অ্যালবার্ট অশোক

সাধারণ মানুষের ভাবনাকে আঘাত দেওয়ার মত উপাদান বা বস্তুকে (মূলতঃ যৌন বিষয়ক) বৈধ ধারণায় অশালীন বা অশ্লীল বলাহয়, যা পৃথিবীর সব রাষ্ট্রের সংবিধানে শাস্তিযোগ্য অপরাধ গণ্য করা হয়ে থাকে। কিন্তু অশ্লীলতার কোন সন্তোষজনক সংজ্ঞা পৃথিবীর কেউ কোথাও দিতে পারেনি। বরং দেখা গেছে, যেভাবেই সংজ্ঞায়িত হয়েছে বুমেরাং হয়ে ফিরে আসছে। যাইহোক, সাধারণের চোখে যা অশ্লীল তা অন্য কারুর চোখে সুন্দরের উদাহরণ হতে পারে। সুতরাং সাধারণ সামাজিক ভারসাম্যতা রক্ষার্থে নানা বিষয় ও পরিপ্রেক্ষিত কেন্দ্র করে প্রত্যেক রাষ্ট্র তার মত করে অশ্লীলতার শাস্তি বিধান রেখেছে। কেউ চ্যালেঞ্জ করলে, আদালতের রায় পালটে যায় বা যেতে পারে। অশ্লীল কথা বা কাজ কাউকে শারীরিক কোন ক্ষতি করেনা, মানসিক মন্দ আনে না। এটা কারুর পছন্দের অধীনে, যিনি দেখেন বা ব্যবহার করেন তিনিই তাকে চালনা করতে পারেন।

সারা পৃথিবী জুড়ে অনেক আলোচনা, পালটা আলোচনা, সবই অশ্লীল সংজ্ঞায়িত করতে ব্যর্থ, কারণ, স্থান, কাল, পাত্র – এই ৩টি জিনিস আপেক্ষিক ও পরিবর্তন শীল। কারু চোখে বা বিচারে কোন জিনিস মন্দ বা ক্ষতিকর, আবার একই জিনিস কারুর চোখে বা বিচারে সমাজের দাবি বা মঙ্গলজনক।

কিন্তু একটা বিষয়ে সারা পৃথিবী একমত যে, শিশুদের (যারা ১থেকে ১৬ বা কোন দেশে ১৮ বছরের নীচে) অপ্রাপ্তবয়স্কদের নিয়ে কিছু নগ্নতা, যৌনতা, বা অপব্যবহার করা যাবেনা। ফলে পর্ণগ্রাফি বা যৌন রগরগে ছবি ও সাহিত্য বড়দের জন্য দেখা যায়, শিশু ও কিশোরদের বাদ দিয়ে।

এই অশ্লীলতা কাজকর্ম উল্টো দিক থেকে এসেছে। সাধারণতঃ অশ্লীলতা মহিলা ও শিশুদের যৌন নিরাপত্তা ভাঙে ও কিছু মানুষকে কুকর্মে প্রবৃত্ত হতে উৎসাহিত করে সেহেতু সামাজিক বিধিতে পরিণত ও শাস্তি বিধান করে দমিয়ে রাখা হয়েছে।

নগ্নতা ও যৌনতার প্রচার, ব্যবহার সুপ্রাচীনকাল থেকেই। সভ্যতার উন্মেষ পর্বের সাথে সাথে। যৌনাঙ্গ, যৌনমিলন ও তাকে নিয়ে সংস্কৃতি, রাজনীতি, বিজ্ঞান দর্শন ও আধিদৈবিক, আধ্যাত্মিক ভাবনা ও কাজ কর্ম মুক্ত ভাবে বিস্তার ও ব্যবহার পেয়েছে। ক্রমে সামাজিক নিরাপত্তা ও সুষ্ঠ ব্যবহারের ভাবনায় যৌনতাকে বিশ্লেষিত করে দেখা শুরু করল। পরিবার ও সম্পত্তির বিবর্তনের সাথে সাথে যেদিন নারীকে সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র হিসাবে বা বংশ বিস্তারের লিঙ্গ ভাবা হল, তখন দেখা গেল কিছু নিয়মকানুন। নারীকে ভোগ করার চুক্তি। নারীকে নিরাপত্তা দেওয়ার ভাবনা। যাতে কেউ ফুসলে অবলা নারীকে ব্যবহার না করতে পারে। বিবাহ প্রথা। নারী, পুরুষের এই অধিকারের বিরুদ্ধে কোন রা বসায়নি।

