলে তাতে নোট করতে থাকল। প্রায় ঘণ্টা দুই ধরে সে এই কাজ গুলো করল।

 

রিসেপসানে বসে বসে তনুকা বক বক করছিল তড়িৎবাবু ও লজের কাজের বয় বাবলুর সঙ্গে। তনুকা বলছিল

-তড়িৎবাবু, সেই দিন অর্থাৎ অরুণা যেদিন খুন হল তার পরদিন সকালে পুলিশ আসার আগে পর্যন্ত আপনাদের কোনো সন্দেহ হয়নি, যে এতটা বেলা হল অথচ আট নম্বর ঘরের বোর্ডর একবারও দরজা খুলল না কিংবা চা-জলখাবার খেতে চাইল না? পুলিশ আসে প্রায় বেলা এগারোটার সময়।

-সন্দেহ নয়, একটু অবাক হয়েছিলাম। কি জানেন ম্যাডাম, “ডোন্ট ডিস্টার্ব” বোর্ড ঝোলানো ছিল বলে আমরা আর বিরক্ত করিনি।

তিনি ঘাড় নেড়ে বাবরি চুল দুলিয়ে বাবলুকে লক্ষ করে বললেন—

-কি রে বাবলু, আমি তোকে বলিনি একটু কড়া নেড়ে দেখতে, দিদিমণি এখনো উঠছে না কেন?

বাবলু ঘাড় নাড়ল। বাবলু একটা হাট্টা কাট্টা যুবক। মুখটা বোকার মতো। তার মুখ দেখে মনে হয় মালিকের যে কোনো নির্দেশ সে বিনা দ্বিধায় পালন করে।

তনুকা বলল

-কি বাবলু, তুমি কড়া নেড়ে দেখেছিলে নাকি।

সে আবার ঘাড় নাড়ল। তারপর বলল

-কিন্তু ভিতর থেকে দিদি সাড়া দেয়নি।

তনুকা আবার তড়িৎবাবুর দিকে ফিরল। বলল-

-তড়িৎবাবু, আপনি অরুণাকে চিনতেন, আগে?

-না, না, ম্যাডাম, আগে কখনো দেখছি বলেই মনে হয় না!

-তবে যে অরুণার বোন বলল, দিদি আশালতা লজে থাকত মাঝে মাঝে।

তনুকা মিথ্যে কথা বলল।

-কি বলছেন ম্যাডাম! কোথাও একটা ভুল হচ্ছে আপনাদের। আমার এই লজে মহিলা কাস্টমর আসেই না বলতে গেলে।

তড়িৎবাবু তার বাবরি চুল দুলিয়ে কথাগুলো বলল।

-তড়িৎবাবু, আপনি এই এলাকার ডাকসাইটে নেতা রুনু লাহিড়ীকে চেনেন?

-দুর থেকে দেখেছি। নাম শুনেছি। এই পর্যন্তই। আমাদের মতো ছোটো লোকদের সঙ্গে উনার মতো বড় মানুষের পরিচয় থাকবে কি করে?

-তা, কি শুনেছেন? কেমন লোক উনি?

-গভীর জলের মাছ, ম্যাডাম। উনার দুটো চেহারা। একটা বাইরের। আর একটা ভিতরের।

-তেমন টা তো বেশীরভাগ মানুষেরই থাকে। তাই না?

তড়িৎবাবু ঘাড় নাড়লেন।

-আচ্ছা, যে লোকটি সেদিন রাত্রে অরুণার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল সে লোকটা কতক্ষণ ছিল অরুণার ঘরে?

-বাবলু, সেই রেনকোট পরা লোকটা কতক্ষণ ছিল অরুণার ঘরে?

বাবলু, একটু আমতা আমতা করল। এদিক সেদিক তাকাল। বলল—

-বেশীক্ষণ না। এই মিনিট দশেক!

-লোকটা যে রেনকোট পরেছিল সেটা তো আগে বলেননি, তড়িৎবাবু?

-বলিনি! না না, বলেছিলাম।

-তা হবে হয়ত! কারন, সেদিন তো খুব বৃষ্টি হচ্ছিল ।আচ্ছা, অরুণা ঘরে ঢোকার কতক্ষণ পরে আবার বের হয়?

