রিমি মুৎসুদ্দি

দুজনের কথার মাঝেই একটা ট্রাক হাতির শুঁড়ের মতো জল ছিটোতে ছিটোতে চলে গেল।
কাল সারারাত বৃষ্টিশেষে আজ সকালেও আকাশ থম মেরে রয়েছে। বাড়ি থেকে বেরানোর সময় তবুও হেলমেট, রেনকোট কিছুই নেওয়ার কথা ওদের মনে পড়েনি। দিয়া বেরানোর সময় অবশ্য নিজের জন্য একটা পুলওভার আর অভির জ্যাকেটটাও নিয়েছিল। কিছুটা শীতেই আটকাচ্ছে।

বাইকের স্পিড যেভাবে পঞ্চাশ ষাট প্রতি ঘণ্টায় উঠছে, মাঝেমাঝে যেন আরও বেশি গতিবেগ, দিয়ার শীতভাব ক্রমশ বাড়ছে। হাইওয়ে দিয়ে বাতাস কেটে কেটে বাইকটা দুজনকে এই মুহূর্তে প্রায় উড়িয়েই নিয়ে চলেছে।
-রেনকোটটা অন্তত আনলে হত।
দিয়া বেশ জোরেই বলল। যাতে বাতাসের স্তর ভেদ করে কথাগুলো পৌঁছয়। বাইকের স্পিড একটু কমিয়ে অভি জবাব দেয়,
-এখন তো অল্প ঝিরঝির বৃষ্টি। দাঁড়াবো কোথাও?

-নাহ্। বৃষ্টি কাল যা হল, আজ আবার ওরকম জোরে না আসে? বেরিয়েছি যখন একবারে পতমদা গিয়েই থামবে না-হয়?
-ঠিকই বলেছ। জোরে হলে দাঁড়াতাম। এ তো খুব সামান্যই হচ্ছে। যত তাড়াতাড়ি পতমদায় পৌঁছানো যায়। কাল রাত থেকে খাওয়া হয়নি। পেটে একেবারে দলমার হাতি ডনবৈঠক দিচ্ছে।
-থাক। কাল রাতের কথা এখন থাক।
আরও একটা ট্রাক ওদের প্রায় পাশ ঘেঁষে বেড়িয়ে গেল।

কালসিটে আকাশের গা মুছে এতক্ষণে বেশ একটা নরম মিষ্টি রোদ উঁকি দিয়েছে। বাতাসে শীতভাব। দিয়ার শীত শীত অনুভূতি হলেই ব্যাক সিট থেকে অভিকে জড়িয়ে ধরে প্রতিবার। অভ্যাসবশত হাত বাড়িয়েও পিছনের হাতলটা ধরে নিল। কাল রাতের ঝগড়া কি কোনোদিন আদৌ ভুলতে পারবে?

-চলো একটু চা খাই।
বাইকটা দাঁড় করিয়ে ওরা একটা খুপড়ি মতো চায়ের দোকানে এল।
-বিজলী, বিস্কুট হ্যায় ক্যায়া? কোকোনাট বিস্কুট?
বিজলী নামের বছর তিরিশের একটা মেয়ে কাচের বয়াম থেকে দুটো বিস্কুট বার করে দেয়। উনুনে ঘন দুধের চা ফুটছে। ফুটন্ত তরল আরও ঘন করতে বিজলী একটা বড় হাতা দিয়ে ক্রমাগত নেড়ে চলেছে। এই হাইওয়ে দিয়ে বহুবার অভি এসেছে। বিজলীর দোকান ওর অনেক দিনের চেনা।

মিষ্টি হেসে বিজলী জিজ্ঞেস করে,
-বহুত দিন বাদ। হাম তো সোচ রহ্যে থ্যে কে আপ লোগ জামশেদপুর ছোড় কে চলে গেয়ে। কহি আউর।
-জামশেদপুর ছোড়কে কাঁহা যায়েঙ্গে? আগর যায়েঙ্গে ফির ভি ওয়াপস আ যায়েঙ্গে।
অভির এই কথাগুলো শুনে দিয়ার মনে হল বলে,
“সত্যিই ফেরত আসবে তুমি অভি?”

