পরিরা কি রূপকথা আর লোকগাথায়, পরিরা কি সাহিত্যের পাতায় শুধু? চারিদিকে চোখ ফেরালে কত পরির দেখা মেলে৷ Arindam-Rayপরিবর্তন থেকে পরিমাপ, পরির সূত্রে সবই নিতে পারে নয়া অর্থ৷ আর ল্যাজকাটা প্রেমিকের ডানাকাটা পরি তো থাকলই৷ অরিন্দম রায়

ছোটবেলার পরিরা

আমাদের ছিল নাকি? পরি বা পরিদের মত কেউ! ছিল না ।আবার ছিলোও। সেইসব রূপকথার গল্পের ভিতর, ঠাকুমার ঝুলি আর ঠাকুর্দার ঝুলির মধ্যে থেকে তারা উঠে আসত।তাদের স্বচ্ছ দুই ডানা,হাতে ধরা জাদুকাঠি কতবার আমাদের ঘুম পাড়িয়েছে! আমরা ভেবেছি তারা সত্যি সত্যিই আছে।নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েছি একানড়ের ভয় কাটিয়ে ।সাদা পোশাক পরা পরিরা ভাল হত।আর দুষ্টু পরিদের পোশাক ছিল কালো রঙের।সেই যে এক কাঠুরে ছিল,যে একদিন নদীর ধারে কাঠ কাটতে গিয়েছিল আর  জলে পড়ে গিয়েছিল তার একমাত্র লোহার কুঠার! তারপর নদীর Angel-3ভিতর থেকে উঠে এসেছিল জলপরি ।কাঠুরেকে প্রথমে দিয়েছিল সোনার কুঠার,তারপর রুপোর আর সবশেষে কাঠুরের নিজের লোহার কুঠারটি ।সৎ কাঠুরে কিন্তু প্রলোভনে পা দেয় নি। সে তার  নিজের কুঠারটিকেই চেয়েছিল,পুরষ্কার হিসেবে জলপরি তাকে তিনটি কুঠারই দিয়ে দেয়। যখন কোন ট্যাক্সিচালককে দেখি প্যাসেঞ্জারের ফেলে যাওয়া লাখ টাকা হেলায় ফিরিয়ে দিতে আমার কি জানি কেন সেই কাঠুরের গল্প মনে পড়ে যায়।মনে হয় এগুলোই বা রূপকথার চেয়ে কম কীসে?

                        লালকমল –নীলকমল দের কাহিনির পাশাপাশি এইসব পরিরা তো ছিল আমার শৈশব জুড়ে।আজ তাদের স্মৃতি ঝাপসা হয়ে গেছে।আমাদের ছেলেমেয়েরাও জানে পরিদের কথা । তবে পড়ার চাইতে তারা দেখে বেশি,পরিদের! অ্যানিমেশনের জাদুতে,কম্পিঊটার আর টিভি র স্ক্রিনে। আমরা ভেবে নিতে পারতাম আমাদের পরিদের,ওরা সরাসরি দেখে নেয় ওদের পছন্দসই পরিদের ।কোথাও কি একটু মায়া জন্মায় না এইসব ছেলেমেয়েদের জন্য? ওরা কি হারিয়ে ফেলছে না কল্পনা করার শক্তি? প্রযুক্তির ব্যবহারে হয়ত উন্নত হয়ে উঠছে ওরা আমাদের থেকে,কিন্তু সেইসঙ্গে প্রযুক্তি কেড়ে নিচ্ছে না তো ওদের মনের চোখ?

ল্যাজকাটা প্রেমিকের ডানাকাটা পরি!

