সোহনলাল বার্থা বাল্মীকি- যেদিন তোমারই ভাবী প্রজন্ম তোমার দিকে আঙুল তুলে বলবে, তুমি ধর্ষক, তুমি পাপিষ্ঠ,kamalika-mallik সেদিন হয়তো প্রকৃত শাস্তি পাবে তুমি৷দণ্ডবিধি না পারলেও মহাকালের কাঠগড়ায় তোমাকে দাঁড়াতেই হবে৷ লিখলেন কমলিকা মল্লিক 

২০১১ সালের ৭ মার্চ। শীর্ষ আদালতের একটি রায়ে আলোড়ন ছড়িয়েছিল দেশজুড়ে। সবাই জেনেছিল নিষ্কৃতি মৃত্যুর কথা। সবাই চিনেছিল অরুণা শানবাগকে। সবাই শুনেছিল কীভাবে ধর্ষণ-ক্লান্ত এক নারী চলচ্ছক্তিহীন, বোধশূন্য অবস্থায় শয্যায় শুয়ে শুয়ে দিন গুজরান করছেন। সবাই বিস্মিত হয়েছিল কীভাবে এক ধর্ষক নামমাত্র শাস্তি পেয়ে আত্মগোপন করে রয়েছে। সবাই যন্ত্রণা পেয়েছিল এক পুরুষের সাময়িক খেয়ালিপনার কারণে কীভাবে এক নারীকে আজীবন শুধু মৃত্যুর জন্য তপস্যা করে যেতে হল, সেই কাহিনি শুনে।

অরুণা শানবাগ। মুম্বইয়ের কিং এডওয়ার্ড মেমোরিয়াল হাসপাতালের সেবিকা। গত ১৮ মে, ২০১৫ প্রয়াত হয়েছেন অরুণা। সংবাদমাধ্যমের দৌলতে এতদিনে পাঠক-পাঠিকারা সকলেই অরুণার জীবন-যুদ্ধের সঙ্গে পরিচিত। তবে আমাদের স্মৃতি বড়ই দুর্বল। ঘটনার পর ঘটনা, দুর্ঘটনার পর দুর্ঘটনা, একের উপর এক তথ্যের আস্তরণ জমতে জমতে অনেক কিছুই অগোচরে রয়ে যায়। তাই অরুণাকে নিয়ে আবারও লিখতে বসা। অরুণা কে, সাধারণভাবে বলতে গেলে ধর্ষিত এক নারী। যা রাজ্যজুড়ে, দেশজুড়ে, বিশ্বজুড়ে কোথাও না কোথাও প্রায় রোজই হয়ে চলেছে। অরুণা স্মরণীয় কারণ, বেশ কয়েকটি নজির গড়েছেন তিনি। সব কটিই যে স্বীয় কৃতিত্বে তা নয়। ১) বিশ্বে সবচেয়ে বেশিদিন (৪২ বছর) কোমায় ছিলেন অরুণা। ২) ভারতে পরোক্ষ নিষ্কৃতি মৃত্যু অর্থাৎ ইউথানেশিয়ার দাবি আইনসিদ্ধ হল অরুণার জন্য। ৩) সোডোমি অর্থাৎ জোর করে পায়ুসঙ্গমও যে ধর্ষণ, তা অরুণাই আদালতকে মানতে বাধ্য করলেন।ARUNA_SHANBAUG_2407560g