বরং তার মনে হয়েছে তার ভাত কাপড়ের, বিলাসিতার সংগ্রাম থেকে অব্যহতি পেল। নিজেকে তার বিলাসিতা, খাদ্য, আশ্রয় ও সুরক্ষা অর্জন করতে হবে না। বরং সে একজন মালিক হিসাবে ক্ষমতা পেল। বিনিময়ে সে পুরুষের যৌনসুখ, সেবা ও সন্তান সন্ততির ভার নেবে , যেগুলিতে তার ১০০ ভাগ কামনা আছে। নারীকে ও তার পরিবারের অন্য সদস্যদের উপর গৃহকর্তা তার সম্পূর্ণ ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে গিয়ে ও সুরক্ষা দিতে গিয়ে শ্লীল অশ্লীল, সম্মান, অসম্মান ভাবনা এনেছে। ১৫০০ শতাব্দীতে মুদ্রণ শিল্প আসার পরও নগ্নতা ও যৌনতা বা ভীষণভাবে অশ্লীল বিষয়- প্রচার ও প্রসার করা যেত। কিন্তু ১৭০০ তে দেখা গেল প্রশাসন ও চার্চ কর্তৃপক্ষ অশ্লীলতার দায়ে লোককে শাস্তি দিচ্ছে। ১৮০০ শতাব্দী অব্ধি ইংল্যান্ডে অশ্লীলতার বিরুদ্ধে শাস্তি দেওয়ার কোন আইন সংবিধানে ছিল না। ১৮৪২ এ আমেরিকার ফেডারেল সরকার অশ্লীল বা কোন নীতি বহির্ভূত যৌনাচার কে শাস্তি দেওয়ার বিধি প্রণয়ন করল।

১৯৮০তে নারী বাদীরা অশ্লীলতাকে ভাবতে লাগল নারীদের অবস্থান ও মর্যাদাকে ছোট করা। তাদের ভাবনা, যোনি স্তন ইত্যাদি তাদের শরীরের অঙ্গ, এসবের মর্যাদা হানি হয়েছে।

কোন কথা বা কাজ যদি স্থানীয় কোন সাধারণ মূল্যবোধ বা নীতি ভাঙ্গে, কুকর্মে উৎসাহিত করে, যৌনকামোদ্দীপক করে তবে তাকে অশ্লীলতা ধরা হয়। বিচারের সময় দেখা হয়।

১। কোন কাজ (আংশিক নয়) সম্পূর্ণভাবে কোন সমাজের মূল্যবোধকে ও নৈতিকতাকে খর্ব করে দিল কিনা, মন্দের দিকে ঠেলে দিল কিনা

২। স্থানীয় কোন কানুনকে অবজ্ঞা করে, যৌনাচার ভুলভাবে ব্যাখ্যা বা বর্ণনা করল কিনা

৩। সেই কাজটিতে কি সাহিত্য, শিল্প, রাজনীতি বা বিজ্ঞানের ব্যবহার বহির্ভূত কিনা। (শিল্প, সাহিত্য, রাজনীতি বা বিজ্ঞানের স্বার্থে হলে অশ্লীলতা ধরা যাবে না।)

এই ৩টি ভাবনার উপর অশ্লীলতার বিচার হয়। (ভাবনাটি আমেরিকার আদালতের, কিন্তু গড়ে সকল সভ্য দেশ, চিন ও সৌদি আরব ছাড়া, মানা হয়)।

কারুর কথা, কাজকর্ম স্থানীয় কর্তৃপক্ষের দ্বারা নীতিবিগর্হিত পরীক্ষা বা ইংরেজি শব্দ সেন্সর করা, যতটুকু তথ্য মেলে তা সম্ভবত খ্রিষ্টজন্মের ৪০০ বছর পূর্ব থেকে চালু আছে।