বয়ঃসন্ধির হরমোন যখন খেলা করছিল আমাকে নিয়ে তখন তো এপাশে পরি আর ওপাশে পরি!ইস্কুল ফেরত মেয়েরা,সদ্য শাড়ি পরা শিখে সেই শাড়ি নিয়ে ব্যতিব্যস্ত মেয়েরা যখন স্কুল ছুটির পরে রাস্তায় নেমে আসত—- সেইসব বিধূভূষণ,তারাসুন্দরী,চপলাদেবী,সুরেন্দ্রনাথ বালিকা বিদ্যালয়ের মেয়েরা!রাস্তা জুড়ে পরিদের ঢল নামত তখন!আমাদের বাইক ছিল না।সাইকেল সম্বল আমাদের প্রেমে তাই গতি আসে নি তেমন।বাইক জিতে নিয়ে গেছে সেইসব পরিদের।কুঁচকে যাওয়া অপরিষ্কার ইউনিফর্ম আর পায়ে হাওয়াই চটি হেরে গেছে ঝকঝকে জামা প্যান্ট,সানগ্লাস,স্নিকারের কাছে। আমরা দুঃখ ভুলতে একে অপরের হাতে সিগারেট বিনিময় করেছি।কাউন্টারের আগুন আমাদের আশা ও উদ্দীপনা নিভে যেতে দেয় নি। বাতাসে আমাদের দীর্ঘশ্বাস মিলিয়ে গেছে। সেইসব নাম না জানা পরিরা জানতেও পারে নি —– কত বিবেকানন্দ,কত শিক্ষানিকেতন, কত ( ব্যাঁটরা )মধুসূদন,কত হাওড়া জেলা স্কুল তাদের জন্য অপেক্ষায় ছিল। তবু আমরা হার মেনে নিই নি কখনো।পরির খোঁজে আমাদের জার্নি  থমকে গেলেও থেমে যায় নি একেবারে। এবং প্রত্যাখানের জবাব হিসেবে অ্যাসিড কে বেছে নিই নি আমরা ।বেছে নিই নি নোংরা এম এম এস ছড়িয়ে দেওয়ার পথ। পরিদের ডানা পুড়ে যায় এমন কোন কাজের কথা স্বপ্নেও ভাবিনি আমরা ।

                        পাড়ায় তো ছিলই,  কলেজেও ছিল ,যারা বয়সে আমাদের দিদির কাছাকাছি হলেও যাদের থেকে চোখ ফেরাতে পারতাম না। পরি দিদি ছিল তারা। তাদের সংগে প্রেম করত পাড়ার দাদারা।যাদের কেউ টেনিস ক্রিকেটের উঠতি তারকা,কেউ আবার জিমন্যাস্টিকে দুর্দান্ত। আমরা  হাঁ করে দেখতাম,গোপনে হিংসার কথা বলতাম হয়ত। এখন সেইসব দিদিদের,সেইসব পরিদের ডানা নেই আর। সংসার নামের ঘোর বাস্তবের মুখোমুখি সেইসব রূপকথারা চুপ করে গেছে।নাকি নিজেদের ডানাগুলো তারা লুকিয়ে রেখেছে,সুযোগ পেলেই মেলে দেবে বলে! কলেজ ইউনিয়নের দাদা দিদিদের প্রেমের আর আত্মত্যাগের গল্প ফার্স্ট ইয়ারের মুখে মুখে ফিরত ।সে তো অন্যরকম পরি,অন্যরকম পরিণতির কাহিনি।আমাদের কলেজে পরি ছিল দু একজন।কিন্তু তাদের জন্য পঙ্খীরাজে চাপা রাজপুত্ররাও ছিল। জেলার যত পরিরা গিয়ে ভর্তি হত গার্লস কলেজে।আমরা হতভাগ্যের দল তাদের দর্শণ পাবো বলে মাঝেমাঝে ভিড় জমাতাম সেই কলেজের গেটের আশেপাশে।কিন্তু ভাগ্য খুললে তো? গেট সেই যক্ষপুরীর দরজার মত বন্ধই থাকত । একমাত্র অ্যাডমিশনের দিনগুলোতে সেই দরজা খুলে যেত,আর  আমরা কেউ পরিদের দাদা,কেউ ভাই সেজে ঢুকে পড়তাম সেই স্বার্থপর পরিদের বাগানে। যেখানে অন্যসময় নোটিশবোর্ডে লেখা থাকত —-‘TRESPASSERS WILL BE PROSECUTED’!

সরস্বতী পুজো, দুর্গা পুজোর দিনগুলো তে সব মেয়েরাই কেমন পরি হয়ে যেত, এখনও হয়ে যায়।তাদের রঙীন উচ্ছ্বাস, তাদের ঠিকরে আসা হাসি বুকে ছলাত তোলে,হার্টবিট বেড়ে যায় নিজের অজান্তে ।এসমস্ত আমাদের নিজস্ব রূপক্তহা,আমাদের ফেয়ারি টেলস,আমাদের মান অভিমান আর হৃদয় ভেঙে যাওয়ার গল্প সব।মোবাইল যুগের আগে,এস এম এস যুগের আগে এইসব পরিদের কথা আমাদের ব্যক্তিগত হরকরা বিলি করে বেরিয়েছিল কোন একদিন।ইতিহাস বইয়ের বাইরে,সিলেবাসের বাইরে সেইসব চিঠিপত্তর কারো না কারো সিন্দুকে আজও তোলা আছে —- খোঁজ নিয়ে দেখুন!