১৯৭৩ সালের ২৭ নভেম্বর। অনেকগুলো বছর পেরিয়ে গিয়েছে। আমরা অনেকেই পৃথিবীর আলো দেখিনি তখনও। মুম্বইয়ের কিং এডওয়ার্ড মেমোরিয়ালের বেসমেন্টে সদ্য চাকরিতে যোগ দেওয়া এক নার্স শারীরিক লাঞ্ছনার স্বীকার হলেন। তাঁর অপরাধ? ওই হাসপাতালেরই চতুর্থ শ্রেণির এক কর্মীর মুখচোরা, শান্ত স্বভাবের নার্স অরুণাকে পছন্দ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু অরুণা গুরুত্ব দেননি বিষয়টিতে। তাঁর ভাল লেগেছিল হাসপাতালেরই এক চিকিৎসককে। ওই মর্মান্তিক ঘটনাটি না ঘটলে কিছুদিনের মধ্যে তাঁরা বিয়েও করতেন। কিন্তু এসব ঠিক সহ্য হয়নি ওই চতুর্থ শ্রেণির কর্মী সোহনলাল বার্থা বাল্মীকির। নার্সদের পোশাক বদলানোর ঘরে অরুণাকে একা পেয়ে তার ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে সে। ঋতুমতী দেখেও অরুণার প্রতি করুণা হয়নি সোহনলালের। অরুণা যাতে চিৎকার করতে না পারেন তাই তাঁর গলায় কুকুর বাঁধার মোটা চেন পেঁচিয়ে দিয়েছিল। তারপর সোডোমিতে (পায়ুধর্ষণ) লিপ্ত হয়। ঘটনার ১১ ঘণ্টা পরে বেসমেন্ট থেকে অচৈতন্য অবস্থায় উদ্ধার করা হয় অরুণাকে। ততক্ষণে তাঁর দৃষ্টি এবং শ্রবণ ক্ষমতা নষ্ট হয়ে গিয়েছে। শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মস্তিষ্কে অক্সিজেনের যোগান বন্ধ হয়ে গিয়ে বোধশক্তি হারিয়ে ফেলেছেন।  অকেজো হয়ে গিয়েছে মস্তিষ্কের অর্ধেকেরও বেশি অংশ। দেহ পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। এইভাবেই কেটে গেল ৪২টি বছর। অবশেষে জটিল-অনিরাময়যোগ্য নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে এই জীবন থেকে মুক্তি পেলেন অরুণা। সম্পূর্ণ সুস্থ-স্বাভাবিক এক তরুণী সোহনলালের লালসার শিকার হয়ে জীবন্মৃত হয়ে পড়ে রইলেন।

দায় কার? দোষ কার? উত্তর দাও সোহনলাল। কেন এমন করলে? উত্তর দাও সোহনলাল। অরুণা তোমার কোনও ক্ষতি করেনি। তুমি কেন করলে? কোন সাহসে? কোন স্পর্ধায়? কোন ঔদ্ধত্যে? কোন প্ররোচনায় এমন কাজ করেছিলে? শুধুমাত্র পুরুষ এই অধিকারে? ঈশ্বর তোমায় ধর্ষণের ক্ষমতা দিয়েছেন, সেই অধিকারে? আইনের মারপ্যাঁচে মাত্র সাত বছর জেল খেটে ছাড়া পেয়ে গেলে। পালিয়ে বাঁচলে। কিন্তু শান্তি পেয়েছ কি? মুহূর্তের জন্যেও স্বস্তি পেয়েছ কি?  জানি না এখন তুমি কোথায় আছ? কীভাবে আছ? সংসারী হয়েছ কি না। পিতা হয়েছ কি না। পিতামহ হয়েছ কি না। কিন্তু তোমার রক্ত যে কলঙ্কিত। তোমার শ্বাসবায়ু পাপে পূর্ণ। তোমার বীর্য কদর্য, কলুষিত। সেই বীর্য যে ভ্রূণের সৃষ্টি করেছে তারাও যে তোমারই মতো অপবিত্র। তোমার উত্তরাধিকারীদের শরীরে তোমার বিষরক্ত প্রবহমান। তারাও যে তোমার পাপের অংশীদার। প্রত্যক্ষে না হলেও পরোক্ষে তোমারই মতো পাপী। কেন না তুমি তাদের সৃষ্টিকর্তা। ভারতীয় দণ্ডবিধি সীমাবদ্ধতায় আবদ্ধ। তাই যতটা কঠিন শাস্তি তোমার প্রাপ্য ছিল, আইনি বিচারে ততটা শাস্তি তুমি  পাওনি। কিন্তু পরমেশ্বর তোমায় শাস্তি দেবেন। প্রকৃতি তোমায় শাস্তি দেবেন। যুগে যুগে প্রতিটি মানুষের ঘৃণার পাত্র হবে তুমি। যেদিন তোমার কন্যা, তোমার নাতনি আঙুল তুলে বলবে তুমি ধর্ষক। তুমি পাপিষ্ঠ।  সেদিন তুমি পাবে তোমার প্রকৃত শাস্তি।