ফুটন্ত চা থেকে তীব্র এলাচের গন্ধ চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। বিজলীর চায়ে চিনির পরিমাণ কখনও কম বেশী হয় না। বরাবরের মতো এই চা এখনও যেকোনো টি জয়ন্টের চা’কে হারাতে পারে। ওরা দুজনেই এরকম মনে করে। আর তাই যেকোনো অলস ছুটির দিনে ওরা এখানেই চলে আসত আগে।
চায়ের ভাঁড়ে চুমুক দিয়ে দিয়ার মনে হল এলাচ গন্ধের সবটুকু বিষাদ গিলে নিচ্ছে ও।

শীতকালে সুর্বণরেখা শুকিয়েই যায়। লোকে হেঁটেই পারাপার করে, মাছ ধরে। কিন্তু কাল রাত্রে বৃষ্টি হওয়ায় নদীর শরীরে একটু মাংস লেগে পৃথুলা লাগছে। একটা নৌকো ওপার থেকে এপারের দিকে আসছে। হঠাৎ দিয়া অভিকে থামতে বলে। বাইক থেকে নেমে নদীর পাড়ে গিয়ে মাঝির সাথে কথা বলে একেবারে নৌকায় উঠে পড়ে। হাতের ইশারায় অভিকেও ডাকে। দিয়ার চোখে একটু আগেই বিষণ্ণতা ছিল। এখন আর তা টের পায় না অভি।

এই ডাক ও উপেক্ষাও করতে পারে না। নৌকায় গিয়ে বৈঠা তুলে নেয় হাতে। জল কেটে কেটে এগোতে থাকে ওরা। মাঝ নদীতে নৌকা থামিয়ে দিয়াকে কাছে টেনে নিয়ে ও বলে,
-সেই প্রিন্সেপ ঘাটের দিনগুলো মনে পড়ে তোমার? নৌকোয় করে প্রথমবার
-হ্যাঁ। তারপর লোকটা এত বেশী টাকা চেয়েছিল যে তুমি ঘাবড়ে গিয়ে ঘামতে শুরু করেছিলে।
-তুমি না থাকলে আমি সত্যিই সেদিন বিপদে পড়তাম।
-কেন? আমি না থাকলে তুমি কি অন্য কাউকে নিয়ে যেতে?

আবার কথাটা অন্যদিকে ঘুরে যেতে পারে দেখে অভি চুপ করে যায়। একটা সিগারেট ধরায়। জ্বলন্ত সিগারেটের দিকে তাকিয়ে দিয়ার মনে হয় একটা শিকারি কুকুরের চোখ জ্বলছে যেন। ভাবনাটা মাথায় আসাতেই নিজেকে বোঝায়। চোখ নয় সিগারেটের আগুন। একটু মায়াও হয় ওর। ধীরে ধীরে গল্প করার ভঙ্গিতে বলে,
-শুধু শুধু ভয় পেয়েছিলে সেদিন। আমরা শুধু নৌকোয় করে ঘুরতে চেয়েছিলাম একটু। আমরা তো
নৌকোর ভিতর নিজেদের জন্য ঘর ভাড়া চাইনি। কেন দেবো বেশি টাকা? আর ভয়ই বা পাবো কেন?
দিয়া কথা বলতে বলতে অভির হাতটা চেপে ধরে। স্মৃতির ভেতর থেকে উঠে এসে বলে

-এইবার আমি খুব ভয় পাচ্ছি। খুব।
অভি দিয়ার হাতটা শক্ত করে ধরে,
-তুমি না চাইলে আমি না করে দেব।
হাতের মুঠো থেকে দিয়া হাত ছাড়িয়ে নিতে গেলে অভি আরও শক্ত করে ওর হাত চেপে ধরে। দিয়া জোর করে হাত ছাড়িয়ে নেয়। নৌকোটা একটু দুলে উঠল যেন।