-অরুণা, ঘরে ঢুকেই, প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বের হয়।

-অরুণা নিশ্চয়ই ছাতা নিয়ে বেরিয়েছিল। কিন্তু অরুণার ঘরে তো কোনো ছাতা ছিল না।

তড়িৎ পাল একটু বোকার মতো যেন হাঁ করে থাকল। তার পরে বলল

-অত কি আর মাথায় আছে ম্যাডাম! আমার লজের বদনাম হয়ে গেল, সেই নিয়েই আমার মাথা খারাপ হয়ে আছে। অন্য কিছু আর ভাবতেই পারিনা। এই ঘটনার পরে কয়েকদিন তো হয়ে গেল। লজে কাস্টমারই নেই। মাছি তাড়াচ্ছি।

তড়িৎ পাল হাত নেড়ে যেন আক্ষেপের ভঙ্গি করল।

তনুকা বলল—

-তড়িৎবাবু, সাত নাম্বার ঘর খালি থাকা স্বত্বেও অরুণাকে আট নম্বর ঘর দিলেন কেন?

ততক্ষণে প্রবাল ও অর্ক কাউন্টারের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।

প্রবাল তিরের ফলার মতো একটা প্রশ্ন করল—

-অরুণাকে মারলেন কেন?

-তড়িৎবাবু, চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন

-কি বলছেন স্যার?

প্রবাল তার কথার কোনো জবাব না দিয়ে বলল—

-কিন্তু কথা হচ্ছে কেন মারলেন? কেন তড়িৎবাবু?

তড়িৎবাবু আবার বাবরি দুলিয়ে ঘাড় নাড়লেন।

-কি, বলছেন আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না?

তনুকা, রেজিস্টারে প্রথমে ঠিক ই লেখা হয়েছিল। অর্থাৎ অরুণা সাত নাম্বার ঘরেই ভাড়া নিয়েছিল। আসলে যে ঘরে অরুণার বডি পাওয়া যায় সে ঘরটা আট নাম্বার ঘর। অরুণা সে ঘরে ছিল না। সারা ঘরে অরুনার কোথাও এক ফোঁটা পায়ের ছাপ বা হাতের ছাপ নেই। কারন অরুণা তো ও ঘরে ছিলই না। খুন করার পরে অরুণা কে আট নাম্বার ঘরে নিয়ে এসে বিছানায় শুইয়ে দেওয়া হয়। পরে রেজিস্টারে সাত নাম্বারকে বুলিয়ে আট করে দেওয়া হয়। কিন্তু, আট নাম্বরের নীচে যে চাবির নম্বর লেখা আছে সেটা সাত নম্বর ঘরের চাবির নম্বর। সেটা আর ঠিক করা হয়নি। তাই না।

-কি, তড়িৎবাবু তাইতো?

তড়িৎ বাবু কোনো উত্তর দিল না।

প্রবাল বলল

-গতকাল যখন রেজিস্টারের জেরক্স দেখি তখনি ব্যপারটা আমার মাথায় খেলে যায়। আজ এসে দেখলাম আট নাম্বার ঘরের ঠিক সামনের ঘরটি সাত নাম্বার ঘর। কিন্তু এত সব কেন? তড়িৎবাবু?

 

তড়িৎবাবুর মুখের চেহারা বদলে যাচ্ছিল। তার ঠোটের কষ বেয়ে লাল পানের রস গড়িয়ে পড়ে মুখটাকে আরো বীভৎস করে তুলেছিল। তড়িৎবাবু হাত দুটো ছুঁড়ে একটা বীভৎস চিৎকারের ভঙ্গি করতে গেল। কিন্তু তার গলা শুকিয়ে আসছিল। তার জিভ শুকিয়ে যেন গলার ভিতর সেঁধিয়ে যাচ্ছিল।

প্রবাল আবার বলল

-তড়িৎবাবু, বলুন, খুনটা কে করল? আপনি না আর কেই?

তড়িৎবাবু গলার ভিতর ঘড় ঘড় শব্দের মতো অদ্ভুত একটা শব্দ করল।

 

চার

 

 

তারপর তড়িৎ পালকে গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু তদন্ত যেখানে শেষ বলে মনে হয় আসলে তদন্ত সেখান থেকেই শুরু হয়। কারণ পুলিশের সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ করে তড়িৎ পাল মুখ বন্ধ করেই থাকে এবং অকস্মাৎ ইন্টারোগেশন রুমেই সে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। কাজের লোক বাবলু স্বীকার করে, অরুণাকে সেই খুন করেছিল।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে,  কেন?

