অরুণা শানবাগ আমাদের সমাজের বিবেকের উপর তীব্র কষাঘাত৷ গত চার দশকে তাঁকে নিয়ে অনেক হইচই হয়েছে, হয়েছে অনেকmanashi লেখালিখি৷ কোমার মধ্যেই তিনি চলে গেলেন৷ এবার চাপা পড়ে যাবে তাঁর কথা৷ কিন্তু এ সমাজের ফাঁপা মূল্যবোধের খোলস ছিঁড়ে দিয়ে অরুণা একদিন ঠিক ফিরবেন৷ তাঁর সে স্বগতকথনে কান পাতলেন মানসী সাহা

“জীবন মরণের সীমানা ছাড়ায়ে

বন্ধু হে আমার

রয়েছ দাঁড়ায়ে……..”

পায়ের নীচে মাটি খুঁজে পেতে আর পাঁচটা ছোট শহরের মেয়ের মতো চোখে বড় হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে পাড়ি দিয়েছিলাম মুম্বই নগরীতে। শুনেছিলাম এই শহর নাকি স্বপ্নের নগরী। মায়াবী সব ইচ্ছা ডানা মেলে এখানে। কিন্তু আমার বেলায় কেন এমনটা হল না? কেন আমার ছোট ছোট স্বপ্ন গুলি ভেঙে দেওয়া হল হিংস্রভাবে। আমি কি সত্যি বেশি কিছু চেয়েছিলাম এই শহর থেকে? জানি না! কেইএম হাসপাতালে চার নম্বর ওয়ার্ডের ছয় বাই চার ছোট খাটটিতে শুয়ে শুয়ে জীবনের বিয়াল্লিশটি বছর ধরে আমি এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে ফিরেছি। কিন্তু আমার সেই প্রশ্নের জবাব মেলেনি। আজ আমি আতীত। শরীরি দুঃখ, কষ্ট, যন্ত্রণা থেকে কোটি যোজন  দূরে, তবুও মনের শান্তি আজও পাইনি। মৃত্যুর ওপারে দাড়িয়ে আমি হাতড়ে  বেড়াই আমার সেই সব অপূর্ণ থেকে যাওয়া সাধগুলিকে। আর আমার সামনে ভিড় করে প্রশ্নরা, যার উত্তর আজও তোমাদের সমাজ দেয়নি৷

তখন আমি কুড়ি। মেয়েবেলা থেকেই পরিবারের পাশে লাঠি হয়ে দাঁড়ানোর আমার আপ্রাণ চেষ্টা সফল হল। সেবিকা হয়ে আমার কর্নাটকের ছোট শহর হলদিপুর থেকে দিদির হাত ধরে এসেছিলাম মুম্বই। মনে আছে, যখন প্রথম আমার এই শহরের সঙ্গে সাক্ষাৎ হল, ভয়ে দিদির হাত চেপে ধরেছিলাম। এত লোক এতো গাড়ি আগে তো কখনও দেখিনি। তবে দিনে দিনে এই অচেনা শহরে অজানা গলিতে আমি ফুল হয়ে ফুটতে লাগলাম। আমার বন্ধু হল, শহরটি ভালো লাগতে শুরু করল। আর এই শহরও যেন আমায় আস্টেপৃষ্ঠে বাঁধতে চাইছিল। তাইতো এখানে আমি পেলাম তাঁকে, আমার মনের মানুষকে। ও আমার সহকর্মী, আমি সেবিকা আর সে ডাক্তার। ধীরে ধীরে এই চার চোখের মিলন মঙ্গলসূত্রে জড়িয়ে যাওয়ার দিকেও এগোল। কিন্তু সেটা আর হল কোথায়? সম্ভাবনা হয়েই থেকে গেল!aruna-shanbaug_030811014246