-আমার চাওয়ার ওপর নির্ভর করে কথা দিয়েছিলে তুমি?
-দিয়া, আমি পিউরিটান নই। তোমার শরীর মনের ওপর তোমার পূর্ণ অধিকার আছে এ যেমন সত্য, একই কথা আমার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তাছাড়া, ওই পরিস্থিতিতে আমি না করতে পারিনি। তবুও আমি দেওয়া কথা ফিরিয়ে নেবো। তোমাকে অশান্তি দিয়ে কিছুই করতে চাইনা।
দুদিকে সজোরে মাথা নাড়তে নাড়তে দিয়া বলে,

-আমি কিচ্ছু চাইনা। তোমার যা মন চায় তাই করো।এখন তাড়াতাড়ি ওপারে চলো। আমার ভাল লাগছে না কিছুই আর। এই অযথা বাইক রাইড ভাল লাগছে না। এগুলো কি সান্ত্বনা পুরষ্কার? একটা অন্য মেয়ের জন্য…
-অন্য মেয়ে? শ্রীতমা কি অন্য মেয়ে? তুমি জানো না? সম্পর্কের শুরুতে আমি বলিনি তোমাকে?
-হ্যাঁ। তাই তো কপাল চাপড়াচ্ছি। এরপরও আমি তোমাকে বিয়ে করলাম?

দিয়ার এসব কথার জবাবে অভি কী বলবে ভেবে পায় না। এত অবুঝ যদি ও ইচ্ছাকৃত হতেই থাকে তাহলে অভিও আর কিছু বলবে না। চুপ করেই থাকবে সিদ্ধান্ত নেয়।
এরপর হাইওয়ে দিয়ে বাইকের ওপর দুটো মানুষ একেবারে নিঃশব্দে এগোতে থাকে। ওদের মাঝে দূরত্ব ক্রমেই বেড়ে চলে।

রাস্তা যত চওড়া ততই যেন দুপাশের সবুজ কমে আসছে। ধানক্ষেতের মাঝে সিমেন্টের কারখানাগুলো দেখে খুব রাগ হয় দিয়ার। নিজেকেই বলে –
-সভ্যতা অভিশাপ। যেখানেই সভ্য লোকজন সেখানেই নোংরামো।
অভি কথাগুলো শুনতে পায়। বাইক থামিয়ে তেড়ে ঝগড়া করতে চায়। কিন্তু থামে না। বরং স্পিড আরও বাড়িয়ে দেয়।
পতমদা এসে পৌঁছল যখন ঘড়িতে সাড়ে তিনটে। এর মধ্যেই স্বপনের ধাবা বন্ধ হয়ে গেছে। আগেও ওরা কতবার এসে মাংস ভাত খেয়েছে এখানে।

-এখন ফিরতে অনেক সময় লাগবে। যা খিদে পেয়েছে!
দিয়া নিশ্চুপ। অভি আশ্চর্য হয়ে যায়। খিদেও পায়নি ওর? হতাশ লাগে খুব। কিন্তু এই মুহূর্তে হতাশাকে পাত্তা দিতে রাজি নয় ও। তাই প্রস্তাব রাখে,
-চলো রাণিবাঁধ পেরিয়ে মুকুটমণিপুর যাই।
দিয়া তখনও কিছুই বলে না। অভি বাইক স্টার্ট দিলে পেছনের সিটে এসে বসে।

দিনের আলো তখনও বেশ জোরালো। রাণিবাঁধের জঙ্গল বেশ ঘন। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে খুব অল্প আলো এসে পড়লেও ওদের আলোর অভাব হচ্ছে না। মেঘলা দিনে আলো কমই থাকে। একটা পরিত্যক্ত বন্ধ একতলা বাড়ি দেখিয়ে অভি বলে,
-এটা ফরেস্ট গেস্ট হাউস। কি হাল হয়েছে? সত্যিই! কোনও রক্ষণাবেক্ষণ নেই?
দিয়া একবার কথা বলার জন্য ঠোঁট ফাঁক করে। কিন্তু কথাটা গিলে নেয়। ও বলতে চেয়েছিল,
-বাড়ি না ফিরে তোমার কি আজ এই গেস্ট হাউসে থাকার প্ল্যান?