কেন’র উত্তর বাবলু দিতে পারেনি। অর্কর মনে হয়েছে পৃথিবীর সবথেকে স্টুপিড খুনিদের মধ্যে একজন হল বাবলু। বোকা, স্টুপিড ও খুনি। তড়িৎ পাল তাকে খুন করতে বলেছিল। তাকে লোভ দেখিয়েছিল?

-বাবলু, রেপ করবি?

বাবলু ঘাড় নেড়েছিল।

-রেপ,করেছিস কখনো?

বাবলু ঘাড় নেড়েছিল।

এই ভাবে বেশ কিছুক্ষণ ধরে তাদের কথোপকথন চলে। বাবলুর চোখ জ্বলতে থাকে শেষ পর্যন্ত। তার সারা শরীর তেতে আগুনের মতো হয়ে গিয়েছিল । তারপর তারা অরুণার ঘরের দরজায় টোকা দেয়। মনে রাখতে হবে সেটা সাত নম্বর ঘর। অরুণা দরজা খুলতেই বাবলু তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। অরুণা শক্ত পোক্ত মেয়ে ছিল। অরুণা পাল্টা লড়াই দেবার চেষ্টা করলে এবং চিৎকার কারার চেষ্টা করলে বাবলু ওড়নাটা তার মুখে গলাব পেঁচিয়ে দেয়। আর তাতেই অরুণা   শ্বাসরোদ্ধ হয়ে মারা যায়। মৃত অরুণাকে রেপ করার অছিলায় বাবলু অরুণার কামিজ নামিয়ে দিয়েছিল। তখনি তড়িৎ পাল তার পশ্চাৎ দেশে একটা লাথি কষায়। বলে-

-বাঞ্চত কি করছিস?

বাবলুর তখন খুব ভয় করছিল । সে মরা অরুণার নাকে মুখে হাত দিয়ে দেখার কিংবা বোঝার চেষ্টা করছিল অরুণা বেঁচে আছে কি না। সে কিছু বুঝতে পারছিল না। ভয়ে তার পায়খানা পেয়ে যায়।

প্রায় ঘণ্টা খানেক সে পায়খানায় বসে থাকে।এই ঘন্টা খানেকের মধ্যে কি হয়েছে বাবলু জানে না। ফিরে এসে দ্যাখে তড়িৎ পাল অরুণার লাশ টাকে বয়ে এনে আট নাম্বার ঘরের বিছানায় শুইয়ে দিয়েছিল।

এর পরেও একটা কিন্তু থেকে যায়, তড়িৎ পাল কেন অরুণাকে খুন করল ! এই প্রশ্নের উত্তর বাবলু দিতে পারেনি। তবে বাবলু বলে আট নাম্বর ঘরে এক জন লোক তিন চার দিন ছাড়া এসে থাকত। তার নাম কখনো রেজিস্টারে এন্ট্রি করা হত না। তড়িৎ বলেছিল সে মালিকের আত্মীয়। নাম অভয় বাবু। বাবলু জানিয়েছিল অরুণা খুন হবার পরে অভয় বাবু আর আশালতা লজে আসেনি। বাবলু বলেছে দু একবার তড়িৎবাবু না থাকায় অভয় লজের কাজ কারবার দেখত। মালিক কালে ভদ্রে আসত।

প্রবাল ভাবল, তা কি করে হয়। তড়িৎ না থাকলে তো বিজয় লজের কাজ কারবার দেখত। অভয়কে কি তবে তড়িৎ পাল মালিকের অজান্তে এখানে নিয়ে এসে হাজির করেছিল? এখানেই কি কোনো টুইস্ট আছে?

তনুকা বলল-

-তাইতো, এখন অভয়কে কি ভাবে খুঁজে পাওয়া যাবে?

