আলো

দীপ শেখর

বামপন্থা ঠকিয়েছিল আমাদের।
তখন থেকেই বাবার সংসারে তেমন মন নেই।যদিও বামপন্থা কী এবং কেন প্রভৃতি নিয়ে বাবার ধারণা কতদূর এই নিয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ ছিল।বামপন্থা অনেকটা সাদাকালো টেলিভিশনের মতো আমাদের মতো মধ্যবিত্ত জীবনের একটা অংশ ছিল, একদিন পুরোনো হয়ে গেলো সেটি। বাবার অবসরের জীবন খুব আশ্চর্য করে আমাকে। মানুষের একটা বিশ্বাস প্রয়োজন জীবনে বেঁচে থাকার জন্য। সেটি যত ভুল বিশ্বাসই হোক না কেন।

অনেকসময় বিশ্বাসের একটা দাসত্ব তৈরি হয়।বাবার জীবনে প্রেম বলে এখন কিছু নেই।কোনকালেই ছিল না বলে আমার বিশ্বাস।এখন কেবল অতিক্রম করা।অপেক্ষা করা।আমাদের জীবনে এমন অপেক্ষার মানুষগুলো কেমন বদলে যায় বারবার।একসময় খেলার জন্য অপেক্ষা করি,একসময় প্রিয় মানুষের জন্য অপেক্ষা করি,কখনও সুখের জন্য অপেক্ষা এবং চিরকাল কেবল মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করে যাওয়া।আমাদের পায়ের ছাপ বরাবর পেছনে পেছনে আসছে মৃত্যু।অথচ আশ্চর্য মৃত্যুর ভয়ের মধ্যেও বেঁচে থাকা ছিল। আজ মৃত্যুর ভয় পাই না।

এ যেন থাকা বা না থাকার মধ্যে একটা সামান্য ব্যবধান।একটা জীবন থেকে হয়ত আরেকটা জীবনে প্রবেশ করা।মাঝেমাঝে মনে হয় আমাদের জীবন সহ এই গোটা বিশ্বব্রহ্মাণ্ড একটা বৃত্ত।কোথাও শেষ নেই, কোথাও শুরু নেই।আমাদের পুরোনো জমিটা বিক্রি হয়ে গেছে একান্ত অর্থাভাবেই।পুরোনো বাড়িটির ছাদ নষ্ট হয়ে যাওয়ার ফলে তা ভেঙে ফেলা ছাড়া কোনরকম উপায় ছিলনা।মানুষের অবহেলাতেই ছাদ নষ্ট হয়।কখনই অন্যরকম কিছু হতে চাইনি আমি। শুধুমাত্র চেয়েছি সামান্য থাকার একটু জায়গা। একটু জায়গার জন্য আমরা সবাই হন্যে হয়ে মরছি।

বিগত দশ বছরে আমার জীবনের সবথেকে বড় দর্শক আমি নিজেই।বয়স বা সময় বলে আমি কিছুই মানতে চাইনা।আমি শুধু বুঝি দৃশ্য। দৃশ্য ক্রমাগত বদলে যেতে থাকে। বিগত দশ বছর ধরে আমার জীবনে যে পরিবর্তন বিশেষভাবে করতে চেয়েছি তার কিছুই হয়ে ওঠেনি। নিজেকে স্বীকার করার বৃত্তে এতটাই ঢুকে গেছি যে তার সামান্য পরিবর্তন আমাকে ক্লান্ত করে তোলে। দশটা বছর আমার চোখের সামনে ধীরে ধীরে নিজের দৃশ্য বদলে ফেলেছে। মানুষ অত্যন্ত অসহায় এক প্রানী। নিজের জীবনকে সে বদলে দিতে পারে এমন ভাবনা তার মনের মধ্যে থাকলেও আদতে তেমন কিছুই নয়।