 

 পণ্যপরি

বাচ্চা বাচ্চা মেয়েরা মায় টিন এজ মেয়েরা  এখনও যে পুতুল পরিটিকে নিয়ে পাগল সেই বার্বি,সেই ক্ষীণ  কটি,সৌন্দর্যের পরাকাষ্ঠা,সেই ডায়েট Swarovski Sparkles In The 2013 Victoria's Secret Fashion Showসচেতন ,গায়ে প্রায় মাংস না থাকা,বুলিমিয়া রোগাক্রান্ত ( অত ডায়েট করলে তার বুলিমিয়া বা খাওয়ায় অনীহা হবে বলেই আমার বিশ্বাস) অবশ্যই যার গায়ের রঙ ধবধবে ফর্সা,যে আবার শত বিতর্কের মুখে কৃষ্ণাঙ্গিনী রূপ ধারণ করবে,যার ওয়াড্রোবে ভর্তি জামাকাপড় —- পণ্যসভ্যতা তাকে উপহার রূপে তুলে দিয়েছিল শিশুদের হাতে। এখনও বার্বি,যতই সে  ওয়ার্কিং গার্ল হয়ে ওঠার প্রাণপণ চেষ্টা করুক না কেন,মেয়েদের এক বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গী থেকেই দেখতে শেখায় আমাদের।আর সেই বিশেষ ধারণাটিকে চারিয়ে দিতে চায় মেয়েদের মনে —- শৈশবেই ।

 ডানা তো আরো দেখেছি।যাকে বলে সত্যিকারের ডানাওয়ালা পরি যারা ওড়ে নি,হেঁটেছে র‍্যাম্প জুড়ে। ভিক্টোরিয়া’স সিক্রেট-র অন্তর্বাস পরিহিত ডানাযুক্ত পরিরা।খারাপ ভাল জানি না।জানি না এটি নারীর ক্ষমতায়ন? নাকি পণ্যায়ন? নাকি পুরুষ চোখের তৃপ্তি লাভ।আবার এও হতে পারে ব্রা, লঁজারি বিষয়ে ছুঁতমার্গ কাটিয়ে তোলার উপায় বিশেষ? তবে একথাও ঠিক যে কৃষ্ণাঙ্গী সেই পরি, সেই সুপার মডেল নাওমি ক্যাম্পবেল কে যতই ভালো লাগুক না কেন, আমরা এখনও, দুনিয়া এখনও ফর্সা পরিদেরই চায়।বিজ্ঞাপন কিম্বা বিয়ে, ফেয়ার অ্যান্ড লাভলিদের জয় জয়কার। আচ্ছা,ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের পরির গায়ের রঙও তো কালো ।তাই না ?


জেলার যত পরিরা গিয়ে ভর্তি হত গার্লস কলেজে।আমরা হতভাগ্যের দল তাদের দর্শণ পাবো বলে মাঝেমাঝে ভিড় জমাতাম সেই কলেজের গেটের আশেপাশে।কিন্তু ভাগ্য খুললে তো? গেট সেই যক্ষপুরীর দরজার মত বন্ধই থাকত । একমাত্র অ্যাডমিশনের দিনগুলোতে সেই দরজা খুলে যেত,আর  আমরা কেউ পরিদের দাদা,কেউ ভাই সেজে ঢুকে পড়তাম সেই স্বার্থপর পরিদের বাগানে।


পরিহাস ! (পরিদের নিয়ে পরিহাস আর কি!)  

লেখা খুব গুরু গম্ভীর হয়ে যাচ্ছে।এই ফাঁকে লঘু কিছু  কথাবার্তা বলে নিই । পরিদের নিয়ে ভাবতে ভাবতে কয়েকটি ‘এককথায় প্রকাশ করো’ মাথায় এলো। পাঠক এই ছ্যাবলামি মেনে নিলে ভাল।নইলে সব দায়িত্ব সম্পাদকের ।

পরিকল্পনা — পরিদের নিয়ে কল্পনা

এই ধরণের কল্পনা সবচেয়ে বেশি সময় ধরে করেছেন ভারত সরকার । পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা ।

পরিবেশন — পরিরা যা মুখে মাখে ফর্সা হওয়ার জন্য

পরিদের নেচারোপ্যাথি।কেয়া শেঠ এদের ক্রেতা হিসেবে পাওয়ার জন্য হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছেন!