-ভাবছি, লজের মালিক দত্ত বাবুর সঙ্গে একবার কথা বলতে হবে।

প্রবাল আর তনুকা আবার আশালতা লজে এসে সমস্ত কাগজ পত্র হাতড়াতে থাকে। যদি কোনো সূত্র হাতে লাগে। তারা জানতে পারে তড়িৎ পাল একটা সখের যাত্রা দলের সঙ্গে যুক্ত ছিল। এবং সেই যাত্রার পোশাক আসক রাখার একটা বড় ট্রাঙ্ক ছিল । কালো রঙের। যেটা লজের স্টোর রুম কাম নয় নাম্বার ঘরে রাখা থাকত।

কিন্তু প্রবালরা সেই ট্রাঙ্কটি খুঁজে পায় না।

লজের রাঁধুনি সহদেব হালদার আগে জেরায় বলেছিল রান্না ঘর নিচে তলার  পিছনের দিকে হওয়ায় সে কিছু বুঝতেও পারেনি আর শুনতেও পারেনি। খুনর ব্যপারে সে কিছু জানে না।

প্রবাল দ্বিতীয়বার তাকে জেরা করে।

-স্টোর রুমে অনেক রান্নার জিনিস পত্র রাখা দেখে ছিলাম।এই ঘরের চাবি কার কাছে থাকত?

-ম্যানেজার বাবুর কাছে।

-একটা কালো রঙের ট্রাঙ্ক ছিল। সেটা কোথায় গেল?

-জানি না স্যার।

-শেষ কবে দেখেছো ওটি?

-ঠিক মনে নেই স্যার।

প্রবাল বুঝে যায় এ শালা কিছু জানে না।

দু চার দিন পরে সে, তনুকা আর অর্ক গিয়ে হাজির হয় ‘অপরূপা যাত্রা কোম্পানি’র অফিসে। জায়গাটা কালীঘাটের ভিতরে একেবারে ঘিঞ্জি বস্তির মধ্যে। রাস্তার পাশে নোংরা নর্দমা। নর্দমার ধারে পায়খানা। পাশেই বেশ্যা-পল্লী। অপরূপা যাত্রা কোম্পানি খুঁজে পেতে তাদের বেশ বেগ পেতে হয়। কাঠের হলদে রঙের দরজায় মাটি মাটি রঙের লেখা “অপরূপা যাত্রা কোম্পানি” । দরজার পাশেই একখানা “মর্দানী” দিনেমার বড় পোস্টার ।

তনুকা বলল

-অর্ক-দা দেখেছো সিনেমা টা?

-না, না। তোমরা তো দুজনে দেখে এলে। আমায় আর ডাকলে কই? শুনেছি রানী ফাটিয়ে অ্যাক্টিং করেছে।

অর্ক চোখ থেকে  সানগ্লাস খুলতে খুলতে বলল।

তনুকা মুখ টিপে হাসল। একটা দুষ্টুমি ভরা রসিকতা প্রায় তার জিবের ডগায় এসে গিয়েছিল কিন্তু বলা হল না।

ততক্ষণে প্রবালের কড়া নাড়ার শব্দে এক বয়স্ক ভদ্রলোক দরজা খুলে দাঁড়িয়েছে। লোকটি চোখে একটা জিজ্ঞাসু ভাব ফুটিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। লোকটির বয়স আনুমানিক পঞ্চাশের উপরে। মুখ ভর্তি কাঁচা পাকা দাড়ি। মাথার চুল বড় বড়। কাঁচা পাকা। চোখে একটা কালো মোটা ফ্রেমের চশমা।

অর্ক কথা বলে

-আমরা পুলিশ থেকে আসছি। কিছু কথা জানার আছে।

পুলিশের লোক শুনে লোকটির মুখ একটু হাঁ হয়। সে কি বলবে বুঝে উঠতে পারে না। তারপর আমতা আমতা করে বলে

-ভিতরে আসুন।

তারা অপরিসর একটি অফিস ঘরের মতো ঘরে গিয়ে বসে। ঘরের চার দেওয়ালেই যাত্রার নানা রকম পোস্টার সাঁটানো। একদিকের দেওয়ালে একটি ‘মা কালীর’ বড় বাঁধানো ছবি । একটি কাঠের নড়বড়ে টেবিল। তেবিলে গুটি কয় খবরের কাগজের মলাট দেওয়া দিস্তা খাতা। টেবিল ঘিরে গুটিকয়েক কাঠের চেয়ার পাতা।

অর্ক একটি চেয়ারে বসতে বসতে বলল

-আপনার নাম ?

