ড. অরিজিৎ ভট্টাচার্য

বীরভূম রেপার্টরি থিয়েটারের তিন বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে সম্প্রতি পূর্ব বর্ধমান জেলার সংস্কৃতি লোকমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল “ ৩ তিরিক্কে ৩” নাট্য উৎসব । এই নাট্য উৎসবের প্রথমদিন মঞ্চস্থ হয় সংস্কৃতি প্রযোজিত, গিরিশ কারনাড রচিত ‘তুঘলক’ । নির্দেশক দেবেশ চট্টোপাধ্যায় । বহু মঞ্চ সফল এই নাটকটি নিঃসন্দেহে বর্ধমানবাসীদের কাছে শারদোৎসবের আগাম উপহার ।
গিরিশ কারনাডের ‘তুঘলক’ (১৯৬৪) ঐতিহাসিক নাটক । বড় ক্যানভাস, ঘটনার বাহুল্য, উন্মাদনাময় বিন্যাস, এই নাটকের সম্পদ । রাজ্যের অধিকার সুনিশ্চিত করতে তুঘলক অনায়াসে মানুষ খুন করেন কিন্তু নিজে থাকেন নিরাপদ দূরত্বে । মুসলমান আমীররা যাতে হিন্দু প্রধান দৌলতাবাদে গিয়ে সুবিধা করতে না পারে সে উদ্দেশ্যে তুঘলক রাজধানী দিল্লী থেকে দৌলতাবাদে স্থানান্তর করেন । নাটকের শেষাংশে পুনরায় রাজধানী দিল্লীতে ফিরিয়ে আনতে প্রয়াসী হতেও দেখা যায় । তুঘলক অর্থ সংকট দূর করার জন্য রৌপ্য মুদ্রার পরিবর্তে তাম্র মুদ্রার প্রচলন করেন। কিন্তু তাম্র মুদ্রা অতিসহজেই জাল হওয়ায়, অর্থনীতি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে । বাধ্য হয়ে তুঘলক সব অর্থ প্রত্যর্পণ করেন প্রজাদের । মুসলমানদের নামাজ পড়া তিনি বন্ধ করে দিয়েছিলেন । কিন্তু বেশ কয়েক বছর পরে তিনি তাও প্রত্যাহার করে নেন । আসলে তুঘলক এক আধুনিক জটিল চরিত্র । গিরিশ কারনাডের ভাষায় ‘existentialist’ ও ‘atheist’ । এই নাটক ঐতিহাসিক হয়েও তাই কোথাও গিয়ে সমসাময়িকও বটে ।
একদিকে কূটনীতি, সন্দেহ, আর খুনের রুদ্ধশ্বাস পরিবেশ, আর অন্যদিকে ফাঁকে ফাঁকে ভাবুক ভঙ্গিতে তুঘলকের নস্ট্যালজিয়া, এবং রুমি আর সাদের কাব্যজগতের প্রতি তার মুগ্ধতা তাঁকে এবং সেইসঙ্গে নাটকটিকেও রোম্যান্টিক করে তুলেছে । এমনকি মঞ্চের উপর খুনের অবতারনায় রাজনীতি শিল্পের শর্ত ছাড়িয়ে গেছে । রাজনীতি নিশ্চয়ই শিল্পের অঙ্গ হতে পারে, কিন্তু তা শিল্পের বিকৃতি ঘটিয়ে নয় । বহু অত্যাচার স্বেচ্ছাচারের পর প্রাকৃতিক নিয়মেই সমাজের পাল্টা আঘাতে তুঘলককে দীর্ণ রূপে দেখা গেলো – চূড়ান্ত পরিস্থিতির মুখোমুখি তাঁকে যথাযথ ধরতে পেরেছেন বটে নাট্যকার । কিন্তু তুঘলকের ব্যক্তিত্ব এবং অস্তিত্বের সংঘাত যে বিন্দুতে এনে শেষ করলেন তিনি, সেখানে কোনো ফলাফল বেরিয়ে এলো না – অবসন্ন ক্লান্ত-নিদ্রাতুর তুঘলকের বিনির্মান ঘটলো বটে, কিন্তু তার কোনোরকম পোলারাইজেশন দেখাতে পারলেন না নাট্যকার । খানিক শস্তা আবেগ আর করুণ রস সঞ্চারিত হয়েছে মাত্র ।