অভি যেন শুনতে পেল কথাগুলো।
-আজ রাতে থাকলে মন্দ হতো না। দলমার হাতি তো সব এখন রাণিবাঁধেই। কাল সকালে একটা জঙ্গল সাফারি করতাম।
অভির মতো দিয়াও জঙ্গল ভালবাসে কিন্তু আজ এসব কিছুই ওর ভাল লাগছে না।
মুকুটমণিপুরে পৌঁছে ওরা মাংস ভাতই খেল। দুজন দুরকম মাংস খায়। দিয়া মুরগী আর অভি খাসি।
অভি ওর মোবাইলটা দিয়ার দিকে এগিয়ে দেয়-

-দেখো। শ্রীতমার সবকটা মেসেজ প্লিজ পড়ো?
দিয়া সেদিকে তাকালোই না। দূরের পাহাড়ে কী যেন খুঁজছে ও। হঠাৎ মনে পড়ল, এভাবে বলল,
-আমাদের ফিরতে হলে বিকেল থাকতে থাকতেই যেতে হবে। নাহলে সন্ধ্যে হয়ে এলে রাণিবাঁধ দিয়ে যাওয়া কি নিরাপদ?
অভিও সচেতন হল। সন্ধ্যে মানেই ঘন অন্ধকার এখানে। জঙ্গলের ভেতর দিয়ে দিয়াকে নিয়ে যাওয়া একদমই নিরাপদ নয়। নিজের জ্যাকেটটা খুলে দিয়াকে পরিয়ে দিয়ে বলল,
-তুমি একেবারে মাথায় পুরো হুডটা লাগিয়ে নাও। তোমার মুখ না দেখা গেলেই ভাল। একসময় তো রাণিবাঁধ খুবই ভয়ের জায়গা ছিল।

দিয়া জ্যাকেটের হুডে নিজের মুখ মাথা ভাল করে ঢেকে নেয়।
আবার ফেরার পথে অভি বাইকের স্পিড পঞ্চাশ ষাটের ওপর তুলে দেয়। এই জঙ্গলে বাইকে কোনও সমস্যা হলে সাহায্য করারও কাউকে পাওয়া যাবে না। অনেক দূরে দূরে গ্রাম। একটু সাবধান হয় ও। কিন্তু যা ভেবেছিল তাইই। বাইকের চাকা স্কিট করে গেল। অভি খুবই দক্ষতায় পড়ে যাওয়া থেকে বাঁচালো নিজেদের। টায়ার পাংচার তবুও হল।

অন্ধকার ক্রমশ গাঢ় হয়ে আসছে।শালপাতাগুলো অন্ধকার বাড়ার সাথে সাথে নিজেদের মধ্যে জড়াজড়ি করে আরও ঘন হয়ে রয়েছে। এখন সাহায্যের প্রয়োজন তবুও কোনও গাড়ির হেডলাইট দেখলেই ভয় পাচ্ছে ওরা। দিয়া এর মধ্যেও মাথা ঠাণ্ডা রেখে বলে,

-এখন এই অন্ধকারে আর কিছুই করা যাবে না। চলোগাড়িটা ঠেলতে ঠেলতে ফরেস্ট রেস্ট হাউসে নিয়ে যাই।
এছাড়া আর কী ই বা উপায়? অভি দিয়ার হাতে আলতো একটা চাপ দেয়। পর মুহূর্তেই মনে হয়, কোনও বুকিং নেই, ওই জীর্ণ তালাবন্ধ রেস্ট হাউসে গিয়েই বা কী সুবিধা করতে পারবে?
দূরে একটা আলো দেখা গেল। একটা স্কুটার আসছে। স্কুটারটা থামল।
-টায়ার?
ওরা দুজনেই সম্মতিসূচক মাথা নাড়ে।
-স্টেপনি নেই?
নাহ!