-দুলাল সামন্ত ।

-আপনি ম্যানেজার ?

-ওই আর কি ! তা আমার এখানে পুলিশ কেন বুঝতে পারছি না !

-তড়িৎ পাল কে ছিল এখানকার ?

-তড়িৎ আমার বন্ধু ছিল । ও যে কেন ও সব করল, জানি না। তড়িৎ ভালো অভিনয় করত । আমাদের টাকা কড়ি দিয়ে সাহায্য করত। যাত্রা ছিল ওর নেশা । একটু মেয়েছেলের দোষ ছিল, তবে তার জন্যে খুন করে ফেলবে ভাবতে পারিনি।

দুলাল বাবু অদ্ভুত উদাসীনের মতো মাথা নাড়তে নাড়তে কথাগুলো বলে থামল।

প্রবাল বলল

-আপনাদের নাটকের মহড়া কখন হয় ?

-সন্ধ্যার দিকে। ছুটির দিন হলে দুপুর বেলা।

-এখানকার কোন মেয়ের সঙ্গে কি লট-ঘট ছিল ?

-তা মলিনার সঙ্গ একটু ছিল ।

-লট-ঘট ?

-মলিনা বেশ্যা। তবে ভালো অভিনেত্রী । তড়িৎ মাঝে মাঝে মলিনার ঘরে রাত কাটাত। ওদের মধ্যে ভাব ভালবাসা গোছের কিছু একটা ছিল।

-তা মলিনাকে কোথায় পাওয়া যাবে?

-মলিনা কাছেই থাকে। ২১নং গলিতে।

-দুলাল বাবু আপনি অভয় নামে কাউকে চেনেন? তড়িৎ এর বন্ধু স্থানীয় ?

-নাহ! তেমন কাউকে তো মনে পড়ছে না!

-তড়িৎ বাবুর কাছে একটা কালো রঙের ট্রাঙ্ক ছিল জানতেন ?

-হাঁ, যাত্রার পোশাক ও আরও জিনিশপত্র থাকত তাতে? দরকার পড়লে একটা একশ সাত টেম্পো ভাড়া করে সে সেটা এখানে নিয়ে আসত ।

-সেটা এখানে না থেকে আশালতা লজ এ থাকত কেন?

-পোশাকের ডিজাইন সেই করাতো তার এক পরিচিত দরজিকে দিয়ে।

-সে দরজির নাম জানেন ?

-দুঃখসুখ মিয়া। আশালতা লজের কাছেই তার দোকান।

তনুকা বলল

-আজকাল লোক আর যাত্রা দ্যাখে?

-গাঁ গঞ্জের লোক দ্যাখে, দিদিমণি । আমরা তো খুব ছোটো দল, খুব কম পয়সার পালা করি। মেদিনীপুরের পাড়া গাঁয়ে আমাদের নিয়মিত বায়না হয়।

দুলাল সামন্ত বেশ গর্ব করে কথাগুলো বলল ।

-আপনাদের কি পালা চলছে এখন?

-এখন তো সিজন নয়। নতুন পালা নামাবার তোরজোড় চলছে।

-আপনারা কি ধরনের পালা করেন ?

-আমরা, দিদিমণি পৌরাণিক টাইপের পালা করি । না হলে ভক্তি মূলক ।

-আচ্ছা হোটেল সামলে তড়িৎ বাবু কি করে যাত্রা করত ? অসুবিধা হত না?

-না, সেই সময় লজের মালিকের এক ভাইপো লজ দেখাশুনা করে।

দুলাল সামন্ত সহসা উত্তেজিত হয়ে পড়ে বলে

-দাঁড়ান, দাঁড়ান, হোটেলের মালিকের ভাইপোর ডাকনাম তো অভয় ।

প্রবাল একটু হবাক হয়ে বলল

-কি বলছেন তার না তো বিজয়।

দুলাল বাবু বেশ মজা পাওয়ার ভঙ্গিতে বলল

-না, স্যার। উনি কয়েকবার আমাদের এখানে এসেছিলেন। ওনার পুরো নাম অভয়বিজয় দত্ত।

প্রবাল এক দৃষ্টিতে দুলালবাবুর দিকে তাকিয়ে থাকে। তার চোখের উপর থেকে একটা পর্দা যেন সরে যায়। মনে মনে বলল