১৯৭৩-এর ২৭ শে নভেম্বর আমার জীবনের সেই অভিশপ্ত রাত। প্রতিদিনের মতো সেদিনও কাজের শেষে পোশাক বদলাতে গিয়েছিলাম বেসমেন্টে। বুঝতেও পারিনি আমার এই ভীষণ পরিচিত জায়গায়টিতে ঘাপটি মেরে অপেক্ষা করছে আমার মৃত্যু। সোহনলাল যখন আমাকে ধর্ষণ করতে এল, তখন আমার ঋতুচক্র চলছে৷ তাতেও নিষ্কৃতি মিলল না৷ ও চেন দিয়ে বাঁধল আমাকে৷ তারপর পায়ুসঙ্গম করল। আমার সারা শরীর নখ-দাঁতে দিয়ে আঁচড়ে-কামড়ে খেলো ও। না এতেও থামেনি সোহনলাল, চালায় অকথ্য অত্যাচার। হত্যা করতে চেয়েছিলো আমায়। কিন্তু বেঁচে যাই আমি। তবে মৃত্যু আমার সেদিনই হয়েছিল। বেঁচে ছিল বলতে আমার অস্থি-চর্মসার শরীরটি। অকথ্য অত্যাচার আমার শরীর সহ্য করতে পারল না। আমি কোমায় চলে গেলাম। এখান আমার কোন কাজ নেই। তাই এখন সারাদিন ভাবনাই আমার কাজ।

প্রথমে বলি আমার ‘তুমি’টার কথা। প্রথম প্রথম তুমি আসতে আমার ঘরে আমার মাথায় বুলিয়ে দিতে তোমার আদরের হাত। আমার খুব ভালো লাগতো। আমার রোমকূপ শিউরে উঠত। আমি অপেক্ষা কখন তুমি আসবে আমার কাছে আমাকে আদর করবে। কিন্তু হঠাৎ একদিন তুমি আর এলে না। আমি বুঝে গেলাম হাল ছেড়েছো তুমি। আমি যে আর কোনদিন তোমার ডাকে সাড়া দিতে পারবো না সেটা বুঝে গিয়েছো তুমি। ভালো থেকে তুমি। বিশ্বাস করো তোমার উপর আমার কোন রাগ নেই। আমিও তো তোমাকে ভালোবেসেছিলাম, তাই তোমার উজ্জ্বল, সুস্থ ভবিষ্যতই চাই। তবে খুব ইচ্ছা ছিল তোমার সাথে ঘর বাঁধার। হল না!

বাবা-মা-ভাই-বোন-দিদি তোমরা আমাকে ক্ষমা কর আমি তোমাদের অনেক দুঃখ দিয়েছি, আর না। আমি কোমাতেই থাকতে চাই। ফিরে তোমাদের আর এই মুখ দেখাতে চাই না। তোমাদের অপমানের কারণ আমি হতে চাইনা। বাবা তোমার ভরসা হতে চেয়েছিলাম আমি। কিন্তু হল না। চেষ্টা করেছিলাম অনেক কিন্তু আমাকে যে করতে দিল না ওরা।মা তুমি যখন আমার বেডের পাশে দাঁড়িয়ে ডুকরে কাঁদো আমার খুব কষ্ট হয়। তোমাদের থেকে দূরে থেকেও পাশে পেতাম তোমাদের। কিন্তু তোমরাও ভুলে গেলে আমায়! শেষ কয়েকটি বছর তোমাদের কারও দেখা পেলাম না। মনটা খুব ছটফট করছিল তোমাদের দেখার জন্য। কিন্তু আমার বাকি সব ইচ্ছার মতো এটাও থেকে গেলে অন্ধকারের অতল গহ্বরে।