তুঘলকের ধর্ম বস্তুত আত্মজাগরণহীন এক মায়াটোপ, প্রাতিষ্ঠানিকতাসর্বস্ব সংস্কার মাত্র – বার্ধক্যে ধর্মচর্চার অনুরূপ । আত্মশুদ্ধির চেষ্টায় ভালো হওয়ার সাধনা তাঁর রক্তে নেই । অস্থিরতা আর উন্মত্ততাই যার ঐশ্বর্য, তার আবার আত্মবিশ্বাস-ই বা কী, ধর্মই বা কী ? ‘মহাজ্ঞানী’ তুঘলক আসলে আগাগোড়াই অধার্মিক, আদিম, বর্বর – ঈশ্বরকে সে ধরেই বা কখন, ছাড়েই বা কখন, তা বোঝা দায় ! সর্বতোভাবেই সে এক মূঢ়, আত্মবিস্মৃত এবং আত্মঘাতী জীব । আধুনিকতা কখনোই এই নির্বোধ, চৈতন্যরহিত জীবের জীবনচর্যা হতে পারে না ।
তুঘলকের নিঃসঙ্গতা ? – তার কোনো বিকাশ ও পরিণতিই তো নাটকে দেখা গেলো না । কেবল দেখা যায়, তুঘলক ভূপতিত হয় এবং সঙ্গীহীন হয়ে পড়ে । বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে আত্মীয়, প্রিয়জন এবং মানুষের কাছ থেকে । কিন্তু তারপর ? নিঃসঙ্গতা কীভাবে বিস্তারিত হলো তুঘলকের জীবনে, কিংবা তার সামাজিক সত্তার মুখোশ খসে পড়ায় কী প্রতিক্রিয়া ঘটলো তার অস্তিত্বে, কিংবা সমাজকে তার অথবা তাকে সমাজের কতোটুকু প্রয়োজন রইলো, কিংবা বিশ্বমঞ্চে এবার কী হবে তার ভূমিকা – তার সামান্যতম ইঙ্গিতও নেই নাটকে ।
কন্নড় সাহিত্যের বিশিষ্ট নাট্যকার গিরিশ কারনাডের এই নাটক বাংলা মঞ্চে বহুদিন আগে সলিল বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিচালনায় থিয়েট্রন নাট্যগোষ্ঠী মঞ্চস্থ করেছিলো । বহুদিন পরে দেবেশ চট্টোপাধ্যায়ের পরিচালনায় সংস্কৃতি নাট্যগোষ্ঠী আবারও অত্যন্ত সফলভাবে নাটকটি মঞ্চস্থ করতে পেরেছে । পরিচালককে অভিনন্দন ।
তুঘলকের চরিত্রে রজতাভ দত্তের অভিনয় চমৎকার । তুঘলকের আবেগ-সংঘাতটুকু তিনি বিশ্বাসযোগ্যভাবে প্রকাশ করতে পেরেছেন । নামাজের দৃশ্যে, এবং ঐ একই দৃশ্যে খুন সম্পাদনে গৈরিশ ছন্দেই পরিচালক একটি নাটকীয় মুহুর্ত উৎপাদন করেছেন । ঐ মুহুর্তে রজতাভ দত্তের অনুত্তেজিত প্রকাশভঙ্গি তাঁর অসামান্য অভিনয় ক্ষমতার প্রকাশ ।
অন্যান্য পার্শ্বচরিত্রের মধ্যে আজিজের চরিত্রে অভিনয় করা গম্ভীরার অভিনয় বহুদিন মনে থাকবে । নাজিবের চরিত্রে অরিন্দল বাবুর অভিনয়ও প্রশংসনীয় । এছাড়া অন্যান্য সব পার্শ্বচরিত্রের অভিনয় সুন্দর ।