যাক একটা প্যারাডক্স তো খুলল।

 

অর্কর মনে হয় তারা একটা রেড হেরিং এর পিছনে দৌড়াচ্ছে, এবং প্রতিবারে তারা একটি কানা গলির সামনে এসে হাজির হচ্ছে। তারা গতি হারিয়ে শৈবাল দামের মধ্যে আটকা পড়ে যাচ্ছে। অরুণার খুনি ধরা পড়ে গিয়েছে। খুনি তার অপরাধ স্বীকার করে নিয়েছে, তা হলে তার পরে আর কি বাকি থাকে ? কিন্তু প্রবাল থামবার পাত্র নয়। সে এখনো বুঝতে পারছেনা কেন অরুণাকে খুন করা হল? এই বিগ কেন’র উত্তর এখনো প্রবালের কাছে শূন্য। তার অনবরত মনে হয় অরুণার খুন একমাত্র অপরাধ নয়। আরও বড় কোন অপরাধ লুকিয়ে আছে এর পিছনে। এবং সেটাই মুখ্য অপরাধ ।

 

দুলাল সামন্তর কাছ থেকে বেরিয়ে তারা মলিনার ঠিকানায় যায়। মলিনা ঘরেই ছিল। তার ঘর যথেষ্ট পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। চারদিকে সচ্ছলতার ছাপ স্পষ্ট। মলিনার যৌবন প্রায় অস্তাচলে। মুখে বয়সের ছাপ স্পষ্ট। কিন্তু সুন্দরী।

 

চারদিকে প্রভূত কোলাহল থেমে যেতে তড়িৎ এসেছিল। কোলাহল বলতে বৃষ্টির কোলাহল। আকাশ থেকে কড়াত কড়াত করে বজ্র বদ্যুত নেমে আসছিল। রাতভোর এমনি বৃষ্টি হয়েছিল সেদিন। ভোরবেলা অনবরত দরজায় কড়া নেড়ে নেড়ে একেবারে ব্যতিব্যস্ত করে দরজা খুলিয়ে তবে ছেড়ে ছিল তড়িৎ । ঘুম চোখে তাকে ভুতের মতন দেখে চমকে উঠেছিল  মলিনা। একেবারে ভিজে ঝুপুশ হয়ে গিয়েছিল তড়িৎ। বাইরে সেই চেনা একশ সাত টেম্পো দাঁড়িয়েছিল। মদে মাতাল হয়েছিল সে। মাতাল না হলেও তার পা টলছিল গা কাঁপছিল। দরজা খুলতেই সে মলিনার উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে, বলা ভালো এক পাশবিক উত্তেজনায় সে মলিনাকে বিছানায় টেনে নিয়ে যায়। তেমনি ভিজে গায়ে সে মলিনাকে বুকে জড়িয়ে ধরে। তার সারা মাথা থেকে, তার বড় বড় চুল থেকে জল টুপ টুপ করে গড়িয়ে নামছিল। একবার তড়িতের সঙ্গে দীঘায় গিয়েছিল মলিনা। সমুদ্রের বেলাভূমিতে অঢেল বাতাস আর বালির কিংবা বালি ও বৃষ্টির ভিতর তড়িৎ তাকে বুকে জড়িয়ে ধরেছিল যেমন করে তেমনটাই মনে হচ্ছিল মলিনার। তড়িৎ তার ঠোঁটে উন্মত্ত ঠোঁট রেখেছিল। এক বিগত যৌবনা রমণীকে বিছানায় ফেলে এক প্রায় সবল বৃদ্ধ মানুষ শাবল দিয়ে দেওয়াল ভাঙ্গার মতো দেওয়াল ভাঙছিল।

মলিনা জানতে চেয়েছিল টেম্পো কেন?

-সব ফেলে দিয়ে এলাম।

তড়িৎ বলেছিল।

-কি?

-সব।

মলিনা ভেবেছিল তড়িৎ ভুল বকছে। বলেছিল

-কোথায়?