যিশুখ্রিস্টের ৪৪৩ বৎসর আগে প্রাচীন গ্রীকরা তাদের সমাজের জনজীবন ও চরিত্রকে সুন্দর রূপায়নের জন্য নানা নীতি নিয়েছিল। কোনটা করা যাবেনা, কোনটা করা যাবে, তার রূপরেখা। তখন থেকে বিধিসতর্কীকরণ, নীতিবিগর্হিত পরীক্ষা বা সেন্সর শব্দটির ব্যবহার। পরে রাজনৈতিক ও সামাজিক নীতিবোধ রূপায়ন এক সম্মানীয় কাজ ও শাসন দণ্ড হিসাবে ধরা হত।

যীশুর জন্মের ৩০০ বছর পর থেকে চীনে, প্রশাসন থেকে, প্রথম বিধি সতর্কীকরণ বা সেন্সর প্রথা চালু হয়।

প্রাচীন যুগে, বিধিভঙ্গের প্রথম শাস্তি পেয়েছিলেন সক্রেটিস। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি যুবকদের কুপথে নিয়ে যান, সামাজিক স্থিতি ভঙ্গকারী ও রাজনৈতিক মূল্যবোধ নষ্টকারী। তাকে বিষপান করতে আদেশ দেওয়া হয়েছিল।

যিশুখ্রিস্ট একধরণের ইহুদী নীতি ভঙ্গকারী হিসাবে ক্রুশবিদ্ধ হন।

যিশুখ্রিস্টের জন্মের ৪৮০ থেকে ৪০৬ বছর আগে ইউ-রি-পিদিজ (Euripides), এক গ্রীক নাট্যকার, যিনি ৯০টি নাটক লিখেছিলেন, তিনি প্রথম প্রবক্তা বাক্‌স্বাধীনতার।

জন মিলটনের Areopagitica (১৬৪৪) হল ক্লাসিক দৃস্টান্ত সেন্সরশিপের বিরুদ্ধে বাকস্বাধিনতার উকালতি।

ডি এইচ লরেন্স, ১৯২৯ সালে ডরোথি ওয়ারেন গ্যালারি, লন্ডনে, তার পেন্টিং এর একটা প্রদর্শনী করেন। পুলিশ প্রদর্শিত কাজের ৯টি অশ্লীলতার দায়ে বাজেয়াপ্ত করল। লরেন্স তখন ইতালিতে। তার সময় ভাল যাচ্ছিল না, তার বই Lady Chatterley’s Lover (১৯২৮), The Rainbow (১৯১৫)। অশালীনতার দায়ে অভিযুক্ত। আদালতের রায়ে নিষিদ্ধ। যাই করছিলেন তাই নেতিবাচক ফল আসছিল।

সেন্সরশিপের বড় ঘটনা ঘটে ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময়, ১৯৩৩ সালে। মানুষের মন বিশুদ্ধ করার জন্য হিটলারের বাহিনী, ইহুদি, কমিউনিস্ট বা মানবতাবাদীদের (Jewish author, communist or humanist) লেখা বই ২০, ০০০ ভলিউম, আগুনে জ্বালিয়ে দিয়েছিল, হিটলার স্বয়ং নিজে এইসব কাজে সক্রিয় থাকেন। ডিজেনারেট (Degenerate) বা অধঃপতিত একটি শব্দ বার করে, প্রচুর শিল্প সাহিত্য ধ্বংস করেন। শিল্পী, সাহিত্যিকরা ও ইহুদীরা যারা পেরেছেন পালিয়ে বেঁচেছেন, যারা পারেননি তারা কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে, গ্যাস চেম্বারে মারা যান। ইতিহাসে গণহত্যা হিসাবে হিটলার এক কলঙ্কিত ঘৃণ্য মানুষ।

যেসব দেশগুলিতে সভ্যতার আলো আগে ফুটেছে সেসব দেশে অশ্লীল শব্দের প্রয়োগে বহু শিল্প সাহিত্য নিষিদ্ধ হয়েছে। লেখক শিল্পীরা, সাংস্কৃতিক কর্মীরা সরকারে রোষানলে পড়ে পুড়েছেন, শাস্তি পেয়েছেন। ১৯৫০ এর পর সাহেবদের দেশে এক নবচিন্তন ও বিশ্লেষণ এসেছে। তারা শিল্প সাহিত্য রাজনীতি ও বিজ্ঞান থেকে অশ্লীল শব্দটির গুরুত্ব কমিয়ে দিয়েছেন। ফলে, শিল্পী সাহিত্যিক বিজ্ঞানীরা তার যথেচ্ছ ব্যবহার করছেন।