-সামনে যে ডাক বাংলোটা আছে সেখানে ঠেলতে ঠেলতে চলুন। কিছু একটা ব্যবস্থা করতে হবে।
ডাকবাংলো বলতে ওই ভাঙাচোরা গেস্ট হাউস। সেদিকেই দুজনে ঠেলতে ঠেলতে গাড়িটা নিয়ে যায়। রাতের রাণিবাঁধ মানেই আতঙ্ক। ওদের দুজনের মনেই ভয়। অভির বিশেষ করে। এতক্ষণ দিয়া একটাও কথা বলেনি। ওরও মনে ভয়। এই অচেনা লোকটা কি সত্যিই সাহায্য করবেন? না অন্য কোনও বিপদ এখনও অপেক্ষায়।

বহু কষ্টে বাড়িটার সামনে ওরা বাইকটা ঠেলে নিয়ে আসে। লোকটা তো এখনও এসে পৌঁছায়নি? আশেপাশে কেয়ারটেকার বা অন্য কোনও জনমানুষের টিকিও নেই। একটা ঘোর অনিশ্চয়তার মধ্যে অভি দিয়ার হাতটা ধরে বলে,
-আমারই কারণে আজ এই বিপদ। আমি সব না করে দেবো। সব। তুমি শুধু সাহস আর ধৈর্য রাখো। আমাদের আজকের এই বিপদটা পেরোতে দাও। মাথা ঠাণ্ডা থাকলে উপায় একটা ঠিকই হবে নিশ্চিত।
এর মধ্যেই স্কুটারের শব্দে বোঝা গেল। লোকটা এসেছে।

-চৌকিদারের জ্বর। আসতে চাইল না। কিন্তু চাবিটা দিল। বুকিং ছাড়া চাবি দেয় না। তবুও আমাকে চেনে তাই চাবি দিল। এখন চলুন যা ব্যবস্থা আছে এতেই রাতটা কাটাতে হবে আপনাদের।
লোকটাকে কীভাবে কৃতজ্ঞতা জানাবে ওরা বুঝতে পারল না। ভয় যদিও এখনও কাটেনি। লোকটাকে এখনও সম্পূর্ণ বিশ্বাস করতে পারেনি ওরা। এমনকি ভোর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই স্টেপনি নিয়ে লোকটা হাজির হলেও ওদের মনে হাজারো প্রশ্ন। এই প্রায় জনবিরল জায়গায় বাইকের চাকা পেল কী করে লোকটা?

-আমার বন্ধুর ঘর আছে তো এই জঙ্গলের কাছেই। আমার স্কুটারটাও একবার বসে গেছিল এখানে। তারপরই ওকে বলেছি। কিছু স্টেপনি, মোটরসারাইয়ের যন্ত্রপাতি রাখতে। যদিও কাজ শেখেনি এখনও। ওর বাপ মা দুজনেই জ্ঞানেশ্বরী লোকালের সেই বিস্ফোরণে মারা গেছে। ওর বাপই আসলে আমার বন্ধু। কিন্তু ছেলেটাকে নিজের কাছে ইচ্ছে থাকলেও নিয়ে যেতে পারলাম না আজও। এখন ও রুজি রোজগার কিছু শিখলে শান্তি পাই আমি।

বাইকের চাকা বদল করতে করতে অভি জিজ্ঞেস করে,
-কেন নিয়ে যেতে পারলেন না বাচ্চাটাকে? বাচ্চাটার আর কেউ নেই? ঠাকুমা দাদু?
-না বাবু। বাচ্চাটা অনাথ হয়ে গেল। আর ওকে কাছে না রাখতে পারার দুঃখ আমার সারাজীবন থাকবে।
অভি টায়ারের দাম ছাড়াও আরও বাড়তি কিছু টাকা দেয় লোকটাকে। লোকটা টাকাটা জামার পকেটে রেখে বলে,
-আসলে বাবু বুধুনের বাপ নয়, ওর মা আমার বন্ধু ছিল। দেশোওয়ালি আউরত। খুব গল্প করত আমার সাথে। আমার পরিবার সেসব সহ্য করতে পারেনি। আর এখন কমলি মারা গেছে তাও আমার স্ত্রীর ওর ওপর রাগ। বুধনকে আমার বাড়িতে আসতেই দেয় না।

বাইকে স্টার্ট দিয়ে অভি জিজ্ঞেস করে
-বাড়ি কোথায় তোমার?
-এই তো কাছেই।
‘কাছেই’ বলতে লোকটা কাছাকাছি কোনও গ্রাম বোঝায়।
-ওনার নাম জিজ্ঞেস করা হল না তো?