পরিবর্তন — পরিদের ব্যবহৃত বাসন

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে এর কোন সম্পর্ক নেই।

পরিষ্কার — পরিদের গাড়ি ( Pori’s car)

পরিচালক — পরিদের গাড়ির চালক

যে কারণে টলি-বলি-হলি সব উডের নায়িকাদের আশেপাশে সব সময় এদের দেখা যায়।

পরিমাপ: পরীদের ভাইটাল স্ট্যাট। দর্জি ছাড়া অন্য পুরুষ মাপ নিতে গেলে গণ পিটুনি খাওয়ার সম্ভাবনা আছে।

সর্বোপরি — সবার জন্য যে পরি

উপরি – সবচেয়ে কাম্য পরি

সকলে যা পায় না। পেলেও হজম করতে পারে না ।

 রূপোলি পর্দার পরি  

 না গো! আমাদের সানি লিওন ছিল না কোন। প্লাস্টিক ফুলের কাছে গন্ধ নিতে যাই নি আমরা। আমাদের ছিল 22slid1এক সিমি গারেওয়াল,আমাদের ছিল এক টিনএজ জোকার,এক ছাত্র,পিকনিকে গিয়ে যে আচম্বিতে দেখে ফেলেছিল শিক্ষিকার পোশাক পাল্টানো। তারপর ধুম এক জ্বর এসেছিল সেই কিশোরের। আমরাও পুড়ে মরেছিলাম সেই তাপে।থার্মোমিটার সেই উষ্ণতা মাপতে পারে নি! সিমি, আমাদের অনন্ত যৌবনা নারী।প্লাস্টিক নয়, রক্তমাংসের।আর আমাদের ছিল সে এক আশ্চর্যময়ী । পর্দায় লিপ দিচ্ছেন লতাজির কন্ঠে —- আজকাল পাও জমি পর নেহি পরতে হে মেরে /বোলো দেখা হে কভি মুঝে/ উড়তে হুয়ে! আবার কখনো তিনি   সালঙ্কারা বসন্তসেনা, একে একে অলংকার খুলে দিচ্ছেন চারুদত্তের হাতে, আর আমাদের গলার কাছে কি একটা আটকে যাচ্ছে বুঝতে পারছি না ।  আমাদের ছিল গভীর চোখের অধিকা্রিণী,মেধাবী এক নারী।যিনি তাঁর স্মিত হাসি, বুদ্ধিদীপ্ত অভিনয়ে  ঘায়েল করেছিলেন আমাদের।ওই কালোতে যে মজেনি তাকে অন্ধ ছাড়া কিই বা বলা যায়? ভাগ্যিস আমাদের কোন সানি লিওন ছিল না!

 আমাদের ছিল ডিডি মেট্রো নামে এক টিভি চ্যানেল।সেখানে একদা প্রতি শনি আর রবিবার ইংরেজি সিনেমা দেখানো হত।সেখানেই দেখেছিলাম এক অপূর্ব রোমান্টিক ছবি –‘ফ্ল্যাশ ’।দেখেছিলাম সাধারণ এক মানুষের সঙ্গে এক মৎসকন্যার প্রেমের কাহিনি।আহা! কি দেখেছিলাম।জন্ম জন্মাতরেও যা ভুলতে পারব না। সেই অপার্থিব নারীকে ভোলা আজও অসম্ভব বলে মনে হয়।

 পরিশেষে

 এই ছিল আমার ‘পরি –ভ্রমণ ’।এই ছিল আমাদের পরিকথা ।তবে রাত্রি গভীর হলে এখনও ছাদের উপর পরিরা  নেমে আসে।তাদের ডানার নীচে শিশুরা ঘুমোয়।জাদুকাঠির ছোঁয়ায় অভিমানী যুবকের দুঃখ লাঘব হয়। পৃথিবীর গভীর, গভীরতর অসুখ তারা একদিন সারিয়ে তুলবে এমন রূপকথায় বিশ্বাস রাখি। শুধু তাদের সুখ দুঃখের খবর কেউ রাখলো না। এটুকুই বেদনার । এটুকুই রূঢ় বাস্তব।