এভাবে কি হিজড়াপুরাণ রচিত হতে থাকে! হিজড়াদের বৃত্তান্ত থেকে নেমে আস্তে থাকে পাখামেলা ব্রিজ। নদী-পুকুর-সাঁকো-সেতু উজিয়ে তাদের ক্লান্তিহীন চলাচল। মহামিছিলের আবহমানতা। টিয়াসুন্দরীর সাড়ে তিন কুড়ির শরীরের পেশীতে তীব্রতা জাগে। সে তার কুঞ্চিত ত্বকের ভেতরে ফুসফুসের ভেতরে গঞ্জগাওয়ের বাতাস ভরে নিলে তার মস্তিষ্কের কোষে কোষে স্মৃতিপরায়নতা জাগে। স্মৃতির তাড়সে টিয়াসুন্দরী তার শৈশবস্মৃতির খুব গভীরে আত্মগত হয়। সে ছিল সতীরাণীর দলে। রাইমোহনের দলে। বড়সড় দল। শিলিগুড়ি জলপাইগুড়ি দিনাজপুরের গ্রামে গ্রামে কেবল ঘুরে বেড়ানো।

সুবীর সরকার

তখন জোতদার জমিদারদের আমল। তারা ছিলেন দরাজ ও দয়ালু। হিজড়াদের মানুষ হিসেবেই দেখতেন। সহানুভূতি ছিল। সম্মান ভালবাসা জানাতেন। সতীরাণী দলবল নিয়ে তাঁবুতে তাঁবুতে রাত কাটাতো। দিনমান ঘুরে ঘুরে তার কামাইকাজ। চারটি ঘোড়াও ছিল দলে। ‘মাদারির খেলাও’ দেখাতো তার দল। টিয়াসুন্দরী এভাবে বড় হতে লাগল। দেশ ভাগ হল। বড় যুদ্ধ হল। জমিদারী প্রথার বিলোপ হল। আর ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর পরে পরেই বুড়ি সতীরাণীও চলে গেল।

দল বিরাটত্ব হারিয়ে ছোট হল। নূতনেরা যুক্ত হল। ঘোড়া নেই। তাঁবু নেই। বর্ণোজ্জল হিজড়াদের যাপনে ছন্দপতন ঘটে গেছে। তবু বাঁচতে হবে। কারণ বাঁচতে হয়। চোখ মেললেই আলোকিত এক রূপসজ্জার পৃথিবী। টিয়াসুন্দরী লড়াই জারি রাখে। দিন যায়। সময় গড়ায়। টিয়াসুন্দরী শক্তপোক্ত করে ফেলে তার ছোট দলটিকে। টিয়াসুন্দরীর বয়স বাড়ে। দিনদুনিয়ার মানুষজন বলে– ‘ঢোলবাজনা ধরি কায় যায় রো?’
জবাব আসেপ– ‘টিয়ারাণী যাছে রো। হিজড়ার ঘর যাছে রো’।

*******
তখন বিকেল অতিক্রান্ত। আজ থেকে যেতে হবে আদ্যনাথ ধনীর বাড়ি। সারা রাত আবার উৎসবের জাক বসবে। নাচা গানা আর চটুল সব কথারঙ্গে মুখরিত হবে গাওগঞ্জ। আকাশমাটির পৃথিবীতে দুলে দুলে গান ধরবে দশ কুড়ি হিজড়ার দল–
‘শ্যাম কালা ও রে শ্যাম কালা
ছাড়িয়া দে মোর শাড়ির আঞ্চল
যায় বেলা,
বেলা ডুবিলে হইবে রাতি
সঙ্গে নাই মোর সঙ্গী সাথী
দেরী হইলে ডাঙ্গাইবে সোয়ামী রে’…

গানকে গতি অথবা গীতিময়তা দিতে নাচ আসে। কাঠি ঢোল বাজে। হিজড়েরা এভাবে জন্মমরণশাসিত এক জীবনকেই বুঝি বন্দনা করে।তাদের লিঙ্গ নেই।যৌনতা নেই। যৌনাচারণ নেই। শোক ও শ্লোকের কুয়াশার আড়ালে হিজড়েরা বুঝি মনে করিয়ে দেয়– ‘জীবন মৃত্যুশাসিত। দিনে দিনে খসিয়া পড়িবে রঙ্গিলা দালানের মাটি’!

*******
এভাবে হিজড়াপুরাণ রচিত হতে থাকে। হিজড়া হয়ে জন্মানোটা অভিশাপ! জীবন পদে পদে অপমান বহন করে আনে। স্বাভাবিকতার একদম বাইরে ব্যাঙ্গবিদ্রুপের এক যাপন বৃহন্নলাকূলের। তবুও বেঁচে থাকবার অতিকায়ত্বে শরীরভরতি আকুতি নিয়েই বেঁচে থাকা। বেঁচে থাকতে চাওয়া। হিজড়াপুরানের পল্লবিত অংশে হাওড়বাওড়্রের হাওয়া এসে লাগে। নদীজলে সামান্য কি দুলে ওঠে ডিঙি! টিয়াসুন্দরী হিজড়াপুরাণকে মান্যতা দিয়েই একপর্বে তুমুল ‘মিথ’-এ রূপান্তরিত হন। আমরা দেখি শুনশান পড়ে আছে হিজড়াদের পদছাপে ভরা আদ্যনাথ ধনীর নিকানো উঠান। বাহির এগিনা। ভিতরের খোলান।