বাইক স্টার্ট দিলে দিয়া কথাগুলো বলে। বোধহয় কেউই শুনতে পায়নি। কোনও উত্তর ও পেল না।
দিনের আলোয় জঙ্গল বেশ মনোরম লাগছে আজ। দিয়ার মনে হয়, সত্যিই তো বন্ধুত্বের সংজ্ঞা আমরা নিজেরাই বদলে নিই। নাহলে কি এক বিষয় নিয়ে এত ঝগড়া অশান্তি? ঘর থেকে রাস্তা পেরিয়ে জঙ্গল অব্ধি ওদের সঙ্গেই রয়েছে? অভির জীবনে দশ বছর শ্রীতমা ছিল। বন্ধু হয়ে, প্রেমিকা হয়ে। অভির পুরনো প্রেম বিষয়ে ওর আগ্রহ ছিল না কখনও। এমনকি শ্রীতমার করোনারি ব্লকেজের রিপোর্টগুলো প্রথম যেদিন অভির কম্পিউটার টেবিলের ড্রয়ারে ও দেখল, খারাপ লাগেনি একটুও। অসুস্থ বন্ধুর পাশে দাঁড়ানো কর্তব্য। এই পর্যন্ত সব ঠিক ছিল।

শ্রীতমা মা হতে চায়। ওর শরীর সক্ষম নয়। শ্রীতমা আর ওর স্বামী দুজনেই সারগোট মাদার খুঁজছে। অথচ ভরসা করতে পারছে না কাউকেই ওরা। অভির সাহায্য চেয়েছে শ্রীতমা। নাওয়া খাওয়া ভুলে দিয়ার স্বামী সারোগেট মাদারের খোঁজে কোথায় না ছুটছে? আর এই ছোটার কারণেই সামনের সপ্তাহে শ্রীতমাকে নিয়ে অভি চেন্নাই যাবে। স্ত্রীর হার্টের সমস্যা ও পুরো বিষয়টা নিয়েই ওর স্বামী নাকি খুবই নার্ভাস। তাই ওরা দুজনেই অভিকে অনুরোধ করেছে যেন শ্রীতমার সঙ্গে ও চেন্নাই যায়। অভির এই এতটা জড়িয়ে পড়া দিয়ার মন মেনে নিতে পারেনি।

রাণিবাঁধ পেরিয়েই অভি বাইকের স্পিড আবার বাড়ায়। যত বেশী স্পিড তত বেশি ভাল লাগা একসময় দিয়ার ছিল। কিন্তু এত দ্রুতগতিতে গল্প করতে পারে না ও। তাই বলে,
-একটু আস্তে। কথা বলতে পারছি না যে।
-আচ্ছা স্লো করলাম। বল?
-ওই লোকটা সাহায্য না করলে কী যে হতো কাল আমাদের?
-হ্যাঁ, প্রয়োজনে সাহায্য পাওয়া আসলে আশীর্বাদ।
-তুমি ঠিকই বলেছ। আমার একটা প্রস্তাব ছিল।
-বাড়ি গিয়ে শুনবো।

-বাড়িই তো যাচ্ছি। কিন্তু কথাটা এখনই বলব। আর বিজলীর দোকানে চা’ও খাবো।
-ওকে ম্যাডাম। যো হুকুম। তোমারই ক্লান্ত লাগছে ভেবে তাড়া দিলাম।
-নাহ। ক্লান্ত লাগছে না আর।
দিয়া আজ আবার অভিকে আঁকড়ে রয়েছে। ওর কানের কাছে মুখ এনে বলে,
তোমার আর হন্যে হয়ে গর্ভযন্ত্র খুঁজতে হবে না। তোমার বন্ধুর সন্তানের জন্ম আমিই দেব। তুমি সব ব্যবস্থা কর।
অভি বাইকের স্পিড আরও বাড়িয়েছে। হাইওয়ে দিয়ে সত্যিই উড়ে যাচ্ছে একটা বাইক।