সোহনলাল তুমিও ছিলে আমার কোমার ভাবনায়। কেন করলে তুমি এমন? তোমার কোন ক্ষতি তো আমি করিনি। তুমি আমাকে উত্যক্ত করেছো প্রতিনিয়ত। মুখ বুজে সহ্য করেছি আমি। এড়িয়ে চলেছি তোমায়। এটাই কি আমার আপরাধ? তবে এইসবের সঙ্গে কোনও যোগ ছিল না সেদিনের ঘটনার। রোগীর পথ্য চুরি করতে গিয়ে হাতেনাতে তুমি ধরা পড়লে আমার কাছে। প্রতিবাদ করলাম আমি। তাই আজ আমি এই ছোট ঘরের খাটটায় শুয়ে।সভ্যতার আদিকাল থেকে প্রতিবাদের যে এমনই দশা হয়ে আসছে। সেটা যদি আগে বুঝতাম! আমি কোমা থেকে সত্যি ফিরতে আর চাই না। যার কারণে আমি হারিয়েছি খোলা আকাশ, পেয়েছি এই বিকলঙ্গ জীবন সেই সোহনলাল কি পেল? না মাত্র সাত বছরের জেল। বিচার হল শরীরের অঙ্গ দিয়ে পা্য়ুসঙ্গমে নাকি নারী সম্মান হানি হয় না। তাই আমি ‘ধর্ষিতা’ নই ‘অত্যাচারিতার’ তকমা পেলাম। আর সোহন পেল ‘জামাই আদার’, কিছু বছর হাজতে কাটিয়ে আজ সে ঘুরে ফিরছে স্বাধীন ভাবে।  সঠিক বিচার হল?


তবে আমি ফিরতে চেয়েছিলাম নির্ভয়ার সঙ্গে। প্রতিবাদে সামিল হতে চেয়েছিলাম সেই সব লক্ষ মানুষের সঙ্গে, যখন শুনেছিলাম কামদুনির কথা, মধ্যমগ্রামের কথা আমার শিরায় বেড়েছিল রক্তের স্রোত, হৃদকম্পনের মাত্রা হয়েছিল দ্বিগুন৷ আমার সহকারীরা ভেবেছিল সাড়া দিচ্ছি৷


এই আক্ষেপে আমি যখন দিন কাটাছিলাম তখন আমার সঙ্গে দেখা করতে এল একজন সাংবাদিক, পিঙ্কি ভিরানি। বেশ ভালো নরম মনের মেয়ে। দেখতে দেখতে অচিরেই পিঙ্কি আমার প্রিয় বন্ধু হয়ে উঠল। আমাকে নিয়ে ও একটা বই লিখল। সেই বই নাকি খুব জনপ্রিয়ও হয়েছিল। হাসি পেয়েছিল খুব, মানুষের দুঃখও নাকি আজকাল তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করে সবাই। পিঙ্কি আমাকে প্রায়ই দেখতে আসতো, মেয়েটা আমাকে ভালোবেসে ফেলেছিল। আমার কষ্ট ও আর সহ্য করতে পারছিল না তাই আমার নিষ্কৃতি মৃত্যু চেয়ে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিল। খুব অবাক হয়েছিলাম সঙ্গে আশ্চর্যও৷ দোষ করল সোহন আর মৃত্যু দেওয়া হবে কিনা আমার। তবে মরে তো আমি কবেই গিয়েছি, এই শরীর না থাকলেও কী যায় আসে। তবে এখানেও বিচার নেই আমার জন্য। বিচার দূরে থাক এদেশে তো আইনই নেই আমার জন্য। তবে একটাই শান্তি আমার, রদ-বদল হল দেশের আইনি ব্যবস্থার। সংবিধানে এল ‘এন্ড অফ লাইফ’ আইন। যেখানে প্রাধান্য পেল তিনটি দিক। ব্রেন ডেথকে মৃত্যু হিসাবে মেনে নেওয়া হল, ‘লিভিং উইল’ কোনও ব্যক্তি অসুস্থ অবস্থায় কতদূর পর্যন্ত চিকিৎসা ব্যবস্থার সাহায্য নিতে চান বা সে কোন অবস্থায় মারা যেতে চান তা আগে থেকে ঠিক করে রাখা ও অসুস্থ ব্যাক্তির জন্য একটা সময় পর চিকিৎসা বৃথা তা জানতে পেরে চিকিৎসক ও রোগীয় আত্মীয়ের অনুমতি নিয়ে পরোক্ষ নিষ্কৃতি মৃত্যু।