-ডায়মন্ড হারবার ।

 

অর্ক দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার এস পি র সঙ্গে যোগাযোগ করে। এবং নিশানায় তির লেগে যায়। সরিষা থানার পুলিশ  দিন পনেরো আগে এক ধান ক্ষেতের ধার থেকে একটি কালো রঙের ট্রাঙ্ক উদ্ধার করে। ট্রাঙ্কটির ভিতর থেকে একটি পচা গলা মৃত দেহ পায় পুলিশ। দেহটি এখনো সনাক্ত কর যায় নি।

অর্ক আশালতা লজের মালিক সাধন দত্তর সঙ্গে  যোগাযোগ করে। অভয়বিজয়ের আংটি ঘড়ি ও পচাগলা লাশ সনাক্ত করে দত্তবাবু আর তার দাদা ।

অভয়ের প্যান্টের পকেট থেকে একটা দরজির দোকানের বিল পাওয়া যায়। বিলে কাপড় জামার বদলে লেখা ছিল

ময়দা- ১০

সুজি -১৫

দরজির দোকানটি দুঃখসুখ মিয়ার ।

দুখু মিয়ার দোকান সার্চ করে পুলিশ। কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে পড়ে। অনেকদিন থেকে একটা ড্রাগ চোরা চালান চক্রের তল্লাশে ছিল পুলিশ। দুঃখসুখ মিয়াকে গ্রেফতার করার পরে সেই চক্র ধরা পড়ে।

 

প্রবাল তার প্যারাডক্সের যে উত্তরটা খুঁজে পাচ্ছিল না সেটির উত্তর খুঁজে পায় । আট নাম্বার ঘরে যে দুটো আন-নোন পায়ের চাপ পাওয়া গিয়েছিল তার একটি অভয়ের আর একটি দুঃখসুখ মিয়ার। তা হলে অরুণাকে খুন করা হল কেন?

প্রবাল বলল

-পিছনের দরজা দিয়ে যখন দুঃখসুখ মিয়া পালিয়ে যাচ্ছিল তখন অরুণা তাকে দেখে ফ্যালে। তারা ভেবেছিল অরুণা হয়ত খুন করতেও তাদের দেখে ফেলেছে।

-শুধু সন্দেহের বশে?

-হ্যাঁ। শুধু সন্দেহের উপর ভিত্তি করে একটা নিষ্পাপ নিরপরাধ মেয়ে খুন হয়ে যায়। খুনির চরিত্র এমনি জটিল। আর সবথেকে বড় কথা এমনি স্টুপিড।

তনুকা বলল

-অভয় খুন হল কেন ?

-আসলে অভয় এই চক্রের সঙ্গ যুক্ত ছিল না। কিন্তু একদিন সে এই ব্যাপারটা জানতে পেরে যায়। আর তখনি ব্ল্যাকমেইল শুরু করে। তার পরিণতি মৃত্যু । ভারি কিছু দিয়ে তার মাথায় আঘাট করে তাকে খুন করা হয়। বাথরুমে যে তোয়ালেটা পাওয়া গিয়েছিল সেটি অভয়বিজয়ের। অভয়কে খুন করে হয়ত তারা আরও ভালো করে লাশ গায়েব করতে পারত কিন্তু দ্বিতীয় খুনটা করে ফেলার পরে তাদের মাথা ভণ্ডুল হয়ে যায়। অরুণার লাশকেও তারা সন্ধ্যা হলে গায়েব করে দিত। কিন্তু সকালেই পুলিশ পৌঁছে গেলে তাদের প্ল্যান ভেস্তে যায়।

কিন্তু কে থানায় ফোন করে খুনের খবর দিয়েছিল?

প্রবাল বলল

আমার মনে হয় যে খুনের খবর দিয়েছিল সে আসলে অভয়ের খুনের খবর দিতে চেয়েছিল। হয়ত এই ড্রাগ চোরা চালান চক্রের কেউ ! কি জানো তো তনুকা, পত্যেক অপরাধের কোনো না কোনো সাক্ষী থাকে। মোটিভ থাকে। আসলে পৃথিবীতে মানুষ খুনের মতো স্টুপীড কাজ আর নেই। খুন করার পরে খুনীর কাছে তার চারপাশের পৃথিবীটা দুমড়ে মুচড়ে যায়। সে তখন পৃথিবীকে যে ভাবে দ্যাখে, পৃথিবীটা আসলে তখন তেমনটা থাকে না। সে ভুল দ্যাখে। সে ভুল করে। পার্ফেক্ট ক্রাইম বলে কিছু হয় না ।