এই অসহায় অবস্থা তার মধ্যে একটা অশান্তি সৃষ্টি করে। তাই জীবনের খুব গভীরে গিয়ে নিজেদের পেতে তাদের ভয় হয়। তারা নিজেরাই নিজেদেরকে ভুলিয়ে রাখতে পারে।ভুলিয়ে রাখার নানা উপায় আবিস্কার করে নিয়েছে মানুষ নিজেই। মাঝে মাঝে মনে হয় জীবনের এতটা গভীরে আসা ভুল হল। এতে আঘাত বেশি আসে।ঠিক তখুনি মনে হয় আসলে আমরা তো আসলে আঘাতই ভালোবাসি। মনে হয় আঘাত এসে আমাদের আরেকবার বাঁচিয়ে দিয়ে যাবে। অথচ আঘাতের ভেতর থেকে সময় নিয়ে চলে গেছে ভালোবাসা। তাই এখন আঘাত আর বাঁচায় না।আরও বেশি জড়তা দিয়ে যায়।

আমরা সকলেই কোন না কোনভাবে নিজেদের বাসস্থান হারিয়েছি। দীর্ঘদিন ধরে বারাসাতে থেকে থেকে বুঝি আসলে কোন জায়গায় দীর্ঘদিন থাকা ভালো নয়।একটি সম্পর্কের মতো ধীরে ধীরে বসবাসের জায়গাটা মরে যায়।তিল তিল করে সেই মৃত্যু চোখের সামনে দেখা আরেক মৃত্যুযন্ত্রণা। রাজনৈতিক পরিচয় বদলে গেছে বারাসাতের। কলকাতার কাছাকাছি হওয়ার জন্য জনবিস্ফোরণ হয়েছে।এমন অনেক মানুষ আজকাল দেখতে পাই যারা বাইরের জাঁকজমকে ভেতরে অন্তঃসারশূন্যতা ঢাকতে চায়।

অথবা এমনও হতে পারে যে অন্তঃসার কাকে বলে সেই বোধ তাদের মধ্যে নেই। ধীরে ধীরে কথা বলার মানুষ এভাবে কমে যায় আমাদের আশেপাশে। বারাসাত এখন কেবলমাত্র কিছু স্মৃতির শৃঙ্খল পরিয়ে রেখেছে আমার হাত পায়ে।সেই স্মৃতিগুলো রোজ টেনে নিয়ে যায় সমস্ত রাস্তায়। অথচ প্রিয় মানুষেরা লুকিয়ে পরেছে অপর দৃশ্যের ভেতর। একা থাকা এবং নিঃসঙ্গতার মধ্যে তফাৎ একদিন এভাবে করতে পারতাম না।এখন বুঝি আদতে আমি এমন এক মাঝামাঝি জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি যেখান থেকে কোন পথ দেখতে পাওয়া যায় না।

খুব নিষ্প্রাণ অথবা খুব প্রাণোচ্ছল কোন মানুষের কাছেই আমি বেশিক্ষণ থাকতে পারি না। শহর আমাকে বিভ্রান্ত করেছে। শহর আমার মজ্জায় ঢুকিয়ে দিয়েছে আসলে কিছুই শেষ নয়।সবকিছু শেষ থেকে একটা শুরু হয়। শহর বুঝিয়ে দিয়েছে আসলে আমাদের বিশ্বাসগুলো কম বেশি অন্ধ।সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর থেকে দুপুর অব্ধি নিজের অস্তিত্বকে নানাভাবে জরীপ করতে করতে সারাটা দিন কেটে যায়। মাঝ মাঝে এসে দাড়াই আমার ব্যালকনিতে। কখনও ছাদে এসে দেখি এখন জীবনের কতদূর চোখ যায়।অথচ একা লাগে।সারাটাদিন সকলের মাঝে একা লাগে।সারাদিন আমি দেখি মানুষ মানুষের সঙ্গে শুধু একটাই সম্পর্ক রাখে। প্রতিহিংসা।