তবে এখানেও বঞ্চিত আমি। এবার আবেগের কাছে। কিছু সহকর্মীদের ভালোবাসায় আটকে গেল আমার পরোক্ষ ইচ্ছামৃত্যু। ভেবেছিলাম রোজকারের শরীরের যন্ত্রণা থেকে আমি মুক্তি পাবো। কিন্তু এবারও হল না। থাক আমার এই যন্ত্রনা কিছু মানুষের মুখে তো হাসি ফোটাবে এই ভেবে মুখ বুঝে সহ্য করে নিলাম এই কষ্টও।

একদিন সকালে দেখি আমাকে দেখতে এসেছে নামি দামি সব মানুষ। আমি রাতারাতি কেমন যেন সেলিব্রিটি হয়ে গেলাম। আমার দেখাশোনায় এল আলাদা মনযোগ। পাশে পেলাম সবসময়ের একজন নার্স। শুনলাম আমাকে নিয়ে নাকি বিস্তর লেখালেখি হয় আজকাল। অনেক সাধু বাবারাও এসেছিল আমাকে দেখতে, মাথা ছুঁয়ে আর্শীবাদ দিয়েছে কোমা থেকে ফিরে আসার। তখন সত্যি একবার বলতে খুব ইচ্ছা হয়েছিল আমি ফিরতে চাই না, আমি বিচার চাই।

তবে আমি ফিরতে চেয়েছিলাম নির্ভয়ার সঙ্গে। প্রতিবাদে সামিল হতে চেয়েছিলাম সেই সব লক্ষ মানুষের সঙ্গে, যখন শুনেছিলাম কামদুনির কথা, মধ্যমগ্রামের কথা আমার শিরায় বেড়েছিল রক্তের স্রোত, হৃদকম্পনের মাত্রা হয়েছিল দ্বিগুন৷ আমার সহকারীরা ভেবেছিল সাড়া দিচ্ছি আমি কিন্তু যখন সবার পরিণতি মৃত্যু হল, তখন আমিও পিছিয়ে গেলাম, আমার কোমাই ভালো।aruna-main759

আমার শরীরও এবার সঙ্গ ছাড়ছে আমার। চার নম্বর ওয়ার্ড থেকে আমাকে সরিয়ে নেওয়া হল। আমার এতোদিনের আশ্রয় ধীরে ধীরে চোখের সামনে আবছা হতে হতে মিলিয়ে গেল। আমি ভেন্টিলেশনে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত। তারপরের ঘটনা তোমরাদের সবার জানার।

আমি বিচার পাইনি। যে আইন আমার জন্য তৈরি হয়েছে তা থেকেও আমি বঞ্চিত। তাই আমার একটাই কথা বলার, বদলাও। বদল ধারনার, বদল বিবাকের, বদল মনুষ্যত্বের। না বদলালে কিছুই যে আমরা পাবো না। জম্ম নেবে আমার মতো হাজার অরুনা। যে দেশে প্রতি ২০ মিনিটে একটি করে রেপ হচ্ছে। সেখানে আমার ঘটনা তো অতি তুচ্ছ। তাই মেয়েদের নিজেদের সম্মান রক্ষার জন্য আমাদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে। মুখ বুজে ঘরের কোণে আর কতোদিন থাকবে, প্রতিবাদী হও। প্রতিবাদই পারে একমাত্র ফেরাতে সেই সুদিন। যখন আমরাও বলতে পারবো আমরা সুরক্ষিত।

তবে এখনও শেষ হয়নি আমার ইচ্ছার। স্বপ্ন আছে আরও একটিবার মেয়ে হয়ে এই পৃথিবীতে আসাব। তবে এবার পঙ্গু হয়ে মরতে নয় প্রয়োজনে ‘গুলাব গ্যাং’-এর মতো তৈরি হবে ‘অরুনা গ্যাং’। মৌন হয়ে নয় সরব কন্ঠে পৌঁছে দেব আমার, আমাদের বেঁচে থাকার দাবী।